শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি অপরিহার্য। বর্তমান সরকার নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যে দায়িত্ব নিলেও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। শুধু বরাদ্দ বাড়ানোই শেষ কথা নয়; বরং বরাদ্দকৃত অর্থের সুষ্ঠু ও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অপচয় এবং দুর্নীতি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ ও সঠিক পরিকল্পনা নিতে হবে। সুনির্দিষ্ট কৌশল ও জনঅংশগ্রহণভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।...

শিক্ষাক্রম বিশ্বব্যাপী চলমান প্রক্রিয়ার অংশ। মানুষের চাহিদা এবং যুগের প্রয়োজনে এটি পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হওয়া জরুরি।একই সঙ্গে পরিবার থেকে শিক্ষার্থীদের বিকাশ শুরু করতে হবে। মা-বাবাকে তার সন্তানদের দিকে নজর দিতে হবে। সেই নজর দেওয়া বলতে তাদের মেধা সুস্থভাবে বিকাশ হচ্ছে কি না প্রথমেই সেদিকটা দেখতে হবে। তার পরের দায়িত্ব বর্তায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপরে। বিশ্বমানের শিক্ষার্থী তৈরি করতে শিক্ষকদের দক্ষ করে তৈরি করা দরকার। আমাদের দেশে শিক্ষকরা শিক্ষাদানে যথেষ্ট পরিমাণে দক্ষ নয়। আমরা দেখেছি শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেও শ্রেণিকক্ষে সেই প্রশিক্ষণের বাস্তবায়ন করেননি। এই হলো শ্রেণিকক্ষের ভেতরে শিক্ষকদের দক্ষতার প্রমাণ। শিক্ষার্থীদের পুঁথিগত বিদ্যা ও মুখস্থবিদ্যা থেকে সরে আসতে হবে। আমরা যদি পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারি, তাহলে আমাদের বাচ্চারা আরও অনেক বেশি পিছিয়ে যাবে। কাজেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। এ পরিবর্তন হতে হবে সময়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ন্যূনতম কতগুলো বিষয়ে অবশ্যই পড়ালেখা করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যেক শ্রেণির ক্ষেত্রে পড়ালেখার পাশাপাশি দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার মূল ভিত্তিটুকু গড়ে ওঠে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। কাজেই শিক্ষায় পরিবর্তনও প্রাথমিক পর্যায় থেকে হতে হবে। সেই সময়টুকু শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার ভিত্তিটুকু শক্ত করতে হলে আমাদের প্রধানত তিনটি বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে- দক্ষ শিক্ষক, সক্ষম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা। সে ক্ষেত্রে যথার্থ বিনিয়োগ প্রয়োজন আছে। এমনিতেই শিক্ষা সরঞ্জামের দাম অপেক্ষাকৃত বেশি। এর ফলে শিক্ষার্থীদের নানা রকম বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। পরিবারকে শিক্ষা সরঞ্জামগুলোর ব্যয়ভার বহনে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়। এ বিষয়গুলোতে আমাদের মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। আমার মতে, শিক্ষাক্রমে কোনো বিভাজন থাকা উচিত নয়। বিজ্ঞান, মানবিক, বাণিজ্য ইত্যাদি বিভাজন করেই শিক্ষার্থীদের আমরা আরেকটি জালের ভেতর ফেলে দিয়েছি। আজকে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা মানবিকে যায় না। মানবিকের শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানের ধারে কাছে যেতে চায় না। আমি মনে করি, বিভাজনের কোনো দরকার নেই।
আমাদের দেশে শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘদিন কোনো সংস্কার হয়নি। বরঞ্চ দিনের পর দিন একইভাবে চলতে গিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। সোজা কথায়, ক্রমপরিবর্তনশীল পৃথিবীর সঙ্গে আমরা বদলাইনি। ছাত্রছাত্রীদের শ্রেণিকক্ষে পাঠ না দিয়ে, পরীক্ষার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোচিং বাণিজ্যের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গাইড বইনির্ভর একটি সংস্কৃতি চালু করা হয়েছে, যা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে নেই। পৃথিবীর বহু উন্নত দেশে পরীক্ষা দিয়ে শিক্ষার্থীর মান নির্ধারণ হয় না কিংবা দক্ষতা যাচাই হয় না। শ্রেণিকক্ষভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়নের মধ্যদিয়ে অর্থাৎ নিয়মিত মূল্যায়ন-প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে দক্ষতা যাচাই হয়। কাজেই গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পুরো শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। একই সঙ্গে তা হতে হবে সময়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। সে ক্ষেত্রে আমি অবশ্যই মনে করি, শিক্ষাক্ষেত্রে পরিবর্তনের ধারার বিরোধিতা না করে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে স্বাগত জানানো উচিত। এখন পর্যন্ত শিক্ষায় আমাদের বিনিয়োগ জাতীয় আয়ের খুবই সামান্য অংশ, যা অবশ্যই কয়েক গুণ বাড়ানো দরকার।
আমাদের দেশে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। শিক্ষা খাতে বরাদ্দকৃত বাজেট দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে নিম্নতম। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলো সেদিক থেকে অনেক বেশি অগ্রগামী। আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাস্তব বিষয়গুলো আসতে হবে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষাব্যবস্থাপনায় আমাদের বড় বড় মেগা প্রকল্প দরকার। আমরা যদি মানবসম্পদ বিনির্মাণে বিনিয়োগ না করি, তাহলে বড় বড় গার্মেন্টসের মতো স্ট্রাকচারগুলো চালু করার জন্য বিদেশ থেকে আমাদের জনশক্তি আমদানি করতে হবে। ভারতে এডুকেশন সারচার্জ বা শিক্ষা কর প্রবর্তন করে লক্ষাধিক কোটি টাকার ‘শিক্ষা সহায়তা তহবিল’ গঠন করা হয়েছে। এ তহবিলের মাধ্যমে তারা শিক্ষা বাজেটের বড় একটি ঘাটতি পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশও পরীক্ষামূলকভাবে এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে।
কারিগরি শিক্ষায় কর্মসংস্থান বাড়াতে বৈষম্য কমানোর জন্য প্রযুক্তি এবং কারিগরি শিক্ষাকে আরও এগিয়ে নিয়ে আসা দরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটা বিশেষ প্রকল্পই আছে এটার জন্য। বিশেষ করে শিক্ষা গবেষণা উন্নয়নে আমরা সঠিক মাত্রায় বিনিয়োগ দেখি না। বিভিন্ন ধরনের প্রজেক্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা না করে ঠিকাদারদের দিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা মতানৈক্য আগে প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশ কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ করে কত বড় সাফল্য দেখিয়েছে। শিক্ষা গবেষণায় বিনিয়োগটা খুব দরকার বলে মনে হয়। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবাসিকসংকট প্রকট। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিকসংকট রয়েছে। অধিকাংশ হোস্টেলে ৬৫ শতাংশ মেয়ে এক রুমে তিন-চারজন করে থাকে। ছেলেরা অপেক্ষাকৃত একটু আরামেই থাকে। এ জায়গায় জেন্ডারবৈষম্য আছে বলে মনে করছি।
ডিজিটাল বৈষম্য দূরীকরণের জন্য প্রযুক্তিগত কাঠামো উন্নয়ন। এখানে ব্যাপকভাবে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। প্রযুক্তি সবার জন্য। বিশ্বব্যাপী নারীরা এ প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে আছে। ইউনেস্কোর রিপোর্ট সেটা বলছে। যেখানে ছেলেদের অংশগ্রহণ ৬০ শতাংশের ওপর, সেখানে নারীদের অংশগ্রহণ ৩০ শতাংশেরও কম। নারী-পুরুষ ও ধনী-দরিদ্রের একটা বৈষম্য আমরা দেখেছি। আমরা তরুণ প্রজন্মকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তাদের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে চাই এবং সেটা অবশ্যই আমাদের করে দেখাতে হবে। শিক্ষায় আরও মনোযোগ দেওয়ার পাশাপাশি যারা মিথ্যাচার করে, জনমনে হতাশা ছড়ায়, তাদের বিষয়ে আমাদের সচেতন থাকতে হবে।
শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি অপরিহার্য। বর্তমান সরকার নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যে দায়িত্ব নিলেও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। শুধু বরাদ্দ বাড়ানোই শেষ কথা নয়; বরং বরাদ্দকৃত অর্থের সুষ্ঠু ও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অপচয় এবং দুর্নীতি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ ও সঠিক পরিকল্পনা নিতে হবে। সুনির্দিষ্ট কৌশল ও জনঅংশগ্রহণভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশকে একটি মানবিক, সাম্যভিত্তিক ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, শিক্ষা নিয়ে কোনো রাজনীতি চলবে না। শিক্ষাঙ্গন কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ নয়, বরং এটি হতে হবে মানবসক্ষমতা বিনির্মাণের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। আশার কথা হচ্ছে, সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তন-পরিমার্জন হচ্ছে এবং অবশ্যই তা হতে হবে। দেশে যারা শিক্ষা নিয়ে কাজ করেন, নীতিনির্ধারক যারা আছেন, তারা প্রতিনিয়তই চেষ্টা করছেন। সে লক্ষ্যে কাজ চলছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, এটি এত সহজ কাজ নয় যে, চাওয়ামাত্রই তা দ্রুত বাস্তবায়িত করে ফেলা সম্ভব। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। সে জন্য শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় সুফল পেতে সময় দিতে হবে। সে লক্ষ্যে চেষ্টা চলছে এবং আমাদের আশাবাদ, পরিবর্তন আসবেই।
লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা
