অতীতে জ্বালানি খাত পরিচালনা ও উন্নয়নে যেসব নীতিকৌশল অনুসরণ করা হয়েছে, তাতে জ্বালানি নিরাপত্তার চরম বিপর্যয় ঘটেছে। সঠিক তথা ন্যায্য ও যৌক্তিক মূল্যহারে ভোক্তার জন্য বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা যায়নি। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রাথমিক জ্বালানি, বিশেষ করে গ্যাসপ্রাপ্তির যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা সঠিকভাবে কাজে লাগানো হয়নি।
দেশের জ্বালানি তথা গ্যাস-কয়লা রপ্তানি দেশের মানুষ জীবন ও রক্ত দিয়ে প্রতিহত করলেও সে সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনের পরিবর্তে বিগত সরকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), তরল জ্বালানি ও কয়লা আমদানির প্রতিই বেশি আগ্রহী হয়। এমন আগ্রহ জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে রীতিমতো সাংঘর্ষিক। ২০১০ সালে প্রণীত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন-২০১০ এর আওতায় বিগত সরকারের আমলে প্রতিযোগিতাবিহীন ব্যক্তি খাত বিনিয়োগে বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ একদিকে বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে, অন্যদিকে সরবরাহ ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধিতে সরকারি ভর্তুকি ও ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যহার দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ভারত ও মায়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ আন্তর্জাতিক আদালতে দীর্ঘদিন হলো নিষ্পত্তি হয়েছে। অথচ সমুদ্রের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।

আগে জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণ করা হতো বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আইনের আওতায় বিইআরসির দ্বারা গণশুনানির ভিত্তিতে। এতে অংশীজনদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হতো। কিন্তু বিইআরসি আইন লঙ্ঘন করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ নিজেই অংশীজনদের অংশগ্রহণ ব্যতীত তরল জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণ করা অব্যাহত রাখে। ফলে তরল জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণ সম্পর্কিত তিনটি প্রবিধানমালা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ কর্তৃক ২০১২ সাল থেকে আটকে রাখার বিরুদ্ধে এবং ৩ নভেম্বর ২০২১ তারিখে তরল জ্বালানির (ডিজেল ও কেরোসিন) কর্তৃত্ববহির্ভূতভাবে নির্ধারিত মূল্যহার বিইআরসি আইনের ধারা ২২ ও ৩৪ অনুযায়ী রিভিউর আদেশ প্রদানের জন্য ক্যাবের দায়েরকৃত ১০৫০৮/২০২১ নম্বর রিট মামলায় হাইকোর্ট রুলনিশি ইস্যু করেন। মামলাটি এখন নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।
এমতাবস্থায় বাংলাদেশের এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) আইন-২০২৩ এর দ্বারা সরকার তথা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণের ক্ষমতা হাতে নেয়। ওই সংশোধিত আইনে ধারা ৩৪ক সংযোজনের মাধ্যমে সরকার মূল্যহার নির্ধারণের ওই ক্ষমতা গ্রহণ করে। সেই সঙ্গে ‘কমিশন কর্তৃক প্রবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত সরকার এনার্জির মূল্যহার নির্ধারণ করিতে পারিবে’- এ কথাও সংশোধনীতে সংযোজন করা হয়। বর্তমান সরকার আধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে ওই সংশোধনের শুধু ধারা ৩৪ক রহিত করে এবং তরল জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণের ক্ষমতা সরকার তথা মন্ত্রণালয়ের হাতেই রয়ে যায়। বিগত সরকারের ধারাবাহিকতায় প্রবিধান গেজেট না করে আটকে রেখে বর্তমান সরকারও বিইআরসির পরিবর্তে জ্বালানি তেলের মূল্যহার নির্ধারণ করা অব্যাহত রাখে। ফলে তরল জ্বালানিতে লুণ্ঠনমূলক ব্যয় সমন্বয় এবং লুণ্ঠনমূলক রাজস্ব ও মুনাফা আহরণ অব্যাহত থাকে।
বর্তমান সরকার কর্তৃক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) (রহিতকরণ) অধ্যাদেশ-২০২৪ জারি করায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন-২০১০ রহিত হয়। তবে অধ্যাদেশে দফা ২(২)(ক) ও (খ) সংযোজন করে ওই আইনের আওতায়কৃত সব কার্যক্রমের আইনি বৈধতা দিয়ে সুরক্ষা তথা দায়মুক্তি দেওয়ায় বিগত সরকারের আমলে জ্বালানি খাত উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনায় অব্যাহত অবাধ লুণ্ঠন এ সরকারের আমলে সুরক্ষা পেল। ভোক্তারা জ্বালানি সুবিচার বঞ্চিত হলো। ফলে রহিতকরণ অধ্যাদেশে সংযোজিত দফা ২(২)(ক) ও (খ) বাতিলের জন্য ক্যাব হাইকোর্টে ১৫১৬১/২০২৪ নম্বর রিট মামলা দায়ের করেছে।
পৃথিবীর জ্বালানির প্রায় সর্বাংশের উৎস সূর্য হলেও পৃথিবীজুড়েই ভূমি ও সাগরের অভ্যন্তরে যে পরিপূরক জ্বালানি সম্পদ রয়েছে, তার মালিকানা রাষ্ট্র তথা জনগণের। কিন্তু যারা বিগত সরকারের আমলে জ্বালানি সম্পদ জনগণের নামে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য ও সমর্থনে লেনদেন করেছেন, তারা জনগণের অধিকার খর্ব করে কতিপয় দুর্ভেদ্য অধিকার বা অলিগার্ক সৃষ্টি করেন। এ অবস্থার পরিবর্তন করা দরকার সবার আগে। অধ্যাদেশে সংযোজিত ওই দফা ২(২)(ক) ও (খ) বাতিল না হলে এ পরিবর্তন হবে কীভাবে? অতিত লুণ্ঠনের বিচার না হলে আগামীতে জ্বালানি খাত লুণ্ঠনমুক্ত হবে কীভাবে? ক্যাব সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত ট্রাইব্যুনালের দ্বারা বিগত ১৫ বছরের লুণ্ঠনের অভিযোগে অভিযুক্ত সুনির্দিষ্ট চারজন বিশিষ্ট অপরাধিসহ সব জ্বালানি অপরাধীদের বিচার চায়। লুণ্ঠনমুক্ত জ্বালানি খাত উন্নয়নের লক্ষ্যে ক্যাব বিইআরসি আইনের আমূল সংস্কার চায় এবং ক্যাব প্রস্তাবিত জ্বালানি রূপান্তরনীতি ২০২৪-এর ভিত্তিতে বাণিজ্যিক নয় সরকারি সেবা খাত হিসেবে জ্বালানি খাত উন্নয়ন ও পরিচালনার জন্য জাতীয় জ্বালানি নীতি চায়।
জ্বালানি আমদানি, অনুসন্ধান ও উৎপাদন বিষয়ক ব্যয়ের ন্যায্যতা ও যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখার ক্ষমতা আইনে বিইআরসিকে দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যতীত সম্পূর্ণ সাপ্লাই চেইন রেগুলেটরি সংস্থা বিইআরসির আওতাবহির্ভূত। ভোক্তার জ্বালানি অধিকার যথাযথভাবে সংরক্ষণ নিশ্চিত হতে হলে সমগ্র সাপ্লাই-চেইন বিইআরসির আওতায় আনা আবশ্যক। তাই ক্যাবের প্রস্তাবিত জ্বালানি নীতিতে বিইআরসি আইন সংস্কার করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবয়ব, বিশেষ করে জ্বালানি খাত যদি লুণ্ঠনমূলক শোষণের চিত্র ধারণ করে, তাহলে দুটি বিষয় অত্যন্ত নির্মমভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়ে। এর একটি জ্বালানি অবিচার এবং অন্যটি জ্বালানি দারিদ্র্য। জ্বালানি অবিচার এবং জ্বালানি দারিদ্র্য অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। অর্থাৎ জ্বালানি অবিচার থেকে জ্বালানি দারিদ্র্যের সৃষ্টি হয়। সাধারণভাবে জ্বালানি দারিদ্র্য বলতে আধুনিক জ্বালানি সেবাসমূহে নাগরিকদের প্রবেশাধিকারের অভাবকে বোঝায়। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মতে, জীবন মানোন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল সূত্র হচ্ছে জ্বালানি সেবায় অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত থাকা। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান প্রতিটি মৌলিক অধিকারই প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে জ্বালানিনির্ভর। জ্বালানি দারিদ্র্য বলতে এমন এক অবস্থাকে বোঝায় যেখানে একজন ব্যক্তি রান্নার প্রয়োজনে বছরে মাথাপিছু ৩৫ কেজি এলপিজি না পাওয়া বা ব্যবহার করতে না পারা অথবা বার্ষিক মাথাপিছু ১২০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করার মতো তার সামর্থ্য না থাকা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জ্বালানিতে প্রবেশাধিকার থাকলেও ব্যবহারে প্রবেশ অধিকার অধিকাংশ ভোক্তার খুবই সীমিত। অর্থাৎ জ্বালানির ওপর অধিকাংশ ভোক্তা স্বত্বাধিকার অর্জনে সক্ষম নয়। ফলে প্রবেশাধিকার সেখানে অর্থহীন। বাংলাদেশে দারিদ্র্যবিমোচনের ক্ষেত্রে জ্বালানি নিরাপত্তাকে বিবেচনায় নেওয়া হয় না। ফলে দারিদ্র্যবিমোচনের ধারণা অসম্পূর্ণ।
জ্বালানি মানব জীবনের জন্য একটি আবশ্যিক পণ্য বা সেবা। জ্বালানি তথা জ্বালানি নিরাপত্তার ঘাটতি, অর্থাৎ যে কোনো মৌলিক চাহিদার (অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা চিকিৎসা, বাসস্থান…) ঘাটতি যতটা না বিপজ্জনক, এর থেকেও জ্বালানি ঘাটতি অত্যাধিক ভয়াবহ বিপজ্জনক। তাই এই ঘাটতি সৃষ্টি করা সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকার খর্ব করার শামিল। সুতরাং দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য ন্যায্য ও যৌক্তিক মূল্যে জ্বালানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। বিগত সরকারের আমলে রাষ্ট্র তার এ দায়িত্ব পালন করতে পারিনি। বর্তমান সরকারের আমলে এরই ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা আজও ভয়াবহ বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। পরিস্থিতি উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই।
লেখক: অধ্যাপক, ডিন, ফ্যাকাল্টি অব ইঞ্জিনিয়ারিং, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও জ্বালানি উপদেষ্টা, ক্যাব



