টানা বৃষ্টি ও ভারতীয় পাহাড় থেকে নেমে আসা আকস্মিক ঢলে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া উপজেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে তলিয়ে গেছে শত শত হেক্টর জমির পাকা ধানসহ বিভিন্ন ফসল। বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ায় ফসলের পাশাপাশি ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। বর্তমানে ধান কাটার শ্রমিক ও যন্ত্রের সংকটে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলের কৃষকরা।
গতকাল বৃহস্পতিবার হালুয়াঘাট উপজেলার মাজরাকুড়া, কুমারগাতী, আচকীপাড়া, তেলীখালী, কড়ইতলী, মহিষলেটি, গোবরাকুড়া, কালিয়ানিকান্দা, মনিকুড়া, রাংরাপাড়া, বুড়াঘাট, বোয়ালমারা, ডুমনীকুড়া, কাতলমারী, সূর্যপুর, সুমনিয়াপাড়া ও মহাজনীকান্দা গ্রাম প্লাবিত অবস্থায় দেখা গেছে।
নিচু এলাকার শতাধিক হেক্টর ফসলের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। মাজরাকুড়া স্কুলের পেছন দিয়ে কুমারগাতি যাওয়ার সড়কের প্রায় ২০ থেকে ৩০ ফুট অংশ নদীতে বিলীন হয়ে যোগাযোগব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী ধোবাউড়া উপজেলার দক্ষিণ মাইজপাড়া ও গামারীতলা ইউনিয়নের কামালপুর, রায়পুর ও বাঘবেড় ইউনিয়নের মেকিয়ারকান্দা, দক্ষিণ ডোমঘাটাসহ বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা এই অঞ্চলে গত মঙ্গলবার রাত থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। পানির চাপে বুধবার সকালে হালুয়াঘাটের মাজরাকুড়া এলাকায় মেনংছড়া নদী এবং গাজীরভিটা ইউনিয়নের মধ্য বোয়ালমারা এলাকায় বুড়াঘাট নদীর বাঁধ ভেঙে যায়। এর ফলে আশপাশের এলাকায় দ্রুত পানি ঢুকে পড়ে। এতে মাজরাকুড়া, কুমারগাতী, তেলীখালী, কড়ইতলীসহ অন্তত ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়।
একই দিন বুধবার বিকেলে ধোবাউড়া উপজেলার গামারীতলা ইউনিয়নের দক্ষিণ গৌরিপুর এলাকায় নেতাই নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। এরপর থেকেই পানি নিম্নাঞ্চলে দ্রুত গতিতে প্রবেশ করতে থাকে। স্থানীয়রা বলছেন, দ্রুত হারভেস্টার সরবরাহ, ভাড়া নিয়ন্ত্রণ ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না নিলে ক্ষতির পরিমাণ আরও ভয়াবহ হবে।
দুই উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে হালুয়াঘাট উপজেলায় ২২ হাজার ৮৪০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৭০ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া ধোবাউড়ায় উপজেলারও কয়েক গ্রামের জমির ফসল তলিয়ে গেছে। ঢলে ফসলের পাশাপাশি রাস্তাঘাটও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
একদিকে প্রকৃতির তাণ্ডব, অন্যদিকে ধান কাটার মেশিনের (হারভেস্টার) সংকটে কৃষকরা দিশেহারা। হালুয়াঘাট উপজেলার জুগলী ইউনিয়নের সংড়া গ্রামের কৃষক সিদ্দিক মিয়া বলেন, ‘এলাকায় ধান কাটার মেশিনের সংকট দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে যে কয়েকটি হারভেস্টার রয়েছে, সেগুলো মালিক সুযোগ বুঝে একরপ্রতি ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা ভাড়া দাবি করছেন। চড়া দাম দিয়েও সময়মতো মেশিন পাওয়া যাচ্ছে না।’
একই উপজেলার বোয়ালমারা গ্রামের কৃষক মনির মিয়া বলেন, ‘জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কয়েক দিনের মধ্যে পানি না কমলে সব ধান পচে নষ্ট হয়ে যাবে। ফসল রক্ষা না হলে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে।’
ধোবাউড়া উপজেলার গামারীতলা ইউনিয়নের কামালপুর গ্রামের কৃষক আব্দুই হাই বলেন, ‘বৃষ্টি ও ভারতীয় পাহাড়ি ঢলে নেতাই নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে জমির ধান তলিয়ে গেছে। আশপাশের বিভিন্ন এলাকাও প্লাবিত হয়েছে। দ্রুত সম্পূর্ণ পানি না কমলে আমার মতো অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি স্বীকার করে হালুয়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফয়সাল আহমেদ বলেন, এই উপজেলার দুটি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। দুটি কাঁচা রাস্তা ভেঙে গেছে। বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকলে পানি আরও বাড়তে থাকবে।
ধোবাউড়া উপজেলার ইউএনও মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, গামারিতলা, ঘোষগাঁও ও দক্ষিণ মাইজপাড়া ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বোরো ধানসহ অন্যান্য কৃষিপণ্যের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কৃষি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ময়মনসিংহের উপ-পরিচালক মো. এনামুল হক বলেন, বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকলে কৃষকদের বড় ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির তালিকা করার কাজ শুরু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা সম্পন্ন হলে তাদের সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে।