ঢাকা ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪

শুদ্ধাচার, শিক্ষক এবং আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৪, ১১:২৮ এএম
আপডেট: ১১ জুন ২০২৪, ১১:২৮ এএম
শুদ্ধাচার, শিক্ষক এবং আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়
শাহ নিসতার জাহান

আমাদের দেশে কদিন আগে দুটি ঘটনা খুব আলোড়ন তুলেছিল। সেটি এখনো খুব মুছে যায়নি। ঘটনাটি দুর্নীতি নিয়ে। আমাদের পুলিশের খুব বড় কর্মকর্তা জনাব বেনজীর আহমেদ, মিলিটারির সবচেয়ে উঁচু কর্মকর্তা জনাব আব্দুল আজীজ সাহেব হলেন এই আলোড়নের মূল। চাকরিতে থাকাকালে বেনজীর সাহেবের মতো ‘সৎ’ পুলিশ আমরা দেখেছি বলে মনে পড়ে না। শিক্ষক, সাংবাদিক আর নানা কিসিমের বুদ্ধিজীবী তার পায়ে হদ্দে দিয়েছেন। রাজনীতিবিদদের কথা বাদ। তারা পুলিশ বাহিনীকে মোটামুটি সাত আসমান দখলের ইজারা দিয়েছেন, আর সাংবাদিকদের দেহ ব্যবসায়ীর পর্যায়ে নামতে সাহায্য করেছেন। 

যেখানে নিজেরা নেমেছেন বহু আগে। আবার বেনজীর সাহেব শুদ্ধাচার পুরস্কার পেয়েছেন। আব্দুল আজীজ সাহেবকে দেওয়া গেল না, সম্ভবত নীতিমালার বাধায়। না-হলে, কোনো সমস্যা ছিল না। আবার, যেখানে নীতি নেই, সেখানে নীতির প্রশ্ন থাকেই বা কেন, তাকেও দিয়ে দিলেই হতো। বা এখনো দিয়ে দিলেই হয়। ল্যাঠা চুকে যায়। তারা সৎ এবং কর্মনিষ্ঠ ছিলেন এতে আমাদের আর সন্দেহ থাকা উচিত নয়। কারণ, দুজনেই ডক্টরেট পাওয়া লোক। কদিন আগে এই নিয়ে আফসোস করতে দেখেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে। 

নিশ্চয় অর্বাচীন শিক্ষক, না হলে এসব বিষয়ে আফসোস করে! তার আফসোস এদের ডেকে এনে পিএইচডি দেওয়া হলো। হয়তো স্বার্থ উদ্ধারে। কীভাবে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, সেটি এক মজার গল্প। শিক্ষার বাঘা বাঘা পণ্ডিতও এসব দেখে-শুনে টুঁ শব্দটিও করছেন না, কিংবা সাহস পাচ্ছেন না। আবার কেউ জান বাঁচাতে বেকুব হয়ে আছেন, তা নিয়ে মহাকাব্য লেখা সম্ভব। 

বলছিলাম আমাদের বড় কর্মকর্তাদের সততা নিয়ে। তারা ‘সৎ’ ছিলেন এবং সেজন্য পুরস্কার পেয়েছেন। মানে, ওই শুদ্ধাচার পুরস্কার (নাহ, আব্দুল আজীজ পাননি)। নিশ্চয় তাদের সততার যে অঙ্গীকার তা এক দিনে তৈরি হয়নি। তাদের ওপর সরকার এবং তার বাহিনীর নির্ভরতা ছিল প্রবাদসম। আমরা তাদের সততা দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। ফলে আমাদের সান্ত্বনা দিতে এখন তাদের দুষ্টতা একটু বেরিয়ে পড়েছে। মানে, বস্তা গলিয়ে একটু বেরিয়েছে। ঠিকঠাক জেরা করলে বহু কিছু বের হবে। তবে জেরা করবেন কে? 

সে এক অনন্ত অঙ্কের টাকার প্রশ্ন। অনন্ত অঙ্ক কেন? নাহ, এখন আর বিলিয়ন, মিলিয়নের হিসাব নিয়ে লাভ নেই, ওসব ওদের দুই আঙুলে এক তুরির ব্যাপার। এর আগে আমরা থলের বেড়াল বেরিয়ে পড়তে দেখেছিলাম। সেকালে শুদ্ধাচার পুরস্কার ছিল না। বেচারা নাবালক! ড্রাইভারের কারণে ধরা পড়ে গিয়েছিল। এখন, নিশ্চয় ‘শুদ্ধাচারীদের’ অসততাও এক দিনের ফল নয়। আমরা তাদের শুদ্ধতার জন্য পুরস্কার দিতে পারলাম মোটামুটি দ্রুত। সেটি করতে গিয়ে তাদের অসততার খবরই রাখলাম না। বরং নানাভাবে তাদের এই কাজে ইন্ধন দেওয়া হলো। 

আসলে অসততার বিনিময় হলো ওই শুদ্ধাচার। নাকি তার সম্পদ ও অর্থ সম্পর্কে দুদক বা সরকারের কেউ জানতেন না? সেটি কী করে সম্ভব? যিনি এক দিনে চারটি ফ্ল্যাট কেনেন, সেটি মাত্রই জানতে পারল সবাই। আর বাংলার বিভিন্ন পরগনায় তাদের জমিদারির খবর, সব জানছি এখন। 

সততার বদৌলতে তারা যে পুরস্কার আমাদের দেশ থেকে পেলেন তার বিনিময় তারা আমাদের দিয়েছেন নানাভাবে। না হলে এত সম্পদ পাচার কী করে সম্ভব? আমরা শুধু বুঝতে পেরেছি, আলোচনা হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে এবং অন্যান্য জায়গায়। শুধু কেউ শব্দ করিনি। কিন্তু এখন আমাদের কাছে সেগুলো সংবাদের কারণে প্রকাশিত হচ্ছে। 

আমাদের সাংবাদিকরা আবার এত ব্যস্ত যে, সবাই এসব গল্প তাদের, মানে ওই শুদ্ধাচারীদের চাকরিরত অবস্থায় প্রকাশ করতে পারেননি। পারেননি, কারণ এরা তখন সাংবাদিকদের কাছে বিশেষ নমস্য! পারেননি, কারণ বহু সাংবাদিকের রয়েছে নানা ব্যবসা। তাই কেউ এক বিন্দু লিখতে পারেননি এই শুদ্ধাচারী মানুষদের ‘শুদ্ধ জীবন-যাপন’ সম্পর্কে। খুব ভালো। এখন, এই দুই ব্যক্তি সম্পর্কে (বেনজীর এবং আজীজ) আমরা বেশ শুনছি। জনাব বেনজীরকে নিয়ে আমাদের দুদক বেশ তাগড়া। বেশ হম্বিতম্বি। তারাও খুব চুপ ছিল কিছুদিন আগে। 

এসব বিষয়ে, বিশেষত রাজনৈতিক বা অন্য কারণে কেউ একটু পিছিয়ে পড়লে দুদুক খুব শক্তি পায় মেরুদণ্ডে। সেটি না হলে, তারা আবার আধ্যাত্মিক লাইনে চলে যায়, দুনিয়ার কর্মকাণ্ডে তাদের মন বসে না। যেমন, এখন তারা নড়েচড়ে বসছেন। যেন এদের সম্পর্কে সমাজের মানুষ আগে কিচ্ছু জানত না। এবং তারাও কিচ্ছু জানতেন না। ফলে, তাদের শুদ্ধাচারী বানানো গেল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাংলাদেশে এরকম অফিসারের অভাব হবে না আশা করি। হাত বাড়ালেই কিংবা ঝাড়ু দিলেই আঠার মতো লেগে আসবে। শত শত। আরও তাজ্জব কাণ্ড হলো, এসব অফিসার এবং আমলা আমাদের বিশ্ববিদ্যাগুলোতে পর্যন্ত আসেন শুদ্ধাচার শেখাতে। 

অথচ তিনি তার অফিসের মানুষদের শুদ্ধ হওয়ার কাজটি করালেন না এবং করতে পারলেনও না। কারণ, সেখানে রয়েছে তারই সততা নিয়ে বিশাল প্রশ্ন। আবার, ওই আমলারাই চাইছেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন তাদের হাতে আসে। তাদের অভিযোগও খুব উত্তম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পড়াতেই তো পারেন না, প্রশাসন চালানো তাদের পক্ষে কী করে সম্ভব? ফলে, আপাতত রেজিস্ট্রার বা ট্রেজারারের পদটি তাদের দেওয়া হোক। কী আনন্দ, কী আনন্দ! বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নানা খবরদারি এখন কিন্তু বেশ লক্ষণীয়। 

আসলে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আমলাদের মাথাব্যাথার এই কারণ কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু মুরগি শিক্ষক। এরা শিক্ষকতার মূল কাজটি বুঝতে পেরেছেন কি না, আমি নিশ্চিত না। কোনো একটি সুযোগ পেলেই হলো, ওসব অফিসারের পায়ে মাথা রাখতে এদের কোনো সমস্যা নেই। এরা যতটা না শিক্ষকতার কাজে সময় দেন তার চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করেন তোষামোদে। কীভাবে ভিসির দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়, সেটিও এদের বড় আরাধনার বিষয়। এবং এদের তোষামোদে বহু ভিসি মুরগি ভিসিতে রূপান্তরিত হন। কিছু বিভাগে সাধারণত এরকম কিছু মুরগিপ্রধানও থাকেন। তিনি নিজ মেধায় কাজ করেন না। 

বিশেষত একাডেমিক কাজ। সেটি হয়তো করার যোগ্যতা তার নেই। ফলে, ব্যস্ত হন নয়-ছয়ে। তবে তা একা করেন না। অন্যের বয়ানে নিজের স্বপ্ন দেখেন। ফলে একটি বিভাগ হয়ে ওঠে তাদের যৌথ প্রযোজনার জায়গা। তারা দিবারাত্রি সাপ-লুডু খেলেন। নানা ফন্দিফিকির করেন। শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয় হওয়ার বিশাল আনন্দের স্বপ্ন দেখেন। তার মতো করে যে শিক্ষার্থী কথা বলেন তাকে কাছে টেনে নেন। তার অপছন্দের শিক্ষকটি সম্পর্কে ওই শিক্ষার্থী কী বলেন, সেটি মন দিয়ে শোনেন। কিন্তু শিক্ষার্থীকে আসল পথটি দেখাতে সব সময় ব্যর্থ হন। চুপচাপ কাজ করে যাওয়া শিক্ষকদের কোণঠাসা করার এক নিরন্তর আরাধনায় এরা সদা লিপ্ত। এই মুরগিরা কবে শুদ্ধাচার পুরস্কার পান, সেটি দেখা এখনো বাকি আছে। 

আমি বলছিলাম শুদ্ধাচারী অফিসারদের কথা। তাদের কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের মুরগি ভিসিরা এবং তাদের দল ডক্টরেট দিয়েছেন। এটি যতটা না শুদ্ধাচারীদের ইচ্ছা, তার চেয়েও বেশি ওই শিক্ষকদের আকুল প্রার্থনা। এই সময় গাভি বৃত্তান্তের লেখক বেঁচে থাকলে কী শিরনামে কী লিখতেন, সেটি এক কঠিন প্রশ্ন। কারণ, শিক্ষকরা এখন শো-ডাউনে কেবল ভিসির টেবিলের ময়লা পরিষ্কার করেন না, পুলিশদের বাসার টয়লেটও সাফ করেন।
 

লেখক: অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

বাজেট বাস্তবায়নে চাই সতর্ক নীতিকৌশল

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৪, ১১:৩৯ এএম
আপডেট: ১৩ জুন ২০২৪, ১১:৩৯ এএম
বাজেট বাস্তবায়নে চাই সতর্ক নীতিকৌশল
ড. আতিউর রহমান

সদ্য পেশ হওয়া বাজেটটিকে ঢালাওভাবে গতানুগতিক বলা ঠিক হবে না। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও চ্যালেঞ্জিং এই সময়ে যথেষ্ট কৌশলের সঙ্গেই এবারের বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা করা হয়েছে। তাই আগের চেয়ে আলাদাভাবেই তাকে বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করতে হবে। আমরা আরও আগে থেকেই বলে আসছিলাম যে, বাইরের এবং ভেতরের নানামুখী চাপে আছে আমাদের অর্থনীতি। 

বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং একাধিক ও অস্থিতিশীল বিনিময় হারের কারণে আমাদের অর্থনীতিতে নানা ধরনের টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। এক দিকে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে বৈশ্বিক অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থা এবং অন্যদিকে আমাদের নিজস্ব সামষ্টিক অর্থনীতির কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের চাপের কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই বড় রকমের অনিশ্চয়তা দানা বেঁধেছে অর্থনীতিকে ঘিরে। 

তা ছাড়া নতুন সরকারেরও এটি প্রথম বাজেট। কাজেই এই বহুমুখী চাপের মুখে প্রণীত বাজেট প্রস্তাবটিকে একটি বিশেষ বাস্তবতার প্রেক্ষাপটেই বিচার করতে হবে। সে বিচারে একেবারে শুরুতেই বলে নেওয়া দরকার যে, এই প্রস্তাবিত বাজেটটি প্রাথমিকভাবে দেখে একে বাস্তবতার প্রতি অনেকটাই সংবেদনশীলই মনে হচ্ছে। 

তবে বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠীপ্রীতি এবং অনৈতিক নীতি সুবিধা দেওয়ার কারণে বাজেটকে নিয়ে অর্থনীতিবিদদের প্রায় সবাইকে সোচ্চার হতে দেখে অবাক হইনি। একই সঙ্গে কর্মাভাব এবং মূল্যস্ফীতির তীব্র চাপে থাকা প্রান্তজনের কথা বিবেচনায় রেখে বাজেটটিতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আরেকটু কল্যাণমুখী হওয়ার সুযোগ যে ছিল, সে কথাটিও বলতে চাই। 

অবশ্য বাজেটটি সদ্যই সংসদে উত্থাপিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞসহ অন্য অংশীজনরা আরও চুলচেরা বিশ্লেষণ করবেন। জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনেও এখানকার প্রস্তাবনাগুলো নিয়ে আরও আলোচনা হবে। তখন আরও গভীরতর পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাওয়া যাবে। সংসদের ভেতরের পাশাপাশি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে বাজেট পর্যালোচনায় ভালোভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ নিশ্চয়ই করা যায়। 

তারা নিজ নিজ খাতের জন্য অন্তত তিনটি করে জনগুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয় পরামর্শ অর্থমন্ত্রীকে দেবেন, এ কথাটি যদি স্পিকার বলতেন, তাহলে বাজেট আলোচনায় খানিকটা নতুনত্ব আনা নিশ্চয়ই সম্ভব হতো। অন্তত প্রকৃত অর্থনীতি সম্পর্কিত কমিটিগুলো (যেমন: অর্থ, পরিকল্পনা, বাণিজ্য, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, জলবায়ু, পরিবেশ ইত্যাদি) যদি সংসদে স্থাপিত হেল্প ডেস্কের সাহায্য নিয়ে বাস্তবায়নযোগ্য দু-একটি করে উপযুক্ত পরামর্শ অর্থ মন্ত্রণালয়ে স্পিকারের মাধ্যমে পৌঁছে দিতে পারত, তাহলে তা পর্যালোচনা করে খসড়া বাজেট অনেকটাই প্রাসঙ্গিক করার সুযোগ পাওয়া যেত। 

ডিজিটাল প্রযুক্তির সুযোগ নিয়ে চলমান বাজেট আলোচনাকে এভাবেই আরও সময়োপযোগী করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ে এখন যথেষ্টসংখ্যক তরুণ মেধাবী কর্মকর্তা আছেন। তারা বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর ও বিভিন্ন হেল্প ডেস্কের প্রতিনিধিদের সহায়তা নিয়ে আসলেই গতানুগতিক বাজেট আলোচনাকে আরও উদ্ভাবনমূলক ও জনসম্পৃক্ত করতে সাহায্য করতে পারবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। 

আগের থেকেই সবাই ধারণা করছিলেন যে, এবারের বাজেটটি সাম্প্রতিক ধারার তুলনায় কিছুটা সংকোচনমুখীই হবে। ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি নিয়ে এগোচ্ছে। ফলে রাজস্ব নীতিতেও সংকোচনমুখিতাই কাম্য। কেননা আমাদের দুই পায়েই হাঁটতে হবে। যদিও মূল্যস্ফীতি বাগে আনার জন্য মুদ্রানীতির ভূমিকাই প্রধান। তবু রাজস্বনীতি তাকে শক্তি জোগাতে পারে।

২০১৯-২০-এ আমাদের প্রস্তাবিত বাজেট ছিল ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২৩-২৪-তে এসে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৭ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকার বেশিতে। অর্থাৎ এ সময়কালে গড়ে বছরে বাজেটের আকার বেড়েছে ৭.৬ শতাংশ হারে। আসন্ন ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও চলতি বছরের চেয়ে বাজেট বেড়েছে। তবে আগের হারে বাড়েনি। মাত্র ৪.৬ শতাংশ বেড়ে ৭ লাখ ৯৭ হাজার টাকা হয়েছে। ফলে বাস্তবতার প্রতি সংবেদনশীল বাজেট প্রণেতারা মুদ্রানীতির ধরনটির সঙ্গে মিল রেখে রাজস্বনীতিকেই সংকোচনের পথেই এগিয়ে নিতে চাইছেন বলে মনে হয়।

এবারের বাজেটে বাস্তবতার নিরিখে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি তথা এডিপিতে বেশি বেশি প্রকল্প বাবদ ব্যয় বরাদ্দ না রাখার পরামর্শ ছিল। সাম্প্রতিক পাঁচটি অর্থবছরে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৭ শতাংশ করে এডিপির আকার বেড়েছে। কিন্তু নতুন অর্থবছরের এডিপিতে চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিতর চেয়ে বরাদ্দ মাত্র ২ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। 

অর্থাৎ চলতি বছরের চেয়ে আসছে বছরের এডিপি বরাদ্দ বেড়েছে ১ শতাংশের কম। কাজেই নতুন নতুন উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়ার সময় আসছে বছরের জন্য সরকার যথেষ্ট সংযমী হচ্ছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা যাচ্ছে। মুদ্রানীতির সঙ্গে সমন্বয় করে রাজস্বনীতিকে সংযত রাখার অংশ হিসেবে বাজেট ঘাটতি ৪.৫ শতাংশ রাখার আকাঙ্ক্ষাটি বাস্তবতার নিরিখে মোটামুটি গ্রহণযোগ্যই বলা চলে। এ অবস্থায় আশা করা গিয়েছিল সামনের বছর প্রবৃদ্ধির ওপর আরও কম জোর দেওয়া হবে। 

কেননা সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। বেসরকারি বিনিয়োগ ২৩ শতাংশ জেনেও এই বাজেটে প্রবৃদ্ধি ৬.৭৫ শতাংশ আশা করা বেশ খানিকটা উচ্চাভিলাষীই বলা চলে। একই কথা বলা যায় মূল্যস্ফীতির প্রস্তাবিত হারের বেলাতেও। প্রায় দেড় বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি রয়ে গেছে। গত মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের বেশি এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতিও প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি। এই বাস্তবতায় এই হার সাড়ে ৩ শতাংশের মতো কমিয়ে সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা মোটেও সহজ হবে না। 

সে জন্য বাজেট ঘাটতি আরও কমিয়ে ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণের পরিমাণ কমানোর কোনো বিকল্প নেই। মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভের ক্ষয় রোধ এবং রাজস্বের হার বাড়ানো- এই তিনটি সূচকেই বাজেটকে আরও বেশি সংবেদনশীল হওয়ার কথা ছিল। কেননা আমাদের অর্থনীতির এই তিনটি ক্ষেত্রেই সক্ষমতার যে ঘাটতি আছে তা মেনে নিতে হবে। সংকটকালে এই আত্ম-উপলব্ধির গুরুত্ব অনেক। সমস্যার পেছনের উৎসগুলোর সঠিক সন্ধান করে চিহ্নিত করাও যে নীতি-বিচক্ষণতার অংশ সে কথাটি আমাদের মানতেই হবে। 

এই বাজেটে নিঃসন্দেহে সমস্যা চিহ্নিত করার একটা চেষ্টা দৃশ্যমান। কিন্তু সমাধানের উপায় ততটা স্পষ্ট নয়। প্রবৃদ্ধি নয় সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই আমাদের প্রধান কাজ- এই কথাটি আরও প্রাঞ্জল ভাষায় এই বাজেটে বলার সুযোগ ছিল। হয়তো এখনো আছে। বাজেট পাশের আগ দিয়ে অর্থনীতির নীতিনিরধারকরা এই বার্তাটি আরও স্পষ্ট করে দেওয়ার সুযোগ পাবেন। তারা সেই সুযোগ কতটা নেবেন সে ভিন্ন কথা।

নিশ্চয়ই আমরা সার্বিকভাবে বাজেটে সংকোচনমুখিতার পক্ষে। তবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো সামাজিক খাতে বরাদ্দ, কৃষির জন্য বরাদ্দ এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে সহায়ক খাতে/কর্মসূচিতে/ প্রকল্পে বরাদ্দে এই কাটছাঁটের প্রভাব যতটা সম্ভব কম ফেলা যায় ততই কল্যাণকর বলে মনে করি। 

মোট বরাদ্দের কত অংশ কোন খাতে গেছে, সেদিকে মনোযোগ দিলে দেখা যাচ্ছে যে আসছে বছরে সাম্প্রতিক অর্থবছরগুলোর মতোই মোট বরাদ্দকে বিভিন্ন খাতের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে। ফলে বলা চলে কাটছাঁটের প্রভাব সব খাতেই সমানভাবে পড়েছে। এ কারণেই আমরা মনে করছি বাজেটটি বাস্তবানুগ হলেও এটিকে আরেকটু আরও কল্যাণমুখী করার কথা ভাবা যেত। আরেকটু ন্যায়ানুগ করার সুযোগ নিশ্চয়ই ছিল।

প্রথমে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের কথা ধরা যাক। অন্যান্য বছরের মতো আসছে অর্থবছরের বাজেটেও এ খাতের জন্য মোট বাজেটের ৫ শতাংশের আশপাশের একটি অনুপাত বরাদ্দ রাখা হয়েছে (মোট বাজেটের ৫.২ শতাংশ)। আমরা দীর্ঘকাল ধরে এই অনুপাতটি ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলে আসছি। এবার অর্থনৈতিক চাপ থাকলেও এ অনুপাতটি বাড়ানো গেলে খুব ভালো হতো। 

মনে রাখতে হবে যে, দেশে মোট যে স্বাস্থ্য ব্যয় হয় তার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি জনগণকে নিজেদের পকেট থেকে দিতে হয়। সরকারের দেওয়া বাজেট দিয়ে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ২৩ শতাংশের মতো নির্বাহ হয়। তাই মূল্যস্ফীতিরকালে সরকারের দেওয়া স্বাস্থ্য বাবদ বরাদ্দ বাড়ানো গেলে দরিদ্র নাগরিকদের ওপর স্বাস্থ্য ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হতো।

শিক্ষা ও প্রযুক্তিতেও বরাবরের মতো বাজেটের সর্বোচ্চ অংশ (১৪ শতাংশের মতো) বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে প্রযুক্তি বাদ দিলে কেবল শিক্ষার দুটি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দকে বিবেচনায় নিলে এই অনুপাত কমে ১২ শতাংশের নিচে চলে আসে। প্রতিবারই এমন হয়। কিন্তু এবারে যেহেতু বাজেটের আকার আগের মতো হারে বাড়েনি, তার অর্থ দাঁড়ায় যে শিক্ষার বরাদ্দও আগের মতো বাড়েনি। কিন্তু বিরাজমান বাস্তবতায় আমাদের বিনিয়োগকে বলশালী করতে এবং প্রবাসী আয় বাড়াতে জনশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিশেষ মনোযোগ দরকার। 

জনশক্তি প্রশিক্ষণের ওপর আরেকটু জোর দিলে ভালো হতো। আর সে জন্য শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়িয়ে বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষার প্রসারে মনোনিবেশ করা জরুরি। বাড়তি বরাদ্দ মানেই অবকাঠামো উন্নয়নের বরাদ্দ ভাবলে চলবে না। অবকাঠামো বাবদ বাড়তি বরাদ্দ দিলে সেটি ব্যয় করার সক্ষমতার বিষয়টি আসে। কিন্তু যোগ্য শিক্ষকের অভাব আমাদের রয়েছে। কাজেই শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে তাদের বেতন-ভাতা বাবদ বাড়তি বরাদ্দ দিলে সেটি তো আর অব্যয়িত থাকার কথা নয়।

রাজস্ব আদায়ের জন্য বাড়তি চাপে থাকায় বাজেটে ব্যাপক হারে করের বোঝা চাপানো হবে- এমন আশঙ্কা অনেকে করেছিলেন। বাজেট প্রণেতারা শেষ পর্যন্ত সে পথে যাননি বলেই মনে হয়েছে। বরং অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় ‘কর ন্যায্যতা বৃদ্ধি’র জন্য দান/অনুদান করমুক্ত ও এতিমখানার গাড়িকে কর অব্যাহতি প্রদানের মতো কিছু শুভ উদ্যোগের কথা বলেছেন। 

তবে মূল্যস্ফীতির এই দুঃসময়ে বৈধ পথে সর্বোচ্চ ধাপের আয়ে ৩০ শতাংশ করারোপের বিপরীতে কালোটাকার ওপর তার অর্ধেক তথা ১৫ শতাংশ করারোপের প্রস্তাবটি নৈতিকতার বিচারে কতটা সঠিক, সে বিষয়ে যে অনেকেই প্রশ্ন তুলবেন তা এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়ে গেছে। 

নৈতিক অর্থনীতিকে বাজেট যে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, সে কথাটি বেশ জোরালোভাবেই অর্থনীতিবিদরা সামনে নিয়ে এসেছেন। একই বিচারে মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট বেশির ভাগ মানুষের আয় বিবেচনায় নিয়ে করমুক্ত আয়ের সীমা অপরিবর্তিত না রেখে আরেকটু বাড়ানোর কথা ভাবা যায়। এখনো সে সুযোগ আছে। মোবাইল ফোনে কথা বলার ওপর যে কর আরোপের কথা বলা হচ্ছে, সেটিও পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।

মোট রাজস্ব আদায়ের যে ৫ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটিকেও সময়োচিত মনে হচ্ছে। তবে এই কর আদায় করা হবে বড় চ্যালেঞ্জ। চলতি বছরে যে ৫ লাখ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল, সংশোধিত বাজেটে দেখা যাচ্ছে আদায় হয়েছে মাত্র ৪ লাখ ৮১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আসছে বছরে কর আদায়ের লক্ষ্য অর্জনে প্রথমত রাজস্ব বোর্ডের দক্ষতা উন্নয়ন ও ডিজিটাইজেশনে মনোনিবেশ করতে হবে। 

পাশাপাশি যারা কর দিচ্ছেন তাদের ওপর বেশি বেশি করের বোঝা না চাপিয়ে নতুন নতুন করাদাতাকে কর প্রদানে আগ্রহী করার নীতি গ্রহণ করতে হবে। অবশ্য বাজেট বক্তৃতায়  অর্থমন্ত্রী করের জাল সম্প্রসারণের দিকে নজর দেবেন বলে বলেছেন। বিদেশি বিনিয়োগ সংগ্রহের জন্য করনীতিকে ৫ থেকে ১০ বছরের মতো স্থিতিশীল রাখা, সরাসরি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের লভ্যাংশ ও পুঁজি সহজেই স্থানান্তর করা এবং স্থিতিশীল বিনিময় হার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাজেটে আরও স্পষ্ট উচ্চারণ আশা করেছিলেন অনেকেই।

আশা করছি, বাজেট পর্যালোচনায় এসব বিষয়ের ওপর সংসদ সদস্য ও বিশেষজ্ঞ মহল যথেষ্ট আলো ফেলবেন। আর নীতিনির্ধারকরা এসব পরামর্শের আলোকে প্রস্তাবিত বাজেটটি সংশোধন করে তাকে আরও গ্রহণযোগ্য করে চূড়ান্তভাবে পাস করবেন।

সব মিলিয়ে প্রাথমিক বিচারে এবারের বাজেটিতে সময়ের দাবি প্রতিফলিত হয়েছে বলা চলে। তবে যেহেতু অনেকখানি কাটছাঁট করতে হয়েছে, তাই এই সংকুচিত বাজেট বাস্তবায়নে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি দক্ষতা ও নিষ্ঠার পরিচয় দিতে হবে। নীতিনির্ধারকদের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তৎপরতা দেখাতে হবে। কেননা আয় বুঝে ব্যয় করার সংস্কৃতিকে পোক্ত না করতে পারলে বাজেট ঘাটতি বরং আরও বেড়ে যাবে।

সম্পদের অপচয় হবে। সে অবস্থায় তরুণদের জন্য বাড়তি কর্মসংস্থান এবং প্রকৃত আয় কমে যাওয়া প্রান্তজনের জন্য সামাজিক সুরক্ষার কৌশলটি বাস্তবায়ন করা আরও কঠিন হয়ে যাবে।

লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক
[email protected]

গবেষণার অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো র‌্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৪, ১১:৩৩ এএম
আপডেট: ১৩ জুন ২০২৪, ১২:০৪ পিএম
গবেষণার অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো র‌্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে
সৈয়দ ফারুক হোসেন

বাংলাদেশের ৫৩তম বাজেট প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। এটি বর্তমান সরকারের টানা চতুর্থ মেয়াদের প্রথম বাজেট, টানা ১৬তম এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ২১তম বাজেট। আর অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর প্রথম বাজেট। চলতি বছর বাজেটের প্রতিপাদ্য করা হয়েছে ‘সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে অঙ্গীকার’। আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য বাজেটের আকার চূড়ান্ত করা হয়েছে ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। 

এটি চলতি বাজেটের তুলনায় ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি। টাকার অঙ্কে বাড়ছে ৩৫ হাজার ২১৫ কোটি টাকা। গত বছরের পঞ্চম বাজেট ঘোষণা ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের টানা তৃতীয় মেয়াদের শেষ বাজেট। গত দেড় দশকে বর্তমান সরকার বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় স্মার্ট বাংলাদেশ চারটি মূল স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত হলো। স্মার্ট সিটিজেন, স্মার্ট গভর্নমেন্ট, স্মার্ট সোসাইটি এবং স্মার্ট ইকোনমি। 

২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় ৪৪ হাজার ১০৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যা ছিল ৪২ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা। এবার বেশি প্রস্তাব করা হয়েছে ১ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা। অপরদিকে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য ১১ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ১০ হাজার ৬০২ কোটি টাকা। 

সেই হিসাবে এবার ১ হাজার ১৮১ কোটি টাকা বেশি প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় শিক্ষাক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। ফলে মানব উন্নয়ন সূচকে ভারত ও পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ ১৯২ দেশের মধ্যে ১২৯তম স্থানে অধিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষার বাজেট দীর্ঘদিন ধরে ২ থেকে ৩ শতাংশের আশপাশেই থাকছে। বাজেটে শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব না দেওয়া হলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে তার জনগণকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হিমশিম খাবে। 

বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে শিক্ষায় বাজেট বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুযায়ী মোট জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করতে হবে। প্রতিবছরই নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে, শিক্ষার্থী বাড়ছে। কিন্তু সে অনুযায়ী বাজেট বাড়ছে না। ফলে গবেষণা তেমন হচ্ছে না।

আমরা আশা করব, আগামী দিনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শিক্ষা হবে সবচেয়ে বড় মেগা প্রকল্প। শিক্ষার্থীরা এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে  বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা করে গবেষণা এবং জ্ঞান আহরণ করে দক্ষ হয়ে সুনাগরিক হবে। আমাদের দেশে গবেষণার পূর্ণাঙ্গ সংস্কৃতি ও আবহ এখনো গড়ে ওঠেনি। কারণ আমাদের দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে বড় একটি অংশ স্নাতক সম্পন্ন করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। দেশে গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে বিদেশেই গবেষণাকর্ম করছেন শিক্ষার্থীরা। 

স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে সবার আগে স্মার্ট শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভাবনীমূলক উদ্যোগ সামনে নিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগগুলোকে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে। 

শিক্ষার ভিত্তিমূল হলো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর। প্রাথমিক শিক্ষার গোড়া মজবুত না হলে পরবর্তী স্তরের শিক্ষা জাতির জন্য তেমন কাজে আসে না। এ দেশের বিপুল জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে কর্মমুখী শিক্ষায় জোর দেওয়া উচিত। এ ছাড়া গবেষণা ক্ষেত্রে বেশি পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া উচিত। মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়ন করতে হলে বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার এবং বণ্টন উভয়ই নিশ্চিত করতে হবে। 

বিশ্বের কোনো দেশ উন্নত মানের গবেষণার অবকাঠামো তৈরি না করে ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি। দক্ষ জনসম্পদ গড়ে তুলতে গবেষণামূলক শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আধুনিক শিক্ষায় পারদর্শী করে তোলে এবং তাদের সৃজনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সব শিক্ষার্থীর হাতে ডিজিটাল যন্ত্রের অভাব ও দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ, যা বাংলাদেশের অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে সবচেয়ে বড় অন্তরায়। শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিকায়নে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, তার অধিকাংশেরই শিক্ষাবিজ্ঞানে বিশেষজ্ঞ জনবল নেই। 

ফলে প্রচুর বিনিয়োগের পরও প্রায়ই কাঙ্ক্ষিত ফললাভ সম্ভব হচ্ছে না। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে যুগের চাহিদা বিবেচনা করে বিশেষায়িত শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে এবারের বাজেটে আরও সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলে ভালো হতো। সেই সঙ্গে প্রযুক্তি বিদ্যার সঙ্গে সঙ্গে মানবিক ও কলাবিদ্যার উন্নয়নের জন্য নির্দেশনাসহ তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরও বিশেষ ভূমিকা পালন করা হলে সবার জন্য খুবই উপকৃত হতো। 

বাংলাদেশে মেধাবী লোকবলের অভাব নেই। মেধাবী এই লোকবলকে সঠিকভাবে ব্যবহার করলে আমরা আরও উন্নতির দিকে এগিয়ে যাব। তাই বাড়াতে হবে গবেষণা এবং তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন জরুরি। একটি দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নির্ভর করে গবেষণার ওপর। গবেষণা খাত দেশের অর্থনীতিকে করে সমৃদ্ধ এবং সামাজিক সক্ষমতাকে পরিপূর্ণতা দান করে। 

শিক্ষার গঠনগত পরিবর্তন, প্রসার ও মান বৃদ্ধিকরণে গবেষণার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর শক্ত ভিত্তি স্থাপনের মূল হাতিয়ার হচ্ছে সুষ্ঠু গবেষণা খাত। গবেষণা খাতকে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে দেশীয় অর্থনৈতিক খাতে আর্থসামাজিক উন্নয়ন বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও দেশের আলাদা স্থান তৈরি করা সম্ভব। 

সভ্যতা আজ অনেক এগিয়েছে। এটি সম্ভব হয়েছে মানুষের নতুন নতুন কিছু বের করা বা গবেষণা করার ক্ষমতার মাধ্যমে। মানুষ প্রতিনিয়ত গবেষণা করে তার সামনে থাকা সব সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করেছে এবং এভাবেই তারা ধীরে ধীরে তাদের সভ্যতা গড়ে তুলেছে। এই গবেষণার জগতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি।

টাকার অঙ্কে প্রতি অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বাজেটে বরাদ্দের পরিমাণ বাড়লেও বাজেটের আকারের অনুপাতে তা সন্তোষজনক নয়। শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার দিকে আমাদের মনোনিবেশ করতে হবে। পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ না থাকলে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা যথাযথভাবে না হলে আমরা হয়তো অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে বিস্তর নগরায়ণ এবং শিল্পায়ন করতে পারব, কিন্তু বিশ্ব জ্ঞানসূচকে ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ব।

আর যে উন্নয়নের পেছনে জ্ঞানের ভিত্তি থাকে না, সে উন্নয়ন কখনোই টেকসই ও মজবুত উন্নয়ন হয় না। তাই একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণে শিক্ষার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা ও গবেষণা খাতের বাজেট আরও বাড়ানো জরুরি।

লেখক: রেজিস্ট্রার, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর
[email protected]

‘কালো? তা সে যতই কালো হোক’

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৪, ১১:৪৫ এএম
আপডেট: ১২ জুন ২০২৪, ১১:৪৫ এএম
‘কালো? তা সে যতই কালো হোক’
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

রবীন্দ্রনাথ কৃষ্ণকলি নামের একটি কালো মেয়েকে নিয়ে যে গান রচনা করেছিলেন, তার মধ্যে যে সৌন্দর্য তিনি অবলোকন করেছিলেন, তার ঠিক ১২৪ বছর পর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সদ্য প্রস্তাবিত বাজেটে নয়া আয়কর আইনের প্রথম তফসিলে ‘‘অংশ ৩’ হিসেবে অপরিদর্শিত পরিসম্পদ প্রদর্শন’’ (ব্যবহারিক অর্থে কালোটাকা সাদা করা) শিরোনামে একটি অনুচ্ছেদ সংযোজনের বিষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সূত্রপাত ঘটেছে। 

প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো যে, টাকার আয় এবং আয়ের উৎস ঘোষণা না দিয়ে রাষ্ট্রের প্রাপ্য কর ফাঁকি দেওয়া হয় বা যায়, যে টাকা অবৈধভাবে অর্জিত, সে টাকাই কালোটাকা। মূলত এবং মুখ্যত এই কালোটাকাই যেকোনো অর্থনীতিতে আয়বৈষম্য, প্রতারণা, বঞ্চনা, অস্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ব্যত্যয়ের প্রমাণক, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও ন্যায়নীতিনির্ভরতাবিহীনতারই সূচক এবং অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্তির পরিবর্তে বিচ্যুতির মাধ্যমে সমূহ ক্ষতি সাধনের প্রভাবক ভূমিকা পালন করে এ কালোটাকা। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে আবহমান কাল থেকে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি নানান আঙ্গিকে বিচার-বিশ্লেষণের অবকাশ উঠে আসে। 

কালোটাকা সাদা করার পদ্ধতি-প্রক্রিয়া নিয়ে নানান মতভেদ যাই-ই থাকুক না কেন, এর বিধিব্যবস্থা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সামাজিক অর্থনীতি তথা রাষ্ট্রের এখতিয়ার, সরকার পরিচালিত রাজনৈতিক অর্থনীতির হওয়া উচিত নয়; অবশ্যই কালোটাকা সমাজের বা সরকারের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অনৈতিকতা ও অব্যস্থাপনার সৃষ্টি, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ন্যায়-ন্যায্যতা ও নীতিনির্ভরতায় বিপুল ব্যর্থতার প্রতিফল। 

সাম্প্রতিক বৈশ্বিক নজির থেকে দেখা যায়, তুলনামূলক সুশাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ পাওয়ার পর হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, ইরান, নিকারাগুয়া, বলিভিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে উঠতে পেরেছে। এসব দেশ প্রথম পর্বে কালোটাকাকে প্রযত্ন দিতে সাদা করাকে গুরুত্ব দিত, পরবর্তীকালে শক্ত হাতে কালোটাকার সৃষ্টির উৎস বন্ধ করার রাষ্ট্রীয় প্রতিবিধান জোরদার করার ফলে সেসব দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নে চমকপ্রদ গতিসঞ্চার হয়েছে। 

আরও খোলাসা করে বলা যায়, যেমন সুহার্তোর ১৯৬৫-৯৮ সালের ৩৩ বছরের শাসনকে ইন্দোনেশিয়ার উন্নয়নতত্ত্বে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ আখ্যায়িত হতো, গত দুই দশকে সর্বগ্রাসী দুর্নীতি কমিয়ে সুশাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় সমর্থ হওয়ায় সেখানে এখন অর্থবহ উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে বা হচ্ছে। 

আমাদের এই উপমহাদেশে ১৯৫৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত কর আহরণ পদ্ধতি সংস্কার কর্মসূচির আওতায় তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার দুর্নীতিতে নিমজ্জিত অর্থনীতি থেকে কালোটাকা সাফ করার উদ্যোগ নিয়েছিল, দুর্নীতি দমনের ঘোষণা দিয়ে আসা সামরিক সরকার তা লেজেগোবরে মিশিয়ে ফেলে। সেখানে উদ্দেশ্য ও বিধেয়র মধ্যে বিস্তর ফারাক ছিল। 

ভারতীয় প্রজাতন্ত্র ১৯৯৭ সালে ভলান্টারি ডিসক্লোজার অব ইনকাম স্কিম অ্যান্ড ইমপোজিশন অব ট্যাক্স অ্যাক্ট জারি করে। ভিডিআইএস প্রবর্তনের পর ভারতের কম্পট্রোলার জেনারেল তার এক প্রতিবেদনে এ স্কিমের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি এই ব্যবস্থাকে as abusive and a fraud on the genuine taxpayers of the country বলে অভিমত দেন। [সূত্র: Rediff.com » Business » Cut your tax bill to just 2-3%, by Sunil Jain May 31, 2004 12:52]

বাংলাদেশে বছর বছর কালোটাকাকে কর প্রদানের সময় ‘অপ্রদর্শিত অর্থ’ সংজ্ঞায়িত করে গুরুতর অপরাধটিকে হালকা করার অবস্থান নেওয়াকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে সমালোচনা হচ্ছে। সংবিধানের ২০(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসেবে কোন ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবেন না।’ 

সংবিধানের এ বিধানমতে ‘অনুপার্জিত আয়’ যদি কালোটাকা হয়, তাহলে কালোটাকার সংজ্ঞা ‘অপ্রদর্শিত অর্থ’ এবং এ সংজ্ঞা দুর্নীতির সঙ্গে কালোটাকার যে ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে, সেটাকে অনেকটাই গৌণ বা লঘু করে দিচ্ছে কি না, তা আইনবেত্তাদের দেখা এবং এর পরীক্ষা পর্যালোচনা প্রয়োজন বলে সুশীল সমাজ থেকে অভিমত প্রকাশ করা হয়েছে। 

এটা অনস্বীকার্য যে, অনেক সময় বৈধভাবে অর্জিত অর্থের ওপর যেমন জমিজমা, অ্যাপার্টমেন্ট, প্লট, দোকান ইত্যাদি রিয়েল এস্টেট ক্রয়-বিক্রয়ে প্রকৃত দাম না দেখিয়ে কম দাম দেখালে রেজিস্ট্রেশন খরচ, স্ট্যাম্প খরচ, সম্পদ কর ও ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া যায়। 

এসব ক্ষেত্রে কালোটাকাকে ‘অপ্রদর্শিত অর্থ’ বলাই সংগত এবং তা প্রদর্শনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই বছর বছর সময় দিয়ে, বিদ্যমান করহার হ্রাস করে নয়। উপরন্তু জরিমানা দিয়ে তো বটেই। আয়কর আইনে প্রযোজ্য কর, জরিমানা পরিশোধ করে অপ্রদর্শিত অর্থ প্রদর্শনের সুযোগ রাখাই আছে।

প্রসঙ্গত, ২০০৭-০৮ অর্থবর্ষে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (জুলাই-সেপ্টেম্বর, ২০০৮) প্রযোজ্য করসহ বছরপ্রতি ১০ শতাংশ হারে (সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ) জরিমানা দিয়ে এ-জাতীয় অপ্রদর্শিত আয় ‘প্রদর্শন’ বা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সময় শেষ হওয়ার পর যাদের কাছে অপ্রদর্শিত আয়ের টাকা পাওয়া যেত, তাদের বিরুদ্ধে আয়কর আইনেই জেল-জরিমানার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছিল।

সে সময় এ স্কিম ইতিবাচক ফলাফল এনে দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে সময়সীমা অবারিত করে দিয়ে, জরিমানা না দিয়ে, হ্রাসকৃত হারে কর দিয়ে এবং অপ্রদর্শিত আয়ের উৎস সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করা হবে না, এ ধরনের ইমিউনিটি দিয়েও কালোটাকা সাদা করায় সাড়া পাওয়া যায়নি। কালোটাকার রাজনৈতিক অর্থনীতির এই চেহারা ও চরিত্র সবার জন্যই বেশ উদ্বেগজনক। 

হল-মার্ক, বিসমিল্লাহ, এমএলএম কেলেঙ্কারি, রাতারাতি মালিকানা দখলকারী ব্যাংক ও লিজিং কোম্পানির সাগর চুরির পর, বেশি দিন আগের কথা নয়, ক্যাসিনোকাণ্ড, প্রখ্যাত প্রতারক, স্বনামধন্য গাড়িচালক ও গোল্ডেন ব্যক্তিনিচয়ের ছিটেফোঁটা কেচ্ছাকাহিনি থেকেও তো অনুমান করা চলে কী ধরনের আয়বৈষম্য বৃদ্ধি তথা ক্ষরণের শিকার হতে চলেছে এই অর্থনীতি। 

স্বেচ্ছা সহনশীল সলিলা (রেজিলিয়েন্ট) শক্তির জোরে আমজনতার ইমিউন পাওয়ার এখনো বলশালী বলেই অর্থনীতি আপাতত স্ট্রোক করছে না। এটাকেই আত্মতুষ্টির হেতু ধরে নিয়ে অর্থনীতির মৌল সহায়ক নৈতিক শক্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা থেকে বিরত থাকাটাই হবে, এর ভালো থাকতে দেওয়ার অন্যতম উপায়। প্রতিকার, প্রতিবিধান ছাড়া কালোটাকা অর্থনীতির জন্য অর্থনীতির ভালো ফল বয়ে আনতে পারে না। 

সৎ ও নিয়মিত করদাতা ১৫-২৫ শতাংশ কর দেবেন আর কালোটাকার মালিক ১০-১৫ শতাংশ কর দিয়ে টাকা সাদা করতে পারবে, এ নীতির ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত যে বছরের পর বছর ৭-৮ শতাংশের নিচে রয়ে যাচ্ছে, তার অনেকগুলো কারণের মধ্যে এহেন অনৈতিক নীতির পরিপোষণ এবং কালোটাকার দাগি আসামিকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়াও একটি।

কয়েক বছর আগে কালোটাকায় কেনা স্থাবর সম্পত্তি এখন নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া হলে বিগত বছরগুলোতে এ সম্পত্তি ব্যবহারজাত আয়ের ওপর কর আহরণের বিষয়েও ছলচাতুরির প্রশ্রয় দেওয়া হবে। এই নজিরের ফলে এ ধরনের খাতে কর প্রদানে বিলম্ব বা বিরত থাকার প্রবণতা বাড়বে। 

যারা রাষ্ট্রের সব নিয়মকানুন মানার বাধার বিন্ধাচল পেরিয়ে স্থাবর সম্পত্তি, অর্থনৈতিক শিল্পাঞ্চল, হাইটেক পার্ক, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছেন, তাদের সেই পরিশ্রম ও কর প্রদান অপমান, অবমাননার শিকার হবেন যদি এখন বিনা ব্যাখ্যায়,  জরিমানা ও কর প্রণোদনা দিয়ে ‘আধার দিয়ে মাছ ধরার মতো’ উপায়ে কালোটাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়। অর্থনীতিতে, বিশেষ করে কর রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে নৈতিক দাবি দুর্বল হবে এবং তার সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। 

অর্থনীতিতে কালোটাকা ফিরিয়ে আনার প্রথম ও প্রধান উপাদেয় উদ্দেশ্য জরিমানা ও নিয়মিত কর আদায়, তারপর পুষ্টিকর খাতে সেই অর্থ বিনিয়োগ। কয়েক বছর আগে কালোটাকায় কেনা স্থাবর সম্পত্তি কিংবা পুঁজিবাজারে মাত্র সীমিত সময়ে লক-ইন করে রাখা বিনিয়োগ থেকে অর্থনীতির জন্য লাভের চাইতে ‘দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন’ নীতিভ্রষ্টতার দোষে ক্ষতিই বেশি হয়েছিল বলে ইতোমধ্যে প্রতীয়মান হয়েছে। 

জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের সম্পদের পাহাড়চুম্বী উন্নতি আয়বৈষম্যের বাহ্যিক এবং রাজনৈতিক অর্থনীতির গজেন্দ্রগামিতার প্রমাণ- এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না। নানান আঙ্গিক ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরীক্ষা পর্যালোচনায় কালোটাকা পুষ্টিসাধনের নিমিত্তে অর্থনীতিতে ফিরে আসার পরিবর্তে অর্থনীতি বরং কালোটাকামুখী হওয়ার আশঙ্কা প্রবল হয়েই চলেছে। কালোটাকা গণতন্ত্রসহ সব নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে সংক্রমণ এবং দখল করার পথে ধাবমান। 

ভারতের সিঅ্যান্ডএজি এবং দেশের সুশীল সমাজের পর্যবেক্ষণ (বণিক বার্তায় ২৩ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে প্রকাশিত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মইনুল ইসলামের নিবন্ধ দ্রষ্টব্য) অনুসারে বলা যায়, সামান্য কিছু অর্থ দুর্নীতিবাজ হ্রাসকৃত কর দিয়ে বৈধ করে নিলে ওই বৈধকরণের নথিপত্রগুলো তাদের হাজার হাজার কোটি কালোটাকা নিরাপদে রেখে দেওয়ার ভালো দালিলিক সুরক্ষা দিতে পারে। 

ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে কালোটাকা আড়াল করার ভালো ব্যবস্থার সুবাদে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জনের মানেই হলো একটা সুনির্দিষ্ট সমঝোতা-নেটওয়ার্কের সহায়তায় দুর্নীতিবাজরা নিজেদের সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে সমর্থ হচ্ছে। এটি দৃশ্যত দুর্নীতিবাজদের জন্য সম্ভাব্য দুর্নীতি দমনের জাল থেকে পলায়নের পথ খুলে দেওয়ার শামিল। এ ব্যবস্থা রাখার মাধ্যমে কালোটাকার মালিকদের সিগনাল দেওয়া হচ্ছে যে, এ সুবিধা নিলে তাদের দুর্নীতিকে দমন করা হবে না। 

‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে’- এই চিন্তাচেতনাকে আড়াল করতে ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’র প্রবণতায় কালোটাকা সৃষ্টির প্রেরণা ও প্রযত্ন প্রদানের নীতি সর্বতোভাবে পরিত্যাজ্য। রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘দুর্নীতিজাত অনুপার্জিত আয়’ এর উৎস, উপায় ও উপলক্ষ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ করা। অবৈধভাবে অর্জিত বা আয়ের জ্ঞাত সূত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন যেকোনো অর্থবিত্তকে কালোটাকা অভিহিত করার যে আইনি অবস্থানে রয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ সেটাই সাংবিধানিকভাবে বেশি যৌক্তিক। 

এর আলোকে দুর্বৃত্তায়নের ভয়াবহ বেড়াজাল থেকে আইনের আওতায় ‘মার্জিনখোর রাজনীতিবিদ, ঘুষখোর সুশীল সেবক (আমলা) এবং মুনাফাবাজ, কালোবাজারি, চোরাকারবারি, ব্যাংকঋণ লুটেরা ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের’ অপরাধের শাস্তি বিধান করা হলে সমাজে ও অর্থনীতিতে একটা ইতিবাচক মেসেজ যাবে। জরিমানা ছাড়া অত্যন্ত হ্রাসকৃতহারে কর প্রদানের সুযোগ এবং ‘অর্থের উৎস নিয়ে আয়কর কর্তৃপক্ষসহ অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে না’ জাতীয় বিধান জারি বলবৎ থাকলে দেশ, সমাজ ও অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎজ-এর কনসেপ্ট ‘নৈতিক বিপদ’-এর উপস্থিতি হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাবে। 

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক

আইসিসি টি-২০ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের টুকিটাকি

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৪, ১১:৪১ এএম
আপডেট: ১২ জুন ২০২৪, ১১:৪১ এএম
আইসিসি টি-২০ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের টুকিটাকি
ডা. নাফিসুর রহমান

টি-২০ বিশ্বকাপের ১৮টি খেলা হয়ে গেল। অর্থাৎ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলা হয়ে গেছে। কেমন হচ্ছে বিশ্বকাপ? খেলা তো আমরা সবাই দেখছি। নতুন কিছু টিম এসেছে এবার। অনেকেই এই টিমগুলোর খেলা খুব একটা পছন্দ করছেন না। অনেকে প্রশ্ন করেন, বিশ্বকাপে অযথা এসব আনাড়ি টিম নিয়ে আসার প্রয়োজনই-বা কী? যেহেতু বিশ্বকাপ, তাই এই প্রশ্নের পেছনে হয়তো যুক্তি আছে। 

কিন্তু অপর পক্ষে এই টিমগুলোকে সুযোগ না দিলে বিশ্বব্যাপী ক্রিকেটের সম্প্রসারণও তো সম্ভব নয়। অ্যাসোসিয়েট দলগুলো ক্রিকেটের সর্বোচ্চ মঞ্চে এসে খেলার সুযোগ না পেলে ভালো খেলার স্বীকৃতিই-বা পাবে কীভাবে? এগুলো ভেবেই আইসিসি এবার থেকে বিশ্বকাপের পরিধি সম্প্রসারণ করেছে। আর সেরা দলগুলো যেন নিজেদের মধ্যে আবার খেলতে পারে, এ জন্য সেরা আটটি দল নিয়ে দ্বিতীয় পর্বেও লিগ বেসিসে খেলার সুযোগ রেখেছে। তার পর হবে সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল। মোট ৫৫টি খেলা। 

কানাডা, উগান্ডা এবং যুক্তরাষ্ট্র এবারই প্রথম বিশ্বকাপের আসরে এসেছে। নেপাল এবং পাপুয়া নিউগিনির জন্য এটি দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। ওমান এবং নামিবিয়ার জন্য তৃতীয় বিশ্বকাপ। কেমন খেলছে এই নতুন দলগুলো? পাপুয়া নিউগিনিকে হারিয়ে উগান্ডা তাদের প্রথম বিশ্বকাপে খেলায় জয় পেয়েছে। নামিবিয়া প্রথম খেলায় সুপার ওভারে জয় পেলেও দ্বিতীয় খেলায় হেরেছে। আর চমক দেখিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। 

এবারের আসরে প্রথম খেলাটি ছিল স্বাগতিক দেশ যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের প্রতিবেশী দেশ কানাডার মধ্যে। দুই দলের জন্যই প্রথম বিশ্বকাপ। টস জিতে যুক্তরাষ্ট্র কানাডাকে ব্যাটিং করতে পাঠায়। কানাডা ১৯৪ রানের এক বিশাল স্কোর করে বসে। এত বড় স্কোর টপকে জেতা খুব সহজ কাজ নয়। তার পরও যুক্তরাষ্ট্র খেলায় জেতে এবং ১৪ বল হাতে নিয়েই জয়লাভ করে। দুই দল মিলিয়ে রান ওঠে ৩৯১। বিশ্বকাপের ইতিহাসে যেকোনো খেলার সম্মিলিত রানের হিসেবে এটি চতুর্থ স্থান করে নিয়েছে। 

সম্মিলিত সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড হলো ৪৫৯। ২০১৬ আসরে মুম্বাই শহরে ইংল্যান্ড এবং দক্ষিণ আফ্রিকার খেলায় এই রেকর্ড গড়া হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার ২২৯/৪ স্কোর ২ বল হাতে রেখে ২৩০/৮ রান করে জয়লাভ করেছিল ইংল্যান্ড। তার আগ পর্যন্ত সম্মিলিত রানের রেকর্ড ছিল ৪১৮। ২০০৭-এর আসরে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান স্টেডিয়ামে ভারতের ২১৮/৪ রানের স্কোর তাড়া করে ইংল্যান্ড রান করে ২০০/৬। 

এই খেলাটির মাত্র আট দিন আগে জোহানেসবার্গে দক্ষিণ আফ্রিকার করা ২০৫/৬ স্কোর ডিঙিয়ে ১৪ বল হাতে নিয়ে ২০৮/২ রান করে জয়লাভ করেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ক্রিস গেইলের ৭টি ৪ এবং ১০টি ছক্কাসহ ৫৭ বলে করা ১১৭ রান ছিল এই ইনিংসের অন্যতম আকর্ষণ। এটিই ছিল বিশ্বকাপের আসরে ৪০০+ রানের প্রথম খেলা। ক্রিস গেইলের ১১৭ রান ছিল বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর এবং এক ইনিংসে কোনো ব্যাটারের ১০টি ছক্কা হাঁকানোর প্রথম রেকর্ড। 

২০১২-এর আসরে নিউজিল্যান্ডের ব্রেন্ডন ম্যাককালাম বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ৫৮ বল খেলে ১২৩ রান করে ক্রিস গেইলের সর্বোচ্চ স্কোরের রেকর্ডটি ভঙ্গ করে। ক্রিস গেইলও ২০১৬ আসরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১১টি ছক্কার মার মেরে তার সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ডও ভেঙেছে। 

তবে এবারের আসরের প্রথম খেলায় যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারোন জোনস মাত্র ৪০ বলে ৯৪ রানের ইনিংসে ছক্কা মেরেছে ১০টি। সে প্রমাণ করল, ক্রিস গেইল ছাড়া আরও ব্যাটার আছে, যারা টি-২০ বিশ্বকাপে খেলার এক ইনিংসে ১০টি ছক্কা মারতে পারে। জয় দিয়ে বিশ্বকাপে খেলার অভিজ্ঞতা আরম্ভ করলেও উগান্ডার অবস্থা ভালো নেই। আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে তারা মাত্র ৫৮ রানে অল আউট হয়েছে। এটি অবশ্য বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বনিম্ন রেকর্ড নয়। ২০১৪ আসরে চট্টগ্রামে শ্রীলঙ্কা নেদারল্যান্ডসকে মাত্র ৩৯ রানে অল আউট করেছিল। 

সেটিই এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের সর্বনিম্ন স্কোরের রেকর্ড। ২০২১ বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কা আবার নেদারল্যান্ডসকে মাত্র ৪৪ রানে অল আউট করেছিল। সেই খেলার পরদিন ইংল্যান্ড ওয়েস্ট ইন্ডিজকে মাত্র ৫৫ রানে অল আউট করেছিল। উগান্ডার এবারের ৫৮ রানের নিচে এই তিনটি রেকর্ড টিকে ছিল, তাই উগান্ডার হয়তো খুব একটা লজ্জিত হওয়ার কিছু ছিল না। 

তবে তৃতীয় খেলায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে তারাও সেই ৩৯ রানেই অল আউট হয়ে সর্বনিম্ন স্কোরের রেকর্ড স্পর্শ করল। লজ্জাজনক এই সর্বনিম্ন স্কোরের তালিকায় এখন প্রথম এবং পঞ্চম স্থানে জায়গা হলো উগান্ডার। 

নামিবিয়া তাদের প্রথম খেলায় ওমানকে পরাজিত করল সুপার ওভারে। দুই দলই নির্ধারিত ২০ ওভারে সমসংখ্যক ১০৯ রান করলে খেলা গড়ায় সুপার ওভারে। নামিবিয়া সুপার ওভারে রান করেছে ২১, যা বিশ্বকাপের সর্বকালের রেকর্ড। এর আগ পর্যন্ত রেকর্ড ছিল ১৭, যা কয়েকবারই ঘটেছে। 

সুপার ওভারে নামিবিয়ার ডেভিড ওয়েইস ১৩ রান এবং বিলাল খান ৮ রান করেন। আবার বল করতে আসে ডেভিড ওয়েইস এবং ১ উইকেট নিয়ে রান দেন মাত্র ১০। টি-২০ ক্রিকেটের ইতিহাসে সুপার ওভারে বোলিং এবং ব্যাটিং করা ক্রিকেটারদের তালিকায় ডেভিড ওয়েইস মাত্র চতুর্থ ব্যক্তি, বিশ্বকাপে এবারই প্রথম এই রেকর্ড স্থাপিত হলো। 

কানাডাও খারাপ খেলছে না। তাদের দ্বিতীয় খেলায় আয়ারল্যান্ডকে হারিয়ে এক অঘটন ঘটিয়ে ফেলেছে। তবে এবারের আসরের প্রথম বড় অঘটনটি ঘটিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, শক্তিশালী পাকিস্তানকে পরাজিত করে। শক্তিশালী টিমগুলোর মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা কোনোভাবে বেঁচে গেছে নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে, আর নিউজিল্যান্ডও শোচনীয়ভাবে হেরেছে আফগানিস্তানের কাছে। এ ছাড়া বাকিরা খেলছে স্বাভাবিকভাবেই। 

ওমানের বিপক্ষে ৪ ওভার বল করে মাত্র ৯ রান দিয়ে ৫টি উইকেট নিয়েছেন আফগানিস্তানের বোলার ফজলহক ফারুকি। টি-২০ খেলায় ৫টি উইকেট পাওয়া সহজ কাজ নয়। এবারের আসরে ফারুকিই ৫ উইকেট পাওয়া প্রথম বোলার। উগান্ডার বিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের আকিল হোসেনও ৫টি উইকেট নিয়েছেন। 

বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্তত ৫ উইকেট পাওয়া বোলার এখন এক ডজন মাত্র। তবে বিশ্বকাপের এক খেলায় সর্বোচ্চ উইকেটের সংখ্যা ৬, শ্রীলঙ্কার অজন্তা মেন্ডিস জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে এই রেকর্ড গড়েছিলেন ২০১২ বিশ্বকাপের আসরে। 

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আরও ৪ উইকেট নিয়ে ৯ উইকেটসহ ফারুকি এবার রয়েছেন উইকেটধারী বোলারদের শীর্ষে। তবে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বোচ্চ উইকেটের রেকর্ড বাংলাদেশের সাকিব আল হাসানের। ৩৭ খেলায় সাকিবের মোট সংগ্রহ ৪৭ উইকেট। 

তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন ৩৯ উইকেট নিয়ে পাকিস্তানের শহিদ আফ্রিদি। বর্তমানে যারা খেলছেন, এর মধ্যে সম্ভাব্যদের তালিকায় রয়েছেন শ্রীলঙ্কার হাসারাঙ্গা (৩৫ উইকেট) এবং আফগানিস্তানের রশিদ খান (২৯ উইকেট)। সাকিব যদি সামনের খেলাগুলোতে কিছু উইকেট পান, প্রথম বোলার হিসেবে বিশ্বকাপে ৫০ উইকেটের রেকর্ড তো তার হবেই, হয়তো বাকি কোনো বোলারেরই ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যেতে পারেন তিনি। 

দলীয় সর্বোচ্চ স্কোরের রেকর্ড শ্রীলঙ্কার, ২০০৭ আসরে কেনিয়ার বিপক্ষে ২৬০ রান করার। ওই খেলায় শ্রীলঙ্কা জয়লাভ করেছিল ১৭২ রানের ব্যবধানে। সেটিই বিশ্বকাপে কোনো দলের সবচেয়ে বড় জয়ের মার্জিন। উগান্ডাকে ১৩৪ রানে পরাজিত করে এবার ওয়েস্ট ইন্ডিজ উঠে এসেছে দ্বিতীয় বৃহত্তম মার্জিনে। আফগানিস্তান উগান্ডাকে পরাজিত করেছিল ১২৫ রানে। সেটি এখন পঞ্চম বৃহত্তম মার্জিন। 

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়া করেছে ২০১ রান। টি-২০ বিশ্বকাপের ইতিহাসে ২০০+ রান হয়েছে এ পর্যন্ত মাত্র ১৫ বার। আশ্চর্য হলেও সত্য, ২০০+ রান অস্ট্রেলিয়া করেছে কিন্তু এবারই প্রথম! এই তালিকায় সবচেয়ে বেশি আছে দক্ষিণ আফ্রিকা (৫ বার), ইংল্যান্ড (২ বার), ওয়েস্ট ইন্ডিজ (২ বার), ভারত (২ বার), শ্রীলঙ্কা (১ বার), পাকিস্তান (১ বার), নিউজিল্যান্ড (১ বার), এবার যুক্ত হলো অস্ট্রেলিয়া। দেখা যাক, এবার আর কোনো দল ২০০ রান পার করতে পারে কি না!

লেখক: মানবাধিকারকর্মী এবং ক্রিকেটপ্রেমী
[email protected]

ভারতের নির্বাচনি ফল দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে না

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৪, ১১:৩১ এএম
আপডেট: ১১ জুন ২০২৪, ১১:৩১ এএম
ভারতের নির্বাচনি ফল দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে না
মো. তৌহিদ হোসেন

সম্প্রতি ভারতের লোকসভা নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচনের আগে বিজেপি একটা উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল যে, তারা ৪০০ আসন প্রত্যাশা করছে। ভারতীয় মিডিয়াও এর সঙ্গে অনেকটা সুর মিলিয়ে বলতে চেয়েছিল যে, বিজেপি নিশ্চয়ই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। বিজেপির আসন পাওয়ার বিষয়ে এরকমই একটা ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু সেটা অবধারিতভাবেই হয়নি। বিজেপি জোট পেয়েছে ২৯৩টি আসন। সরকার গঠনের জন্য বিজেপি এককভাবে ২৭২ আসনও পায়নি। তারা পেয়েছে ২৪০টি আসন। 

এ ক্ষেত্রে কিছু চমক নিশ্চয় ছিল বলা যায়। কংগ্রেস গত ১০ বছর ধরে খুবই খারাপ অবস্থায় ছিল। বিরোধীদল হওয়ার জন্য ন্যূনতম যেটুকু প্রয়োজন সেটাও তাদের ছিল না। প্রকৃতপক্ষে বিরোধী দল বলে ১০ বছর ধরে ভারতীয় লোকসভায় কিছু ছিল না। সেদিক বিবেচনায় কংগ্রেস পুনরায় ফিরে এসেছে বলা যায়। কংগ্রেস জোট থেকে ২৩২টি আসনের মতো পেয়েছে। বিজেপির যেমন তার জোটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে কিন্তু মূল অংশটি বিজেপির পাওয়ার ছিল। কংগ্রেস অর্ধেকও পায়নি। যদিও আগের নির্বাচনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ আসন তারা পেয়েছে। 

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে গতকাল ৯ জুন সন্ধ্যায় টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন নরেন্দ্র মোদি। নির্বাচনে কংগ্রেস জোট ২৩২টি আসন পেলেও এককভাবে কংগ্রেসের আসন সংখ্যা মাত্র ৯৯টি।
অনেকেই এমনকি নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছিলেন ছিলেন, ৪০০ না হলেও ৩৫০ আসন পাচ্ছেন মোদি।  কিন্তু তাদের ধারণা ও উত্তেজনা সবই ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ‘বিজেপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে এটা আমার কাছেও অতিপ্রত্যাশা বলে মনে হয়েছিল এবং এক প্রশ্নোত্তরে আমি সেটা বলেছিলাম।

বিজেপি যেহেতু একক সংখ্যাগড়িষ্ঠতা পায়নি অথবা বলা যায়, জোটসঙ্গীদের সমর্থন নিয়েই সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে সরকার গঠন করছে। ইতোমধ্যে নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে। বলা বাহুল্য, বিজেপির আসনসংখ্যা ২৪০-এ নেমে আসা এবং কংগ্রেসের ৫২ থেকে ৯৯ আসনে উত্তরণ, সেই সঙ্গে ১০ বছর দোর্দণ্ড প্রতাপে এককভাবে ভারত শাসনের পর সরকার গঠনে মোদির জোটসঙ্গীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়াকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পরাজয় এবং উদারনৈতিকতার একপ্রকার বিজয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। 

লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলে দুটি দিক পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রথমত, মোদি টানা তিনবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। অন্যদিকে লোকসভায় গত ১০ বছরব্যাপী বিজেপির এককভাবে আধিপত্যের অবসান হলো। অন্যদিকে ভারতীয় লোকসভায় একটি বাস্তব বিরোধী দল থাকছে, যাদের কণ্ঠস্বরও এখন থেকে শোনা যাবে। দ্বিতীয়ত, ২০১৪ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস দলের ভরাডুবি হলেও সেই অবস্থা থেকে তারা আবার মূলধারায় ফিরতে পেরেছে। 

গত দুটি লোকসভায় কোনো স্বীকৃত বিরোধী দল ছিল না। প্রয়োজনীয় ৫৫টি আসন লাভেও ব্যর্থ হয় কংগ্রেস। ৯৯টি আসন নিয়ে কংগ্রেস এবার স্বীকৃত বিরোধী দল হিসেবে স্বস্তিদায়ক অবস্থায় থাকবে। ভারতের গণতন্ত্রের ক্রান্তিলগ্নে দুটি বিষয়ই আশাব্যঞ্চক খবর। কিন্তু আরেকটু যদি গভীরে প্রবেশ করা হয় তাহলে দেখা যাবে, আঞ্চলিকভাবে হয়তো কিছু কিছু মেরুকরণ ঘটেছে, কিন্তু সর্বভারতীয় পর্যায়ে ২০১৯-এর তুলনায় বিজেপির ভোট কমেছে। 

সাধারণ মানুষের ক্ষমতাসীনদের ওপর অসন্তোষ, সে কারণেই হোক এমনকি আরেকটু বেশিও তফাৎ হতে পারত। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ভোটারদের মাঝে বিজেপির সার্বিক প্রভাব কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। লোকসভায় আসন লাভে যদিও ব্যাপক হ্রাস-বৃদ্ধি হয়েছে, জনসমর্থনে পরিবর্তন সে তুলনায় তেমন স্পষ্ট নয়। দুই দলই আগামী পাঁচ বছর পর ২০২৯-এর নির্বাচনের জন্য তাদের কার্যকৌশল নির্ধারণ করবে বলেই মনে হয়।

ভারতের এই নির্বাচনি ফল বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না বলেই মনে হয়। কারণ, দুই দেশের কোথাও নীতিগত পরিবর্তন হয়নি এবং উভয় দেশের নেতৃবৃন্দ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে পুনঃ পুনঃ সন্তোষ ব্যক্ত করে আসছেন। বাংলাদেশের চাওয়া-পাওয়ার ক্ষেত্রে ইতিবাচক কিছু ঘটবে কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে। যেহেতু বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়গুলোর সমাধান না করেই ভারত তার স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে, কাজেই বিষয়গুলো খুব দ্রুত সমাধান হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই বলা যায়। 

তাছাড়া নিয়মমতো পূর্বপ্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম ছাড়া শীর্ষ বৈঠকে বড় কোনো সিদ্ধান্ত সাধারণত হয় না। এমন কোনো দ্বিপক্ষীয় কার্যক্রম আমাদের চোখে পড়েনি। কিছুদিন আগে সংক্ষিপ্ত সফরে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব যখন এসেছিলেন, তিনি দ্বিপক্ষীয় আলোচনা নয় বরং তিনি এসেছিলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে নিমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করতে, দুই দেশের বিষয়ভিত্তিক কোনো আলোচনা করতে নয়। 

প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরে হয়তো দুই দেশের সরকারেরই নতুন মেয়াদে প্রবেশ উপলক্ষে একটি সৌজন্য সফর হলেও যদি কোনো পাস্পরিক সমস্যা সমাধানে প্রকৃত অগ্রগতি হয়, যেমন তিস্তা বা সীমান্ত  হত্যা, বাংলাদেশের মানুষ তাকে সানন্দে স্বাগত জানাবে। আমার মনে হয় বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে এমন কোনো বড় প্রভাব পড়বে না। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে মোদি এবং বিজেপির অবস্থান যেমন ছিল সেটা তারা ধরে রাখতে পারবে বলেই প্রতীয়মান হয়। 

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের কথা যদি বলি, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বেশ ভালো অবস্থায় আছে। আমাদের পক্ষ থেকে হয়তো কিছু চাওয়া-পাওয়ার আছে। সেটাও পাওয়ার ব্যাপারে আমার মনে হয় না দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সম্পর্ক যেরকম আছে কমবেশি সেরকমই থাকবে বলেই আমি মনে করি।

লেখক: সাবেক পররাষ্ট্র সচিব