জনগণের দেওয়া গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলন সংসদ থেকে রাজপথে ছড়িয়ে পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
শনিবার (১৬ মে) বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠে (হাজী মুহম্মদ মহসীন সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠ) জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ লাঘব এবং পদ্মার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে আয়োজিত রাজশাহী বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ হুঁশিয়ারি দেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন আকস্মিকভাবে আসেনি; এর পেছনে রয়েছে বহু মানুষের ত্যাগ ও রক্ত। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ভয়কে জয় করে রাজপথে নেমেছিল বলেই ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন সম্ভব হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘যে তরুণ-তরুণীরা বুক চিতিয়ে গুলির মুখে আন্দোলন করেছে, জনগণ তাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিল। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, যুবক-বৃদ্ধ সবাই রাস্তায় নেমে এসেছিল বলেই আন্দোলন সফল হয়েছে।’
বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, ‘যারা আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, তারাই এখন সেই শক্তিকে অবমূল্যায়ন করছে। জনগণের রায় অগ্রাহ্য করা হলে অতীতের স্বৈরশাসকদের মতো বর্তমান সরকারেরও একই পরিণতি হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।’
সংস্কার কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আগে সংবিধান সংস্কার ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এখন সরকার সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে।’
তিনি বলেন, ‘আপনারাই বলেছিলেন দেশকে মেরামত করতে হবে, সংবিধানের সংস্কার করতে হবে। এখন বলছেন সংস্কার কী জিনিস তা বুঝেন না। তাহলে কি না বুঝেই এসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন?’
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত না করারও সমালোচনা করেন জামায়াত আমির।
গুম, খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংস্কৃতি বন্ধে স্বাধীন কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার বিচার বিভাগ ও প্রশাসনকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে।’
দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমির বলেন, ‘দেশে এখন চাঁদাবাজি ও দখলবাজির মহাউৎসব চলছে। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের কেউই কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। মানুষ এখন বলতে শুরু করেছে, মাথা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত সবাই চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত। না হলে কেন এসব বন্ধ হচ্ছে না?’
বাংলাদেশ ব্যাংক, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয় বিবেচনায় অযোগ্য লোক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে পদ্মা ও তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবি জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, ‘ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুকনো মৌসুমে পদ্মা প্রায় মরুভূমিতে পরিণত হয় এবং বর্ষায় ভয়াবহ দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।’
প্রতিবেশী দেশের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাস করে। তবে দেশের দিকে ‘লাল চোখ’ দেখানো হলে জনগণ তা মেনে নেবে না।’
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সব ধর্মের মানুষের দেশ। এখানে সবাই সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবে এবং কোনো সাম্প্রদায়িক অশান্তি সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সংসদে জনগণের দাবি আদায়ের চেষ্টা করা হবে। কিন্তু সেখানে কথা বলতে না দেওয়া হলে রাজপথেই জনগণের পার্লামেন্ট গড়ে উঠবে।’
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও উত্তরাঞ্চল পরিচালক মাওলানা রফিকুল ইসলাম খানের সভাপতিত্বে সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম, জামায়াতের সিনিয়র নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আল্লামা জালালুদ্দিন আহমদ, নেজামে ইসলাম পার্টির আমির আব্দুল কাইয়ুম সোবহানী, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির অধ্যাপক সিরাজুল হক, জামায়াত নেতা নুরুল ইসলাম বুলবুল, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং জাতীয় নারী শক্তির আহ্বায়ক মনিরা শারমিন প্রমুখ।
রিফাত/