আমেরিকা চায় ভারত তাদের কাছ থেকে তেল কিনুক। এ ছাড়া পশ্চিম আফ্রিকার নাইজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা থেকেও তেল আমদানি করতে পারে ভারত। লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল, কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা থেকেও তেল কেনা যাবে, তবে এ বিকল্প ব্যবস্থায় ভারতের তেল আমদানির খরচ অনেকটা বেড়ে যাবে। ফলে দেশের অভ্যন্তরে পেট্রোল-ডিজেল থেকে শুরু করে রান্নার গ্যাস- সবকিছুরই দাম বাড়বে অনেকটা।...

ভেনেজুয়েলার পর গোটা পশ্চিম এশিয়ার তেলের ভাণ্ডার দখল করতে উঠেপড়ে লেগেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকা। আর এ লক্ষ্যে তিনি যেকোনো কিছুরই পরোয়া করবেন না, তাও বারবার একাধিক আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি। এ লেখা পর্যন্ত বিশ্বের মহাশক্তিধর দেশগুলো প্রায় সবাই তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করেছে। কিন্তু তার সামান্যতম প্রভাবও পড়েনি ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর। ভারত এখনো পর্যন্ত সেভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি, তাও স্পষ্টভাবেই পরিলক্ষিত হয়েছে। তবে ভারতে বিরোধী দলগুলো কিন্তু ইরানের ওপর ইসরায়েলের হামলার প্রতিবাদ জানিয়েছে। এমনকি অতি সম্প্রতি ইসরায়েল সফর নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বক্তব্যও জানতে চেয়েছেন ভারতের বিরোধী নেতারা।
এদিকে ইরানকে লক্ষ্য করে ইসরায়েলের হামলার যেন কোনো বিরাম নেই। রবিবার ভোররাতে তেহরানের গান্ধী হাসপাতালে আক্রমণ চালিয়েছে ইসরায়েলের সেনা। হাসপাতালের একাংশ সম্পূর্ণভাবে ধসে গেছে। ফলে চিকিৎসাধীন রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত খালি করা হয়েছে বিল্ডিংটি। রোগীদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে কর্তৃপক্ষকে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, রাতের অন্ধকারে হাসপাতালের ওপর মিসাইল আছড়ে পড়ে প্রবল বিস্ফোরণ ঘটে। কালো ধোঁয়া গোটা এলাকা ঢেকে দেয়। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে বহু রোগী। ইরানের সংবাদসংস্থার প্রকাশিত ফুটেজে দেখা গেছে, হাসপাতালের মেজে রক্তে ভেসে গেছে, মৃতদেহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। ১৯৬০ সালে তেহরানে থাকা ভারতীয়দের জন্য এ হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়েছিল। মহাত্মা গান্ধীর নামে এর নামকরণ করা হয় গান্ধী হাসপাতাল। পরবর্তীতে ইরানি নাগরিকদের জন্যও চিকিৎসা পরিষেবা খুলে দেওয়া হয়। রোগীদের সরিয়ে নিয়ে যেতে উদ্ধারকাজে হাত লাগান ইরানের সেনা ও স্থানীয় কর্মকর্তারা। ইসরায়েল ও আমেরিকা যৌথভাবে হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে ইসরায়েলের তরফে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি আসেনি।
গত শনিবার দুই দেশের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি-সহ কয়েকজন শীর্ষ নেতা নিহত হন। এর প্রতিশোধে ইরান মার্কিন সেনাঘাঁটিগুলোতে মিসাইল হামলা চালানো শুরু করে। থেমে নেই ইসরায়েলও। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর স্পষ্ট হুংকার, যতদিন প্রয়োজন, ততদিন অভিযান চলবে। তবে তেহরানের এ আক্রমণ সংঘাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা করছেন, সামনের দিনগুলোতে সংঘাত আরও বিস্তৃত ও মারাত্মক আকার নিতে পারে। অন্যদিকে, খামেনির মৃত্যুর পর আরব দুনিয়ায় যে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল, তা এবার সরাসরি লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তে বড়সড় সংঘাতের রূপ নিয়েছে। তেহরান খামেনির নিহত হওয়ার খবর ঘোষণা করতেই ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লা গোষ্ঠী ইসরায়েলে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে শুরু করে। যদিও লেবানন সরকার এ পদক্ষেপকে কোনোভাবেই সমর্থন করেনি। এরপরই সোমবার ভোরে ওই দেশের রাজধানী বৈরুতসহ একাধিক জায়গায় হামলা চালায় ইসরায়েল।
মোদির ইসরায়েল সফরের সময় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ইসরায়েলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক সফরকে ‘অত্যন্ত অসময়োচিত বলেই মনে করছে আন্তর্জাতিক মহল। এবং তা প্রাথমিকভাবে ইরানের ওপর ইসরায়েলের আক্রমণকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেও মনে করছেন অনেকে। এমনই মত প্রকাশ করেছেন কেরালায় জন্মা নেওয়া এক সাবেক কৃষিবিজ্ঞানীও, যিনি প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে তেল আবিবে ভারতীয় দূতাবাসে আমন্ত্রিত ছিলেন।
৭২ বছর বয়সী মেনাহেম পাল। জন্ম কেরালার নর্থ পারাভূরে। বর্তমানে তিনি ইসরায়েলের বাসিন্দা। রবিবার ভোরে সাইরেন বেজে উঠতেই তাকে ও তার ছেলেকে দু-দুবার আশ্রয় নিতে হয় বাড়ির নিচের বাংকারে। ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের পরিস্থিতি এখন নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে উঠেছে বলেই জানিয়েছেন তিনি।
পাল জানান, মোদির সফরের সময় তাকে তেল আবিবে ভারতীয় দূতাবাসে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। জেরুসালেমে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে যৌথ বিবৃতি দেন নরেন্দ্র মোদি। সে পরিপ্রেক্ষিতেই তার সফরের সময় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
পালের কথায়, অনেক দিন ধরেই ইরানের ওপর সম্ভাব্য হামলার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল। সে আবহেই প্রধানমন্ত্রীর দুই দিনের সফর হয়। যা একেবারেই বেমানান। তার দেশে ফেরার পরই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেকোনো মুহূর্তে ইরানে আক্রমণের সবুজ সংকেত দিতে পারেন। তার মতে, এ সফর আন্তর্জাতিক মহলে এমন একটি ধারণা তৈরি করতে পারে যে, ভারত ইরানের ওপর আক্রমণের প্রতি পরোক্ষ সমর্থন জানাচ্ছে। তার মতে, এ বিষয়টি কূটনৈতিক ভারসাম্যের দিক থেকে সংবেদনশীল।
গতবার মার্কিন হামলার আগেই বাংকারে প্রবেশ করেছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি। সে ভুল আবার করা যাবে না, তাই সুযোগ বুঝেই খামেনির ওপর আকস্মিক আক্রমণ। বেছে নেওয়া হয় শনিবার সকালকেই। কয়েক মাস ধরেই ইরানকে ঘেরাওয়ের চেষ্টা চালাচ্ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। শনিবার সন্ধ্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ রুদ্ধদ্বার বৈঠক করার কথা ছিল তার। কিন্তু আচমকাই বৈঠকের সময় বদলে যায়। সন্ধ্যার পরিবর্তে সকালেই বৈঠকের ডাক। সে খবর পেয়ে যায় আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা। নিউইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিআইএ গ্রিন সিগন্যাল দিতেই ভয়াবহ হামলা চালায় ইসরায়েল।
একটা যুদ্ধ, তার জেরে থমকে যেতে পারে গোটা বিশ্ব। আশঙ্কা আগেই করা হয়েছিল। ইরান-আমেরিকার যুদ্ধ বাঁধলে বন্ধ হতে পারে হরমুজ প্রণালি। সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো। একযোগে ইরানের ওপরে হামলা করেছে ইসরায়েল-আমেরিকা। তার প্রত্যাঘাতে আমেরিকার সাতটি বন্ধু দেশ- জর্ডান, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন ঘাঁটি থেকে শুরু করে হোটেল-বহুতল ভবন লক্ষ্য করে মিসাইল ছুড়েছে ইরান। এবার আরও বড় সিদ্ধান্ত। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করল ইরান।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস জানিয়েছে, কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেতে পারবে না। এর জেরে বিশ্ববাজারে তেল লেনদেনে বড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। কারণ এ সরু খালের মতো পথ দিয়েই বিশ্বের ২০ শতাংশ তেলের আমদানি-রপ্তানি হয়। বিশ্বে প্রতি পাঁচটি ব্যারেলের মধ্যে একটি ব্যারেল হরমুজ প্রণালির মধ্যদিয়ে আসে। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ইরান- তেলের ভাণ্ডারের ওপরে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশই হরমুজ প্রণালির মাধ্যমেই তেল রপ্তানি করে। এ তেল আসে এশিয়ার বাজারে। মূলত ভারত, চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় তেল রপ্তানি করা হয়।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় চাপে পড়বে ভারতও। কারণ তাদের তেলের ভাণ্ডার প্রায় ফাঁকা। ভারতের কাছে যতটা তেলের রিজার্ভ আছে, তাতে ৭৪ দিনের জন্য অন্তর্দেশীয় চাহিদা মেটাতে পারবে। তার পর অন্য কোথাও থেকে তেল জোগাড় করতে হবে। তেলের ভাঁড়ার শেষ হয়ে গেলে খরচ বাড়বে অনেকটাই। দাম বাড়বে পেট্রোল-ডিজেল থেকে শুরু করে সব নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের।
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি দুই মাসেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসা অপরিশোধিত তেল কেনা বাড়িয়েছে ভারত। গত বছর যেখানে ২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল কিনেছিল ভারত, সেখানে ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতি দিনে ২ দশমিক ৬ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছেছে। এ রুটে নির্ভরশীলতা বেড়েছে, কারণ ভারত সম্প্রতি রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমিয়ে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল কেনা শুরু করেছিল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতের মাসিক তেল আমদানির ৫০ শতাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে এসেছে। গত বছর নভেম্বর-ডিসেম্বরে যেখানে ৪০ শতাংশ তেল আমদানি করা হয়েছিল এ পথ ধরে। এবার হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় ভারত মধ্যপ্রাচ্যেরই বিকল্প রুট বেছে নিতে পারে তেল আমদানির জন্য। সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন (লোহিত সাগরে) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত, আবুধাবি ক্রুড অয়েল পাইপলাইন হরমুজের বিকল্প হিসেবে কাজ করে, তবে এর বেশ কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। তেল আমদানির পরিমাণও সীমিত।
আমেরিকা চায় ভারত তাদের কাছ থেকে তেল কিনুক। এ ছাড়া পশ্চিম আফ্রিকার নাইজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা থেকেও তেল আমদানি করতে পারে ভারত। লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল, কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা থেকেও তেল কেনা যাবে, তবে এ বিকল্প ব্যবস্থায় ভারতের তেল আমদানির খরচ অনেকটা বেড়ে যাবে। ফলে দেশের অভ্যন্তরে পেট্রোল-ডিজেল থেকে শুরু করে রান্নার গ্যাস- সবকিছুরই দাম বাড়বে অনেকটা।
লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক


.jpg)