আমরা অনেকে ভয় পাই। ভয়ে আমাদের ভেতরটা কুঁকড়ে আসে। আমরা ভয় পাই বদ্ধ ঘরে, অপরিচিত মুখ দেখলে, ভয় পাই অন্ধকারে। আচমকা শব্দে। এই ভয়গুলো হয়তো সবসময় যুক্তির সঙ্গে মেলে না। তবু আমরা ভয় পাই।
আমার ছোটবেলার অনেক ভয়াবহ স্মৃতি আছে, যেগুলো কাউকে বলিনি। ভয়, কষ্ট, অপমান- এগুলো জমে আছে মনে বহুবছর। তখন শিশু ছিলাম। তখন কেউ শুনতে চাইত না আমার কথা। বুঝতে পারতাম ছোটদের কষ্ট বুঝতে চায় না বড়রা। এখনো হয়তো অনেকেই তেমনি করে ভাবে।
আমার মতো অনেক শিশু আছে যারা দুঃসহ অভিজ্ঞতা মনে বয়ে বেড়াচ্ছে চুপচাপ। তারা মুখ খোলে না, শুধু চুপ করে যায়। তাদের চোখের কোনায় কান্না জমে থাকে, আর ভয় জমাট বাঁধতে থাকে মনের ভেতর। কেউ বলে না, কিন্তু ওই চুপ করে থাকাটাই শিশুদের সবচেয়ে বড় চিৎকার।
সম্প্রতি রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুলে ভয়াবহ এক ঘটনা ঘটে গেছে। প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে স্কুলের ওপর। যেসব শিশু সেই ঘটনায় বেঁচে গেছে, তারা শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও গভীর আঘাত পেয়েছে। যে ভয় তারা সেদিন অনুভব করেছে, তা তাদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে, আতঙ্কে তারা কেঁপে উঠছে, আবার স্কুলে ফেরার কথা উঠলে তাদের বুক ধড়ফড় করে উঠছে।
এই শিশুরা এখন ট্রমার মধ্যে আছে। শিশুদের এই ট্রমা যদি আমরা সময়মতো বুঝে উদ্যোগ নিতে না পারি, শিশুদের মন থেকে ভয় আর আতঙ্ক ঝেড়ে ফেলতে না পারি, তাহলে আমাদের এই সন্তানরা বড় হবে ভয় আর সংশয়ে ভরা এক মানসিক ভার নিয়ে। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে- আমরা যারা বড়, তারা যেন শিশুদের পাশে থাকি।
শিশুদের কথা শুনুন: শিশুরা অনেক কিছু বলে না, কিন্তু বলতে চাইলে তাদের থামিয়ে দেওয়া যাবে না। তারা যা বলছে, তা-ই তাদের সত্য। হয়তো কোনো শব্দ তাদের ঠিকমতো আসে না, হয়তো তারা গুছিয়ে বলতে পারে না, কিন্তু মন জানে সে কী বলছে। এই সময় শিশুর প্রয়োজন একজন মন দিয়ে তার কথা শোনার মতো মানুষ।
ভয়কে অস্বীকার নয়, স্বীকৃতি দিন: ‘ভয় পেয়ো না’- এই কথাটি অনেক সময় শিশুকে আরও নিঃসঙ্গ করে দেয়। কারণ তারা ভয়ে আছে, তবু বলা হচ্ছে, ভয় পাওয়া যাবে না। বরং বলুন, ‘ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক, আমি তোমার পাশে আছি।’ এই আশ্বাসেই তৈরি হবে নিরাপত্তার আস্থা, যা শিশুর ভয়ংকর সেই স্মৃতি ভুলতে সাহায্য করবে।
নিরাপত্তার বোধ ফিরিয়ে দিন: শিশুকে বুঝিয়ে বলুন, সে এখন নিরাপদ। ভয়ংকর সেই সময় পেছনে পড়ে গেছে, সে এখন পরিবারের আপনজনের সঙ্গে আছে, ভালোবাসার আশ্রয়ে। শিশুকে আশ্বস্ত করুন, ‘তুমি এখন নিরাপদ’, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’, ‘তুমি একা নও’- এই কথাগুলো শিশুর মনে আস্থা আনবে, ভয় দূর করে দেবে।
শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিন: শুধু ওষুধ আর ব্যান্ডেজে সব ঠিক হয় না। শিশুর ভেতরের ভয় কাটাতে দরকার কাউন্সেলিং। শিশু যদি ঘন ঘন আতঙ্কে জেগে ওঠে, একা থাকতে না চায়, বা আচরণে পরিবর্তন আসে, তাহলে আপনার সন্তানের জন্য দ্রুত মনোবিদের পরামর্শ নিন। মানসিক যত্নও শারীরিক যত্নের মতোই জরুরি।
ভালোবাসার স্পর্শ ওষুধের চেয়েও কার্যকর: আলতো করে জড়িয়ে ধরা, মাথায় হাত বুলিয়ে বলা- ‘তুমি ভালো থাকবে’, ‘আমি এখানে আছি’- এই ছোট ছোট অভিব্যক্তিগুলো শিশুর মনে শান্তি আনে। শিশু অনুভব করে- সে একা নয়, কেউ তাকে ভালোবাসে, কেউ তার পাশে আছে।
ঘুম ও শিশুর দেহভাষা খেয়াল করুন: অনেক শিশু হঠাৎ ঘুম ভেঙে চিৎকার করে উঠবে। এটা ট্রমার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। শিশুর ঘুমের সময় তার পাশে থাকুন, আলতো করে হাত রাখুন, আদরমাখানো গলায় বলুন, ‘তুমি নিরাপদ, ভয় নেই।’ এমন নরম আশ্বাস শিশুর জন্য অনেক বড় ওষুধ।
অপ্রয়োজনীয় ও চাপ তৈরি করে এমন প্রশ্ন এড়িয়ে যান: শিশুকে বোঝার চেষ্টা করুন, নাড়িয়ে দিয়ে চাপ তৈরি করবেন না। ‘তুমি কী দেখেছিলে?’, ‘ঘটনার সময় তুমি ঠিক কোথায় ছিলে?’- এমন প্রশ্ন শিশুর মনে আবার ভয় ফিরিয়ে আনতে পারে। বরং বলুন, ‘তুমি চাইলে বলতে পার’, ‘যতটুকু বলতে চাও, সেটাই যথেষ্ট’, ‘আমি তোমার পাশে আছি।’
শিশুর স্কুলে ফেরা হোক সৃজনশীল পথ ধরে: শুধু বই আর ক্লাস নয়, স্কুলে শিশুদের জন্য দরকার নিরাপদ পরিবেশ, যেখানে তারা খেলতে পারে, ছবি আঁকতে পারে, গান গাইতে পারে। এসব সৃজনশীল কাজে জড়ানোর মধ্যদিয়ে শিশুরা ধীরে ধীরে আবার স্কুলকে ভালোবাসতে শিখবে। ভয়ের ঘরে ফেরার মতো কঠিন কিছু নেই। এখন স্কুল মানেই এই শিশুদের চোখে আতঙ্ক। স্কুলের ক্লাসরুম, বেঞ্চ, করিডর- সবকিছুতেই হয়তো ট্রিগার হয়ে উঠবে শিশুদের মনে সেই দিনের ভয়াবহ সব স্মৃতি। তাই বাবা-মা, অভিভাবক, স্কুল কর্তৃপক্ষ আর শিক্ষকরা যেন একথা মনে রাখেন- এই শিশুদের কাছে এখন স্কুল মানে শুধু পড়া শেখার জায়গা নয়, বরং নিজেকে ফিরে পাওয়ার নিরাপদ আশ্রয়।
জোর নয়, ধৈর্য দরকার: শিশুরা অনেক সময় নিজে থেকে বলতে চায় না। কেউ কেউ হয়তো স্কুলে যেতে চাইবে না, কেউ কেউ কল্পনার জগতে ঢুকে যাবে, কেউ হয়তো হঠাৎ হঠাৎ রেগে যাবে। এসব আচরণকে শাসন নয়, দরকার বুঝে নেওয়া। শিশুদের সময় দিতে হবে, পাশে থাকতে হবে, ভালোবাসা দিয়ে, সাহস দিয়ে সঙ্গ দিতে হবে।
এই শিশুদের ভবিষ্যৎ আমাদের হাতেই। আমরা যদি এখন তাদের এই মানসিক আঘাত থেকে আগলে না রাখি, তবে ভয় তাদের মনে এক দীর্ঘ জীবনের যন্ত্রণা হয়ে রয়ে যাবে। আমরা যদি তাদের কথা না শুনি, যদি না বুঝি তাদের না বলা কষ্ট, তাহলে আমাদের সন্তানরা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে এক গভীর নিঃসঙ্গতায়।
শিশুরা স্বপ্ন দেখে। তারা নতুন করে শুরু করতে চায়, যদি কেউ পাশে থাকে। তারা অন্ধকার থেকেও আলো আঁকতে পারে, যদি কেউ হাত ধরে। তারা কান্নার ভেতর থেকেও হাসি খুঁজে পায়, যদি কেউ ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখে। আসুন, আমরা সেই মানুষটি হই- যে শিশুর ভয় বুঝবে, পাশে থাকবে এবং বলবে- ‘তোমার ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক, আমি তোমার পাশে আছি।’ এই একটি কথাই হতে পারে শিশুর সুস্থ হয়ে ওঠার শুরু।
লেখক: শিশুসাহিত্যিক ও শিশুর যত্ন
বিকাশ এবং শিক্ষা পরামর্শক



.jpg)