প্রযুক্তির প্রভাব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগমন প্রকাশনার জগতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এআই এখন গল্প, কবিতা, এমনকি গবেষণাপত্রও তৈরি করতে পারে। সৃজনশীলতার জায়গায় এআই পুরোপুরি জায়গা দখল করলে মানুষের চিন্তার গভীরতা হ্রাস পাবে। তাই এআই ব্যবহারে নৈতিকতা, কপিরাইট আইন এবং সামাজিক সচেতনতা জরুরি।...

মুদ্রণযন্ত্রের মাধ্যমে হরফ যখন কাগজের জমিনে ঠাঁই নিয়েছে, তখন জ্ঞানচর্চার ভুবন নতুন মাত্রিকতা পেয়েছে। বই প্রকাশনার মাধ্যমে বিদ্যার পুঁজিপতি হওয়ার প্রয়াস অগ্রায়ণ হয়েছে। এ ধারায় আজ প্রকাশনার মাধ্যমে সামাজিক পুঁজি তৈরির প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সৃজনশীল প্রকাশনার চ্যালেঞ্জ বিবিধ। প্রকাশনা সমস্যার আলোচনায় বলা যায়, যাত্রাকালের প্রারম্ভে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রস্তুতি জুতসই ছিল না। আবেগ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে পূর্ববঙ্গে প্রকাশনার অঙ্কুরোদগম হলেও প্রকাশকদের পেশাজীবী শ্রেণিচরিত্র অনুপস্থিত ছিল। দীর্ঘ সময় পেরিয়েও প্রকাশনার মান আজও তৃপ্তির ঢেকুর তোলার মতো নয়।
প্রকাশনার চ্যালেঞ্জ বলতে গেলেই আমরা পুঁজি থেকে প্রযুক্তির পশ্চাৎপদতার দীর্ঘ সারণি এঁকে দিই। কিন্তু প্রকাশনা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরিপ্রেক্ষিত, পরিকল্পনা ও দর্শনের দৈন্যতা প্রায়শই আলোচনার পেছনে থাকে। মূলত আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বইয়ের জন্য যথার্থ উপযোগিতায় এখনো তৈরি হয়নি। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দৃশ্যমান উপাত্তনির্ভর উন্নয়নকে প্রাধিকার দেওয়ায় বই গুরুত্বের তালিকার তলানিতে থাকে। বইকে টিকে থাকার আবশ্যিক উপাদান হিসেবে গণ্য না করায় প্রকাশনা জগৎ মনোহর নয়। প্রকাশনাকে নিয়ে মগজের লড়াইয়ে গুরুত্ব না পাওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণেই দ্রুত বদলে যাওয়া পৃথিবীতে বাংলাদেশ উন্নত দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে। বই শৈল্পিক বস্তু হলেও মোটাদাগে পণ্য হিসেবেই বাজারে প্রবেশ করতে হয়। ক্রেতা তুষ্টি নিশ্চিত করতে এবং অন্যান্য পণ্যের ভিড়ে উপযোগ তৈরি করতে পাণ্ডুলিপি উন্নয়ন ও মানসম্পন্ন অর্থলগ্নির প্রয়োজন। কিন্তু সৃজনশীল বইয়ের বাজার সংকুচিত হওয়ায় বিনিয়োগে প্রকাশকের বুক কাঁপে সংশয় ও উদ্বেগে।
যুগচাহিদার প্রয়োজনে আমাদের প্রকাশনার কনটেন্টকে বৈচিত্র্যকরণের উদ্যোগ নাজুক। কাগজের বইয়ের পাশাপাশি ই-বুক, অডিও ভিজুয়াল কনটেন্ট- এরকম দুয়েকটি উদাহরণ থাকলেও তা বিস্তৃত নয়। জেন-জি প্রজন্ম ডিজিটাল মাধ্যমে অভ্যস্ত হচ্ছে। বইয়ের প্রমোশনে সনাতনী ব্যবস্থার চেয়ে বুক প্রমোটারের ভিডিও রিলস জনপ্রিয় হলেও আমাদের যোগসূত্র কম। বই নির্মাণে প্রচ্ছদ, ফন্ট, টাইপফেস, বিন্যাসে আমাদের আয়োজন ও লগ্নির খবর সুখকর নয়। সমস্যার তালিকা দীর্ঘ। নমুনা হিসেবে বর্তমান সময়কে আমলে নিয়ে বলা যায়-
১. জেন-জি প্রজন্মের পাঠাভ্যাস, রুচি চিহ্নিতকরণ
২. প্রকাশনা শিল্পে প্রযুক্তিগত সামর্থ্য, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অভিঘাত ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব মূল্যায়ন
৩. বর্তমান প্রকাশনা শিল্পের কাঠামোগত ও অর্থনৈতিক সংকট চিহ্নিতকরণ
৪. দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও সর্বসাধারণের শিক্ষাস্তর মূল্যায়ন ও উন্নয়ন
৫. বই পাঠে সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের প্রণোদনার কর্মকৌশল নিরূপণ
এসব বিষয়ে কাঠামোবদ্ধ পরিকল্পনা ও কার্যকর ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি।
প্রকাশনার চ্যালেঞ্জের দীর্ঘ তালিকা থেকে নমুনা হিসেবে কয়েকটি প্রতিপাদ্য তুলে ধরলে-
প্রথমত, প্রকাশনার কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট। পাইরেসি, চৌর্যবৃত্তি, অদক্ষ সম্পাদনা এবং বাজারজাতকরণের অভাব বইয়ের মান ও পাঠকের আস্থা দুটোই কমিয়েছে। অনেক লেখক রয়্যালটি পান না, ফলে সৃজনশীল লেখালেখির যথার্থ মূল্যায়ন হয় না। অমর একুশে বইমেলার মতো ঐতিহ্যবাহী বিক্রয়মঞ্চে বিক্রির ধস এই শিল্পের সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
দ্বিতীয়ত, তরুণ প্রজন্মের পাঠাভ্যাস ও রুচির পরিবর্তন প্রকাশনার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। জেন-জি প্রজন্ম ডিজিটাল মাধ্যমে অভ্যস্ত, তারা দ্রুতগতির, বৈচিত্র্যপ্রবণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর। তাদের চাহিদা অনুযায়ী বইয়ের উপস্থাপন ভিন্ন হতে হয়। অথচ আমাদের প্রকাশনা এখনো পুরোনো ধাঁচে চলছে, ফলে নতুন পাঠক তৈরি হচ্ছে না, পুরোনো পাঠক হারাচ্ছে।
তৃতীয়ত, প্রযুক্তির প্রভাব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগমন প্রকাশনার জগতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এআই এখন গল্প, কবিতা, এমনকি গবেষণাপত্রও তৈরি করতে পারে। সৃজনশীলতার জায়গায় এআই পুরোপুরি জায়গা দখল করলে মানুষের চিন্তার গভীরতা হ্রাস পাবে। তাই এআই ব্যবহারে নৈতিকতা, কপিরাইট আইন এবং সামাজিক সচেতনতা জরুরি।
চতুর্থত, প্রকাশনার প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা আমাদের বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে রেখেছে। বাংলা ফন্টের উন্নয়ন, ই-বুক প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন বিপণন, অনুবাদকর্ম- এসব ক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তুতি দুর্বল। অথচ বিশ্বে ই-বুক ব্যবহার, অন-ডিমান্ড প্রিন্টিং, অডিওবুক ইত্যাদি দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল না মিললে তা আরও পিছিয়ে পড়বে।
করোনা-পরবর্তী তারল্য সংকটপর্বে বই বাজারে মন্দা দশা। বাংলাদেশে এই সমস্যা আরও প্রগাঢ়। গত কয়েক বছরে সৃজনশীল বই বিক্রির ধস এবং অমর একুশে বইমেলার দুরবস্থা অবস্থাকে আরও সঙ্গিন করেছে। এ অবস্থার উত্তরণে বহুপক্ষীয় কর্মযোগের মধ্যে সরকারি উদ্যোগ অতি জরুরি।
বই প্রকাশের পর বিপণন কাঠামোর অভাবও একটি বড় সংকট। লাগসই বিপণন প্রকরণ অনুপস্থিত। ফলে প্রকাশক হতাশ হন, লেখক রয়্যালটির হিসাব কষেন, আর প্রকাশকের বাড়তে থাকে বাকির হিসাব। বইতে লগ্নি করা টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা অনিশ্চিত এবং এত মন্থরগতির যে লাভ-ক্ষতির হিসাবে তা প্রেরণাদায়ক নয়। করপোরেট পুঁজি ছোট বাজারে আগ্রহী নয়। অনেক প্রকাশক পেশা পরিবর্তন করে টিকে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।
তরুণ প্রজন্ম তথা জেন-জির পাঠাভ্যাস ও মননচর্চা প্রকাশনার ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর চিন্তাপ্রবাহে এই প্রজন্মের ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হয়েছে। তাদের চাহিদা অনুযায়ী প্রকাশনার পরিকাঠামো পুনর্গঠন জরুরি, যেখানে ট্র্যাডিশনাল কনটেন্ট ও মুদ্রণশৈলীর বাইরে গিয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ই-বুক, অডিওবুক এবং ইন্টারঅ্যাকটিভ কনটেন্টের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
তরুণ প্রজন্ম তথা জেন-জির পরিবর্তিত পাঠাভ্যাস ও প্রযুক্তিনির্ভর চিন্তাধারা প্রকাশনা শিল্পের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। ই-বুক, অডিওবুক, ইন্টারঅ্যাকটিভ কনটেন্ট- এসবের চাহিদা বাড়লেও বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এখনো অপর্যাপ্ত। বাংলা ফন্ট, টাইপিং সফটওয়্যার, ক্যালিগ্রাফি এবং এআই-ভিত্তিক লেখালেখির ক্ষেত্রে ঘাটতি প্রকট।
প্রকাশনার উন্নয়নে প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার, রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার এবং নৈতিক ও কপিরাইট সচেতনতা। লেখক-প্রকাশক-সম্পাদক ত্রয়ীর মধ্যে স্বচ্ছতা ও পেশাদারত্ব গড়ে তুলতে হবে। সরকারকে প্রকাশনা শিল্পকে পূর্ণাঙ্গ, সম্মানিত শিল্প খাতে রূপান্তরের জন্য নীতিগত সহায়তা ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি। মেধাভিত্তিক সামাজিক পুঁজি যেমন- জ্ঞান, সংস্কৃতি, ভাষা ও সাহিত্য বর্তমানে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। সরকার প্রকাশনাকে পূর্ণাঙ্গ শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে জাতীয় গ্রন্থনীতি প্রণয়নের মাধ্যমে ‘জাতীয় গ্রন্থ উন্নয়ন পরিষদ’ গঠন করলে সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা সম্ভব হবে। ফলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সমৃদ্ধ হবে, তেমনি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির ভিত্তিও শক্তিশালী হবে।
প্রকাশনার উত্তরণের জন্য অনুমিতি নির্ভর প্রেসক্রিপশন যোজনা করা গেলেও সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সংশ্লিষ্টদের আন্তরিক বোধন ও বোঝাপড়া। দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে নিজের মতকে হুকুমত হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেয়ে সবার মতকে গুরুত্ব দিয়ে আর্থসামাজিক বাস্তবতায় ব্যবস্থা গ্রহণ অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
সাইবার ওয়ার্ল্ডের বলয়ে কনজিউমার প্রোডাক্টগুলো মার্কেট ইকোনমির বিজ্ঞাপনে বিজ্ঞাপিত। সেই পর্বে প্রকাশনা নিয়ে যেসব প্রশ্নেবাণের সামনে দাঁড়াতে হয়- পাঠকের রুচি তৈরিতে আপনার ভূমিকা কী? লেখা বা লেখক কোনটি দেখে আপনি বই বেছে নেন? বিপরীতক্রমে লেখকের সামনে প্রশ্ন-পাঠকের রুচি তৈরিতে আপনি লিখতে চান নাকি পাঠকের প্রত্যাশা আপনার লেখায় প্রেরণা জোগায়? প্রশ্নের দ্বিধা জট পাকে। মীমাংসা দেয় না এবং প্রকাশনা গভীর আবর্তে ঘুরপাক খায়।
লেখক: প্রকাশনা বিশেষজ্ঞ ও খণ্ডকালীন শিক্ষক
মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
mahbub.sahana@ gmail.com


.jpg)