ঢাকা ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
ভারতীয় ভিসা নিয়ে আশার কথা শুনালেন নতুন হাইকমিশনার ফিলিপাইনে ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৫ লাজ ফার্মায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আজই আবেদন করুন বাংলাদেশের হজ ব্যবস্থাপনার প্রশংসা করলেন সৌদি হজ ও উমরাহ মন্ত্রী যুদ্ধ থামিয়ে আলোচনার টেবিলে ট্রাম্প-ইরান; বাতিল মার্কিন হামলা তুমি এলে বসন্তে একটা শুক্রবারের দিবাভাগ তোমাকে দেখার স্বাদ মিটবে না ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা দাউদকান্দি থেকে নিখোঁজ লাবণ্য ধরে রাখো কীভাবে? খুব বেশি কিছু না 'সুবিধা হলে নিয়ম মানবে, না হলে নয়', মার্কিন নীতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ জয়শঙ্করের দায়বদ্ধ রেফারিদের মাথায় কী? হৃদয়ের ভাঙা নীলিমা সময় একটি সাধনাযোগ্য শিল্প জাবি শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের প্রতিবাদে ছাত্রশক্তির বিক্ষোভ মিছিল জুলাইয়ের পর ভারত-ইসরায়েল মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি আলোচনা পুনরায় শুরুর সম্ভাবনা বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে বিইউএফটি’তে দু’দিনব্যাপী কর্মসূচি চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভটভটি উল্টে প্রাণ গেল চালকের মোস্তফা কামালের বিষাদ বসুধা কুষ্টিয়ার সীমান্তে ১২ জনকে পুশইনের চেষ্টা, বিজিবির বাধা সাতচল্লিশের অস্বাভাবিকতার মধ্যেও স্বাভাবিক জীবনযাপন করেছি শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে ২ কিশোর গ্রেপ্তার প্রাচ্য-প্রতিচ্যের দ্বন্দ্ব ও সমকালীন চিন্তার বহুমাত্রিক পাঠ ১৭ বছর পর বিএনপি সরকারের বাজেট, সোনারগাঁয় আনন্দ মিছিল কারাগারে স্ত্রীকে গাঁজা পৌঁছে দিতে গিয়ে স্বামী আটক চুয়াডাঙ্গায় অপারেশনের মাঝপথে চলে যান চিকিৎসক সোনারগাঁয় অবৈধ গ্যাস সংযোগে চুন কারখানার মালিকের কারাদণ্ড মাদারগঞ্জে এসএসসি পরীক্ষার্থীকে অপহরণ, গ্রেপ্তার ৬
Nagad desktop

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি ও শিশুর মানসিক সুস্থতা

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৫, ০৪:৪৯ পিএম
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি ও শিশুর মানসিক সুস্থতা
দীপু মাহমুদ

আমরা অনেকে ভয় পাই। ভয়ে আমাদের ভেতরটা কুঁকড়ে আসে। আমরা ভয় পাই বদ্ধ ঘরে, অপরিচিত মুখ দেখলে, ভয় পাই অন্ধকারে। আচমকা শব্দে। এই ভয়গুলো হয়তো সবসময় যুক্তির সঙ্গে মেলে না। তবু আমরা ভয় পাই।

আমার ছোটবেলার অনেক ভয়াবহ স্মৃতি আছে, যেগুলো কাউকে বলিনি। ভয়, কষ্ট, অপমান- এগুলো জমে আছে মনে বহুবছর। তখন শিশু ছিলাম। তখন কেউ শুনতে চাইত না আমার কথা। বুঝতে পারতাম ছোটদের কষ্ট বুঝতে চায় না বড়রা। এখনো হয়তো অনেকেই তেমনি করে ভাবে।

আমার মতো অনেক শিশু আছে যারা দুঃসহ অভিজ্ঞতা মনে বয়ে বেড়াচ্ছে চুপচাপ। তারা মুখ খোলে না, শুধু চুপ করে যায়। তাদের চোখের কোনায় কান্না জমে থাকে, আর ভয় জমাট বাঁধতে থাকে মনের ভেতর। কেউ বলে না, কিন্তু ওই চুপ করে থাকাটাই শিশুদের সবচেয়ে বড় চিৎকার।

সম্প্রতি রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুলে ভয়াবহ এক ঘটনা ঘটে গেছে। প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে স্কুলের ওপর। যেসব শিশু সেই ঘটনায় বেঁচে গেছে, তারা শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও গভীর আঘাত পেয়েছে। যে ভয় তারা সেদিন অনুভব করেছে, তা তাদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে, আতঙ্কে তারা কেঁপে উঠছে, আবার স্কুলে ফেরার কথা উঠলে তাদের বুক ধড়ফড় করে উঠছে।

এই শিশুরা এখন ট্রমার মধ্যে আছে। শিশুদের এই ট্রমা যদি আমরা সময়মতো বুঝে উদ্যোগ নিতে না পারি, শিশুদের মন থেকে ভয় আর আতঙ্ক ঝেড়ে ফেলতে না পারি, তাহলে আমাদের এই সন্তানরা বড় হবে ভয় আর সংশয়ে ভরা এক মানসিক ভার নিয়ে। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে- আমরা যারা বড়, তারা যেন শিশুদের পাশে থাকি।

শিশুদের কথা শুনুন: শিশুরা অনেক কিছু বলে না, কিন্তু বলতে চাইলে তাদের থামিয়ে দেওয়া যাবে না। তারা যা বলছে, তা-ই তাদের সত্য। হয়তো কোনো শব্দ তাদের ঠিকমতো আসে না, হয়তো তারা গুছিয়ে বলতে পারে না, কিন্তু মন জানে সে কী বলছে। এই সময় শিশুর প্রয়োজন একজন মন দিয়ে তার কথা শোনার মতো মানুষ।

ভয়কে অস্বীকার নয়, স্বীকৃতি দিন: ‘ভয় পেয়ো না’- এই কথাটি অনেক সময় শিশুকে আরও নিঃসঙ্গ করে দেয়। কারণ তারা ভয়ে আছে, তবু বলা হচ্ছে, ভয় পাওয়া যাবে না। বরং বলুন, ‘ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক, আমি তোমার পাশে আছি।’ এই আশ্বাসেই তৈরি হবে নিরাপত্তার আস্থা, যা শিশুর ভয়ংকর সেই স্মৃতি ভুলতে সাহায্য করবে।

নিরাপত্তার বোধ ফিরিয়ে দিন: শিশুকে বুঝিয়ে বলুন, সে এখন নিরাপদ। ভয়ংকর সেই সময় পেছনে পড়ে গেছে, সে এখন পরিবারের আপনজনের সঙ্গে আছে, ভালোবাসার আশ্রয়ে। শিশুকে আশ্বস্ত করুন, ‘তুমি এখন নিরাপদ’, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’, ‘তুমি একা নও’- এই কথাগুলো শিশুর মনে আস্থা আনবে, ভয় দূর করে দেবে। 

শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিন: শুধু ওষুধ আর ব্যান্ডেজে সব ঠিক হয় না। শিশুর ভেতরের ভয় কাটাতে দরকার কাউন্সেলিং। শিশু যদি ঘন ঘন আতঙ্কে জেগে ওঠে, একা থাকতে না চায়, বা আচরণে পরিবর্তন আসে, তাহলে আপনার সন্তানের জন্য দ্রুত মনোবিদের পরামর্শ নিন। মানসিক যত্নও শারীরিক যত্নের মতোই জরুরি।

ভালোবাসার স্পর্শ ওষুধের চেয়েও কার্যকর: আলতো করে জড়িয়ে ধরা, মাথায় হাত বুলিয়ে বলা- ‘তুমি ভালো থাকবে’, ‘আমি এখানে আছি’- এই ছোট ছোট অভিব্যক্তিগুলো শিশুর মনে শান্তি আনে। শিশু অনুভব করে- সে একা নয়, কেউ তাকে ভালোবাসে, কেউ তার পাশে আছে।

ঘুম ও শিশুর দেহভাষা খেয়াল করুন: অনেক শিশু হঠাৎ ঘুম ভেঙে চিৎকার করে উঠবে। এটা ট্রমার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। শিশুর ঘুমের সময় তার পাশে থাকুন, আলতো করে হাত রাখুন, আদরমাখানো গলায় বলুন, ‘তুমি নিরাপদ, ভয় নেই।’ এমন নরম আশ্বাস শিশুর জন্য অনেক বড় ওষুধ।

অপ্রয়োজনীয় ও চাপ তৈরি করে এমন প্রশ্ন এড়িয়ে যান: শিশুকে বোঝার চেষ্টা করুন, নাড়িয়ে দিয়ে চাপ তৈরি করবেন না। ‘তুমি কী দেখেছিলে?’, ‘ঘটনার সময় তুমি ঠিক কোথায় ছিলে?’- এমন প্রশ্ন শিশুর মনে আবার ভয় ফিরিয়ে আনতে পারে। বরং বলুন, ‘তুমি চাইলে বলতে পার’, ‘যতটুকু বলতে চাও, সেটাই যথেষ্ট’, ‘আমি তোমার পাশে আছি।’

শিশুর স্কুলে ফেরা হোক সৃজনশীল পথ ধরে: শুধু বই আর ক্লাস নয়, স্কুলে শিশুদের জন্য দরকার নিরাপদ পরিবেশ, যেখানে তারা খেলতে পারে, ছবি আঁকতে পারে, গান গাইতে পারে। এসব সৃজনশীল কাজে জড়ানোর মধ্যদিয়ে শিশুরা ধীরে ধীরে আবার স্কুলকে ভালোবাসতে শিখবে। ভয়ের ঘরে ফেরার মতো কঠিন কিছু নেই। এখন স্কুল মানেই এই শিশুদের চোখে আতঙ্ক। স্কুলের ক্লাসরুম, বেঞ্চ, করিডর- সবকিছুতেই হয়তো ট্রিগার হয়ে উঠবে শিশুদের মনে সেই দিনের ভয়াবহ সব স্মৃতি। তাই বাবা-মা, অভিভাবক, স্কুল কর্তৃপক্ষ আর শিক্ষকরা যেন একথা মনে রাখেন- এই শিশুদের কাছে এখন স্কুল মানে শুধু পড়া শেখার জায়গা নয়, বরং নিজেকে ফিরে পাওয়ার নিরাপদ আশ্রয়।

জোর নয়, ধৈর্য দরকার: শিশুরা অনেক সময় নিজে থেকে বলতে চায় না। কেউ কেউ হয়তো স্কুলে যেতে চাইবে না, কেউ কেউ কল্পনার জগতে ঢুকে যাবে, কেউ হয়তো হঠাৎ হঠাৎ রেগে যাবে। এসব আচরণকে শাসন নয়, দরকার বুঝে নেওয়া। শিশুদের সময় দিতে হবে, পাশে থাকতে হবে, ভালোবাসা দিয়ে, সাহস দিয়ে সঙ্গ দিতে হবে।

এই শিশুদের ভবিষ্যৎ আমাদের হাতেই। আমরা যদি এখন তাদের এই মানসিক আঘাত থেকে আগলে না রাখি, তবে ভয় তাদের মনে এক দীর্ঘ জীবনের যন্ত্রণা হয়ে রয়ে যাবে। আমরা যদি তাদের কথা না শুনি, যদি না বুঝি তাদের না বলা কষ্ট, তাহলে আমাদের সন্তানরা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে এক গভীর নিঃসঙ্গতায়।

শিশুরা স্বপ্ন দেখে। তারা নতুন করে শুরু করতে চায়, যদি কেউ পাশে থাকে। তারা অন্ধকার থেকেও আলো আঁকতে পারে, যদি কেউ হাত ধরে। তারা কান্নার ভেতর থেকেও হাসি খুঁজে পায়, যদি কেউ ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখে। আসুন, আমরা সেই মানুষটি হই- যে শিশুর ভয় বুঝবে, পাশে থাকবে এবং বলবে- ‘তোমার ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক, আমি তোমার পাশে আছি।’ এই একটি কথাই হতে পারে শিশুর সুস্থ হয়ে ওঠার শুরু।

লেখক: শিশুসাহিত্যিক ও শিশুর যত্ন
বিকাশ এবং শিক্ষা পরামর্শক

খরচ বাড়লে বিপাকে পড়বে সাধারণ জনগণ

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ০৬:৫৯ পিএম
খরচ বাড়লে বিপাকে পড়বে সাধারণ জনগণ
আবু আহমেদ

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আছে কিন্তু আয়কর রিটার্ন দিচ্ছে না, ফাইভ স্টার হোটেলে ডিনার করছে, অথচ কর দিচ্ছে না, কোম্পানির ডিভিডেন্ট দেয় না, অথচ ওই কোম্পানির এমডি পাজেরো গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়ান, তাদের জরিমানাসহ করের আওতায় আনতে হবে। সরকারের আয়-ব্যয়ের সমন্বয়হীন অসম আকার অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবেই। সে ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই সংস্কার, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।...

আগামী বাজেটের আকার ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি হবে। এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের আয় বাড়াতে হবে। এনবিআরের রাজস্বের আওতা ও লক্ষ্যমাত্রা বাড়াতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন করে শুল্ক-কর-ভ্যাট আরোপ করতে হবে। এতে অনেক পণ্যের দাম বাড়বে। সেবা খাতের  খরচ বাড়বে। যা জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াবে। এখনই সাধারণ মানুষ খরচের চাপে আছে। আরও খরচ বাড়লে বিপাকে পড়বে।

রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থসংকটে নিয়মিত খরচ চালিয়ে যাওয়াও সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ আগামী বাজেটে খরচ কমানোর প্রত্যাশা করলেও তা বাস্তবায়ন হবে না। বরং বাজেটে সরকার আয় বাড়াতে গিয়ে আগামী অর্থবছরের বাজেটে অনেক জিনিসপত্রের দাম বাড়াচ্ছে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয়, ব্যবসাবাণিজ্য, শিল্প খাতে খরচ বাড়বে। এরই মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বাড়বে মূল্যস্ফীতি। অন্যদিকে নতুন অর্থবছরে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ভ্যাটের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। অন্য সব বাদ দিয়ে শুধু এই দুই কারণেই অনেক কিছুর দাম ও খরচ বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এ সবকিছুই জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে ফেলবে।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে শুল্ক-কর-ভ্যাটের কারণে বিভিন্ন নিত্যপণের দাম বাড়বে। চিকিৎসা ও যাতায়াতের খরচ বাড়বে। শিক্ষা উপকরণের দাম বাড়বে। আমদানি করা পণ্যের দামও বাড়বে। দেশি পোশাকের দাম বাড়বে। ঠিকাদার ব্যবসায়ের লাইসেন্স ফি বাড়বে। বাজেটে চাল, ডাল, চিনি ও ভোজ্য তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি পর্যায়ে উৎসে কর কিছুটা কমিয়ে বহাল থাকছে। আমদানিকারকরা এই বহাল থাকা করের অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়িয়ে রাখার সুযোগ পেতে পারেন। এমনও জানা যাচ্ছে যে, আগামী বাজেটে তামাকপণ্যের দাম বাড়বে। কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোয় দেশে উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়বে। এমনকি আমদানি করা গুঁড়া দুধ, মাছ ও শুকনা ফলের দাম বাড়বে।

মোটরসাইকেল উৎপাদনে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান রাজস্ব বহাল থাকলেও উচ্চ সিসির সম্পূর্ণ মোটরসাইকেল আমদানিতে শুল্ক হার বাড়বে। এতে আমদানি করা বেশি সিসির মোটরসাইকেলের দাম বাড়বে। অন্যদিকে আসন্ন বাজেটে আমদানিকৃত প্লাস্টিক পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। পার্লারের খরচ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহনে চলাচল খরচও আসন্ন বাজেটে বেশি থাকবে। আগামী বাজেটে দেশে শিল্প খাতে ব্যবহৃত অনেক কাঁচামালের আমদানি নিরুৎসাহিত করা হবে। বিশেষভাবে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি, লোহার রড, স্ক্র্যাব, টেক্সটাইল, চামড়া খাত, পাটশিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হবে। দেশি গরুর দুধ, মসলা ও দেশি শিল্পে বানানো খেলনার দাম বাড়বে না।

আবার, দেশে ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সরকার গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি, তারল্যসংকট, দেউলিয়া বা অস্তিত্বের জন্য হুমকি, এমন সব ঝুঁকির সময়োপযোগী সমাধান এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণে ইতোমধ্যে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে। বিগত সময়ে আর্থিক খাতে ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাট হয়েছে। নজিরবিহীন অপশাসনের মাধ্যমে ব্যাংক খাতকে প্রায় ধ্বংসের মধ্যে ফেলে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছিল। ব্যাংকগুলো লুটপাটের কারণেই আর্থিক খাতের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের পুঁজিবাজারেও। দেশ থেকে প্রচুর টাকা পাচার হয়েছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র এখন সামনে আসতে শুরু করেছে। ২০২৩ সালের জুনে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১০ দশমিক ১১ শতাংশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ২০ শতাংশে। অর্থাৎ খেলাপি ঋণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এ ব্যাংকগুলোকে প্রায় শেষ করে দিয়েছে মাফিয়া গ্রুপ। এ সরকারের সময় আর সেই সুযোগ নেই। এদের বিচারের আওতায় আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।

দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারকে সংস্কারের দিকে আরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে হলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি করে ভালো কিছু আশা করা যায় না। আমাদের রাজস্ব বাজেটের আকার বেড়েছে, যা এডিপির তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ। রাজস্ব নিয়ে আমাদের আগে থেকেই আরও চিন্তাভাবনা করা উচিত ছিল। আগের সরকার নির্বাচনের নামে নানারকম প্রহসন করেছে। ফলে অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কাজেই গণতন্ত্রের নামে আমরা এখনো যদি বিভাজন করি, তাহলে কোনোভাবেই সামনে এগোনো সম্ভব নয়। দেশে বিনিয়োগ অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হলেই ব্যবসা ও বিনিয়োগ সৃষ্টিতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আস্থা ফিরে পাবেন। কৃষকের জন্য কোনো কিছুর ভর্তুকি দেওয়ার উদ্যোগ খুবই ভালো দিক।

শেয়ারবাজারকে পুনরায় চাঙা করে তুলতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ও তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির মধ্যকার করপোরেট করহারের ব্যবধান বৃদ্ধি এবং ব্রোকারেজ হাউসের লেনদেনের ওপর ধার্য কর কমানো। এসব প্রণোদনার সুবিধাভোগী শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সরাসরি বিনিয়োগকারীরা কোনো সুবিধা পাবেন না। যদিও বাজেটের আগে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ আয় থেকে শুরু করে মূলধন মুনাফার ওপর থেকে কর প্রত্যাহারে জন্য দাবি জানানো হয়েছিল। আমরা যে বাজেট প্রণয়ন করি, তার ৭০ শতাংশই রাজস্ব বাজেট। এর কারণ হলো, আমাদের অর্থনীতির তুলনায় বিশাল আকারের সরকার নিয়ে আমরা বসে আছি। এখন এ বিশাল আকারের সরকারকে চালাতে হলে জনগণকে কর দিতে হবে। সরকার দক্ষ না হলে দেশের অর্থনীতিতে গতি আসবে না। বড় অর্থনীতির দেশ অথচ সরকারের পরিধি অনেক ছোট, এমন অনেক দেশ আছে। তারা পারছে, কাজেই আমাদেরও সেটা পারতে হবে। বাজারে কোনো কোম্পানি যখন লাভ করতে পারছে না, সেটাকে ভর্তুকি দিয়ে টিকিয়ে রাখার কোনো দরকার নেই। একটা লোকসানি শিল্পকে কেন সরকারের মধ্যে রাখতে হবে?

কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আমরা বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে যাচ্ছি। যতদিন এ ভর্তুকির সংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারব, ততদিন আমাদের অর্থনৈতিক দৈন্য থেকেই যাবে। আর এসব কারণেই আমরা কর সংগ্রহ যতটুকুই করি, খরচটা অপব্যয় হচ্ছে এবং সেটা রোধ করতে হবে। রাজস্ব আদায় বাড়াতে যে ক্ষেত্রগুলো করহারের অধীনে আসেনি সেগুলোকে করহারের আওতায় আনতে হবে। সে ক্ষেত্রে অটোমেশনে যেতে হবে। যাদের ঢাকা শহরে অনেক বাড়ি আছে, অথচ তারা সরকারকে কর ফাঁকি দিচ্ছে। এ রকম উদাহরণ বহু আছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আছে কিন্তু আয়কর রিটার্ন দিচ্ছে না, ফাইভ স্টার হোটেলে ডিনার করছে, অথচ কর দিচ্ছে না, কোম্পানির ডিভিডেন্ট দেয় না, অথচ ওই কোম্পানির এমডি পাজেরো গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়ান, তাদের জরিমানাসহ করের আওতায় আনতে হবে। সরকারের আয়-ব্যয়ের সমন্বয়হীন অসম আকার অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবেই। সে ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই সংস্কার, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। 

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও চেয়ারম্যান, আইসিবি 

গণতন্ত্রমুখী বাজেট ও প্রত্যাশার সমীকরণ

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৬:০৯ পিএম
আপডেট: ১০ জুন ২০২৬, ০৬:১০ পিএম
গণতন্ত্রমুখী বাজেট ও প্রত্যাশার সমীকরণ
ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল

কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য–এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই এবারের বাজেট একটি নতুন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রূপরেখা তৈরি করতে পারে। কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধি করলেই এই গণতন্ত্রমুখী বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাবে না, সমান্তরালে সুশাসন ও কাঠামোগত সংস্কারও নিশ্চিত করতে হবে। স্বৈরাচারী সরকারের রেখে যাওয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং জবাবদিহিহীন যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা উপড়ে ফেলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।...

অতীতে দেশের অর্থনীতি যে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা এবং বাহ্যিক চাকচিক্য প্রদর্শনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল, তা সবার জানা। স্বৈরাচারী সরকারের আমলে গৃহীত উচ্চাভিলাষী, মেগা-প্রকল্পনির্ভর এবং খাতাকলমে বড় জিডিপি প্রবৃদ্ধির বাজেটগুলো দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও নেতিবাচক ধস নামিয়েছিল। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ-সংকট এবং ব্যাংক খাতের ভঙ্গুর দশা তারই অকাট্য প্রমাণ। বিভিন্ন সূত্রের আভাসে জানা গেছে, এবারের বাজেট হতে যাচ্ছে ‘গণতন্ত্রমুখী’। সাম্যবাদী বাংলাদেশ বিনির্মাণের অভিযাত্রায় ‘গণতন্ত্রমুখী বাজেট’ ধারণাটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও অপরিহার্য।

গণতন্ত্রমুখী বাজেট বলতে এমন একটি অর্থনৈতিক দর্শনকে বোঝায়–যেখানে বাজেটের কেন্দ্রে থাকে সাধারণ নাগরিক। এতকাল ধরে যে ‘টপ-ডাউন’ অর্থনৈতিক মডেল অনুসরণ করা হয়েছে, তার অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল মানুষের অধিকার ও চাহিদাকে প্রাধান্য দেওয়াই এ বাজেটের মূল লক্ষ্য হবে। স্বৈরাচারী কাঠামোর প্রধান বৈশিষ্ট্যই ছিল কতিপয় সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর পকেট ভারী করা এবং এমন কিছু দৃশ্যমান অবকাঠামো তৈরি করা, যা সাধারণ মানুষের মৌলিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে খুব কমই অবদান রাখে। এর ফলে সমাজে তৈরি হয়েছে তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য।

বাজেটকে শুধু মুখে ‘গণতন্ত্রমুখী’ বললেই হবে না। এর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট খাতের পুনর্বিন্যাস এবং কাঠামোগত সংস্কার। একটি গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের ভিত্তি শক্ত হয় তার নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণের ওপর। আর এ অধিকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি স্তম্ভ হলো– কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। বিগত সরকারের আমলে এই তিন খাতের ওপর দিয়ে যে অবহেলার ঝড় বয়ে গেছে, তার ক্ষত এখনো দগদগে। মেগা প্রকল্পের আড়ালে দেশের ফুসফুসখ্যাত এ খাতগুলোকে ক্রমাগত সংকুচিত করা হয়েছে। তাই নতুন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন নিশ্চিত করতে এই তিন খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির অন্য কোনো বিকল্প নেই।

যে দেশের সিংহভাগ মানুষ এখনো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল, মানসম্মত শিক্ষা নতুন প্রজন্মের একমাত্র ভবিষ্যৎ এবং সাধারণ মানুষের আয়ের একটি বড় অংশ চলে যায় চিকিৎসার পেছনে, সেখানে এই তিন খাতকে পেছনে ফেলে কোনো টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এবারের বাজেটকে যদি সত্যিকার অর্থেই একটি ঐতিহাসিক ও রূপান্তরকামী দলিল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তবে রাষ্ট্রকে তার ব্যয়ের অগ্রাধিকার আমূল বদলে ফেলতে হবে। এই বিনিয়োগই নির্ধারণ করবে আমরা কেমন বাংলাদেশ পেতে যাচ্ছি।

বিগত সরকার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষিকে এক প্রকার উপেক্ষাই করেছে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ উচ্চমূল্যস্ফীতির এই ক্রান্তিকালে খাদ্য নিরাপত্তাই হলো আমাদের সবচেয়ে বড় ঢাল। সরকারের প্রথম দায়িত্ব হলো দেশের মানুষের জন্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা। এর জন্য প্রয়োজন কৃষি খাতে ভর্তুকি বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং বীজ ও সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে কৃষকরা যাতে তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পান, সে জন্য বাজেটে সুনির্দিষ্ট বাজারজাতকরণ কাঠামোর জন্য বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখতে হবে। কৃষি খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিরও সবচেয়ে বড় উৎস। ফলে কৃষির আধুনিকায়ন ও কৃষিজাতশিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করলে তা গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করবে।

কৃষির পর যে খাতটি জাতির মেরুদণ্ড শক্ত করে, তা হলো ‘শিক্ষা’। বিগত আমলগুলোতে শিক্ষা খাতকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। ত্রুটিপূর্ণ কারিকুলাম, গবেষণায় বরাদ্দের অভাব এবং দলীয়করণের কারণে শিক্ষার গুণগত মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। নতুন বাংলাদেশে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি বরাদ্দের গুণগত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ইউনেস্কোর পরামর্শ অনুযায়ী শিক্ষা খাতে জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ বা মোট বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া উচিত, অথচ আমাদের দেশে তা বরাবরই উপেক্ষিত ছিল। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই ক্ষতি পূরণে সাহসী পদক্ষেপ দেখতে চায় দেশবাসী। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষকদের উপযুক্ত বেতন ও প্রশিক্ষণ এবং উচ্চশিক্ষায় গবেষণার জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর সুযোগ আমরা হারাব। শিক্ষা খাতকে বৈষম্যমুক্ত করা না গেলে কোনো দিনই একটি সাম্যবাদী ও গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব নয়।

শিক্ষা ও কৃষির মতোই আরেকটি ভঙ্গুর ও উপেক্ষিত খাত হলো ‘স্বাস্থ্য’ খাত। বিগত দিনগুলোতে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনা দেশের মানুষকে কতটা নিঃস্ব করেছে, তা সবার জানা। সাধারণ মানুষের আয়ের একটি বিশাল অংশ চলে যায় চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে, যা অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে দারিদ্র্যের চরম সীমায় ঠেলে দিচ্ছে। একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র কখনোই তার নাগরিকদের চিকিৎসার অভাবে মরতে দিতে পারে না। এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ জিডিপির অন্তত ২ থেকে ৩ শতাংশে উন্নীত করা সময়ের দাবি। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর আধুনিকায়ন, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য বিমা চালুর জন্য বাজেটে পাইলট প্রজেক্টের সূচনা করা যেতে পারে। চিকিৎসাসেবা যখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসবে, তখনই বাজেটের গণতান্ত্রিক চরিত্র সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান হবে।

কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য–এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই এবারের বাজেট একটি নতুন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রূপরেখা তৈরি করতে পারে। কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধি করলেই এই গণতন্ত্রমুখী বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাবে না, সমান্তরালে সুশাসন ও কাঠামোগত সংস্কারও নিশ্চিত করতে হবে। স্বৈরাচারী সরকারের রেখে যাওয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং জবাবদিহিহী যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা উপড়ে ফেলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাজেটের টাকা যাতে কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেটের পকেটে না গিয়ে সরাসরি মাঠপর্যায়ে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছায়, তার জন্য একটি স্বচ্ছ, আধুনিক ও ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি খাতের খরচের হিসাব জনগণের সামনে উন্মুক্ত রাখতে হবে, যেন বাজেটের ওপর নাগরিকের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটিই হবে বাজেটের প্রকৃত গণতন্ত্রীকরণ।

এই বিশাল বাজেটের অর্থসংস্থানের ক্ষেত্রেও একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। পরোক্ষ কর বা ভ্যাটের বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর থেকে নামিয়ে ফেলতে হবে। একটি গণতন্ত্রমুখী বাজেটের নীতি হওয়া উচিত প্রত্যক্ষ করের ওপর জোর দেওয়া। অর্থাৎ, ধনীদের ওপর করের হার বাড়িয়ে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের করের বোঝা কমাতে হবে। কর ফাঁকি রোধ, অর্থ পাচার বন্ধ এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের মাধ্যমে যদি অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বৃদ্ধি করা যায়, তবে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমে আসবে। স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার এ প্রক্রিয়াটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করবে। যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে প্রণোদনা দেওয়া এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পরিধি আরও সম্প্রসারিত করার মাধ্যমেই এ বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রতিফলিত হবে।

লেখক: চিকিৎসক, ছড়াকার ও কলামিস্ট
[email protected]

দারিদ্র‍্য থেকে মুক্তি–পথের সন্ধানে

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৫:৩১ পিএম
আপডেট: ১০ জুন ২০২৬, ০৫:৩২ পিএম
দারিদ্র‍্য থেকে মুক্তি–পথের সন্ধানে
কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ

বাংলাদেশের রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শনির্ভর এক দৃঢ় ভিত্তি–সাম্য, মানবাধিকার, মানবমর্যাদা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও অসাম্প্রদায়িকতা। একটি ন্যায়ভিত্তিক মানবিক সমাজ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় মূল্যবোধ ও কার্যকারণ তাই বংলাদেশের জন্মলগ্মেই নিহিত। এ পর্যন্ত দেশকে সে পথে তেমন পরিচালনা করা হয়নি; তাই বলে তা কখনো বাস্তবায়িত হবে না–এ কথা বলা যায় না। বরং সেই আদর্শিক তাগিদ বাস্তবায়িত হওয়া বাঞ্ছনীয়।...

জন্মের সময় মানুষের মাথায় স্বাধীনতার তিলক থাকে এবং তখন মানবমর্যাদা ও সব মানবাধিকার তার প্রাপ‍্য থাকে। কিন্তু সমাজ ও রাজনৈতিক ব‍্যবস্থা মানুষের মধ‍্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি করে। ক্ষমতা ও সম্পদের বদৌলতে কিছু মানুষ সমাজের ওপরতলা দখলে নেয়। তাদের দাপটে অসংখ‍্য মানুষ ছিটকে পড়ে জন্মগত অধিকার থেকে। তারা হয় দরিদ্র, বঞ্চিত, অবহেলিত, অনেক সময় লাঞ্ছনার শিকার।

বর্তমান সময়ে সম্পদে-প্রযুক্তিতে পৃথিবী অচিন্তনীয় উচ্চতায় অধিষ্ঠিত। থেমে নেই অগ্রগতি–উভয় ক্ষেত্রে দ্রুত নতুন নতুন চূড়া প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। অপরদিকে পৃথিবীর সর্বত্র, বিশেষ করে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পিছিয়ে থাকা, পিছিয়ে পড়া ও পিছিয়ে রাখা মানুষের লম্বা মিছিল বিদ‍্যমান। বিশ্বব‍্যাপী বিভাজনের এই কুৎসিত স্বরূপ বোঝার জন‍্য নিম্নোক্ত তথ‍্য কয়েকটিই যথেষ্ট। বিশ্ব বৈষম‍্য প্রতিবেদন-২০২২ (World Inequality Report 2022) অনুযায়ী, বিশ্বের অতি ধনী ১০ শতাংশ মানুষের মালিকানায় বিশ্বের ৭৬ শতাংশ সম্পদ, তার মধ্যে ৪০ শতাংশের হাতে ২২ শতাংশ আর পেছনের ৫০ শতাংশের হাতে মাত্র ২ শতাংশ। বিশ্বব‍্যাংকের তথ‍্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মূল‍্যের ভারসাম‍্য রক্ষাকারী ডলারে দৈনিক ৩ দশমিক শূন্য ডলার আয়সীমার ভিত্তিতে বিশ্বে অতি দারিদ্র‍্যকবলিত মানুষের সংখ‍্যা ৮০৮ মিলিয়ন (৯ দশমিক ৯ শতাংশ), আর দৈনিক আয়সীমা ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ পিপিপি ডলারের ভিত্তিতে দরিদ্র মানুষের সংখ‍্যা প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন (৪৫ শতাংশ)। যেখানে বর্তমানে সম্পদ ও প্রযুক্তিতে বিশ্ব সনৈ সনৈ করে শিখরে ওঠার উদাহরণ স্থাপন করে চলেছে, সেখানে বৈষম‍্য ও দারিদ্র্যের এই ভয়াবহতা মানবতার চরম অবমাননা এবং মানবতার ধ্বজা সমুন্নত রাখতে বিশ্বনেতাদের নৈতিক ও নীতিগত গুরুতর সীমাবদ্ধতার নির্দেশক।

এবার আসি বাংলাদেশের কথায়। প্রাপ্ত তথ‍্য থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে দেশের মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশ এবং জাতীয় আয়ের ৪১ শতাংশ। অপরদিকে, সবচেয়ে পেছনের ১০-এর হাতে জাতীয় আয়ের ১ দশমিক ৩১ শতাংশ এবং জাতীয় সম্পদের ১ শতাংশের কম। পেছনের ৫০ শতাংশ মানুষের মালিকানায় রয়েছে জাতীয় সম্পদের মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং জাতীয় আয়ের ১৯ শতাংশ।

বিশ্বব‍্যাপী সম্পদ ও আয় বিভাজনের তুলনায় বাংলাদেশে তা খানিকটা কম প্রকট। বলাবাহুল‍্য, তার পরও অতি প্রকট। মৌলিক চাহিদার খরচের ভিত্তিতে বিশ্বব‍্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০২৫ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২১ দশমিক ৪ থেকে ২২ দশমিক ৯ শতাংশের মধ‍্যে। বিদ‍্যমান সম্পদ ও আয় বিভাজন থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার ওপরের অসংখ‍্য মানুষ সেই সীমার এত সন্নিকটে যে তাদের নানা টানাপোড়নের মধ‍্যদিয়ে চলতে হয়। দরিদ্র এবং দরিদ্রসম মানুষের অনুপাত দেশের সব মানুষের ৬০ বা ততধিক শতাংশ হতে পারে।

দারিদ্র‍্য শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়। দারিদ্র‍্য আসলে মহুমাত্রিক, যেমন জীবনের নানা মাত্রা রয়েছে। আয় ছাড়াও মাত্রাগুলোর মধ‍্যে রয়েছে: শিক্ষা, স্বাস্থ‍্য‍, সক্ষমতা, সমাজে অবস্থান, আইনের বিচারের নিশ্চয়তা, সব মানবাধিকারে যথাযথ অভিগম‍্যতা এবং মানব-মর্যাদা। এই নিরিখে বিচার করলে দেখা যাবে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে বঞ্চিত। মুষ্টিমেয়ের নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজব‍্যবস্থা। অবশ‍্য উন্নত বিশ্বে আইনের শাসনের প্রচলন তুলনামূলকভাবে উন্নতমানের থাকায়, দেখা যায় মৌলিক মানব স্বাধীনতা মোটামুটি সবাই ভোগ করেন।

লক্ষণীয়, পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র ওয়াশিংটন সমঝোতা-ভিত্তিক নব‍্য উদারতাবাদ দাপটের সঙ্গে বিরাজমান। এর মূল সুর হলো যাদের যত বেশি সম্পদ ও ক্ষমতা আছে তারাই অগ্রগতির সিংহভাগ নিজেদের করে নেয়।

তদুপরি, উন্নয়নশীল বিশ্বে অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতা এমন যে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বলি হয় বিভিন্নভাবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষমতার পরিবর্তনও ঘটানো হয়। আবার উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশে অনেক সময় আন্তর্জাতিক যোগসাজশে দেশ পরিচালনা করা হয়, ক্ষমতাবলয়ের স্বার্থ রক্ষার কৌশল হিসেবে।

এ বাস্তবতায় কোনো উন্নয়নশীল দেশে মানবকেন্দ্রিক কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব হতে পারে, সে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। পরিবর্তনের সম্ভাবনা অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু তার জন‍্য প্রয়োজন জনমুখী রাষ্ট্রচিন্তা, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি, মানবাধিকারের প্রতি অঙ্গীকার এবং বৈষম‍্য হ্রাসে কার্যকর রাজনৈতিক সদিচ্ছা। বিদ‍্যমান বৈশ্বিক ও দেশীয় ক্ষমতাকাঠামোর বাস্তবতায় এমন পরিবর্তন সহজে ঘটবে–তার নিশ্চয়তা নেই।

স্মর্তব‍্য, ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র গ্রহণ করে। এ প্রবন্ধের শুরুতে যে বক্তব‍্য উল্লেখ করা হয়েছ, তা এ ঘোষণাপত্রের প্রথম ধারায় বলা হয়েছে: মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন এবং মর্যাদা ও সব মানবাধিকারের অধিকারী। সুতরাং, যদি এমন একটি সমাজ গড়ার লক্ষ‍্য থাকে যেখানে ব্রত হবে দারিদ্র্যের উল্লিখিত বহুমাত্রিকতার উপশমে সচেষ্ট হওয়া, তবে সেখান থেক শুরু করতে হবে। অর্থাৎ, সোজা কথায়–মানুষ হিসেবে সব মানুষ সমান; আর মানবতার দাবি হচ্ছে, কারও প্রতি বৈরিতা, অবহেলা, অন‍্যায় আচরণ না করা এবং সবার জন‍্য ন‍্যায‍্য রাষ্ট্রীয় ও আইনি ব‍্যবস্থা নিশ্চিত করা। তবেই জনকেন্দ্রিক, সুস্থ, ন‍্যায়ভিত্তিক ও বহুমাত্রিক-দারিদ্র্যমুক্ত রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের পথ প্রশস্ত হতে পারে।

এই আলোকে বলা যায়, বাংলাদেশের রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শনির্ভর এক দৃঢ় ভিত্তি–সাম্য, মানবাধিকার, মানবমর্যাদা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও অসাম্প্রদায়িকতা। একটি ন্যায়ভিত্তিক মানবিক সমাজ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় মূল্যবোধ ও কার্যকারণ তাই বংলাদেশের জন্মলগ্মেই নিহিত। এ পর্যন্ত দেশকে সে পথে তেমন পরিচালনা করা হয়নি; তাই বলে তা কখনো বাস্তবায়িত হবে না–এ কথা বলা যায় না। বরং সেই আদর্শিক তাগিদ বাস্তবায়িত হওয়া বাঞ্ছনীয়।

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও সমাজচিন্তক

রামিসা ও নূরজাহান হত্যা: আমাদের মূল্যবোধের পচন

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম
রামিসা ও নূরজাহান হত্যা: আমাদের মূল্যবোধের পচন
ড. নাহিদ ফেরদৌসী

নূরজাহান বেগমের মরদেহ পরীক্ষা করলে আইনের চেয়ে বেশি ধরা পড়ে আমাদের মূল্যবোধের পচন। যে দেশের সংবিধান বলে জনগণের মৌলিক অধিকারের কথা, সেই দেশের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অধিকার কেবল কাগজে বন্দি হবে না–এ দাবি এখন সময়ের।...

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি বিচারিক কার্যকারিতা ও শিশু সুরক্ষার বিষয়ে গভীর উদ্বেগের সূত্রপাত করেছিল। ঘটনা সংঘটনের ১৯ দিন পর, ঘথ ৭ জুন বহুল প্রতীক্ষিত রায় প্রকাশ হয়েছে।

এতে দুজন মূল অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই যুগান্তকারী রায়টি নিঃসন্দেহে দ্রুত বিচারের একটি নজির সৃষ্টি করেছে। রায়টি শোকাহত মা-বাবার জন্য কতটুকু স্বস্তি ও মানসিক মুক্তি এনে দিয়েছে এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরে এসেছে কি না, তা নির্ভর করছে রায়টির দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর।

স্বপ্ন মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান, যা কারও দ্বারা দখল বা কেড়ে নেওয়া যায় না। একজন বাবা-মা সারাজীবন কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সন্তানের ভবিষ্যৎকে ঘিরে যে স্বপ্ন বুনে যান, তা কেবল অর্থনৈতিক বিনিয়োগ নয়; বরং তা একটি গভীর মানবিক প্রতিশ্রুতি, ভালোবাসা ও আশার প্রতিফলন।

কিন্তু আজ আমরা এমন এক সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে শিশুদের–বিশেষ করে কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। তাদের মৌলিক অধিকার, নিরাপদ শৈশব ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা আজ গভীর প্রশ্নের সম্মুখীন।

রামিসার মতো একটি নিষ্পাপ শিশুর ওপর সংঘটিত নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিক কাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকটকে উন্মোচিত করেছে। এই নির্মম ঘটনা জাতির বিবেককে যেমন গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনি সমাজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সহিংসতা ও অবক্ষয়ের নগ্ন চিত্রও স্পষ্ট করেছে।

যে মা-বাবা তাদের সন্তানের স্বপ্ন, আশা ও ভবিষ্যৎকে কেন্দ্র করে জীবনের প্রতিটি ত্যাগ স্বীকার করেন, তাদের জন্য সন্তানের নিথর ও ক্ষতবিক্ষত দেহের সামনে দাঁড়ানো অকল্পনীয়, ভাষাহীন ও চিরস্থায়ী বেদনার অভিজ্ঞতা। এই বেদনা কেবল একটি পরিবারের নয়, এটি সমগ্র মানবিক সমাজের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

এই নির্মম ঘটনার জন্য প্রকৃত দায় কার–পরিবার, সমাজ, নাকি রাষ্ট্র? নাকি আমাদের সম্মিলিত উদাসীনতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং কার্যকর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ব্যর্থতাই এই ট্র্যাজেডির মূল কারণ?

আজ প্রশ্ন আরও গভীরভাবে উঠে আসে–শিশুদের সার্বিক সুরক্ষার চূড়ান্ত দায়িত্ব কার ওপর বর্তায়? এবং কেন বারবার এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে?

বছরের পর বছর কত আর মা-বাবাকে সন্তানের শোকে আজীবন মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাতে হবে? রামিসার মতো অসংখ্য শিশু ও পরিবার আজ একই অনিশ্চয়তা ও ভয়ের মধ্যে বসবাস করছে, এটাই আমাদের সমকালীন সামাজিক বাস্তবতার নির্মম চিত্র।

এখন সময় এসেছে ন্যায়বিচারের এমন একটি দৃষ্টান্তমূলক ও কার্যকর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার, যেখানে অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া হবে দ্রুত, নিশ্চিত ও নির্ভরযোগ্য; যাতে আর কোনো মা-বাবাকে সন্তানের নির্মম মৃত্যু স্মরণ করে আজীবন মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে না হয়।

বাংলাদেশের আইনি প্রেক্ষাপটে এ ধরনের জঘন্য অপরাধ মোকাবিলার জন্য সুস্পষ্ট আইনগত কাঠামো বিদ্যমান। দণ্ডবিধি-১৮৬০ (Penal Code, 1860)-এর অধীনে হত্যা (ধারা ৩০২) এবং ধর্ষণ-সংক্রান্ত গুরুতর অপরাধগুলোর জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (Women and Children Repression Prevention Act, 2000) শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা এবং যৌন সহিংসতার মতো অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন করেছে, যেখানে অনেক ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত। এ ছাড়া শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে শিশু আইন-২০১৩ (Children Act, 2013) রাষ্ট্রকে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে, যা সংবিধানের ২৭, ২৮, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে জীবন, মর্যাদা ও সমতার অধিকারকে সুরক্ষা দেয়। তবুও বাস্তবতা হলো, আইনগত কাঠামো থাকা সত্ত্বেও এর কার্যকর প্রয়োগ, দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া এবং প্রতিরোধমূলক সামাজিক ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী না হলে এ ধরনের নির্মম ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে দ্রুত নিরপেক্ষ ও সময়বদ্ধ বিচার নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে অপরাধীরা কোনোভাবেই আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে না পারে। শিশু সুরক্ষায় রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারকে সমন্বিতভাবে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও নজরদারি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

আইন ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে রামিসার ওপর সংঘটিত ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড এমন এক অপরাধ, যা সমাজের সামষ্টিক বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট Bachan Singh v. State of Punjab (1980) এবং পরবর্তীতে Machhi Singh v. State of Punjab (1983) মামলায় ‘Rarest of the Rare Cases’ নীতি প্রবর্তন করে ঘোষণা করেন যে, যখন কোনো অপরাধের নৃশংসতা, ভুক্তভোগীর অসহায়ত্ব, অপরাধের সামাজিক অভিঘাত এবং মানবিক মূল্যবোধের ওপর আঘাত এতটাই গভীর হয় যে, সাধারণ শাস্তি ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য পূরণে অপর্যাপ্ত হয়ে পড়ে, তখন সর্বোচ্চ শাস্তি বিবেচিত হতে পারে। আদালত আরও উল্লেখ করেন যে, এমন অপরাধ সমাজের ‘collective conscience’ বা সামষ্টিক বিবেককে স্তম্ভিত করে দেয়। রামিসার মতো একটি নিষ্পাপ শিশুর ওপর সংঘটিত এই পাশবিক নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড সেই নীতির আলোকে বিচারযোগ্য একটি ঘটনা হিসেবে জনমনে প্রতীয়মান হয়েছে, যেখানে ন্যায়বিচার কেবল একটি পরিবারের জন্য নয়, বরং সমগ্র সমাজের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য।

গত ৩১ মে ঢাকার মিরপুর-১১-এর একটি অভিজাত ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয় ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের অর্ধগলিত মরদেহ। তার পাশেই ছিল সন্তানদের পাসপোর্ট সাইজের ছবি, সার্টিফিকেটের ফ্রেম–এক যুগ্ম সচিব, এক বুয়েট শিক্ষক, এক কানাডাপ্রবাসী ছেলে আর এক স্কুলশিক্ষিকা কন্যার মা। কিন্তু মা মারা গেছেন কবে? কেউ জানেন না। গন্ধ ছড়ালে প্রতিবেশীরা ফোন দেয় ৯৯৯-এ। এ ঘটনা কোনো ইংরেজি থ্রিলারের দৃশ্য নয়। এ আমাদের সমাজের সাদা-কালো সিসিটিভির ফুটেজ–যেখানে বড় পদ, বিদেশি ডিগ্রি, চমকানো সিভির নিচে পুঁতে রাখা আছে এক প্রবীণের নিঃশব্দ যন্ত্রণা, অবহেলা আর অপেক্ষার অবসান।

বাংলাদেশে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন-২০১৩’ আছে। আইনটি স্পষ্ট বলেছে: সন্তানকে মায়ের ভরণপোষণ দিতেই হবে–খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান, এমনকি ‘সঙ্গ’ দেওয়াও আইনি দায়িত্ব। পিতা-মাতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো যাবে না। অমান্য করলে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা বা ৩ মাসের কারাদণ্ড। এসব বিধান দেখে মনে হয়, নূরজাহান বেগমের সন্তানদের জেলে যাওয়া উচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো–কে যাবে আদালতে? আইনে বলা আছে, শুধু ভুক্তভোগী বাবা বা মা নিজেই অভিযোগ করতে পারবেন। যে মা মারা গেছেন, তিনি তো আর মামলা করবেন না। অথচ বেঁচে থাকতেও তিনি কি পারতেন? নিজের সন্তান–যুগ্ম সচিব আর বুয়েট শিক্ষক, যাদের মুখে সমাজের ‘আইন’ ও ‘নীতি’ উচ্চারিত হয়, তাদের বিরুদ্ধে থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া, কোন বৃদ্ধ বাবা-মা সেটা পারেন?

এটাই এই আইনের মারাত্মক দুর্বলতা। বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের অবহেলা একটি ‘নীরব অপরাধ’–কারণ ভুক্তভোগী নিজে প্রায়শই শারীরিক, মানসিক বা আর্থিকভাবে অসহায়; আর সামাজিক লজ্জায় চুপ করে থাকেন। নূরজাহান বেগমের মরদেহ পরীক্ষা করলে আইনের চেয়ে বেশি ধরা পড়ে আমাদের মূল্যবোধের পচন। যে দেশের সংবিধান বলে জনগণের মৌলিক অধিকারের কথা, সেই দেশের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অধিকার কেবল কাগজে বন্দি হবে না–এ দাবি এখন সময়ের।

লেখক: ডিন, স্কুল অব ল, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় 
[email protected]

ট্রাম্পের চুক্তি যে কারণে নস্যাৎ করতে চান নেতানিয়াহু

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৪:৪৫ পিএম
ট্রাম্পের চুক্তি যে কারণে নস্যাৎ করতে চান নেতানিয়াহু
সামি আল-আরিয়ান

ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আরববিশ্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো অর্থপূর্ণ পথ নেই। তবে নেতানিয়াহু তার মূল বিশ্বাসের পরিপন্থি কোনো চুক্তি মুখ বুজে মেনে নেবেন, এমনটা ভাবা হবে সবার জন্য বিপজ্জনক বিভ্রম। তবে এর চেয়েও গভীরতর বিভ্রম হলো, পাশবিক শক্তি দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য কোনো আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বিশেষ করে যখন এর রাজনৈতিক, নৈতিক ও কৌশলগত ভিত্তি ইতোমধ্যে ভেঙে পড়েছে।...


ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন না। তার পুরো রাজনৈতিক ক্যারিয়ারজুড়ে ইসরায়েলি আধিপত্য বজায় রাখা এবং নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য যুদ্ধের কৌশলকেই তিনি পছন্দ করেন বেশি।

বর্তমানে তার প্রধান অগ্রাধিকার হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের সঙ্গে প্রায় চূড়ান্ত হওয়া সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত রাখা। এ সংকটের কূটনৈতিক বিজয় ঘটার সম্ভাবনা দেখা দিলে তিনি তা নস্যাৎ করার জন্য রাজনৈতিক, সামরিক, কূটনৈতিক, গণমাধ্যম এবং লবিংয়ের মতো হাতিয়ার ব্যবহার করবেন।

তথাকথিত ‘চূড়ান্ত বিজয়’ নিয়ে তিনি অনমনীয় এবং আপস করতে নারাজ। তার কাছে কোনো সমঝোতাই গ্রহণযোগ্য নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না গাজায় হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ, লেবাননে হিজবুল্লাহকে খতম এবং স্বয়ং ইরানকে নিষ্ক্রিয় বা ধ্বংস করা হচ্ছে।

গাজা, পশ্চিম তীর, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন এবং ইরানজুড়ে চলা যুদ্ধগুলো কখনোই বিচ্ছিন্ন কোনো সংঘাত ছিল না। এসব যুদ্ধ ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠা এবং এ অঞ্চলে ইসরায়েলি হেজিমনি বা আঞ্চলিক আধিপত্য সুসংহত করার আগ্রাসনের অংশ হয়ে ওঠে। নেতানিয়াহু ভালো করেই জানেন, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো সত্ত্বেও তার এই লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি। তিনি নিশ্চিত হয়েছেন, পর্যাপ্ত শক্তি প্রয়োগ না করার কারণে তার লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না। ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাতে জড়াতে প্ররোচিত করার পর, নেতানিয়াহু এখনো আত্মবিশ্বাসী তিনি আবারও সেই একই চাল চালতে পারবেন। তবে এবার তার লক্ষ্য সীমিত হামলা নয়, বরং চূড়ান্ত ও সর্বাত্মক যুদ্ধ, যা এই অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্যকে স্থায়ীভাবে বদলে দেবে।

নেতানিয়াহু অবশ্য যা-ই মনে করেন না কেন, ট্রাম্পকে আরও জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তিনি হয়তো বিশ্বাস করেন, ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ও বাইরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। অভ্যন্তরীণভাবে, মার্কিন জনগণের একটি বড় অংশ এখন প্রকাশ্যেই এসব যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার পক্ষে জনসমর্থন মারাত্মকভাবে কমে গেছে। ট্রাম্পবিরোধী মনোভাব ট্রাম্পের নিজের জোটের মধ্যেই ফাটল ধরাচ্ছে। তার সমর্থকরা নেতানিয়াহুর এজেন্ডা বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ ও সৈন্যদের রক্ত দেওয়ার নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

আমেরিকানরা এখন আরও বেশি করে জানতে চাচ্ছেন কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি আঞ্চলিক যুদ্ধের অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক বোঝা বইতে হবে। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এ প্রশ্নগুলো আরও জোরালো হচ্ছে। জ্বালানি বাজার এখনো নাজুক এবং মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও বাড়ছে, যা মার্কিন ভোক্তাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিয়েছে এবং হোয়াইট হাউসের জন্য অর্থনৈতিক পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে উঠছে।

ট্রাম্প জানেন, অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করে কোনো বৈদেশিক অভিযান চালানো সম্ভব নয়। আর যেহেতু মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে তাই যেকোনো ভুলের মাশুল তাৎক্ষণিকভাবে দিতে হবে। তিনি যদি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারান, তাহলে তাকে ইমপিচমেন্ট বা অভিশংসনের মুখে পড়তে হতে পারে।

আন্তর্জাতিক চাপ ট্রাম্পের ওপর আরও তীব্রভাবে চেপে বসেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৌশলগত পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। এ সংকট যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। ৩৯ দিনব্যাপী চলা যুদ্ধে ইরান এবং তাদের মিত্রদের হামলায় আটটি দেশজুড়ে থাকা অন্তত ১৬টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার কয়েকটি প্রায় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

স্যাটেলাইট ইমেজের ওপর ভিত্তি করে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরানি হামলায় ওই অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলোর অন্তত ২২৮টি স্থাপনা ও সরঞ্জাম ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হ্যাঙ্গার, জ্বালানি ডিপো, যুদ্ধবিমান, রাডার নেটওয়ার্ক, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এ যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের পুরো কাঠামোকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত মারাত্মকভাবে ফুরিয়ে এসেছে।

পেন্টাগন সতর্ক করেছে, ক্ষেপণাস্ত্রের এ মজুত আগামী দশকের আগে পূরণ করা সম্ভব হবে না। রাশিয়ার এবং চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের পরিকল্পনা করতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক দুর্বলতা। ট্রাম্পের যুদ্ধ করার উদ্দেশ্য ছিল নিজের আধিপত্য জাহির করা, কিন্তু এখন তা উল্টো আমেরিকার শিল্প ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে।

ওয়াশিংটন এবং তেল আবিব সর্বোচ্চ লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধে নেমেছিল। সেটা হলো ইরানকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা, তার পারমাণবিক অবকাঠামো ধ্বংস করা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দ করা, প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং ইরানি রাষ্ট্রের উৎখাত বা একে খণ্ডবিখণ্ড করে ফেলা। কিন্তু এর একটি লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি। ইরান আত্মসমর্পণ করেনি, তার সরকার ভেঙে পড়েনি এবং তীব্র চাপের মধ্যেও আঞ্চলিক জোটগুলোকে নিশ্চিহ্ন করা যায়নি। ইরান এবং তার মিত্ররা আঘাত সয়েছে, কিন্তু পরাজিত হয়নি।

ইরান যুদ্ধক্ষেত্রকে প্রসারিত করেছে, বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহকে হুমকির মুখে ফেলেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সহজ বিজয় থেকে বঞ্চিত করেছে। আত্মসমর্পণের বিকল্প হিসেবে তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলার পথ বেছে নেয়, যা পুরো পরিস্থিতিকে ঘুরিয়ে দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিকে পরাস্ত করার ক্ষমতা ইরানের ছিল না। কিন্তু পাল্টা আক্রমণ করে তারা আত্মরক্ষা করতে পেরেছে। ইরানের জন্য পরাজয় এড়ানো, নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং শত্রুকে তার রাজনৈতিক লক্ষ্য থেকে বঞ্চিত করাই যথেষ্ট ছিল। একটি রাষ্ট্র যখন প্রবল পরাক্রমশালী শক্তির মুখোমুখি হয়, তখন নিজের অস্তিত্ব ও কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখতে পারাটাই এক ধরনের বিজয়। ইরান সেটা পেরেছে।

নেতানিয়াহু তার সম্প্রসারণবাদী প্রকল্পের হুমকিটা এখন বুঝতে পারছেন। কিন্তু যুদ্ধবিরতি ইসরায়েল কখনই মেনে নিতে পারবে না। কেননা তাহলে যুদ্ধটি ইসরায়েলের বিজয়ের মধ্যদিয়ে শেষ হবে না, শেষ হবে ইরানের টিকে থাকার মধ্যদিয়ে।

বর্তমান আলোচনা, যা জানা গেছে যে পাকিস্তান মধ্যস্থতা করছে এবং বেশ কয়েকটি আরব ও ইসলামিক রাষ্ট্র এতে সমর্থন দিচ্ছে। চুক্তির প্রায়-চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে অন্তত ৬০ দিনের জন্য লেবাননসহ বহুমাত্রিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা। অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি খাতের অস্থিরতা এবং উত্তর আমেরিকায় আসন্ন বিশ্বকাপের মতো বড় ইভেন্টগুলোকে বিঘ্নিত করতে পারে এমন একটি বৃহত্তর যুদ্ধের আশঙ্কা থেকে ওয়াশিংটনের এখন শান্ত পরিস্থিতি প্রয়োজন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এই পিছুটান কোনো বিজয়ের ফসল নয়, বরং পরিস্থিতি তাকে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করছে।

যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি, অন্তর্বর্তী সময়ে এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা আনার লক্ষ্যে একগুচ্ছ পদক্ষেপের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালির মধ্যদিয়ে নৌচলাচল নিরাপদ করা, ইরানের শিপিংয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, ইরানের অবরুদ্ধ করে রাখা সম্পদের আংশিক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া এবং সম্পর্ক আরও স্বাভাবিক করার বিষয়ে আলোচনা শুরু করা।

এ রূপরেখা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বেশ কয়েকটি দাবি মেনে নেবে। কিন্তু নেতানিয়াহুর কাছে এটা একেবারেই অসহ্য লাগছে। কারণ, এরকম চুক্তি হলে ইরান অর্থনৈতিকভাবে স্বস্তিতে থাকবে। তার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে না। আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গেও ইরানের সম্পর্ক অটুট থাকবে। এতে তেহরান ভবিষ্যতে আরও বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যাবে। ট্রাম্পের ওপর নেতানিয়াহুর তীব্র চাপ দেওয়ার কারণ এটাই। দুজনের মধ্যে যে কথা চালাচালি হচ্ছে তা এ কারণেই উত্তপ্ত ও অস্বাভাবিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে হচ্ছে। নেতানিয়াহু কূটনৈতিক সমঝোতার বিরোধিতা করছেন এবং গাজা ও লেবাননজুড়ে নতুন করে হামলা বাড়ানোর জন্য ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন।

নেতানিয়াহুর সামনে এখন সীমিত ও বিপজ্জনক কিছু পথ খোলা আছে। তিনি যদি কূটনৈতিক সমঝোতাকে সরাসরি আটকে দিতে না পারেন তাহলে এ চুক্তি যাতে বাস্তবায়িত না হয় সেজন্য নাশকতা করার চেষ্টা করবেন। এ জন্য তিনি লেবাননে হামলা চালিয়ে যাওয়া এবং ফিলিস্তিনে আক্রমণের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারেন। নেতানিয়াহু হয়তো হিসাব কষছেন, গাজায় নতুন করে গণহত্যা, অবরোধ জোরদার করা বা অধিকৃত পশ্চিম তীরের পবিত্র স্থানগুলোতে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালালে যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যেতে পারে। এরকম পরিস্থিতেতে ট্রাম্প তখন ইসরায়েলের দাবির পক্ষে দাঁড়াতে বাধ্য হবেন।

আসলে ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আরববিশ্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো অর্থপূর্ণ পথ নেই। তবে নেতানিয়াহু তার মূল বিশ্বাসের পরিপন্থি কোনো চুক্তি মুখ বুজে মেনে নেবেন, এমনটা ভাবা হবে সবার জন্য বিপজ্জনক বিভ্রম। তবে এর চেয়েও গভীরতর বিভ্রম হলো, পাশবিক শক্তি দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য কোনো আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বিশেষ করে যখন এর রাজনৈতিক, নৈতিক ও কৌশলগত ভিত্তি ইতোমধ্যে ভেঙে পড়েছে। আদর্শিক অন্ধত্ব এবং কৌশলগত ব্যর্থতার মাঝে আটকা পড়ে নেতানিয়াহু হয়তো শেষ পর্যন্ত মারাত্মক জুয়া খেলতে পারেন এবং পুরো ব্যবস্থাটি তার সঙ্গে ভেঙে পড়ার আগ পর্যন্ত যুদ্ধকে আরও ছড়িয়ে দিতে পারেন। এরকম শঙ্কা একেবারেই অমূলক নয়। (সংক্ষেপিত)

লেখক: ইস্তাম্বুল জাইম ইউনিভার্সিটির ‘সেন্টার ফর ইসলাম অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স’-এর পরিচালক। মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ: মাসুদুজ্জামান