কোনো মানুষই অপরাধী হয়ে জন্ম নেয়নি। নানাবিধ কারণে মানুষ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। কাজেই অপরাধীর বোধোদয় হলে তাকে সঠিক পথে ফেরত আসার রাস্তা খোলা রাখতে হবে। সর্বোপরি সামাজিকভাবে সমাজ থেকে উদ্ভূত সব সমস্যার সমাধানে সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিতে কাজ করে যেতে হবে।...

সমাজের প্রতিটি স্তরে অপরাধের উপস্থিতি বিদ্যমান। পৃথিবীতে এমন কোনো সমাজব্যবস্থা খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে অপরাধের উপস্থিতি নেই। সংগত কারণেই অপরাধ প্রতিকার ও প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন পর্যায় থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এ বিষয়টি অত্যন্ত ইতিবাচক ও যৌক্তিক। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে অপরাধের উৎসগুলোকে ধ্বংস করা। অপরাধের সোর্সগুলোকে যদি একেবারে গোড়া থেকে নির্মূল করা সম্ভব হয় তাহলে দেখা যাবে অদূর ভবিষ্যতে সমাজে অপরাধ সংঘটনের হার ধীরে ধীরে কমে আসবে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় যে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব তার মধ্যে অন্যতম হলো, সমাজে অপরাধের উৎসগুলোকে নির্মূলে সামগ্রিকভাবে কাজ করা। কেননা প্রত্যেকটি সমাজে অপরাধের উৎস রয়েছে। অপরাধের উৎসগুলো অপরাধীকে নানাভাবে অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। কাজেই অপরাধের ক্ষেত্র প্রস্তুতে সমাজের দায় রয়েছে।
এডইন এইচ সাদারল্যান্ড তার সামাজিক শিখন তত্ত্বে উল্লেখ করেছেন, মানুষ মূলত অপরাধের কৌশল ও আচরণ শিখে অন্তরঙ্গ ব্যক্তি ও পিয়ার গ্রুপের কাছ থেকে। একজন ব্যক্তি যাদের সঙ্গে নিয়মিত চলাফেরা করে, দিনের একটি উল্লেখযোগ্য সময় কাটায়, বিভিন্ন ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়াদি শেয়ার করে, দলবেঁধে আড্ডা দেয় তারাই মূলত পিয়ার গ্রুপ। অপরাধ হচ্ছে একটি শিক্ষণীয় প্রক্রিয়া এবং এ প্রক্রিয়ায় পিয়ার গ্রুপ ভূমিকা পালন করে থাকে। শিখন মূলত পারস্পরিক মেলামেশা ও মেলবন্ধনের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। অপরাধের কৌশলগুলোও সাধারণত পিয়ার গ্রুপ থেকে শেখা হয়। কোন পদ্ধতি কিংবা প্রক্রিয়ায় অপরাধ সংঘটন করা সহজতর ইত্যাদি বিষয়ও পিয়ার গ্রুপের কাছ থেকে শিখে থাকে অপরাধীরা। শেখন প্রক্রিয়া সাধারণত সময়কাল, গুরুত্ব এবং গভীরতার ওপর নির্ভর করে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর অপরাধের ভয়াবহতার স্বরূপ নির্ণয় করলে এ তত্ত্বটির বাস্তব প্রয়োগ পাওয়া যায়। যে তরুণরা স্কুল থেকে ঝরে পড়ে, মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়, অর্থের বিনিময়ে সমাজ ও রাষ্ট্রবিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়ে প্রত্যেকেই পিয়ার গ্রুপ দ্বারা প্রভাবিত হয়। কাজেই উঠতি বয়সী শিক্ষার্থী ও কিশোরদের প্রতি পরিবার ও অভিভাবকদের বিশেষ নজর দিতে হবে।
চার্লস হর্টন কোলি, জর্জ হার্বার্ট মিড এবং হার্বার্ট ব্লুমার সামাজিক লেবেলিং তত্ত্বে উল্লেখ করেছেন, যখন সমাজের অধিকাংশ মানুষ কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে, তখন সেই ব্যক্তিকে প্রকৃত অর্থেই অপরাধী হিসেবে লেবেল করে দেওয়া হয়। এ ধরনের লেবেলের কারণেই ব্যক্তির মধ্যে অপরাধ প্রবণতা দেখা যায় এবং ব্যক্তির পরিচয়ের জন্য উল্লিখিত লেবেলগুলো ব্যবহৃত হয়। লেবেলিং বিষয়টি সাধারণত একটি প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে সম্পন্ন হয়। শুরুতে ব্যক্তির প্রারম্ভিক অপরাধকর্ম (কতিপয় কারণে মানুষ অপরাধ করে থাকে) লেবেলিংয়ের সূচনা করে থাকে। দ্বিতীয় ধাপে ব্যক্তির অপরাধকর্ম ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম কর্তৃক শনাক্ত করা হয় (জাতিগত, অর্থনৈতিক এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক সম্পর্ক অপরাধীকে গ্রেপ্তারে প্রভাবিত করে থাকে)। তৃতীয়ত ব্যক্তিকে লেবেলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় (পুলিশ এবং আদালত কর্তৃক অফিশিয়ালি অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়)। চতুর্থত, লেবেলিংয়ের ফলে ব্যক্তির একটি নতুন পরিচয় গড়ে ওঠে যা সমাজের জন্য ক্ষতিকর। এতে ব্যক্তি অপরাধী হিসেবে পরিচিতি লাভ করে এবং প্রথাগত সমাজ কর্তৃক সে পরিত্যক্ত হয়। পঞ্চমত অপরাধীরা লেবেলকে গ্রহণ করতে বাধ্য হয় (লেবেল করা ব্যক্তিরা নিজেদের সমাজের বাইরের মানুষ হিসেবে ভাবতে শুরু করে); শেষত বিচ্যুতির পরিবর্ধন হয় (কলঙ্কিত বিচ্যুতিসম্পন্ন ব্যক্তিরা ক্রিমিনাল ক্যারিয়ারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে)। উপরোক্ত প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়েই একজন অপরাধী কিংবা বিচ্যুতিসম্পন্ন ব্যক্তি লেবেলিংয়ের শিকার হয়ে অপরাধী হিসেবে সমাজে পরিচিতি পায় এবং উক্ত ব্যক্তির সমাজের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে আসার সম্ভাবনাও ধীরে ধীরে কমে আসে। অর্থাৎ লেবেলিংয়ের কারণে ব্যক্তি স্বাভাবিক পথে ফিরে আসার সব সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় এবং ব্যক্তি অপরাধকর্মকেই জীবিকার পথ হিসেবে বেছে নেয়।
ট্রাভিস হার্সি তার সামাজিক নিয়ন্ত্রণ তত্ত্বে উল্লেখ করেছেন; প্রত্যেকের মধ্যে অপরাধী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু প্রত্যেকেই আবার সমাজের প্রতি তার বন্ধনের মধ্যদিয়ে অপরাধ থেকে নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে। অপরাধ তখনই ঘটে যখন ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে কিংবা বন্ধন ভেঙে যায়। এই তত্ত্বে তাত্ত্বিক চারটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা দিয়েছেন, এ বৈশিষ্ট্যগুলোই ব্যক্তিকে সমাজের প্রতি বন্ধন সুদৃঢ় করতে সহায়তা করে। আবার বিপরীত দিকে যাদের মধ্যে এসব বৈশিষ্ট্যের ঘাটতি দেখা যায় তাদের মাধ্যমে সমাজ বিরুদ্ধ কাজ সংঘটিত হয়ে থাকে। প্রথমটি হচ্ছে, সংযুক্তি (পরিবার, বন্ধু, কমিউনিটি) যে ব্যক্তির সঙ্গে পরিবারের সদস্য, বন্ধু এবং কমিউনিটির পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা থাকে তার মাধ্যমে কখনোই সমাজবিরুদ্ধ কাজ করা সম্ভব হয়ে উঠে না। বিপরীত দিকে যাদের সঙ্গে পরিবারের দূরত্ব সৃষ্টি হয়, বন্ধুদের সঙ্গে এবং কমিউনিটির সঙ্গে বিভাজন সৃষ্টি হয় তাদের মাধ্যমেই অপকর্ম হয়ে থাকে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে দায়বদ্ধতা (ভবিষ্যৎ, ক্যারিয়ার, সফলতা, ব্যক্তিগত লক্ষ্য পূরণ), যে ব্যক্তির ভবিষ্যতে সুন্দর ও মর্যাদাসম্পন্ন ক্যারিয়ারের লক্ষ্য রয়েছে এবং লক্ষ্যে পৌঁছাতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের সদিচ্ছা থাকে তার মাধ্যমে কোনো ধরনের অনিয়ম হওয়ার সম্ভাবনা নেই। অন্যদিকে যে ব্যক্তির জীবনের কোনো মানে নেই, জীবন নিয়ে যার মধ্যে কোনো লক্ষ্য অর্জনের ইচ্ছা নেই তার মাধ্যমে যেকোনো ধরনের অনিয়ম করার সম্ভাবনা থাকে। তৃতীয়টি হচ্ছে সম্পৃক্ততা (বিদ্যালয় কার্যক্রম, ক্রীড়া সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় গ্রুপ, সামাজিক ক্লাব), যে ব্যক্তি সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের ইউনিট ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন তিনি স্বাভাবিকভাবেই ইতিবাচক কাজের মধ্যদিয়ে জীবন অতিবাহিত করেন। এ ধরনের ব্যক্তিদের মাধ্যমে সমাজবিরোধী কাজ হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম। আবার যারা সমাজের কোনো ইউনিটের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, সমাজকে এড়িয়ে চলে তাদের মাধ্যমে অপরাধকর্ম সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। চতুর্থটি হচ্ছে বিশ্বাস (সততা, মূল্যবোধ, ন্যায্যতা, দেশপ্রেম, দায়িত্বশীলতা), যারা রাষ্ট্রের আইনকানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, যাদের মধ্যে সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি মেনে চলার যোগ্যতা রয়েছে তাদের মধ্যেই দেশপ্রেম রয়েছে। এ ধরনের দেশপ্রেমিকরা তাদের প্রত্যেক কাজেই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়, কাজেই এ শ্রেণির নাগরিকরা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কাজে যুক্ত হয় না। বিপরীত দিকে যাদের মধ্যে সততা নেই, যারা সমাজের নিয়মকে অনুসরণ করে না, যারা দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং যাদের মধ্যে দেশপ্রেম নেই তাদের মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রবিরোধী অপকর্ম সম্পাদিত হয়ে থাকে।
কাজেই সমাজকে যদি সঠিকভাবে পরিচালিত করা যায় তাহলে অপরাধের উৎসগুলো ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে এবং একটা সময় পরে উৎসগুলো সমাজ থেকে নির্মূল হয়ে যাবে। দীর্ঘদিন ধরে সমাজে প্রচলিত রীতি-নীতি ও প্রথাগুলোকে মেনে চলার সংস্কৃতি নতুনদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। তাহলেই নাগরিকদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় সুদৃঢ় হবে। সততা, ন্যায্যতার চর্চা করতে হবে। কোনো মানুষ অপরাধ করার পরবর্তী সময়ে তাকে সঠিক পথে ফিরে আসার সুযোগ করে দিতে হবে সমাজকে। মনে রাখতে হবে, কোনো মানুষই অপরাধী হয়ে জন্ম নেয়নি। নানাবিধ কারণে মানুষ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। কাজেই অপরাধীর বোধোদয় হলে তাকে সঠিক পথে ফেরত আসার রাস্তা খোলা রাখতে হবে। কোনো মানুষকে লেবেল করে সমাজের বাইরে রাখার মানসিকতা থেকে দূরে সরে আসতে হবে। এছাড়া অভিভাবকদের তাদের সন্তানের বিষয়ে সর্বদা সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। ঘরের বাইরে সন্তান কাদের সঙ্গে মিশছে, নিয়মিত পঠন-পাঠনে অংশগ্রহণ করছে কি না; এ বিষয়েও দৃষ্টি রাখতে হবে। সর্বোপরি সামাজিকভাবে সমাজ থেকে উদ্ভূত সব সমস্যার সমাধানে সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিতে কাজ করে যেতে হবে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


.jpg)