সরকারি ব্যবস্থাপনায় গ্রন্থাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে কর্মীদের আর্থিক ও অনার্থিক সুবিধা নিশ্চিত যেমন জরুরি, একই সঙ্গে বেসরকারি গ্রন্থাগারের জন্য শুধু সরকার নয়, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এমন হওয়া চাই, তারা যেন শুধু হাওয়া খেয়ে সেবা দেবে এমনটা নয়, সামাজেরও কিছু রশদ ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি জ্ঞাপনের আবশ্যিকতা রয়েছে। সমাজের ভেতর থেকে যখন এমন বোধের জাগরণ হবে যে, গ্রন্থাগার হচ্ছে সামাজিক পুঁজি গঠনের প্লাটফর্ম...
জাতীয় দিবসগুলোর একটি মহিমা থাকে বিষয়কে কেন্দ্র করে। বিস্তৃত করে বললে যে বিষয়, ঘটনা, কিংবা প্রতিষ্ঠান ঘিরে জাতীয় দিবস হয়- ওই দিনে উজ্জীবিত হওয়ার একটা অনুঘটক কাজ করে। সঙ্গত কারণেই ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস উপলক্ষে গ্রন্থাগারকর্মীদের সঞ্জীবনী শক্তি কাজ করে। অংশীজনরা চায় এ দিবস ঘিরে সেবার মান সম্প্রসারণসহ নানা প্রসরণের। গ্রন্থাগারের সেবা অদৃশ্য। ফলে উপকারভোগীরা মোটা দাগে কোনো পণ্য পায় না। কিন্তু নিজের মনের ভিত শক্ত করে মানবিক ও ভেদহীন মানুষরূপে সমাজে ভূমিকা রাখতে সহায়তা পায়।
৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার স্থাপনের ঘটনাকে ভিত্তি ধরে এ দিবসের অবতারণা। গ্রন্থাগারের কাছে সমাজের চাহিদার বহর দীর্ঘ, তবে গ্রন্থাগারকে বেড়ে উঠতে দিতে সহযোগ কম। এ কথা সরকারি গণগ্রন্থারের ক্ষেত্রেও প্রযুক্ত। উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়নের রূপকল্পে বিভোড় হয়ে থাকে বস্তুসর্বস্ব উন্নয়ন উপকরণ। ইট, বালু, পাথরসমেত দালানকোঠা, রাস্তাঘাট এর আধেয়। কিন্তু মানুষের জাগরণে মানসপট তৈরি যে কত জরুরি সে বিষয়টি অধরা থেকে যায়। এর বড় কারণ অংশীজনদের দ্রুত ও স্বল্পমেয়াদি উপকরণনির্ভর বস্তুর প্রতি দুর্বার আকর্ষণ। নিজেকে ও প্রতিবেশকে উপযোগী করে মানবিক ভিত ও সামাজিক পুঁজি তৈরির বিষয়টি সভা-সমিতিতে আলোচিত হলেও প্রয়োগক্ষেত্র থাকে তালিকার তলানিতে। মানুষের অগ্রাধিকার চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে চেতনার জাগরণে বই ও বইনির্ভর প্রতিষ্ঠান গণগ্রন্থাগার চাহিদার সারণির সামনে স্থান নিতে পারে না। বাজেট বরাদ্দ থেকে মনোযোগ বরাদ্দ সঙ্গত কারণেই কম হয়। এ চিত্র শুধু গণগ্রন্থাগারের জন্য নয়, সুকুমার কলার পৃষ্ঠপোষকতার জন্য নিযুক্ত সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতি। ফলকথা, আমরা যতই জাতীয় গ্রন্থাগার দিবসকে ঘিরে স্বপ্নের পসরা সাজাই, বাজেট বরাদ্দে অপ্রতুলতা, যথার্থ জনবল কাঠামোর অনুপস্থিতিসহ নানা সমস্যামঞ্জুরিতে প্রাপ্তির ডালি পূর্ণ হয় না। এ তো গেল মুদ্রার একটা দিক, ভিন্ন দিকেও আলোর প্রক্ষেপণ প্রয়োজন।
সমাজের ভেতর থেকে পাঠাগার আন্দোলন কাম্য মাত্রায় নয় কেন? এ প্রশ্নের উত্তর শুধু সরকারের ওপর দোষারোপ একতরফা বৈকি। সামাজিক চলকগুলো এতটাই আর্থিক মাপকাঠিতে পরিমেয়, সে পর্বে সমাজ ও পরিবারের শিক্ষা হচ্ছে বেশি পাঠ্যবই পড়, ভালো জিপিএ অর্জন কর, অতপরঃ ভালো চাকরি করে কারি কারি টাকা আয় কর। সমাজ তো ভেদহীন ও মানবিক মানুষ হওয়ার স্বপক্ষে কর্মযোগ চালায় না। সমাজের গন্তব্য পুঁজির দিকে এতটাই নির্ভর, এ পর্বে জ্ঞান অন্বেষণে গ্রন্থাগারে গমনের ফুরসুত কোথায়? পাঠক তার চাকরির জন্য তৈরি হতেই বেশির ভাগ গ্রন্থাগারে যায়। টিকে থাকার সংগ্রামে চাকরির পড়ার বইগুলোর পাশে পড়ে থাকে আমাদের জ্ঞানান্বেষী বইগুলো। এ বইগুলোর নীরব হরফগুলোকে সজীবতা দেবে কে? ২০২৬ সালের জাতীয় গ্রন্থাগার দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘জ্ঞানই মুক্তি আগামীর ভিত্তি’- এটা স্লোগান হিসেবে মনমোহনী ও লোকপ্রিয়। কিন্তু এ জ্ঞানের মশালে পলতে লাগাবে কে? গণগ্রন্থাগারসমেত সরকারি ক্রিয়াকর্ম, সামাজিক রেনেসাঁস নাকি অন্য কোনো অনুঘটক- নাকি একটা সামগ্রিক আন্দোলন। জ্ঞানের মাধ্যমে মুক্তি যা আগামীর চলার পথের দিশা দেখাবে, একথা যদি সরকার বিশ্বাস করতে চায় তাহলে কেবল গণগ্রন্থাগারের ৭১টি শাখার মাধ্যমে কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। প্রতিটি কেন্দ্রে লোকবলের সংকটসহ প্রণোদনমূলক কার্যক্রমের ন্যূনতম বাজেট নেই। প্রতিবেশী দেশগুলো শিশুদের জন্য গ্রন্থাগারকে আকর্ষণীয় করতে ভিজ্যুয়াল কার্যক্রমকে প্রণিধানরূপে মেনে কর্মকৌশল গ্রহণ করেছে। মালয়েশিয়ায় শিশুরা গ্রন্থাগারে প্রবেশ করলে ডিজিটাল স্কিনে যেন স্বপ্নপুরীতে প্রবেশ করে। আর আমাদের দেশে এখনো বাচ্চাদের বড়জোর কিছু রঙিন বই ধরিয়ে দেওয়া হয়। বাচ্চাদের শিশুকর্নার থাকলেও সুযোগ-সুবিধায় চাহিদা ও জোগানের ঘাটতি প্রকট। গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের রূপকল্পে উৎকীর্ণ আছে- ‘জ্ঞানমনষ্ক আলোকিত সমাজ’। এ সমাজ কায়েমে গণগ্রন্থাগারের রশদ কতটুকু! প্রতিবেশী দেশগুলো যখন গণগ্রন্থাগার কার্যক্রমে ই-লাইব্রেরি স্থাপন, ডিজিটাল সেবা নিশ্চিতকরণে অনেক দূর এগিয়েছে, তখন আমরা কেবল যাত্রাপর্বে। ১৯৫৮ সালে ১০,০৪০টি বই নিয়ে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের যাত্রায় আজ বইয়ের সংখ্যা ৩২,৬৫,৮৫৪। এতে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার কারণ নেই। পরিমাণগত সেবা হয়তো খানিকটা হয়েছে কিন্তু গুণগত সেবা কতটুকু? আশা জাগানিয়া কার্যক্রমও আছে। গণগ্রন্থাগারের শাহবাগে কেন্দ্রীয় নবনির্মিত ভবনের স্বপ্ন এখন অনেকটাই বাস্তবতা। সুউচ্চ বিশাল এ ভবনে নানাবিধ সুবিধার সঙ্গে থাকবে নারীদের জন্য বিশেষ কর্নার, শিশুদের জন্য খেলার সামগ্রীসহ বিশেষ আয়োজন। বর্তমানে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কার্যক্রমে দেশের ৩২০০টি স্পটে মানুষের দোরগোড়ায় বই পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। গণগ্রন্থাগারের আকর্ষণীয় প্রকল্প হচ্ছে চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স। ১৬ তলা এ কমপ্লেক্স গ্রন্থাগার ছাড়াও উন্মুক্ত মঞ্চ, গ্যালারি, গার্ডেন, পাবলিক প্লাজাসহ একটি বহুমাত্রিক মিলনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পরিকল্পনাগুলো সুন্দরভাবেই সম্পূর্ণ হচ্ছে কিন্তু ফলদারি কতটুকু হবে তা নির্ভর করবে উপকারভোগীদের আন্তরিকতা, সঙ্গে সেবাদাতাদের সহযোগিতা তো অবধারিত।
গ্রন্থাগার আন্দোলনে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রার্থিত হলেও প্রাণভোমরা হলো বেসরকারি সামাজিক উদ্যোগ। সাদা সত্য হলো বেসরকারি উদ্যোগগুলো বড়ই অসার। বিশাল জনগোষ্ঠীর এ দেশের জন্য বেসরকারি গ্রন্থাগার আন্দোলন সার্বিক বিচারে তেমন কোনো প্রভাবক নয়। বরং শতবর্ষ আগে সেসব গ্রন্থাগার আলোর মশাল জ্বেলেছিল আজ তার বেশির ভাগ চলে পাদপ্রদীপের ক্ষীণ আলোর মতো। মূলত টিকে থাকার সংগ্রাম ও সম্পদ অর্জনের মাত্রাতিরিক্ত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে জনসমাজের জন্য স্বার্থহীনভাবে নিবেদিত মানুষগুলো ক্ষয়ে পড়ছে। ফলে পাঠাগার আন্দোলন আজ অনেকটা হিমঘরে। জনকয়েক মানুষ পাঠাগার গড়ে সেবাধর্মী এ কাজে মনোসংযোগ করলেও সামাজিক সহযোগিতা তো পরের কথা, দৃষ্টিভঙ্গিটাও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ইতিবাচক নয়। বইনির্ভর সামাজিক কর্মগুলো সমাজে ততটা স্বীকৃত নয় বলে আর্থিক অর্জন ও প্রশান্তি কোনোটাই মেলে না। ফলে প্রণোদনা একেবারেই অনুপস্থিত।
৫ ফেব্রুয়ারি জতীয় গ্রন্থাগার দিবসকে কেন্দ্র করে প্রতিকূলতার ফিরিস্তি দীর্ঘ না করে আমাদের সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যেতে হবে। দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে একটা মিলন মোহনায় দাঁড়াতে হবে সবাইকে ঐক্যতানে। গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের সীমিত সামর্থ্য থাকলেও কর্মীদের একটা সেবামুখী মানসিকতা রয়েছে- এটা বড় শক্তির জায়গা। এ শক্তির ভরবিন্দুতে দাঁড়িয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়নকে সঙ্গে নিয়ে চাকরির নয়, অধিক সৃজনের প্রত্যাশা নিয়ে এগিয়ে যাবে, এমনটা প্রত্যাশা। পাঠাগার আন্দোলন বেসরকারিভাবে স্বপ্রণোদিত ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে এগিয়ে যাবে এমন ভাবনায় বুঁদ হয়ে থাকলে চলবে না। সমাজের একজন হিসেবে দায়িত্ব যুথবদ্ধ প্রয়াসে পাঠাগার আন্দেলনকে এগিয়ে নেওয়ার। পাঠাগার আন্দোলন ব্যতিরেকে উন্নয়নের দৌড়ে আপামর জনগণের অংশগ্রহণ সম্ভব নয়। মানুষের বহুরৈখিক সাফল্যের জন্য তৈরি হতে পাঠাগার একটা আতুরঘর। এ ঘরের দৃশ্যকল্প বিবর্ণ হলে মন খারাপের সংস্কৃতি তৈরি হবে। এমন সংস্কৃতি নিয়ে বড় ক্যানভাসে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
সরকারি ব্যবস্থাপনায় গ্রন্থাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে কর্মীদের আর্থিক ও অনার্থিক সুবিধা নিশ্চিত যেমন জরুরি, একই সঙ্গে বেসরকারি গ্রন্থাগারের জন্য শুধু সরকার নয়, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এমন হওয়া চাই, তারা যেন শুধু হাওয়া খেয়ে সেবা দেবে এমনটা নয়, সামাজেরও কিছু রশদ ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি জ্ঞাপনের আবশ্যিকতা রয়েছে। সমাজের ভেতর থেকে যখন এমন বোধের জাগরণ হবে যে, গ্রন্থাগার হচ্ছে সামাজিক পুঁজি গঠনের প্লাটফর্ম এবং গ্রন্থাগারে সময় ও অর্থ বিনিয়োগে দীর্ঘমেয়াদি ফল নিশ্চিত, তখনই গ্রন্থাগারের মৌল উদ্দেশ্য অর্থাৎ শিক্ষা, তথ্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, তথ্যের অবাধ প্রবাহ, সংস্কৃতি ও বিনোদনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে আমাদের গ্রন্থাগারগুলো। ঠিক তখনই কেবল স্লোগানের যে ভাষা ‘গ্রন্থাগার হচ্ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়’- এ বাস্তবতা পাবে। জাতীয় গ্রন্থাগার দিবসকে উপজীব্য করে অন্তত গ্রন্থাগার-সহায়ক একটা বোধের মিছিল প্রয়োজন। আমরা কি পারি না সবাই সে মিছিলে শামিল হতে?
লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক


.jpg)