জাতীয় বাজেটের মূল চালিকাশক্তি হলো একটি নিখুঁত আয়-ব্যয়ের হিসাব। তাত্ত্বিকভাবে বাজেটের লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশের সব নাগরিকের মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা দেওয়া এবং সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা।
তবে বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় বাজেট অনেক সময়ই সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত করের জালে আটকে ফেলে এবং গুটিকয়েক পুঁজিপতির স্বার্থরক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়।
ঠিক এই সংকটকালেই এক কালোত্তীর্ণ ও মানবিক সমাধান নিয়ে হাজির হয় ইসলামের অর্থনৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ‘বায়তুল মাল’ (রাষ্ট্রীয় কোষাগার)। যার মূল ভিত্তি হলো মহান আল্লাহর প্রতি আমানতদারিতা এবং নিরেট মানবকল্যাণ। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল—রাষ্ট্রীয় বাজেটে ঘাটতি থাকলেও সমাজের অবহেলিত ও দরিদ্র মানুষ কখনো অনাহারে থাকত না, কারণ তাদের সামাজিক নিরাপত্তা ছিল সবসময় সুনিশ্চিত।
বর্তমান বিশ্বের কল্যাণকামী রাষ্ট্রগুলোর বাজেট সাধারণত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধির ওপর জোর দেয়। তবে বাস্তব চিত্র হলো, এই প্রবৃদ্ধির সমান্তরালে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে।
সম্পদের এই কৃত্রিম ও অন্যায্য কেন্দ্রীকরণকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে সম্পদ তোমাদের মধ্যকার শুধু বিত্তবানদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।(সুরা হাশর, আয়াত: ৭)
ইসলামি অর্থনীতির এই কালজয়ী দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে বায়তুল মাল। আধুনিক ব্যবস্থার মতো সাধারণ মানুষের ওপর ভ্যাট বা পরোক্ষ করের বোঝা চাপানোর পরিবর্তে ইসলাম ধনীদের উদ্বৃত্ত সম্পদ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে ‘জাকাত’ ও ‘উশর’ (ফসলের ওপর ধার্য অংশ) আদায়ের বিধান করেছে। এর ফলে সম্পদ সমাজের উচ্চস্তর থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিম্নস্তরের দিকে প্রবাহিত হয়।
ইসলামি ইতিহাসের স্বর্ণযুগ, বিশেষ করে খুলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামলে বায়তুল মাল একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সুশৃঙ্খল রূপ লাভ করে। প্রখ্যাত ফকিহ ইমাম আবু ইউসুফ তাঁর বিখ্যাত ‘কিতাবুল খারাজ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, বায়তুল মালের মূল আয়ের উৎস ছিল—জাকাত, উশর, খুমুস (খনিজ ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ), খারাজ (ভূমি রাজস্ব) এবং জিজিয়া কর।
এখানে লক্ষণীয় যে, জাকাত থেকে অর্জিত অর্থ সম্পূর্ণ সুনির্দিষ্ট খাতে ব্যয় হতো। এটি সাধারণ রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন বা প্রশাসনিক খরচে ব্যবহার করার কোনো সুযোগ ছিল না।
আজকের দিনে রাষ্ট্রগুলোকে ‘বাজেট ঘাটতি’ মেটাতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা বাজারে মুদ্রাস্ফীতি ঘটায় এবং সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ায়। বিপরীতে, বায়তুল মাল ব্যবস্থায় জাকাত ও সদকা ফান্ড সবসময় সংরক্ষিত থাকত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষার জন্য। ফলে মূল বাজেটে ঘাটতি থাকলেও দরিদ্র মানুষ কখনো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হতো না।
প্রখ্যাত ইসলামি অর্থনীতিবিদ ড. এম নেজাতুল্লাহ সিদ্দিকি তাঁর ‘রোল অব দ্য স্টেট ইন দ্য ইকোনমি: অ্যান ইসলামিক পারসপেক্টিভ’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, ইসলামে জনগণের ওপর কর বা রাজস্ব চাপানো তখনই বৈধ, যখন তা সরাসরি জনকল্যাণে ব্যবহৃত হয় এবং বায়তুল মালের স্বাভাবিক উৎসগুলো অপর্যাপ্ত হয়ে পড়ে। এর বাইরে জনগণের ওপর কোনো ধরনের জুলুমমূলক কর চাপানোর সুযোগ ইসলামে নেই।
রাষ্ট্রীয় অর্থ বণ্টন ও সুশাসনের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাবের (রা.) গৃহীত পদক্ষেপগুলো ছিল অত্যন্ত আধুনিক ও প্রগতিশীল। তিনিই প্রথম ইসলামি রাষ্ট্রে ‘দেওয়ান’ বা রাষ্ট্রীয় খাতা তৈরি করেন, যা ছিল মূলত একটি সুপরিকল্পিত বাজেট ও বণ্টন নীতিমালা।
এই ব্যবস্থার আওতায় মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত ভাতার ব্যবস্থা করা হয়। এমনকি নবজাতক শিশুদের জন্যও বায়তুল মাল থেকে বিশেষ অনুদান বরাদ্দ ছিল (তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক, ইবনে জারির তাবারি)।
খলিফা ওমরের (রা.) মানবিকতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় প্রখ্যাত আলেম আবু উবায়েদ আল-কাসিম ইবনে সালামের গ্রন্থে। সিরিয়া সফরকালে এক বৃদ্ধ অমুসলিম (ইহুদি) নাগরিককে ভিক্ষা করতে দেখে খলিফা আফসোস করে বলেছিলেন, আমরা তোমার যৌবনে তোমার কাছ থেকে জিজিয়া নিলাম, আর এখন বৃদ্ধ বয়সে তোমাকে এভাবে ফেলে রাখলাম! এটা কখনোই হতে পারে না।
তিনি তৎক্ষণাৎ বায়তুল মালের কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন যেন সেই বৃদ্ধ এবং তাঁর মতো সমস্ত অক্ষম ও প্রবীণ নাগরিকদের জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে স্থায়ী ভাতার ব্যবস্থা করা হয়।
বর্তমান যুগে বাজেট পাস হওয়ার পর আমলাতান্ত্রিক বিলাসিতা, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প এবং তথাকথিত ‘ভিআইপি সংস্কৃতির’ পেছনে জনগণের ট্যাক্সের বিশাল অর্থ অপচয় হতে দেখা যায়। কিন্তু ইসলামি দর্শনে বায়তুল মালের প্রতিটি পয়সা হলো জনগণের পবিত্র আমানত, যার সুনিপুণ হিসাব শাসককে পরকালে আল্লাহর দরবারে দিতে হবে।
চতুর্থ খলিফা আলী (রা.) পারস্যের গভর্নর জিয়াদ ইবনে আবিহির কাছে লেখা এক চিঠিতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ খরচের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। ‘নাহজুল বালাগাহ’গ্রন্থে সংকলিত সেই চিঠিতে তিনি লেখেন, আমি আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, আমি যদি জানতে পারি যে তুমি মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় কোষাগার (বায়তুল মাল) থেকে ছোট বা বড় কোনো অংশ নিজের স্বার্থে আত্মসাৎ করেছ, তবে তোমার বিরুদ্ধে এমন কঠোর ব্যবস্থা নেব যা তোমাকে নিঃস্ব, কলঙ্কিত এবং ভারী বোঝার নিচে পিষ্ট করে ছাড়বে।
ইসলামি অর্থনীতিবিদ ড. এম ওমর চাপরা তাঁর ‘ইসলাম অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ইসলামি রাষ্ট্রে বাজেট প্রণয়নের মূল ভিত্তিই হলো ‘আদল’ (ইনসাফ) ও ‘ইহসান’ (দয়া)। এখানে শাসক সম্পদের মালিক নন, বরং তিনি জনগণের পক্ষে একজন ট্রাস্টি বা জিম্মাদার মাত্র।
বর্তমান উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাষ্ট্রীয় আয়ের একটি বিশাল অংশ চলে যায় ঋণের সুদ পরিশোধ এবং অনুৎপাদনশীল খাতে। এই চক্রাকার সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে সামষ্টিক বাজেটের দর্শনে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।
ইসলামের বায়তুল মাল ব্যবস্থা আমাদের দেখায় কীভাবে জাকাত এবং ওয়াক্ফ (জনকল্যাণে উৎসর্গীকৃত সম্পদ) ব্যবস্থাপনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে জাতীয় বাজেটের পরিপূরক শক্তি হিসেবে দাঁড় করানো সম্ভব।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামি অর্থনীতিবিদ ড. এম কবির হাসান তাঁর ‘ইসলামিক ফাইন্যান্স: প্রিন্সিপালস অ্যান্ড প্র্যাকটিস’গ্রন্থে মত প্রকাশ করেছেন যে, উন্নয়নশীল দেশগুলো যদি তাদের মোট জিডিপির একটি নির্দিষ্ট অংশ জাকাত ও ওয়াক্ফ ব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি দারিদ্র্য বিমোচনে কাজে লাগাতে পারে, তবে সরকারের রাজস্ব বাজেটের ওপর থেকে সামাজিক নিরাপত্তার বিশাল চাপ অনেকটাই কমে যাবে।
ইসলামের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও বায়তুল মাল ব্যবস্থা মূলত সুশাসন, মানবিকতা ও সামাজিক আস্থার এক অপূর্ব ভারসাম্যপূর্ণ পথ প্রদর্শন করে। বাজেট কখনো ধনীদের আরও ধনী করার আইনি দলিল হওয়া উচিত নয়। বরং একটি আদর্শ বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিটি নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারের পূর্ণ নিশ্চয়তা দেওয়া।
লেখক: প্রিন্সিপাল, মাদরাসা ফাতেমাতুজ জাহরা (রা.), মুহাম্মদপুর, ঢাকা।