কিশোরগঞ্জ ও সৈয়দপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের ১৫ নম্বর আসন নীলফামারী-৪। এর মধ্যে সৈয়দপুরকে বাঙালি-অবাঙালি (বিহারি) জনগোষ্ঠীর সহাবস্থানের শহর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানকার মোট ভোটারের একটি বড় অংশ অবাঙালি। কোনো নির্বাচন এলেই তাদের গুরুত্ব অন্য সময়ের তুলনায় অনেকাংশে বেড়ে যায়। ভোটের মাঠে তাদের ‘গেমচেঞ্জার’ হিসেবে ভূমিকা রাখার সক্ষমতা রয়েছে। এমন বাস্তবতায় প্রার্থীরা ভোট পাওয়ার আশায় তাদের কাছে যান। দীর্ঘ বছর ধরে পিছিয়ে থাকা এই জনগোষ্ঠীর জীবন-মান উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দেন। এমনকি ভোটের প্রচারে বাংলার পাশাপাশি উর্দু ভাষার ব্যবহার করেন। বিষয়টি বহু বছর ধরে চলে আসছে। তবে এখানকার অবাঙালিদের প্রতিনিধিত্বকারীরা বলছেন, ভোট এলে প্রার্থীরা শুধু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু নির্বাচনের পর কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না।
সৈয়দপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে পুরো উপজেলায় উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। লিফলেট বিতরণ, মাইকিং ও পথসভার মতো কর্মসূচির মধ্য দিয়ে প্রার্থীরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। প্রচার-প্রচারণায় বাংলার পাশাপাশি উর্দু ভাষাও ব্যবহার করা হচ্ছে। সৈয়দপুর শহরের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি, আবাসিক এলাকায় প্রতিদিন দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত মাইকিংয়ে দুই ভাষায় ভোট প্রার্থনা করতে শোনা যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিটি নির্বাচনে প্রার্থীরা অবাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় উর্দুতে মাইকিং করেন। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মাইকিংয়ে শোনা যাচ্ছে, ‘মেরি মা-ব্যাহেনো, আপকা পিয়ারা, আপকা দুলারাকো ১২ ফেব্রুয়ারি আপকা কিমতি ভোট দেকার কামিয়াব কিজিয়ে’। বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায়, ‘প্রিয় মা-বোন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি আপনার পছন্দের প্রার্থীকে মূল্যবান ভোট দিয়ে জয়ী করুন।’
হাতিখানা ক্যাম্পের বাসিন্দা প্রবীণ ভোটার এজাজ খান বলেন, ‘উর্দুতে প্রচার করলে আমাদের বুঝতে সুবিধা হয়। কারণ আমাদের মধ্যে অনেকেই বাংলা খুব একটা বোঝেন না।’ বাবুপাড়া এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান মহসিন বলেন, ‘সৈয়দপুর শহরে অনেক ভাষার মানুষ বসবাস করেন। এটি আমাদের শহরের একটি ঐতিহ্য। উর্দুতে মাইকিং নতুন কিছু না। আমরা এগুলোতে অভ্যস্ত।’
প্রার্থীদের ভাষ্য, নতুন প্রজন্মের অনেক অবাঙালি বাংলা বুঝলেও প্রবীণ ভোটারদের একটি বড় অংশ এখনো উর্দুতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ফলে প্রতীক ও প্রার্থী পরিচিত করাতে বাংলার পাশাপাশি উর্দু ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে।
এই আসনের জাতীয় পার্টির প্রার্থী সিদ্দিকুল আলম বলেন, ‘৭৫ হাজার অবাঙালিকে আকৃষ্ট করার পাশাপাশি তাদের বোঝার সুবিধার্থে উর্দুতে নির্বাচনি প্রচার চালানো হচ্ছে।’ বিএনপির প্রার্থী আব্দুল গফুর সরকার বলেন, ‘অনেক অবাঙালি প্রবীণ ভোটার আছেন যারা বাংলা ভালো বোঝেন না, বলতেও পারেন না। তাদের কথা চিন্তা করে উর্দুতে মাইকিং করা হচ্ছে।’
নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, নীলফামারী-৪ আসনের মোট ভোটার ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৬৪৯ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ২৪ হাজার ৪২৭ জন, পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২৪ হাজার ২১৭ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের পাঁচজন। শুধু সৈয়দপুরেই ভোটার ২ লাখ ২৬ হাজার ৯৪ জন। এর মধ্যে অবাঙালি ভোটার ৭৫ হাজার ৬৭ জন। নারী অবাঙালি ভোটার ৩৯ হাজার ৯৩৪ জন এবং পুরুষ ৩৮ হাজার ১৩৩ জন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এবার অবাঙালি ভোটার বেড়েছে ২ হাজার ৮৪৬ জন।
উর্দুভাষী ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটির সভাপতি মাজেদ ইকবাল আক্ষেপ করে বলেন, ‘নির্বাচন এলে প্রার্থীরা আমাদের জীবন-মান উন্নয়নে শুধু আশ্বাস দেন। বাস্তবে উন্নয়ন খুব একটা দেখি না। পানি, ড্রেনেজ, বাসস্থান সবখানেই সংকট। রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের সময় ক্যাম্পে আসে, কিন্তু নির্বাচনের পর আর তেমন খোঁজ রাখে না।’
এই আসনে ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় পার্টির সিদ্দিকুল আলম (লাঙ্গল), বিএনপির আব্দুল গফুর সরকার (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী আব্দুল মুনতাকিম (দাঁড়িপাল্লা) এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শহিদুল ইসলাম (হাতপাখা)। পাশাপাশি রয়েছেন একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী।
জানা গেছে, ১৯৮৪ সালে আসনটি গঠনের পর থেকে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও ন্যাপ (মোজাফফর) সব দলই এখানে জয় পেয়েছে। ফলে এটি হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আসন। সব দিক বিবেচনায়, অবাঙালি ভোটারদের সমর্থন ছাড়া এখানে জয় পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই বাংলার পাশাপাশি উর্দু ভাষায় প্রচার বাড়তি কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।