অর্থনীতির একচেটিয়াকরণ ও বৈষম্য ঠেকাতে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা থাকবে। এ ব্যবস্থা পরিচালিত হবে ‘ঐশী নির্দেশ’ বা ‘আল্লাহর আইন’ অনুযায়ী। কোনটা ঠিক কোনটা বেঠিক ঈশ্বরের পক্ষে তা কে নির্ধারণ করবেন? করবেন ক্ষমতাবানরা, এর বিরুদ্ধে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ খুবই সীমিত। একদিকে শোষণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আর অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা- এ দুটোর সমন্বয় প্রকৃতপক্ষে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থাই নির্দেশ করে।...

মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ বা ইহুদি যে ধর্মেরই হোক, এর অনুসারী রাজনৈতিক শক্তি স্ব স্ব ধর্মগ্রন্থ বা ঐশী বিধান নিয়ে নিজ নিজ ব্যাখ্যার ওপর ভর করেই তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে। বৌদ্ধ ধর্ম নিরীশ্বর হলেও তার মধ্যেও বিধিবিধান নিয়ে ব্যাখ্যা ও ভূমিকার তারতম্য হয়। বিভিন্ন ধর্মের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তি ইহজগতের রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধ, আইনকানুন, প্রতিষ্ঠানকে দাঁড় করানোর ক্ষেত্রেও ধর্মগ্রন্থের নিজ নিজ ব্যাখ্যাকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে রায় দেয়। এগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলাও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। হিন্দুধর্মের ক্ষেত্রে একটি বাড়তি বিষয় হলো বর্ণপ্রথা, যা এর মৌলভিত্তি। মৌলবাদী বা ফান্ডামেন্টালিস্ট শব্দটি এসেছে মার্কিন প্রটেস্টান্ট খ্রিষ্টানদের মধ্য থেকে। তারা তুলনামূলকভাবে উদারনৈতিক খ্রিষ্টানদের থেকে নিজেদের পার্থক্য বোঝাতে এ শব্দটি ব্যবহার করতেন।
এখন এ শব্দটি ইসলামপন্থি রাজনীতি প্রসঙ্গেও ব্যবহৃত হয়। মৌলবাদী বলতে সাধারণভাবে বোঝানো হয়, ধর্মগ্রন্থ যে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন বিধিবিধান জারি করেছে তার মধ্যে সব সমস্যার সমাধান খোঁজা এবং এর বাইরে কোনো কিছু গ্রহণ করতে অসম্মতি। এর অর্থ হলো সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পরিবর্তন তাদের বিবেচনাযোগ্য নয়। সে হিসেবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সঙ্গেও তাদের মিলবার কথা নয়। এজন্য এদের অনেক সময় ‘প্রাক-পুঁজিবাদী’ শক্তিও বলা হয়।
বিশ্বজুড়ে বহু ধর্মপন্থি দলের কার্যক্রম থেকে তার প্রমাণ মেলে না। ধর্মের বাণিজ্যিকীকরণ, নেতাদের জীবনযাপন, ব্যাংক-বিমাসহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে দক্ষ বিনিয়োগসহ অর্থনৈতিক নীতি- তৎপরতা ইত্যাদি বহু কিছুই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মান্য করেই কাজ করে। নেতাদের অনেকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সুফলভোগীও বটে। তাছাড়া বর্তমান সব ধর্মপন্থি রাজনীতির বড় অংশই আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর। তাদের অধিকাংশ পুঁজিবাদী ব্যবস্থারই একটি নির্ধারিত সংস্করণ তৈরির জন্য চেষ্টারত, তা বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্বায়নেরও সুফলভোগী। যোগাযোগ-প্রযুক্তির অভূতপূর্ব বিকাশ পুঁজির আন্তর্জাতিকীকরণের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মপন্থি রাজনীতির বিস্তার ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক তৈরিতেও সহযোগী হয়েছে।
পার্থক্য এখানেই যে, তাদের অনেকে এ ব্যবস্থার ওপর ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে সচেষ্ট। যেমন- বিজেপি, আরএসএস পুঁজিবাদের কট্টর বা নয়া উদারনৈতিক ধারা অনুসরণ করছে হিন্দুত্ববাদের আবরণ দিয়ে। জামায়াতে ইসলামীর অর্থনৈতিক নীতি ও কর্মসূচি অনুযায়ী ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও মুনাফাকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক তৎপরতা তাদের সমাজ-অর্থনীতি মডেলের দুটো গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। বলা হয়, অর্থনীতির একচেটিয়াকরণ ও বৈষম্য ঠেকাতে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা থাকবে। এ ব্যবস্থা পরিচালিত হবে ‘ঐশী নির্দেশ’ বা ‘আল্লাহর আইন’ অনুযায়ী। কোনটা ঠিক কোনটা বেঠিক ঈশ্বরের পক্ষে তা কে নির্ধারণ করবেন? করবেন ক্ষমতাবানরা, এর বিরুদ্ধে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ খুবই সীমিত। একদিকে শোষণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আর অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা- এ দুটোর সমন্বয় প্রকৃতপক্ষে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থাই নির্দেশ করে।
কোনো ধর্মই ইতিহাসের বাইরে নয়, স্থান-কাল নিরপেক্ষ নয়। সেজন্য সব ধর্মের মধ্যেই স্থান ও কালের ছায়া আছে। সব ধর্মের মধ্যেই ভিন্ন ভিন্ন কাল ও স্থানভেদে নানা মত ও পথের সন্ধান পাওয়া যায়। অভিন্ন গ্রন্থ বা ধর্মীয় কাঠামো থেকে এ ভিন্ন ভিন্ন মত ও তরিকা তৈরি হয় স্থান, কাল ছাড়াও সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মতাদর্শিক অবস্থানগত ভেদের কারণে। অর্থাৎ ধর্মের ব্যাখ্যা ব্যক্তি/ গোষ্ঠী/ মতাদর্শিক অবস্থান ভেদে ভিন্ন হতে পারে।
প্রধান প্রধান ধর্মগুলোর মধ্যে তো বটেই, একই ধর্মের বিভিন্ন ধারা ও উপধারার মধ্যেও সংঘাত, বিদ্বেষ তাই অনেক পুরোনো। ইসলাম ধর্মের মধ্যেও এর কমতি নেই। ষষ্ঠ শতকে আরববিশ্বে তৎকালীন বিদ্যমান ব্যবস্থার নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মধ্যদিয়ে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তন হয়। পরবর্তীকালে এ ধর্ম ব্যাখ্যা অনুসরণে এমনকি কোরআনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, হাদিসের বিভিন্ন ভাষ্য ব্যাখ্যায় বহু মত ও পথ তৈরি হয়। এর মধ্যে বৈষম্যবাদী, নিপীড়নমূলক বহু মত পরীক্ষা করলে তার সঙ্গে সেই সময়ের ক্ষমতাবানদের যোগ পাওয়া যায়। আবার সাম্য ও সংবেদনশীল মতও পাওয়া যায়, যার সঙ্গে মানুষের লড়াইয়ের যোগ আছে।
স্পষ্টতই বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্রের অনুসারী উগ্রপন্থি রাজনীতির প্রধান ধারাগুলোর মধ্যে কিছু অভিন্ন উপাদান পাওয়া যায়, যা আবার অনেক ক্ষেত্রে ধর্মবহির্ভূত কিছু রাজনীতির ধারা, যেমন- শ্বেতাঙ্গ উগ্রপন্থি, উগ্র জাত্যাভিমানী, যৌনবাদী ইত্যাদি ধারার সঙ্গেও মেলে। ভারতে বিজেপি-শিবসেনা-আরএসএস, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপে খ্রিষ্টান মৌলবাদী উগ্রপন্থি শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী জাতি ও ধর্মবিদ্বেষী থেকে শুরু করে জামায়াত, আলকায়েদা, তালেবান, আইসিস- এদের সবার মধ্যেই কিছু অভিন্ন প্রবণতা কমবেশি পাওয়া যায়। এগুলোর মধ্যে উচ্চকিত বা প্রচ্ছন্ন বক্তব্যের সাধারণ দিকগুলো নিম্নরূপ:
১. মানুষ ঐশী ক্ষমতার সৃষ্টি। ঈশ্বর একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে তাদের সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু এই ঐশী গ্রন্থ এবং ঈশ্বরের ইচ্ছা বিশ্লেষণ ক্ষমতা বা অধিকার সব মানুষের নেই। এ দায়িত্ব নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ধারণ করেন। এরা পূর্বনির্ধারিত ধর্মীয় নেতা।
২. এ বিশ্বাস কাঠামো এবং তাদের ইহজাগতিক জীবন অবশ্যই একটি সুনির্দিষ্ট উচ্চক্রম অনুযায়ী কঠোর আইন দ্বারা সংগঠিত ব্যবস্থায় পরিচালিত হতে হবে।
৩. ‘ঈশ্বরের বিধান’ হিসেবে ধর্মীয় নেতাদের স্বীকৃত বিষয়গুলো নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না। ‘মানুষ তৈরি’ কোনো বিধান দিয়ে তাকে প্রতিস্থাপন করা যাবে না।
৪. একই ধর্মের মধ্যে বিভিন্ন ধারা-উপধারা গ্রহণযোগ্য নয়। অন্য ধর্ম বা বিশ্বাসের মানুষ বিশেষ বিবেচনায় থাকবেন, সমান মর্যাদা নিয়ে নয়।
৫. নারীকে পূর্ণ মানুষ হিসেবে স্বীকারে অনীহা, ভূমিকা নির্দিষ্ট পরিসরে সীমিতকরণ। ঘরে ও বাইরে নারীর প্রতি বৈষম্য ও নিপীড়নকে বৈধতা দানের যুক্তি; বয়ানে নারীকেই সব ঝামেলার কারণ, পাপের আঁধার, বিপজ্জনক, অনিয়ন্ত্রিত হিসেবে উপস্থিত করা। লিঙ্গীয় বৈচিত্র্য অস্বীকারের প্রবণতা।
৬. গর্ভপাত, নির্ধারিত বিধিবিধানের বাইরে নারী-পুরুষ সম্পর্ক পাপ হিসেবে বিবেচিত।
৭. নির্দিষ্ট কাঠামোর বাইরে স্বাধীন চিন্তা, সৃজনশীলতা গ্রহণযোগ্য নয়। ধর্মের কাঠামোর মধ্যে থেকেও স্বাধীন চিন্তা বা (কর্তৃত্বের সঙ্গে) ভিন্নমত হুমকির সম্মুখীন। লেখক, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, ধর্মতাত্ত্বিক অনেকেই বিভিন্ন সময়ে নির্যাতিত।
বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক আন্দোলন, সশস্ত্র সংগ্রাম কিংবা সন্ত্রাসী তৎপরতার মাধ্যমে ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার তৎপরতা আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে ইসলামপন্থি রাজনীতির কোনো একক বা সমরূপ চেহারা নেই। কারও কাছে এর লক্ষ্য- ওপর থেকে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে সমাজকে পরিবর্তিত করা, কারও কাছে সমাজে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করে রাজনীতিকে প্রভাবিত করা। আবার ইসলামের ভিত্তি যে কোরআন তার ব্যাখ্যায় হাজারো মত। ইসলামের মুক্তিকামী ব্যাখ্যার পাশাপাশি নারীবাদী ব্যাখ্যা ইসলাম সম্পর্কে অনেক নতুন চিন্তাও যোগ করেছে।
সমাজে ইসলাম কায়েম করা সবার কাছে রাজনীতিও নয়। উল্লেখযোগ্য কিছু ধারা আছে যারা ব্যক্তিকে ইসলামের পথে আনার মাধ্যমে সমাজে ইসলাম প্রতিষ্ঠার নীতি অনুসরণ করেন। সুফিবাদী ধারা ধর্ম-মতনির্বিশেষে মানুষকে গুরুত্ব দিয়ে ঈশ্বরের সঙ্গে প্রেম এবং সবার মধ্যে ঐক্যের আহ্বান নিয়ে হাজির হয়।
ইসলামি রাষ্ট্র অতীতে আমরা অনেক দেখেছি, বর্তমান বিশ্বেও তা দুর্লভ নয়। অতীতে বিভিন্ন স্থানে ও কালে ইসলামি রাষ্ট্রের রূপ ভিন্ন ভিন্ন দেখা গেছে। ইসলামের শুরুতে খেলাফত স্বল্পস্থায়ী ছিল, সেখানে রাজতন্ত্র অনুমোদিত ছিল না। হজরত ইমাম হোসেনের ঘাতক ইয়াজিদকে দিয়েই রাজতন্ত্র শুরু, যা এখন পর্যন্ত অব্যাহত আছে। মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, জর্দান, সংযুক্ত আরব আমিরাত কথিত ইসলামি শাসনব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে রাজতন্ত্র অনুমোদিত আইন, বিধান ও প্রতিষ্ঠান সেখানে সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর। ইসলাম ধর্মে অনুমোদিত না হলেও এদের রাজতন্ত্রী ব্যবস্থাই মুসলিম বিশ্বে সবচেয়ে প্রভাবশালী। পাকিস্তান ও আফগানিস্তান ইসলামি প্রজাতন্ত্র হলেও দুয়ের মধ্যে পার্থক্য অনেক। বিশেষত নারী শিক্ষায় বিশাল তফাৎ। ইরান ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালিত। এখানে ধর্মীয় নেতা ও নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট এবং পার্লামেন্টের একটি সমন্বয় তৈরি করা হয়েছে।
লেখক: শিক্ষক, লেখক এবং ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক


.jpg)