ঢাকা ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
বিষাদ-বেদনার আঙুলে চুমো খাও নির্বাচনের খরা কাটল মাসুদুজ্জামানের শান্তি নিদ্রা আব্বার সেই ম্লান হাসিটা আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে বিশ্বকাপে নিষিদ্ধ পানির বোতল যে বই কেউ ছাপতে চায়নি সেই বইয়ের বুকার জয় ময়মনসিংহ মেডিকেলে হাম উপসর্গে ভর্তি আরও ১৯ শিশু বেড়েছে মুরগি, কাঁচা মরিচ-কাঁচা পেঁপের দাম বাতাসে যেন আগুনের হলকা, কষ্টে প্রাণিকুল তিন ক্যাটাগরিতে রিটেইল এশিয়া অ্যাওয়ার্ডস পেল এপেক্স ফুটওয়্যার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে আবারও যাত্রীবাহী বাস পড়ল পদ্মা নদীতে চুয়াডাঙ্গায় পুত্রবধূকে ধর্ষণের অভিযোগে শ্বশুর গ্রেপ্তার খুলনায় হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর ভিড় গোপালগঞ্জে দুই বাসের সংঘর্ষ, নিহত ২ ৬ ঘণ্টা পরে ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম-সিলেটের ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক কর্মস্থলে গরমে হাঁসফাঁস ভ্যাট রিটার্ন দাখিলে আসছে ত্রৈমাসিক ব্যবস্থা ভূঞাপুরে দুই গ্রামের সংঘর্ষে নিহত ১, মাইকিং করে ফের সংঘর্ষের ঘোষণা পর্যটন খাতে তাপের প্রভাব বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধনের খসড়া অনুমোদন ইসলামী ব্যাংকের অধিকাংশ শাখায় কলমবিরতি হয়নি নাটোরে গরু আনতে গিয়ে বজ্রপাতে যুবকের মৃত্যু বেলকুচিতে বাসচাপায় অটোভ্যানের ৩ যাত্রী নিহত বন্ধ শিল্প ও প্রতিষ্ঠান সচল করতে ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল ফেনীতে প্রখর রোদে দুর্ভোগে খেটে খাওয়া মানুষ বজ্রপাতে চার জেলায় নিহত ১০ দিলারার রেকর্ড গড়া ইনিংসে বাংলাদেশের জয় কৃষ্ণচূড়ার রাঙা মঞ্জরি ৫ জুন: তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীনের আজকের রাশিফল তৃণমূলে বিদ্রোহের নেপথ্যে ‘ভাইপোবিরোধী’ হাওয়া
Nagad desktop

শিক্ষাব্যবস্থায় যুগোপযোগী পরিবর্তন জরুরি

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬, ০৪:৫৫ পিএম
আপডেট: ২৫ মে ২০২৬, ০৪:৫৬ পিএম
শিক্ষাব্যবস্থায় যুগোপযোগী পরিবর্তন জরুরি
রাশেদা কে চৌধূরী

শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি অপরিহার্য। বর্তমান সরকার নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যে দায়িত্ব নিলেও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। শুধু বরাদ্দ বাড়ানোই শেষ কথা নয়; বরং বরাদ্দকৃত অর্থের সুষ্ঠু ও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অপচয় এবং দুর্নীতি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ ও সঠিক পরিকল্পনা নিতে হবে। সুনির্দিষ্ট কৌশল ও জনঅংশগ্রহণভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।...

শিক্ষাক্রম বিশ্বব্যাপী চলমান প্রক্রিয়ার অংশ। মানুষের চাহিদা এবং যুগের প্রয়োজনে এটি পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হওয়া জরুরি।একই সঙ্গে পরিবার থেকে শিক্ষার্থীদের বিকাশ শুরু করতে হবে। মা-বাবাকে তার সন্তানদের দিকে নজর দিতে হবে। সেই নজর দেওয়া বলতে তাদের মেধা সুস্থভাবে বিকাশ হচ্ছে কি না প্রথমেই সেদিকটা দেখতে হবে। তার পরের দায়িত্ব বর্তায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপরে। বিশ্বমানের শিক্ষার্থী তৈরি করতে শিক্ষকদের দক্ষ করে তৈরি করা দরকার। আমাদের দেশে শিক্ষকরা শিক্ষাদানে যথেষ্ট পরিমাণে দক্ষ নয়। আমরা দেখেছি শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেও শ্রেণিকক্ষে সেই প্রশিক্ষণের বাস্তবায়ন করেননি। এই হলো শ্রেণিকক্ষের ভেতরে শিক্ষকদের দক্ষতার প্রমাণ। শিক্ষার্থীদের পুঁথিগত বিদ্যা ও মুখস্থবিদ্যা থেকে সরে আসতে হবে। আমরা যদি পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারি, তাহলে আমাদের বাচ্চারা আরও অনেক বেশি পিছিয়ে যাবে। কাজেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। এ পরিবর্তন হতে হবে সময়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ন্যূনতম কতগুলো বিষয়ে অবশ্যই পড়ালেখা করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যেক শ্রেণির ক্ষেত্রে পড়ালেখার পাশাপাশি দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষার মূল ভিত্তিটুকু গড়ে ওঠে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। কাজেই শিক্ষায় পরিবর্তনও প্রাথমিক পর্যায় থেকে হতে হবে। সেই সময়টুকু শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার ভিত্তিটুকু শক্ত করতে হলে আমাদের প্রধানত তিনটি বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে- দক্ষ শিক্ষক, সক্ষম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা। সে ক্ষেত্রে যথার্থ বিনিয়োগ প্রয়োজন আছে। এমনিতেই শিক্ষা সরঞ্জামের দাম অপেক্ষাকৃত বেশি। এর ফলে শিক্ষার্থীদের নানা রকম বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। পরিবারকে শিক্ষা সরঞ্জামগুলোর ব্যয়ভার বহনে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়। এ বিষয়গুলোতে আমাদের মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। আমার মতে, শিক্ষাক্রমে কোনো বিভাজন থাকা উচিত নয়। বিজ্ঞান, মানবিক, বাণিজ্য ইত্যাদি বিভাজন করেই শিক্ষার্থীদের আমরা আরেকটি জালের ভেতর ফেলে দিয়েছি। আজকে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা মানবিকে যায় না। মানবিকের শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানের ধারে কাছে যেতে চায় না। আমি মনে করি, বিভাজনের কোনো দরকার নেই।

আমাদের দেশে শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘদিন কোনো সংস্কার হয়নি। বরঞ্চ দিনের পর দিন একইভাবে চলতে গিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। সোজা কথায়, ক্রমপরিবর্তনশীল পৃথিবীর সঙ্গে আমরা বদলাইনি। ছাত্রছাত্রীদের শ্রেণিকক্ষে পাঠ না দিয়ে, পরীক্ষার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোচিং বাণিজ্যের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গাইড বইনির্ভর একটি সংস্কৃতি চালু করা হয়েছে, যা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে নেই। পৃথিবীর বহু উন্নত দেশে পরীক্ষা দিয়ে শিক্ষার্থীর মান নির্ধারণ হয় না কিংবা দক্ষতা যাচাই হয় না। শ্রেণিকক্ষভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়নের মধ্যদিয়ে অর্থাৎ নিয়মিত মূল্যায়ন-প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে দক্ষতা যাচাই হয়। কাজেই গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পুরো শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। একই সঙ্গে তা হতে হবে সময়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। সে ক্ষেত্রে আমি অবশ্যই মনে করি, শিক্ষাক্ষেত্রে পরিবর্তনের ধারার বিরোধিতা না করে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে স্বাগত জানানো উচিত। এখন পর্যন্ত শিক্ষায় আমাদের বিনিয়োগ জাতীয় আয়ের খুবই সামান্য অংশ, যা অবশ্যই কয়েক গুণ বাড়ানো দরকার।

আমাদের দেশে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। শিক্ষা খাতে বরাদ্দকৃত বাজেট দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে নিম্নতম। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলো সেদিক থেকে অনেক বেশি অগ্রগামী। আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাস্তব বিষয়গুলো আসতে হবে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষাব্যবস্থাপনায় আমাদের বড় বড় মেগা প্রকল্প দরকার। আমরা যদি মানবসম্পদ বিনির্মাণে বিনিয়োগ না করি, তাহলে বড় বড় গার্মেন্টসের মতো স্ট্রাকচারগুলো চালু করার জন্য বিদেশ থেকে আমাদের জনশক্তি আমদানি করতে হবে। ভারতে এডুকেশন সারচার্জ বা শিক্ষা কর প্রবর্তন করে লক্ষাধিক কোটি টাকার ‘শিক্ষা সহায়তা তহবিল’ গঠন করা হয়েছে। এ তহবিলের মাধ্যমে তারা শিক্ষা বাজেটের বড় একটি ঘাটতি পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশও পরীক্ষামূলকভাবে এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে।

কারিগরি শিক্ষায় কর্মসংস্থান বাড়াতে বৈষম্য কমানোর জন্য প্রযুক্তি এবং কারিগরি শিক্ষাকে আরও এগিয়ে নিয়ে আসা দরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটা বিশেষ প্রকল্পই আছে এটার জন্য। বিশেষ করে শিক্ষা গবেষণা উন্নয়নে আমরা সঠিক মাত্রায় বিনিয়োগ দেখি না। বিভিন্ন ধরনের প্রজেক্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা না করে ঠিকাদারদের দিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা মতানৈক্য আগে প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশ কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ করে কত বড় সাফল্য দেখিয়েছে। শিক্ষা গবেষণায় বিনিয়োগটা খুব দরকার বলে মনে হয়। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবাসিকসংকট প্রকট। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিকসংকট রয়েছে। অধিকাংশ হোস্টেলে ৬৫ শতাংশ মেয়ে এক রুমে তিন-চারজন করে থাকে। ছেলেরা অপেক্ষাকৃত একটু আরামেই থাকে। এ জায়গায় জেন্ডারবৈষম্য আছে বলে মনে করছি।

ডিজিটাল বৈষম্য দূরীকরণের জন্য প্রযুক্তিগত কাঠামো উন্নয়ন। এখানে ব্যাপকভাবে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। প্রযুক্তি সবার জন্য। বিশ্বব্যাপী নারীরা এ প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে আছে। ইউনেস্কোর রিপোর্ট সেটা বলছে। যেখানে ছেলেদের অংশগ্রহণ ৬০ শতাংশের ওপর, সেখানে নারীদের অংশগ্রহণ ৩০ শতাংশেরও কম। নারী-পুরুষ ও ধনী-দরিদ্রের একটা বৈষম্য আমরা দেখেছি। আমরা তরুণ প্রজন্মকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তাদের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে চাই এবং সেটা অবশ্যই আমাদের করে দেখাতে হবে। শিক্ষায় আরও মনোযোগ দেওয়ার পাশাপাশি যারা মিথ্যাচার করে, জনমনে হতাশা ছড়ায়, তাদের বিষয়ে আমাদের সচেতন থাকতে হবে।

শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি অপরিহার্য। বর্তমান সরকার নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যে দায়িত্ব নিলেও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। শুধু বরাদ্দ বাড়ানোই শেষ কথা নয়; বরং বরাদ্দকৃত অর্থের সুষ্ঠু ও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অপচয় এবং দুর্নীতি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ ও সঠিক পরিকল্পনা নিতে হবে। সুনির্দিষ্ট কৌশল ও জনঅংশগ্রহণভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশকে একটি মানবিক, সাম্যভিত্তিক ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, শিক্ষা নিয়ে কোনো রাজনীতি চলবে না। শিক্ষাঙ্গন কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ নয়, বরং এটি হতে হবে মানবসক্ষমতা বিনির্মাণের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। আশার কথা হচ্ছে, সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তন-পরিমার্জন হচ্ছে এবং অবশ্যই তা হতে হবে। দেশে যারা শিক্ষা নিয়ে কাজ করেন, নীতিনির্ধারক যারা আছেন, তারা প্রতিনিয়তই চেষ্টা করছেন। সে লক্ষ্যে কাজ চলছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, এটি এত সহজ কাজ নয় যে, চাওয়ামাত্রই তা দ্রুত বাস্তবায়িত করে ফেলা সম্ভব। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। সে জন্য শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় সুফল পেতে সময় দিতে হবে। সে লক্ষ্যে চেষ্টা চলছে এবং আমাদের আশাবাদ, পরিবর্তন আসবেই। 

লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এবং ‘কোচিং সেন্টার’ বিতর্ক

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এবং ‘কোচিং সেন্টার’ বিতর্ক
শাহ নিসতার জাহান

আমাদের ছেলেমেয়েরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায়; মানে, ভর্তি পরীক্ষার দৌড়ে যখন টিকে যায়, তখন কিন্তু আমরা সেটি নিয়ে খুশি থাকি এবং আনন্দের সঙ্গে অন্যকে জানাতেও পছন্দ করি। সে তুলনায়, কেউ নর্থসাউথ, ব্র্যাক বা এরকম কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, এমন সংবাদে খুব উৎসাহিত হতে দেখি না...

বাংলাদেশের একজন মাননীয় মন্ত্রী (জনাব ববি হাজ্জাজ) বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি কোচিং সেন্টার। অবশ্য তিনি পরে তার বক্তব্য থেকে সরে গেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ডেটাসহ বলছেন, তাদের এবং অন্যদের কী অবস্থা। তাদের তথ্য বলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনেক এগিয়ে। বিষয়টি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে হেয় করা হয়েছে, কেউ কেউ বলছেন। আমার মনে হয়, মাননীয় মন্ত্রীর আশা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে অনেক বেশি ছিল বা আছে। সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি বলে আফসোস থেকে তিনি ওই মন্তব্য করেছেন। কারণ, বাংলাদেশের মানুষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে অনেক আশা করে এবং সেই আশা ভঙ্গ হলে তারা আশাহত হয়। স্বাভাবিক। আবার, এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েই তারা গর্ব করে। উদাহরণ হিসেবে বলব, আমাদের ছেলেমেয়েরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায়; মানে, ভর্তি পরীক্ষার দৌড়ে যখন টিকে যায়, তখন কিন্তু আমরা সেটি নিয়ে খুশি থাকি এবং আনন্দের সঙ্গে অন্যকে জানাতেও পছন্দ করি। সে তুলনায়, কেউ নর্থসাউথ, ব্র্যাক বা এরকম কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, এমন সংবাদে খুব উৎসাহিত হতে দেখি না এবং বহু ক্ষেত্রেই এটি কোনো সংবাদ নয়। এর মানে এই নয় যে, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব গুরুত্ব নেই। নিশ্চয় আছে। তবে সেটি সাধারণ্যে অত গুরুত্ব দিয়ে কেউ বলে, অন্তত আমার জানা নেই।

দীর্ঘ সময় ধরে পাবলিক এবং প্রাইভেট, এই দ্বিবিধ লেবেল বা তকমা আমরা শুনে আসছি। সেই লেবেলের মধ্যে একটা বিশাল দেয়াল আছে, এ কথা আশা করি কেউ অস্বীকার করবেন না। আসলে, যে যার মতো কাজ করে যেতে পারলেই হলো। একটি ভালো কাজে কে এগিয়ে থাকে সেটি বিবেচ্য। সেক্ষেত্রে, যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রকাশিত ডেটা (আমি নিজে সেই ডেটার সত্যাসত্য বলতে পারব না। কারণ, আমি সেটি দেখেছি ফেসবুকে) সঠিক হয়, তাহলে বলতে হবে, মাননীয় মন্ত্রী কিছুটা আবেগ কিংবা আশাবঞ্চিত হয়ে সেই কথা বলেছেন। তার এই আবেগকে আমি সম্মান করি। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। যদি ধরেও নিই, মাননীয় মন্ত্রীর ডেটা সঠিক এবং ফেসবুকে যেসব কথা, দাবি উঠেছে, সেগুলো ভুল, সেক্ষেত্রে কিন্তু এ দেশের রাজনীতিকরা দায় এড়াতে পারেন না। আমরা দেখেছি, বাংলাদেশের ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে কী হয়। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কী ঘটে। আমার অভিজ্ঞতা বলে, একজন ভিসি কেবল টেলিভিশনে যাবেন, ‘টক শো’ করবেন, সেই লোভে একটি বিভাগকেই জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন। মোটামুটি যাকে-তাকে ধরে এনে শিক্ষক বানানো হয়েছিল। যারা শিক্ষক হয়ে এসেছেন, তারা জানেন না, একজন শিক্ষকের কাজ কী এবং এটি কেবল একটি বিভাগ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে নয়। উদাহরণ অনেক। ভিসিদের ইচ্ছের মাত্রা বিবিধ। তাহলে, এবংবিধ যখন অবস্থা, শিক্ষকরা পড়াশোনা করবেন কেন? একজন প্রজ্ঞাবান ভিসি আমরা আশা করতে পারি কীভাবে? আমি তো দেখি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় তাদের ‘ব্যবসা’ই জমজমাট কিংবা রমরমা, যাদের ওই অর্থে কোনো একাডেমিক কাজ বা ইচ্ছে নেই। সেই ১৯৯৬ সালে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ইউসুফ আলীকে সরিয়ে দিয়েছিল তৎকালীন সরকার। কারণ, তিনি বিএনপির ভিসি। রাজনৈতিক বিবেচনায় এর আগেও হয়তো হয়েছিল নিয়োগ, কিন্তু এত উন্মুক্ত অবস্থায় নয়। তারপর থেকে শিক্ষকরা মোটামুটি ‘কুত্তা-দৌড়’ (মাফ করবেন, এই শব্দটি ব্যবহারের জন্য। তবে, আমার কাছে এর চেয়ে ভালো কোনো শব্দ আপাতত নেই) শুরু করলেন রাজনীতি মাথায় নিয়ে, শুধু পদ-পদবির (ভিসি ইত্যাদি) লোভে। সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এবং বাইরে। এটি যদি তার একাডেমিক কাজ বিবেচনায় হতো তাহলে কিন্তু কোনো কথা থাকত না, শিক্ষকরা অযথা রাজনীতি নিয়ে পড়েও থাকতেন না। এই রাজনৈতিক বিবেচনাতেই শিক্ষক নিয়োগ হয়। আমি তো দেখি বেশ কিছু শিক্ষার্থী এক্ষুনি রাজনৈতিক দৌড়ঝাঁপ করছে, কেবল শিক্ষক হওয়ার আশায়। অথচ তার কাজ ছিল, নিজেকে শিক্ষক হওয়ার জন্য উপযুক্ত করা। সেটি করছে না। কারণ, সে বুঝে গেছে কাকে দিয়ে কাজ হবে এবং এ কাজে বহু ক্ষেত্রেই ইন্ধন দিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, মানে সেখানে বিভিন্ন পদে বসা মানুষ। কারণ, তারাও হয়তো একই ধারায় নিয়োগপ্রাপ্ত। বিষয়টি কষ্টের।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনার জন্য, লিখিত পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে। সেটি প্রশ্নাতীত নয়। ভাইবার কথা বাদ দিলাম। আমি বলব, শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে, একেবারে লেকচারার পদেই, একটি কাজ করুন না, বিজ্ঞাপনের সঙ্গে বলে দেবেন, একাডেমিক লাইন থাকা জরুরি। মানে, আবেদনের সঙ্গে অন্তত একটি প্রকাশিত আর্টিকেল থাকতে হবে। মানে, তিনি যে শিক্ষক হবেন, তার শুরু তিনি দেখিয়ে দেবেন। তাহলে, আমাদের ওই শিক্ষার্থী আর রাজনীতি নিয়ে থাকবেন না। ভিসি যতই মাথা নষ্ট করুক, এই শর্তের বাইরে যেতে পারবেন না। ফলে, লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার দরকারও হবে না। এখন, দেখতে হবে লেখাটি কোন জার্নালে ছাপা হয়েছে। একই কথা বলব শিক্ষকদের প্রমোশনের ক্ষেত্রেও। তাদের প্রমোশন ওই জার্নালের মানের ওপর হবে। প্রয়োজনে একজন শিক্ষক কখনোই ‘অধ্যাপক’ পদের যোগ্য হবেন না। বিদেশে বহু উদাহরণ আছে, সিনিয়র লেকচারার থেকেই অবসরে। আমরা কেন পারব না? সেজন্য একটি মানদণ্ড থাকতে হবে। তখন বহু শিক্ষকের হম্বিতম্বি বন্ধ হয়ে যাবে। তারা গবেষণায় মন দেবেন নয়তো ছিটকে পড়বেন। কিন্তু মাননীয় মন্ত্রী, সেটি কি করতে পারবেন? চেষ্টা করলে পারতেন; কিন্তু করবেন কি না জানি না। কাজটি ঘটাতে পারলে, ঢাকা কেন, বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারেই আপনার হতাশা থাকত না। কিছুদিন আগে আমি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রমোশনাল নিয়োগ বোর্ডে’ গিয়েছিলাম। তাদের আকাঙ্ক্ষা আমার কাছে ভালো লাগল। অন্তত দুটি লেখা Scopus Indexed জার্নালে প্রকাশিত না হলে তারা পদোন্নতি আটকে দিচ্ছেন। শর্ত দিচ্ছেন, পদোন্নতি পেতে হলে, প্রার্থীকে ওই জাতীয় জার্নালে লেখা প্রকাশ করতে হবে এবং ক্ষেত্রবিশেষ একক লেখা। করুন না ওই নিয়ম ঢাকা, জগন্নাথ, জাহাঙ্গীরনগর কিংবা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেখবেন, আপনি আর কাউকে ‘কোচিং সেন্টার’ বলতে পারবেন না। শিক্ষকরা আত্মমর্যাদাবোধ করবেন। কিন্তু সে ব্যাপারে রাষ্ট্রেরও কিছু দায়িত্ব নিতে হবে আপাতত। পরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেই ঠিক হয়ে যাবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী এই কিছুদিন আগেই অনেকটা হতাশার কথা বলেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের নিয়োগ নিয়ে। আমি আশা করি, এ ব্যাপারে তাহলে তার আগ্রহের কমতি নেই। দেশকে ফেরানোর একটি বড় ইচ্ছা আমরা তার মধ্যে দেখছি। সেটি তার চলাফেরা এবং কথাবার্তায় অপ্রকাশ্য থাকে না। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে গেছেন তিনি। আপনাদের পক্ষে তাই বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে নতুন নীতিমালা তৈরি করে ফেলা অসম্ভব নয়। শুধু একবার এই কাজটি করে ফেলতে পারলে, কিছু শিক্ষক অবশ্য অসন্তুষ্ট হবেন। কিন্তু বহু শিক্ষক খুশি হবেন (আমি আশা করি এই শ্রেণিটিই আপনাকে হতাশামুক্ত করবে এবং করে যাচ্ছে)। আপনি তখন কাউকে ‘কোচিং সেন্টার’ বলতে পারবেন না; কিংবা বললেও তারা গায়ে মাখবেন না। কারণ, আপনার কথা তখন হাস্যকর মনে হবে সবার কাছে। সেখানেই আপনার তৃপ্তি আসবে। বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্র আমার এই কথাগুলো সত্যি ভাববে কি? 

লেখক: অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ; চেয়ারপারসন, ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

পাসপোর্ট ও বিদেশযাত্রার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৫:০৬ পিএম
পাসপোর্ট ও বিদেশযাত্রার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে
ড. খলিলুর রহমান

যখন নাগরিকরা নিজেদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকেই ভয় করতে শুরু করে, তখন কোনো জাতি এগোতে পারে না। সরকার জনগণের সেবা করার জন্য–ভয় দেখানোর জন্য নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ মানুষের মধ্যে আস্থা, ন্যায়বিচার ও বিশ্বাস সৃষ্টি করা; আতঙ্ক ও সন্দেহ নয়।...

পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার কোনো রাজনৈতিক অনুগ্রহ নয়; এটি নাগরিকত্বের একটি মৌলিক অধিকার। পাসপোর্ট শুধু বিদেশ ভ্রমণের নথি নয়–এটি একজন নাগরিকের পরিচয়, জাতীয়তা এবং নিজের রাষ্ট্রের প্রতি তার বৈধ সম্পর্কের স্বীকৃতি। যখন কোনো সরকার রাজনৈতিক পরিচয়, সন্দেহ বা প্রশাসনিক পক্ষপাতের ভিত্তিতে এই অধিকার প্রয়োগ করে, তখন তা ন্যায়বিচার, সমতা ও গণতান্ত্রিক শাসনের মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।

গত রাতে আমার এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির ফোন পেলাম, যাকে আমি কয়েক দশক ধরে চিনি। তিনি সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে চার দশক ধরে দেশসেবা করে আসছেন। তিনি তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়ে নতুন বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার জটিলতা নিয়ে আমার সহায়তা চাচ্ছিলেন। তার অভিজ্ঞতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি এমন একটি উদ্বেগজনক প্রবণতার প্রতিফলন, যা ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অনির্বাচিত প্রশাসনের সময়ে ব্যাপকভাবে দেখা গিয়েছিল।

বিষয়টির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে যাওয়ার আগে একটি বাস্তবতা স্বীকার করা জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিক সরকারগুলো কূটনৈতিক পাসপোর্টের মর্যাদা ও গুরুত্বকে ক্ষুণ্ন করেছে। অনেকে পেশাগতভাবে কূটনৈতিক পাসপোর্ট পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না কিংবা পেশাদার কূটনীতিক ছিলেন না, তাদেরও এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ঐতিহ্যগতভাবে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী কূটনীতিকদের জন্য সংরক্ষিত এই নথির গুরুত্ব ও মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত রাতে যিনি আমার সহায়তা চেয়েছিলেন, তিনিও কূটনৈতিক সেবার বাইরে থেকেও কূটনৈতিক পাসপোর্ট পেয়েছিলেন তার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের জন্য।

তবে কূটনৈতিক পাসপোর্টের অপব্যবহার সংশোধনের নামে কোনো নাগরিককে সাধারণ পাসপোর্ট থেকে বঞ্চিত করা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিক, যার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি দণ্ড বা আইনি নিষেধাজ্ঞা নেই, তার সমানভাবে পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এটি শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি সাংবিধানিক ও মানবাধিকারসংক্রান্ত প্রশ্ন।

দুঃখজনকভাবে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এমন কিছু চর্চা গড়ে ওঠে, যা দেখে মনে হয়েছে পূর্ববর্তী সরকারে কাজ করেছেন বা একসময় কূটনৈতিক পাসপোর্ট ধারণ করেছেন এমন ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়ার মানসিকতা কাজ করেছে। বহু সম্মানিত সরকারি কর্মকর্তা, পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে এক ধরনের অলিখিত সন্দেহ ও বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। আইন ও বিধিমালার ভিত্তিতে আবেদন মূল্যায়নের পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচিতি ও ইচ্ছাকৃত প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করা হয়েছে।

আরও দুঃখজনক হলো, ড. ইউনূস ও তার অনির্বাচিত প্রশাসন সমাজে বিভাজন সৃষ্টির রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিল। মানুষকে পাশাপাশি দাঁড়াতে উৎসাহিত করার পরিবর্তে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর প্রবণতা তারা উৎসাহিত করেছে।

আমি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে এসব চর্চার প্রভাব প্রত্যক্ষ করেছি এবং একজন ভুক্তভোগী। শত শত মানুষ পাসপোর্ট পেতে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব, জটিলতা ও অপমানজনক আচরণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে, যখন সাবেক কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের সাধারণ পাসপোর্ট প্রক্রিয়ায়ও জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর অস্বাভাবিক সম্পৃক্ততা যোগ করা হয়। এতে বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগ ও রাজনৈতিক নজরদারির সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, ড. ইউনূস ও তার ঘনিষ্ঠদের আমলে পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত পুলিশ ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা বাতিল করা হয়, যা একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত হিসেবে সমালোচিত হয়েছিল। যদিও অনেক নাগরিক আমলাতান্ত্রিক হয়রানি কমার কারণে এটিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তবু ক্রমে অভিযোগ ওঠে যে, অতিরিক্ত শিথিলতা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করেছে। এমনো অভিযোগ সামনে আসে যে, পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়াই বাংলাদেশে অবস্থানরত অনাগরিক বা বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে।

কানাডায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি দক্ষতা ও জাতীয় নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একটি পাসপোর্ট আন্তর্জাতিকভাবে রাষ্ট্রের সার্বভৌম নিশ্চয়তার প্রতীক। এর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হলে তার প্রভাব শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আজ বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের ভিসা নাকচ হওয়ার ঘটনা এর একটি অন্যতম নিদর্শন। শুধু ভিসা প্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতা নয়, দুর্বল যাচাই ব্যবস্থা প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশযাত্রা কঠিন করে তুলতে পারে এবং রাষ্ট্রকে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

ড. ইউনূসের অপশাসনের সময় আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় ছিল বিমানবন্দরে যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও অন্যায় আচরণ। অভিযোগ রয়েছে, বিশেষ করে যারা আগে কূটনৈতিক পাসপোর্ট ধারণ করেছেন বা সরকারি দায়িত্বে ছিলেন, তাদের অনেককে বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা অপ্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ, বিলম্ব এবং ভীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগ ছাড়াই যাত্রীদের যাত্রা বিলম্বিত বা আটকে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

এর চেয়েও উদ্বেগজনক ছিল গণমাধ্যমের কিছু অংশের ভূমিকা। বিমানবন্দরের এসব ঘটনার পর কিছু যাত্রীকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও চাঞ্চল্যকর সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে জনসমক্ষে সন্দেহভাজন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অনেক শিরোনাম ও প্রতিবেদন এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে নিরপেক্ষ তথা উপস্থাপনের চেয়ে ব্যক্তি বিশেষকে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রবণতা বেশি ছিল। এটি শুধু পেশাগত নীতির পরিপন্থী নয়; বরং সমাজে ভয় ও বিভাজনের সংস্কৃতি তৈরি করে।

যখন নাগরিকরা নিজেদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকেই ভয় করতে শুরু করে, তখন কোনো জাতি এগোতে পারে না। সরকার জনগণের সেবা করার জন্য–ভয় দেখানোর জন্য নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ মানুষের মধ্যে আস্থা, ন্যায়বিচার ও বিশ্বাস সৃষ্টি করা; আতঙ্ক ও সন্দেহ নয়। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন বহু নাগরিকের মধ্যে স্বস্তি ও নতুন আশার সঞ্চার করেছে। নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের প্রত্যাবর্তনকে অনেকে ড. ইউনূসের অনির্বাচিত প্রশাসনের বিতর্কিত চর্চাগুলো থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। এটি উৎসাহব্যঞ্জক যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এসব বিষয়ে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। সাবেক কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের প্রতি তুলনামূলক মানবিক ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ এবং বিমানবন্দরে অপ্রয়োজনীয় হয়রানি কমানোর উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার।

বিশেষ করে ব্যক্তিগতভাবে আমি সন্তুষ্ট যে, এই উন্নয়নগুলো বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে হচ্ছে, যিনি ঘটনাচক্রে আমারই সিভিল সার্ভিস ব্যাচের কর্মকর্তা ছিলেন এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা ও নাগরিক মর্যাদার গুরুত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখেন। কার্যকর শাসনের জন্য শুধু ক্ষমতা নয়; প্রয়োজন প্রজ্ঞা, সংযম ও মানবিকতা।

তবে সংস্কার অর্ধেক পথে থেমে থাকলে চলবে না। বাংলাদেশ এখন এমন একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও অধিকারভিত্তিক পাসপোর্ট ও অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছে, যা জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করবে। এ ধরনের ব্যবস্থার জন্য কয়েকটি মৌলিক নীতি জরুরি।

প্রথমত, রাজনৈতিক পরিচয়, পেশাগত পটভূমি বা অতীত সরকারি সম্পৃক্ততা নির্বিশেষে সব নাগরিককে সমানভাবে বিবেচনা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে সুস্পষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।

তৃতীয়ত, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে পেশাদারত্ব ও সংযমের সঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়া কোনো যাত্রী হয়রানির শিকার না হন।

চতুর্থত, বাংলাদেশি পাসপোর্টের মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় পূর্বের যথাযথ যাচাই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অ-নাগরিকরা পাসপোর্ট না পায় বা পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে অপব্যবহার রোধ করা যায়, আবার প্রকৃত নাগরিকরাও হয়রানির শিকার না হন।

সবশেষে, গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা চরিত্র হননের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

সম্ভবত ড. ইউনূসের অনির্বাচিত প্রশাসনের সবচেয়ে ক্ষতিকর উত্তরাধিকার ছিল নাগরিকদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি। তাদের সবচেয়ে বড় মেটিকুলাস ডিজাইন ছিল সমাজে মানুষকে সহনাগরিক নয়, প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শেখানো। তবে এটি স্বস্তিদায়ক যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সময় সেই বিভাজনের রাজনীতি ধীরে ধীরে অবসানের দিকে যাচ্ছে। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্য স্বাভাবিক; কিন্তু সন্দেহ, প্রতিশোধ ও সংঘাতনির্ভর শাসনব্যবস্থা জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দীর্ঘ রাজনৈতিক মেরূকরণের জন্য বড় মূল্য দিয়েছে। এখন দেশের প্রয়োজন পুনর্মিলন, প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। নাগরিকদের উচিত জাতি গঠনের কাজে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানো, মুখোমুখি সংঘাতে নয়।

যেকোনো সরকারের দায়িত্ব শুধু আইন পরিচালনা নয়; সামাজিক আস্থা ও জাতীয় সংহতি রক্ষা করাও। যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা উভয়ই।

এখন জাতির প্রত্যাশা বাংলাদেশ আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যাবে; যেখানে নাগরিক অধিকার সম্মানিত হবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষ থাকবে এবং প্রশাসন দলীয় স্বার্থের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থে কাজ করবে।

পরিশেষে, পাসপোর্ট কখনোই রাজনৈতিক অস্ত্র হওয়া উচিত নয়। এটি হওয়া উচিত সেই প্রতীক, যা প্রতিটি বাংলাদেশির নাগরিকত্ব, মর্যাদা ও সমঅধিকারের প্রতিনিধিত্ব করে।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব

বৃদ্ধার করুণ মৃত্যু মানবিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভয়াবহ সংকটে

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ১১:২৮ এএম
মানবিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভয়াবহ সংকটে
মনিরা রহমান

এই ঘটনা আমাদের সমাজের মানবিক মূল্যবোধের গভীর অবক্ষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে। এখানে অর্থনৈতিক সংকট, শিক্ষার অভাব বা সামাজিক অক্ষমতার কোনো অজুহাত নেই। সন্তানরা শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও যদি একজন অসুস্থ, বয়স্ক মায়ের খোঁজ না নেন, তাহলে প্রশ্ন ওঠে মানবিকতা ও পারিবারিক দায়বদ্ধতার জায়গায় এসব কী ঘটছে!

শিশু অবস্থায় যেমন মা-বাবা সন্তানের যত্ন নেন, তেমনি বার্ধক্যে মা-বাবার দেখাশোনা করা সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব। সাত দিন ধরে একজন মা মৃত অবস্থায় পড়ে থাকলেন, কেউ ফোনও করল না, এটি এক ধরনের চরম অবহেলা, যা সামাজিক অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। এ ধরনের সামাজিক অপরাধ দমনে আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ জরুরি।

বর্তমানে সমাজে সহমর্মিতা ও পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে। আমরা একের পর এক সহিংসতা, নির্মমতা ও ট্রমার মধ্যে বসবাস করছি, যার প্রভাব মানুষের মানসিকতা ও আচরণে পড়ছে। ফলে অনেকেই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছেন এবং অন্যের কষ্টের প্রতি সংবেদনশীলতা হারাচ্ছেন।

এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্তানরা মানসিক ও সামাজিক বিকাশের প্রক্রিয়াগত গবেষণার বিষয় হয়ে গেছেন। কারণ, মানুষ কীভাবে এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যেখানে নিজের মায়ের প্রতিও ন্যূনতম সহমর্মিতা থাকে না, বোঝা জরুরি। এ ছাড়া পরিবার, শিক্ষা ও সমাজে নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের চর্চা বাড়ানো এবং প্রবীণদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয়ভাবে জবাবদিহি ও কার্যকর সেবাব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

- মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং নির্বাহী প্রধান, ওয়েলবিং ফাউন্ডেশন

বৃদ্ধার করুণ মৃত্যু এ ঘটনা গভীর মূল্যবোধ সংকটের বহিঃপ্রকাশ

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ১১:১৭ এএম
এ ঘটনা গভীর মূল্যবোধ সংকটের বহিঃপ্রকাশ
অধ্যাপক সালমা আক্তার

একা ঘরে মায়ের মৃত্যু, দীর্ঘ সময় সন্তানদের খোঁজ না নেওয়ার ঘটনা–এটা কোনো বিচ্ছিন্ন পারিবারিক দুর্ঘটনা নয়। বরং এটি সমাজের গভীর মূল্যবোধগত সংকটের বহিঃপ্রকাশ। একজন যুগ্ম সচিব, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা অন্য কোনো উচ্চপদস্থ পেশাজীবী হওয়া বড় পরিচয় নয়, বড় পরিচয় হলো একজন মানুষ হিসেবে আপনি কতটা দায়িত্বশীল। একজন অসুস্থ, শয্যাশায়ী মায়ের খোঁজ যদি সন্তানেরা না নেয়, তা শুধু পারিবারিক ব্যর্থতা নয়, মানবিকতারও ব্যর্থতা।

আমরা এখন কী দেখছি? অভিভাবকরা সন্তানদের সফল মানুষ বানাতে ব্যস্ত, কিন্তু ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার শিক্ষা দিতে তারা ব্যর্থ। কারণ বর্তমানে সমাজে সন্তানের সাফল্যকে মাপা হয় তার চাকরি, আয়, ডিগ্রি কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়ে। কিন্তু মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও পারিবারিক সম্পর্কের মূল্যবোধ শেখানোর ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজ উভয়েই পিছিয়ে পড়ছে। 

কর্মসংস্থানের বিস্তার, নগরায়ণ এবং মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির ফলে যৌথ পরিবার ভেঙে যাচ্ছে। একই সঙ্গে সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে বড় করা হচ্ছে। বাবা-মায়ের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়ানো, বিদেশে পাঠানো কিংবা উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু তাকে একজন সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।

সামাজিক এই সমস্যার শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। তাই এর সমাধানও সহজ নয়। তবে শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা, পারিবারিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানবিক সম্পর্কের গুরুত্ব নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে হবে। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখভাল নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র চাইলে কিছু আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নিতে পারে। কারণ সমাজে মানবিকতা ও নৈতিকতার চর্চা না বাড়লে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতেই থাকবে।

- অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বৃদ্ধার করুণ মৃত্যু বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে এ রকম ঘটনা বাড়ছে

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ১১:১২ এএম
আপডেট: ০৩ জুন ২০২৬, ১১:১৭ এএম
বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে এ রকম ঘটনা বাড়ছে
অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ

সমাজে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ একজন মা ঘরে একা মারা যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে লাশ পড়ে থাকা এবং সন্তানদের কারোর খোঁজ না নেওয়া শুধু পারিবারিক ব্যর্থতা নয়, এটি সামগ্রিক সামাজিক অবক্ষয়েরও প্রতিফলন। 

সামাজিক সম্প্রীতি ও পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাওয়ার পেছনে রাষ্ট্রেরও দায় রয়েছে। পরিবার ও সমাজের বন্ধনকে শক্তিশালী রাখতে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। গত দেড় বছরে বিভিন্ন অনিয়ম, অস্থিরতা, সহিংসতা এবং সামাজিক শৃঙ্খলার অবনতির কারণে মানুষের মানসিক জগতে নেতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরে যে অসহিষ্ণুতা ও সহিংস আচরণ দেখা গেছে, তা মানুষের মূল্যবোধ ও পারস্পরিক দায়বদ্ধতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

আসলে আইন থাকলেই অপরাধ কমে না। অপরাধ কমে যখন বিচার দ্রুত ও নিশ্চিত হয়। বাংলাদেশে বিচার-প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং বিচার পাওয়ার অনিশ্চয়তা মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে অপরাধ বা দায়িত্বহীন আচরণের ক্ষেত্রেও অনেকের মধ্যে ভয় কাজ করে না।

কোনো অপরাধের বিচার যদি ১৫-২০ বছর পর হয়, তাহলে তা সমাজের জন্য কার্যকর বার্তা হয়ে উঠতে পারে না। অপরাধ সংঘটনের এক-দুই বছরের মধ্যেই বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে তা অন্যদের জন্য শিক্ষা এবং সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে। এ জন্য বিচারব্যবস্থার জটিলতা দূর করতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন।

সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে না পারলে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা আরও বাড়বে। তাই এখনই সরকারকে সামাজিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠন এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন রাষ্ট্রের কার্যকর পদক্ষেপ। 

- সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি