দেশে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায়, এখন গ্যাস সেক্টরকে আমলাদের প্রভাব থেকে মুক্ত করে সময়োপযোগী শিল্পবিনিয়োগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। সংকট গভীর, এর সমাধান সুচিন্তিত ও কার্যকর হওয়া জরুরি। তাই সঠিক পদক্ষেপ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দেশের শিল্প খাত নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। এ খাতের উন্নয়ন শুধু দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে না, বরং একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।...
ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সবখানেই রাস্তায় বেরোলে বা টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখলেই অস্বাভাবিক একটা সংকটের দৃশ্য চোখে পড়ে। ভুক্তভোগীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে পুড়ছেন। ধুলোবালিতে আক্রান্ত হচ্ছেন, অপেক্ষার যন্ত্রণায় তাদের জেরবার অবস্থা। জ্বালানি সংকটের এ হাল পানিতে ডুবন্ত বরফের চূড়া মাত্র। সংকট শুধু উপরিতলে নয়, আরও গভীরে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ইরানে অতর্কিত হামলা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তখন থেকে যতই দিন যাচ্ছে, দেশে জ্বালানি তেলের সংকট তীব্র হচ্ছে। এ সংকট দূর হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের অযোগ্যতা, অদক্ষতা সর্বোপরি তাদের একচোখা নীতিতে দেশের অর্থনীতি এবং পুরো ব্যবস্থাপনার মধ্যে সংকট তৈরি হয়। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ একে আরও জটিল করে তুলেছে। যুদ্ধের ডামাডোল আর জ্বালানি তেলের অভাবে দেশ এখন স্মরণকালের সবচেয় ভয়াবহ সংকটের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে।
দেশের অন্তত ১০টি খাতে এর প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এগুলো হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, শিল্প, কৃষি, বাণিজ্য, গৃহস্থালি, সেবা, নির্মাণশিল্প, পর্যটন ও বিনোদন, টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তি। বাংলাদেশ তার মোট জ্বালানি তেলের ৯৫ শতাংশ আমদানি করে। এর আবার ৯০ শতাংশ আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে। হরমুজ নিয়ে এখন চলছে গভীর টানাপোড়েন।
মধ্যপ্রাচ্যসংকট কতদিন স্থায়ী হবে, তা বলা কঠিন। স্বাভাবিকভাবে জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় দীর্ঘস্থায়ী প্রস্তুতি থাকা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিদ্যুৎনির্ভর ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন চালাতে পারছে না। অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ না থাকায় কলকারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে কৃষি খাতে সেচ কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায় ফসল উৎপাদন নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এ সংকট দীর্ঘমেয়াদে আরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে দেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (ক্রুড অয়েল) আমদানি কার্যত থমকে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের একমাত্র সরকারি তেল শোধনাগার চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) ওপর। কাঁচামালের অভাবে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ইউনিট ‘ক্রুড অয়েল ডিস্টিলেশন’ বন্ধ হয়ে গেছে। টানা তিন বছর মন্থর প্রবৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত বৈশ্বিক প্রতিকূলতা এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে ডিজেল, গ্যাস ও কয়লার প্রয়োজন। জ্বালানির অভাবে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিপর্যয় ঘটেছে। অন্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর অবস্থাও ভালো নেই। দেশে লোডশেডিং বেড়েছে। তেলের সংকটে পরিবহন ব্যবস্থায় নৈরাজ্য দেখা দিয়েছে। দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড কৃষি ও শিল্প খাতেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ব্যাহত হচ্ছে সেচ, ট্রাক্টর চালনা, পণ্য পরিবহন ও শিল্প উৎপাদন, বাণিজ্য, নির্মাণশিল্প, সেবা, গৃহস্থালি, পর্যটন, টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তি খাতের অবস্থাও তথৈবচ।
নিস্তরঙ্গভাবে চললেও আমাদের জীবনে যে এক ধরনের ছন্দ ছিল, তা এখন সুরলয়তালহীন এবং অনেকটাই স্থবির। অর্থনীতিবিদদের মতে, কয়েক বছর ধরে একটা ধারাবাহিক সংকটজনক বাস্তবতার মধ্যদিয়ে যাচ্ছে দেশ। এর প্রভাব পড়েছে মানুষের আয়-ব্যয় এবং দারিদ্র্য পরিস্থিতি ও অন্যান্য খাতে। পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তারা বলেন, সম্প্রতি মানুষের জীবনযাত্রার খরচ অনেক বেড়েছে। খাবার, চিকিৎসা, বাসাভাড়া ও শিক্ষা প্রতিটি খাতেই ব্যয় বেড়েছে। ফলে দরিদ্র থেকে মধ্যবিত্ত পর্যন্ত সবাই আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য রাখতে পারছে না। বর্তমান বাস্তবতায় নতুন ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে বলে তারা মনে করছেন। তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য একটি বহিরাগত সংকট হলেও এর প্রভাব মোকাবিলার সক্ষমতা নির্ভর করছে অভ্যন্তরীণ নীতির ওপর। তাই এখনই সময় দ্রুত ও কার্যকর সংস্কারে মনোযোগী হওয়া। দারিদ্র্যের অন্ধকার ছায়া আবার ঘনিয়ে আসছে, তা আরও দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনীতির ভিত্তি যতই শক্তিশালী মনে হোক, যদি তা একমুখী ও সীমিত বৈচিত্র্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে সামান্য ধাক্কাতেই নরবড়ে হয়ে পড়তে পারে। ব্যবসা ও রপ্তানিপণ্য- এ দুই ক্ষেত্রেই বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমে ঝুঁকি কমাতে না পারলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের সংকট ফিরে আসবে।
বর্তমান বিশ্বে জ্বালানি শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের প্রশ্ন। আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন সামান্য আন্তর্জাতিক সংঘাতে তেল-গ্যাসের বাজারকে অস্থিতিশীল করে দিতে পারে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত বিশ্বকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে, জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা ভঙ্গুর। এ বাস্তবতার প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন নয় বাংলাদেশ। আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে আমদানি-নির্ভর জ্বালানি তেল, গ্যাস ও কয়লার ওপর। জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা অর্জন করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ে গোটা বিশ্বই আজ বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে। দেশে দেশে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নবায়ণযোগ্য জ্বালানি অনেকটা অনিবার্য হয়ে উঠেছে বলে মনে করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তেল-গ্যাসের ওপর নির্ভরতা, মোটা অঙ্কের বাণিজ্য: বিশ্বরাজনীতিসহ নানা বিষয়ে নবায়ণযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি ক্ষেত্রে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ, সমুদ্রশক্তি এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ- সব উৎসকে একত্রে ব্যবহার করার একটি সমন্বিত নীতি গ্রহণ করা জরুরি, কোনো একক উৎস নয়। বরং একটি বহুমুখী জ্বালানি কাঠামো গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।
দেশে শিল্প উৎপাদন ক্রমাগত বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। শিল্পে গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় এবং বর্তমানে তেল সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পথে। এ অবস্থা চলতে থাকলে শিল্প উৎপাদন হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে। দেশে বেকারত্বের হার বেড়ে যাবে। এর ফলে সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সমাজবিজ্ঞানিরা।
গ্যাস সেক্টরে শৃঙ্খলা আনা জরুরি। আমলাদের খপ্পর থেকে এ সেক্টরকে মুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় দেশের চলমান জ্বালানিসংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
মাত্র দেড় মাসে নতুন রাজনৈতিক সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৭৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অন্যদিকে, ঋণের অভাবে হাহাকার চলছে বেসরকারি খাতে। বিগত আওয়ামী সরকারের সময় থেকেই বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কের ঘরে। দীর্ঘ সময় বেসরকারি ঋণ এবং বিনিয়োগ খরার ফলে জাতীয় সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর সে আশঙ্কাই হলো বেকারত্ব বৃদ্ধি। বর্তমান সরকারের শুরু থেকেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের আর্থিক সংকটে রয়েছে।
এলএনজি আমদানিতে অতিরিক্ত প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে সরকার। চলমান এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে পরিকল্পনানুযায়ী কাজ করতে হবে। বেসরকারি হাতকে শক্তিশালী করে বন্ধ কারখানা চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করে অর্থনীতিকে গতিশীল করা প্রয়োজন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বন্ধ হওয়া দেশের সব শিল্পকারখানা চালুর কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। যা একটি বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হিসেবে মনে করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দৃশ্যপটে শিল্প খাতের অবদান অপরিসীম। দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এবং শিল্প খাতের বিকাশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। সরকার বিভিন্ন ধরনের শিল্পনীতি প্রণয়ন করছে, যা উদ্যোক্তাদের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করছে। এসব নীতির লক্ষ্য শিল্প খাতের প্রসার ঘটানো এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। দেশের আর্থিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে শিল্প খাতের বিকাশে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে দেশে সামগ্রিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি শিল্প খাতের আরেকটি বড় সংকট। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অভাবে অনেক কারখানার উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল এবং ওষুধশিল্পে এর প্রভাব গভীর।
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি শুধু উৎপাদন ব্যাহত করছে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে সময়মতো পণ্য সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। ডলারসংকটও শিল্প খাতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে কাঁচামাল আমদানিতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। শিল্পোদ্যোক্তরা তাদের প্রয়োজনীয় উপকরণ আনতে না পেরে উৎপাদন প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চালাচ্ছেন। ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থা ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। গ্যাস সেক্টরে আমলাদের প্রভাব খুবই বেশি। ফলে অনভিজ্ঞ, অদক্ষ আমলাদের প্রতিবন্ধকতায় শিল্প উৎপাদন এবং শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেশে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায়, এখন গ্যাস সেক্টরকে আমলাদের প্রভাব থেকে মুক্ত করে সময়োপযোগী শিল্পবিনিয়োগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। সংকট গভীর, এর সমাধান সুচিন্তিত ও কার্যকর হওয়া জরুরি। তাই সঠিক পদক্ষেপ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দেশের শিল্প খাত নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। এ খাতের উন্নয়ন শুধু দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে না, বরং একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক
[email protected]



