২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং একটি টেকসই ও কাঠামোগত পরিবর্তনের। দীর্ঘ ১৭ বছর পর একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে ভোট দিতে পেরে সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন এক উদ্দীপনা ও একই সঙ্গে একগুচ্ছ দাবি তৈরি হয়েছে।
চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস বন্ধ করতে হবে: মো. শাহ আলম, কারওয়ান বাজারের মায়ের দোয়া জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট শহিদ জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের মানুষের আস্থার প্রতীক ছিলেন। তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। সবার কাছে তিনি বিশ্বাস ও ভালোবাসার জায়গায় ছিলেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায় মৃত্যুর পর তার জানাজায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি। তারই সুযোগ্য পুত্র এবার সরকার গঠন করছেন। তাই তার কাছে আমাদের প্রত্যাশা হচ্ছে–সব জায়গায় চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। চাঁদাবাজমুক্ত সমাজ গঠন করতে হবে। সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গড়তে হবে। যাতে সবাই সুন্দরভাবে জীবনযাপন করতে পারেন। এই কাজ করতে পারলে তিনি বাংলাদেশের সব পরিবারের কাছে প্রিয় মানুষ হয়ে থাকবেন। বাংলাদেশ এই পরিবারের কাছেই থাকবে। অন্য কেউ ক্ষমতা নিতে পারবে না। কেউ শত্রু হিসেবে আসবে না। আগের সরকার কী কাজ করেছে, বিশ্ববাসীর তা জানা। দেখার কিছু্ বাকি নেই। সবাই স্পষ্টভাবে তাদের কার্যক্রম দেখেছে। জোর করে কেউ কোনো ভালোবাসা আদায় করতে পারে না। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও আমরা ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজের অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিলাম। সন্ত্রাসীদের কারণে আতঙ্কে ছিলাম। তাই নতুন সরকারপ্রধান তারেক রহমানের কাছে বারবার একটাই অনুরোধ থাকবে–চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গড়ুন।
মায়ের মতো দেশ চালাতে হবে: হারুনুর রশিদ, রিকশাচালক
ধানের শীষে ভোট দিয়েছি। ধানের শীষই জিতেছে। এখন তারেক রহমানের মা যেভাবে দেশ চালিয়েছেন, সেভাবে চালালেই হবে। খালেদা জিয়ার সময়ে আমরা সবচেয়ে কম দামে ভাত খেয়েছি। কিন্তু এখন তো জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি। খালেদা জিয়ার মতো জিনিসপত্রের দাম কমাতে হবে। চালের দাম কমিয়ে কেজি ২৫ টাকা করলে, আমরা গরিব মানুষ পেটভরে খেয়ে বাঁচতে পারব। আগে যেমন মারামারি, খুনোখুনি হয়েছে, সেটা যেন এখন আর না হয়। দেশে সন্ত্রাস, ক্যাডারবাজি, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি যেন না হয়, মানুষ যেন শান্তিতে থাকতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। যদি সেটা করতে না পারে তাহলে আর কখনো ধানের শীষে মানুষ ভোট দিবে না। জিনিসপত্রের দাম না কমালে আমরাও পরে আর ভোট ধানের শীষে দিব না। শুনেছি অনেকেই ভোট দেওয়ার জন্য টাকা দিয়েছে। আমি টাকা পাইনি। তবে যদি কেউ টাকা দিত, তাহলে তাকে আর ভোট দিতাম না। কারণ যে টাকা দিত, সেই দুর্নীতিবাজ, তারা সরকারে আসবেই দুর্নীতি করার জন্য। দুর্নীতিবাজ সরকার আমি চাই না। হাসিনা যে কারণে পালাইছে সে রকম সরকার চাই না। ভালো সরকার চাই। সরকার যদি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধ করে দেয়, তাহলে আমাদের নতুন কাজের ব্যবস্থা করে দিতে হবে।
নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে: সোহানুর রহমান শুভ, শিক্ষার্থী, স্নাতকোত্তর (প্রথম বর্ষ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দায়িত্ব পায় অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকারের গুরুদায়িত্ব ছিল একটি সুষ্ঠু-সুন্দর নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি সেই কাঙ্ক্ষিত সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। একটি নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার নতুন অধ্যায়ের সূচনা। নবনির্বাচিত সরকারের কাছে আমাদের মতো তরুণ প্রজন্মের প্রধান প্রত্যাশাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং চাকরিতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা। কেননা, একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি বেকারত্ব, অনিশ্চয়তা ও বৈষম্যের শিকার হয়, তবে সেই দেশের উন্নয়ন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে।
বিশেষত নিয়োগে কোনো ধরনের দলীয় প্রভাব বা সুপারিশ নয়, বরং মেধা, যোগ্যতাই যেন চাকরি পাওয়ার একমাত্র মানদণ্ড হয়। আমরা এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা চাই, যেখানে একজন তরুণ তার স্বপ্ন পূরণের পথে শুধু নিজের যোগ্যতার ওপর ভরসা করতে পারবেন। যেখানে পরীক্ষার হলে বসে জানবেন তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে তার মেধা, কোনো অদৃশ্য শক্তি নয়। একটি স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত নিয়োগব্যবস্থা গড়ে উঠলে শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো রাষ্ট্র উপকৃত হবে। আস্থা ফিরবে, দক্ষ জনশক্তি তৈরি হবে, আর উন্নয়ন হবে টেকসই। নবনির্বাচিত সরকারের কাছে এটাই আমার প্রত্যাশা–নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হোক আর নিয়োগ হোক স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও দেখেছি যে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, আর্থিক লেনদেন কিংবা অস্বচ্ছ পরীক্ষা পদ্ধতির অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগ শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বিশেষ করে নিয়োগ পরীক্ষার প্রক্রিয়া আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন থেকে শুরু করে ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাই একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী কর্মকমিশন গঠন করাও এই সরকারের অন্যতম দায়িত্ব, যা অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্ত করবে।
এ ছাড়া বেসরকারি খাতেও নিয়োগে স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক প্রার্থী বাছাই নিশ্চিত করা জরুরি। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যদি দক্ষতা ও যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে প্রতিযোগিতামূলক কর্মসংস্কৃতি গড়ে উঠবে। সরকারের উচিত বেসরকারি খাতকে এমন নীতিগত প্রণোদনা দেওয়া, যাতে তারা স্বচ্ছ ও মানসম্মত নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। পাশাপাশি শিল্পায়ন, তথ্যপ্রযুক্তি খাত, কৃষিভিত্তিক শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এসব খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং বাজার-সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি উদ্যোগে কর্মমুখী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা গেলে অনেক তরুণ নিজেই কর্মসংস্থানের স্রষ্টা হতে পারেন।
মব-সন্ত্রাস দমন করতে হবে: আজাদ মিয়া, চাকরিজীবী ও রাইড শেয়ারচালক
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। আমি মোহাম্মদপুর এলাকায় থাকি। এখানকার কথা আর কী বলব, মনে হয় অন্য দেশে আছি। পরিবার নিয়ে প্রতিদিনই অনিরাপদ অনুভব করি। সকালেও (গতকাল) দেখেছি ১৫-২০ জনের গ্যাং লম্বা রামদা-চাইনিজ কুড়াল নিয়ে মহড়া দিচ্ছে। রাতে বের হতে ভয় লাগে। এলাকায় আগের মতো শান্তি নেই। মনে হয় যেন দেশটা অভিভাবকহীন। একটা পরিবারে অভিভাবক না থাকলে যা হয়, আমাদের দেশেও তাই হইছে। আমার স্ত্রী ওয়ারী এলাকায় একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। প্রতিদিন সকালে স্ত্রীকে অফিসে পৌঁছে দিয়ে অবসরে রাইড শেয়ারিং গাড়ি চালাই। কিন্তু বিভিন্ন সময় সড়ক অবরোধ ও আন্দোলনের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। তিরিশ মিনিটের পথ যেতে দুই ঘণ্টা লেগে যায়। কখনো আবার যাওয়াই যায় না। যে কেউ রাস্তা আটকে দাবি তোলে–এতে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায়। এমনিতেই জিনিসপত্রের দাম বেশি। কিছু করতে না পারলে খাব কী? দাবি-দাওয়া থাকলে তা নির্দিষ্ট ও আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় জানানো উচিত।
আগে দুইটা করে ডিম খেতাম, এখন সেই ডিমই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। মাছ-মাংস তো এখন মুখেও আনা যায় না। বাজারে গেলে ভয় লাগে। আগে বাবা ৫০০ টাকা দিয়ে দুনিয়ার বাজার করে আনতেন। এখন তা চিন্তায় আনা যায় না। মনে হয় দেশে এখন উচ্চবিত্ত আর নিম্নবিত্ত আছে, মধ্যবিত্ত বলতে কিছু নেই।
তারেক রহমান ক্ষমতায় আইছেন। আমরা রাজনীতি বুঝি না, শুধু শান্তিতে বাঁচতে চাই। কাজ করে পরিবার চালাতে চাই। জীবনের নিরাপত্তা চাই, মব-সন্ত্রাসমুক্ত দেশ চাই। ছাত্ররা যা শুরু করেছে, তা বন্ধ করা হোক। তাদের মধ্যে অন্য কেউ থাকে। হাদি হত্যার বিচার চাইতে ইনকিলাব মঞ্চ রাস্তা বন্ধ করে রাখে, আসলে ছাত্রদের আড়ালে ছিল অন্যরা।


.jpg)