অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কাজ যথাযথ গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন করা এবং তার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার করা। মানুষ যেন নিরাপদে এবং সুস্থভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে, ভোট দিতে পারে, সংঘাত বা সহিংসতা যেন না হয় এগুলো নিশ্চিত করাই এ সরকারের প্রধান দায়িত্ব। সরকারের যা নিশ্চিত করতে হবে, তা হলো- সরকার যেন পক্ষপাতহীন থাকে, প্রশাসন এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলোকে দক্ষতার সঙ্গে বিন্যাস করে। প্রয়োজনে পুনর্বিন্যাস করবে, প্রয়োজনে কাঠামোর ভেতরে যে পরিবর্তন দরকার, সেটা করবে। আমরা অতীতে দেখেছি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলো নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করেছে, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে বড় কোনো অভিযোগ ওঠেনি। এখনকার অন্তর্বর্তী সরকার শুরু থেকেই নানা বিতর্ক ও দলীয় প্রভাবের মধ্যে আছে, ফলে সমাজে নানা মাত্রায় অনাস্থা তৈরি হয়েছে।
বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি তিনটি দলই আলাদা আলাদা বৈঠকে ‘কিছু উপদেষ্টার’ অপসারণ চেয়েছে। তিনটি দল ভিন্ন ভিন্নভাবে ভিন্ন ভিন্ন উপদেষ্টার অপসারণ চাইছে, এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। যে দলগুলো নির্বাচনে অংশ নেবে, উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে তাদের যদি সমবেতভাবে অভিযোগ থাকে, তবে সেটা আমাদের সবারই গুরুত্বের সঙ্গে দেখার বিষয়।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে তিন ধরনের অভিযোগ হতে পারে- (১) অদক্ষতা, (২) দুর্নীতি ও (৩) দলীয় পক্ষপাত। যদি এসব অভিযোগ সুনির্দিষ্ট হয়, সেখানে যদি তথ্যপ্রমাণ থাকে, তাহলে সরকারকে অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে তা বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু যদি অভিযোগগুলো অযৌক্তিক হয় কিংবা জোরজবরদস্তি হয়- যেমন আমরা অনেক সময় দেখি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লোক বসানো বা সরানোর ক্ষেত্রে মব সন্ত্রাসের মতো প্রবণতা তৈরি হয়, তাহলে সেটাকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। এখন এ অবস্থায় প্রধান উপদেষ্টা কতটা বিচার-বিবেচনা, দক্ষতা, সক্ষমতা, নিরপেক্ষতা এবং বস্তুনিষ্ঠতা দিয়ে বিষয়গুলো মোকাবিলা করতে পারবেন, সেটিই প্রশ্ন।
এ তিনটি রাজনৈতিক দল তিনভাবে অভিযোগ করলেও আমরা দেখছি এ তিন দলের মধ্যেই দলীয় প্রভাব বাড়ানোর প্রতিযোগিতা আছে। কোথাও জোরজবরদস্তি হচ্ছে, কোথাও কৌশল প্রয়োগ হচ্ছে, কোথাও চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এসব তৎপরতা দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য বড় হুমকি। সাধারণভাবে ধারণা করা যে এ সরকার বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি- এ তিন দলের সরকার। তাই যদি এই তিন দলের মধ্যে নিজেদের অংশ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়, সেটা সামনের সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের মানুষ যে বড় স্বপ্ন দেখেছে তার পথে কাঁটা বিছানোর চেষ্টা করছে কেউ কেউ।
জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিলেন এ দেশের প্রান্তিক, দরিদ্র ও বঞ্চিত জনগণ থেকে আগত। কারণ কোটা আন্দোলন তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সন্তানের নিশ্চিত কর্মসংস্থানের স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল সেখানে। গুলিতে রক্তাক্ত হতে হতে পুরো জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে যে দাবি সামনে এসেছে তা হলো এই দুর্নীতিবাজ, খুনি, অত্যাচারী শাসকের পতন হোক, আমরা বৈষম্যহীন অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে চাই। এ আন্দোলনে শিশু, নারী, শ্রমিক, শিক্ষার্থীসহ শত শত মানুষের জীবন গেল, ২০ সহস্রাধিক জখম হলেন, যাদের মধ্যে বহুজনের হাত-পা বা চোখ হারিয়ে সারা জীবনের জন্য ভয়ংকর স্বাক্ষর বহন করছেন এক অত্যাচারী শাসকের। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায়, অথচ পরিস্থিতির গুণগত পরিবর্তনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই।
জুলাই-আগস্টের শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থান একটা সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছিল। বাংলাদেশে দেড় দশক ক্ষমতায় থাকা একটি গভীর দুর্নীতিগ্রস্ত ও নিপীড়ক শাসকগোষ্ঠীকে উৎখাত করেছে এ গণ-অভ্যুত্থান। এ সময়ে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা তীব্রভাবে প্রকাশিত হয়েছে, স্বৈরাচার ও বৈষম্যমুক্ত সমাজের জন্য শক্তিশালী জনমত তৈরি হয়েছে। এমনকি দেয়ালে আঁকা চিত্রগুলোও এমন পরিণত বার্তাই প্রকাশ করে। দেয়ালগুলো ঘোষণা করে মুসলমান, হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধনির্বিশেষে সব বাংলাদেশির সমানাধিকার থাকা উচিত। এগুলোর স্পষ্ট বক্তব্য এটাই যে, ধর্ম পরিচয় দিয়ে কোনো বিভেদ সৃষ্টি গ্রহণযোগ্য নয়। বাঙালি ছাড়াও আরও বহু জাতির দেশ এ বাংলাদেশ, জাতিগত বৈষম্য তাই চলবে না। দেয়ালচিত্রে তরুণরা লিঙ্গসমতা ও একটি ন্যায়সঙ্গত বাংলাদেশ দাবি করে। এসব বিষয়ও দেয়ালে এসেছে। প্রকৃতপক্ষে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে গেলে বৈষম্যের উৎস নির্মূলের প্রশ্ন আসে। এর জন্য রাজনীতি মতাদর্শও স্পষ্ট করা দরকার হয়।
ক্ষমতায় উঠে আসা ব্যক্তিরা রাজপথে দেয়ালে স্পষ্টভাবে ব্যক্ত বৈষম্যের অবসানের দাবিগুলো সমান স্পষ্টতার সঙ্গে যে ধারণ করেননি তারই প্রকাশ ঘটছে বারবার। শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে দেশের সর্বস্তরের মানুষের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকার তা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। স্বৈরাচারী শাসন দূর হলেও এখনো দেশজুড়ে মব সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি অব্যাহত আছে। মব সন্ত্রাস করে মানুষের বাড়িঘর ভাঙা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা করা এবং কিছু লোকের ভাড়াটে হিসেবে মব সন্ত্রাস কাজ করছে। মব তৈরি করা হচ্ছে কাউকে বসানোর জন্য, আবার কাউকে ওঠানোর জন্য।
এই যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তাতে সরকারকে আমরা দায়ী করতাম না, যদি আমরা দেখতাম, সরকার এগুলো থামানোর জন্য উদ্যোগ নিচ্ছে। আমরা বরং দেখতে পাচ্ছি, সরকারের মধ্যে কেউ কেউ এ মব সন্ত্রাসকে যৌক্তিকতা দেওয়ার চেষ্টা করছে। সাম্প্রদায়িকতা, জাতিবিদ্বেষ, নারীবিদ্বেষী প্রচারণা ভয়ংকর বাড়ছেই। জাতীয় স্বার্থবিরোধী বিভিন্ন চুক্তি ও প্রকল্প বহাল আছে। সে কারণেই অন্তর্বর্তী সরকার যেভাবে সরকার পরিচালনা করছে তাতে আমরা গত সরকারের ছায়া দেখতে পাচ্ছি। সেই একই রকম স্বৈরতন্ত্র, জনগণের ওপর একই রকম নিপীড়ন এবং একই রকম বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা হয়েছে। একইভাবে দেশের স্বার্থ বিপন্ন করে জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করা হচ্ছে।
ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ থেকে স্বৈরশাসন, দুর্নীতি, গুম-খুন-নির্যাতন, উন্নয়নের নামে প্রাণবিনাশী প্রকল্প গ্রহণের বিরুদ্ধে একের পর এক আন্দোলনের মধ্যদিয়ে প্রতিরোধের চেতনা এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রত্যাশা ঘনীভূত হয়েছে। ২০১৪ সালের পর থেকে অনির্বাচিত সরকারের জোর-জবরদস্তি, অবৈধ ক্ষমতা আর অদৃষ্টপূর্ব মাত্রায় লুণ্ঠন, অত্যাচার অব্যাহত রাখতে পারায় শাসকদের মধ্যে তৈরি হয় সীমাহীন ঔদ্ধত্য। এ ঔদ্ধত্যই গত বছরের ১৫ জুলাই থেকে নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের অবস্থা তৈরি করে। আর এ হতাহতের নৃশংসতায় বহু বছরে মানুষের জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয় এবং তৈরি হয় চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান। এ গণ-অভ্যুত্থান সফল হয়েছে সব স্তরের মানুষের অদম্য ভূমিকার কারণে। এখানে অংশ নিয়েছেন সব ধর্ম, মত, লিঙ্গ, পেশা, বিশ্বাসের মানুষ, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমিক, নিরাশ্রয়, তরুণ, শিশু, বৃদ্ধ।
আমরা এমন একটি দেশ চাই, যেখানে কেউ ক্ষমতার ব্যবহার করে তার অধস্তনকে নিপীড়ন করবে না, শ্রমজীবী মানুষের হিস্যা আদায় হবে, তাকে নিপীড়িত হতে হবে না, নারীরা নিরাপদে চলাফেরা ও জীবনযাপন করতে পারবে, যেখানে ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষদের বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হতে হবে না। মানুষের লড়াই ততদিন চলবে, যতদিন জুলাই হত্যাকাণ্ডসহ অতীত ও বর্তমানের সব মানবাধিকার লঙ্ঘন, ও নিপীড়ন-অত্যাচারের বিচার না হবে। যতদিন বৈষম্য নিপীড়ন ও আধিপত্যের অবসান না হবে ততদিন মানুষের লড়াই থামবে না।
এর মধ্যে সামনের নির্বাচন অনুষ্ঠান যথাযথভাবে সম্পন্ন করা এ সরকারের দায়িত্ব যাতে জনগণের অংশগ্রহণে দেশ পরিচালনা এবং গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে যাত্রা শুরু হয়। এর অন্যথা করার কোনো সুযোগ এ সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলোর নেই।
লেখক: শিক্ষাবিদ


.jpg)