নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানির জয় এমনসব প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতাকে প্রত্যাখ্যান করল, যারা রাজনৈতিক সদগুণকে বিসর্জন দিয়েছিল। অর্থ সম্পদকে তারা মনে করেছিল যোগ্যতার মাপকাঠি। কিন্তু এটা ভুল ছিল। কোটিপতি ধনীদের কাড়িকাঁড়ি চাঁদা, মিডিয়ার সংশয়, ইসলামভীতি এবং নিজের দলের নেতাদের বিদ্বেষের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মামদানি জয়লাভকরলেন। তার জয় এটাই বুঝিয়ে দিল, সম্পদের পুরোনো গাণিতিক কচকচানি আর প্রভাব ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না।
কয়েক দশক ধরে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জাতীয় এলিটরা দলের অর্থদাতা (ডোনার) এবং লবিস্টদের খায়েস পূরণের জন্য নরম সুরে কথা বলে এসেছেন। মামদানির প্রচারণা স্বচ্ছতা এবং সাহসের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে উন্মোচিত করে দিল। তিনি বিমূর্ত কথা বলেননি, বরং নাগরিক জীবনকে সংজ্ঞায়িত করে মৌলিক চাহিদার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সেই প্রশ্নটা ছিল- এই শহরে বসবাসের সামর্থ্য কাদের আছে? মামদানির কাছে এই প্রশ্নের উত্তরও ছিল সহজ এবং নৈতিক দিক থেকে প্রাসঙ্গিক। তিনি সাধারণ মানুষের জন্য নির্মিত আবাসন, ভাড়াটেদের মর্যাদা ও ভাড়া-সুরক্ষা, সর্বজনীন শিশুষত্ব এবং বিনামূল্যে সিটি বাস সার্ভিস চালুর কথা বলেছেন। জনসাধারণের মালিকানাধীন মুদি দোকানগুলোকে সাশ্রয়ী মূল্যে খাবার সরবরাহ করার এবং মানুষের ক্ষুধাকে জিম্মি করে মুনাফা করা চেইন কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া অধিকার ভেঙে ফেলার প্রস্তাবও দিয়েছেন। ধনীরাও যাতে ন্যায্য ভাগ পায়, ভারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
মামদানি কেবল তার জনবান্ধব কর্মসূচির জন্য নয়, তিনি স্বচ্ছতার সঙ্গে তার করণীয় মূলনীতিগুলো তুলে ধরেছিলেন। সেই নীতিগুলো হচ্ছে: যারা শ্রম দেয় সরকারের উচিত তাদের সেবা করা; যারা লবিং বা তদবির করে তাদের নয়। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, নিউইয়র্ক শহরটি হচ্ছে এই শহরের নাগরিকদের শহর; ডেভেলপার, ব্যাংকার ও পার্টি ডোনারদের নয়।
অন্যদিকে তার প্রতিপক্ষ অ্যান্ড্রু কুয়োমো সেই রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করেছেন, ভোটাররা যে রাজনীতিকে ঘৃণা করতে শুরু করেছেন। ওয়াল স্ট্রিটের হর্তাকর্তা আর ডোনারদের (দলের চাঁদাদাতা) গোষ্ঠী অনেক আগেই রাজনীতিতে প্রবেশের ক্ষমতা কিনে নিয়েছিল। কুয়োমো ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে এই কেলেঙ্কারি থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলেন। তার প্রচারণা ছিল অভিজ্ঞতার ছদ্মবেশে আগ্রাসনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তবু তার সব ধরনের প্রচারণা, দৌড়ঝাঁপ এবং ডোনারদের অর্থব্যয়ের আসল উদ্দেশ্য ভোটারদের কাছে গোপন থাকেনি।
কুয়োমোকে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন দেওয়াও আলাদা কিছু ছিল না। উভয়ের মূল্যবোধ শূন্য এবং ক্ষমতা ও আত্ম-সংরক্ষণের দ্বারা চালিত রাজনীতির প্রতিফলন ঘটিয়েছে মাত্র।
প্রার্থী হওয়ার প্রাথমিক দৌড়ের সময় ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা তাড়াহড়ো করে ঘোষণা করেছিলেন, নির্বাচিত হলে তাদের প্রথম গন্তব্য হবে ইসরায়েল। কিন্তু মামদানি তখন জোর দিয়ে বলেছিলেন, তিনি নিউইয়র্কের মেয়র পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তিনি রাষ্ট্রদূত নন। ইসরায়েল সফরের কোনো ইচ্ছা তার নেই। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা তখন তার এই সততাকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করেছেন। ডেমোক্র্যাট দলীয় সদস্য এবং বেশির ভাগ মিডিয়া ইহুদিবাদী লবিকে তার এইভাবে অস্বীকার করাকে অযোগ্যতা বলে উল্লেখ করেছিল। তবে ভোটারদের ভাবনায় অন্য কিছু খেলা করছিল। তারা প্রচারণার চেয়ে সত্যতা এবং নাচনকেদিনের চেয়ে নীতিনিষ্ঠাকেই বেছে নিয়েছেন।
মামদানিকে কুয়োমো সমর্থকদের 'সোস্যালিস্ট' বলে ভয় দেখানোর পুরোনো কৌশলও হালে পানি পায়নি। নিউ ইয়র্কের ভোটাররা বুঝতে পেরেছিলেন, ট্রাম্পের মতো ব্যক্তিরা যাকে 'স্বামদানির কমিউনিজম' বলে বর্ণনা করছেন, তা জনসাধারণের সম্পদ দিয়ে জনসাধারণের চাহিদা পূরণের নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি ছাড়া অন্য কিছু নয়।
গাজাকে কেন্দ্র করে ইহুদিবাদের সমালোচনা এবং ইসরায়েলি নৃশংসতার নিন্দা করার জন্য তার বিরুদ্ধে ইহুদি-বিদ্বেষের অভিযোগও আনা হয়। কিন্তু এই অভিযোগের ঢালাও অপ্রয়োগের কারণে এর নৈতিক ভিত্তি কমে গেছে। ভোটাররা বুঝেছিলেন এর অর্থ কী আর এর দ্বারা প্রভাবিত হতে অস্বীকৃতি জানান।
উভয় অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে নিউইয়র্কবাসীরা দেখিয়েছেন, নৈতিক স্বচ্ছতা এবং বাস্তবে সহানুভূতি প্রকাশের বিষয়টি আসলে উগ্রতা নয়, বরং এর প্রয়োজন রয়েছে। কুয়োমো ও তার সহযোগীরা প্রকাশ্যে সূক্ষ্মভাবে বর্ণবাদ এবং ইসলামোফোবিয়াকে বর্জন করেছেন। মামদানির বিজয় তাদের জন্য তিরস্কার প্রতিপন্ন হয়েছে যারা তার বিশ্বাসকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিলেন। ভোটাররা প্রমাণ করেছেন তারা ভয় পাননি এবং বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন।
নির্বাচনের নৈতিক ত্রুটির দিকটি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে। মামদানি এমন কিছু করেছিলেন যা করার সাহস খুব কম আমেরিকান রাজনীতিবিদ দেখাতে পেরেছেন। তিনি স্থায়ী বৈষম্যব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ঘটেছে, এই ধারণাকেই অস্বীকার করেছেন। গাজায় ইসরায়েলি আক্রমণকে গণহত্যা হিসেবে নিন্দা করেছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন, ন্যায়বিচার কখনো বাছবিচার করে হয় না। ন্যায়বিচারকে হতে হয় সর্বজনীন।
পক্ষান্তরে কুয়োমো গাজা-গণহত্যার বিচার হলে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে রক্ষা করার প্রস্তাব দেন। তিনি ইসরায়েলের নৃতাত্ত্বিক জাতীয় পরিচয়ের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করে মামদানির অবস্থানকে 'চরমপন্থা' বলে নিন্দা করেন। তবে ভোটাররা উল্টো কুয়োমোর অবস্থানকে 'চরমপন্থা' বলে মনে করেছেন। তাদের মনে হয়েছে, কুয়োমো নিজেই চরমপন্থি, ক্ষমতা কুক্ষিগত করা আর নিজেকে রক্ষা করার জন্য চরমপন্থা অবলম্বন করছেন। ডোনারদের ব্যাপারে তিনি পরিচয় দিচ্ছেন নৈতিক অন্ধত্বের।
ভোটাররা তাদের পরিচিত এই নাচানাচির বিরুদ্ধে অটল ছিলেন। ইসরায়েলের সমালোচনা না করে নীরব থাকতে হবে, তরুণ প্রজন্ম এই ট্যাবু থেকে মুক্ত হতে চেয়েছে। তারা গাজায় নির্বিচারে বর্বরতা চালানোর ছবিগুলো দেখেছে এবং 'মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র শুধু ইসরায়েলেই আছে', ইসরায়েলের এই গালগল্প বিশ্বাস করেননি। অনেকেই এখন আর ইসরায়েলকে বর্ণবাদী রাষ্ট্র বলতে ভয় পাচ্ছেন না। তারা আর মেনে নিচ্ছেন না যে, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতি মানেই ধর্মদ্রোহিতা বা লবিউদের খুশি করার জন্য নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে নীরব থাকা উচিত।
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বের আচরণও এরকমই ছিল। মামদানির বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তারা তাকে সমর্থন করেননি। মার্কিন সিনেটর চাক শুমার এদেরই একজন। তাদের এই দ্বিধান্বিত অবস্থান নেতৃত্বের নৈতিক ভীরুতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। তারা এখনো দাতা-গোষ্ঠীর কাছে বন্দি। যে বিশ্বের কথা তারা বলেন, সেখানে ওয়াল স্ট্রিটের অর্থনৈতিক যুক্তি প্রাধান্য পায়। জায়নবাদী লবির নীতি অনুসৃত হয়। কিন্তু তা বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং অপ্রাসঙ্গিক ছিল। ভোটাররা ততদিনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেদের মতো এগিয়ে গেছেন।
মামদানির বিজয় হলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা বিদ্রোহের চূড়ান্ত পরিণতি। তরুণ এবং প্রগতিশীলরা এই কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, বর্তমান ব্যবস্থায় পচন ধরেছে; এটি অসম্পূর্ণ, মেনে চলার বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে না। তারা দেখছেন, তাদের ভবিষ্যৎ ছাত্র-ঋণের চক্রে বিলীন হয়ে যাচ্ছে, বাড়িভাড়া তাদের মজুরি গ্রাস করে নিচ্ছে। তাদের ভাবনা ও আদর্শকে রাজনীতিবিদরা অগ্রাহ্য করছেন; যে-রাজনীতিবিদরা প্রজ্ঞার বিপরীতে নৈতিকতাকে গুলিয়ে ফেলেন। তারা তাই আর প্রতীকী উদারনীতি অথবা শূন্যগর্ভ মূল্যবোধের চাপাবাজিতে সন্তুষ্ট নয়, একে ধারণও করতে চায় না। তারা এখন এমন রাজনীতি চায় যা সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সত্য নিয়েই কাজ করবে। তারা মনে করেন, তাদের অবাধ্যতার মধ্যেই ঘটবে নতুন দিনের সূচনা।
তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক বিধি-ব্যবস্থা এই ফলাফলকে স্থানীয় অসঙ্গতি বা নাগরিক উগ্রবাদের ঝাঁকুনি হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবে। এই ফলাফল এর বেশি কিছু নয়, এরকম অভিযোগও করা হবে। বলা হবে, ডেমোক্র্যাটিক পার্টি তহবিল বৃদ্ধির জন্য নৈতিকতা এবং জনগণের আস্থার ওপর নির্ভর করে বাণিজ্য করেছে। দলের নেতারা যে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন বলে দাবি করেন, তারা ওয়াল স্ট্রিট এবং জায়নিস্ট লবির প্রতি বেশি অনুগত। তবে নিউইয়র্কের বার্তাটি স্পষ্ট। আমেরিকার সবচেয়ে জটিল এবং বৈচিত্র্যময় শহরের নাগরিকরা, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম ইহুদি জনগোষ্ঠীর বসবাস, ভণ্ডামি এবং আত্মসমর্পণের রাজনীতিতে সম্মতি দেয়নি। তারা এই ভ্রান্ত ধারণাকেও প্রত্যাখ্যান করেছে যে, অর্থ-সম্পদের সঙ্গে স্বচ্ছ নীতি-নৈতিকতার পার্থক্য রয়েছে।
মামদানিকে নির্বাচিত করে, নিউইয়র্কবাসী তাদের গণতন্ত্রকে যারা বিক্রি করেছেন, তাদের কাছ থেকে পুনরুদ্ধার করল। তারা জাতিকে মনে করিয়ে দিল, নীতি-নৈতিকতা এখনো ক্ষমতাকে পরাজিত করতে পারে, বিবেক এখনো পুঁজিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং যে দল ওয়াল স্ট্রিটের সেবা করে আর সত্যকে ভয় পায়, তারা জনগণের পক্ষে কথা বলার ভান করতে পারে না। এই বিজয় যদি ডেমোক্র্যাটদের নৈতিক ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতে না পারে, তবে এমন এক নতুন প্রজন্মের জন্ম হবে, যে-প্রজন্ম বিকল্প খুঁজে নেবে, ডেমোক্র্যাটদের সরিয়ে দেওয়ার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হবে।
লেখক: হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ল-এর আইন বিভাগের অধ্যাপক
আল-জাজিরা থেকে অনুবাদ: মাসুদুজ্জামান


.jpg)