কলব শব্দটি আরবিতে সাধারণত হৃৎপিণ্ডকে বোঝালেও ইসলামি দর্শন ও আধ্যাত্মিকতায় এটি শুধু বুকের ভেতরের একটি মাংসপিণ্ড নয়। এটি মানবসত্তার মূল কেন্দ্র, বোধ, উপলব্ধি ও বিবেকের উৎস। কলব হলো সেই স্থান, যেখানে ঈমান ও কুফরের লড়াই চলে এবং যেখানে আল্লাহর নূর বা শয়তানের অন্ধকার স্থান পায়।
শুধু একটি মাংসপিণ্ড নয়
পবিত্র কোরআন ও হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, কলব হলো মানুষের ভেতরের সেই ‘যন্ত্র’, যা উপকারী-ক্ষতিকর, নোংরা-পবিত্র, ভালো-মন্দের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করে। আমাদের চোখ বাহ্যিক জগৎ দেখে, কিন্তু কলব দেখে ভেতরের বাস্তবতা। আল্লাহতায়ালা বলেন, চোখ অন্ধ হয় না। অন্ধ হয় মূলত অন্তর, যা থাকে বুকের ভেতরে। (সুরা আল-হাজ, ৪৬) এই আয়াতটি স্পষ্ট করে যে, আসল অন্ধত্ব শারীরিক নয়, বরং তা হলো আত্মার বা কলবের অন্ধত্ব। চোখ দেখায়, কিন্তু কলব নির্দেশনা দেয়।
কলবের অন্ধত্ব ও দূরদৃষ্টি
যখন এই কলবটি পাপ, লোভ এবং পার্থিব মোহ দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে যায়, তখন তা অন্ধ হয়ে যায়। এই অন্ধ কলবের কারণেই মানুষ শিরক, কুফর ও নানা মন্দ কাজে নির্দ্বিধায় জড়িয়ে পড়ে। অন্ধ অন্তর তাকে সঠিক পথে চলতে বাধা দেয়, সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য হিসেবে দেখায়। অন্যদিকে, যখন কারও অন্তর হয় দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, তখন সে সামান্য আলোতেও অন্ধকার থেকে মুক্তির পথ খুঁজে পায়। এই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কলবই মানুষকে মন্দ বিষয় থেকে বাঁচিয়ে রাখে, কারণ এটি প্রতি মুহূর্তে পাপের বিপদ ও কল্যাণের পথ চিহ্নিত করে।
সবকিছুর মূল কলব
রাসুলুল্লাহ (সা.) এক হাদিসে বলেছেন, সাবধান! দেহের মধ্যে এক খণ্ড মাংসপিণ্ড আছে, যখন তা সুস্থ থাকে, তখন গোটা দেহ সুস্থ থাকে। আর যখন তা দূষিত হয়, তখন গোটা দেহ দূষিত হয়ে যায়। জেনে রাখো, সেটি হলো কলব (অন্তর)।
সুতরাং, এটিই মূল বিষয়। মানুষের সব চিন্তা, চেতনা ও কর্মের কেন্দ্রবিন্দু হলো এই কলব। কলবের সুস্থতার ওপরই নির্ভর করে ব্যক্তির সামগ্রিক জীবন ও তার চূড়ান্ত পরিণতি। কলব যদি পরিশুদ্ধ থাকে, তবে তার হাত, পা, চোখ- সবকিছু আল্লাহর নির্দেশিত পথেই পরিচালিত হয়। তাই মুমিনের জীবনভর সাধনা হওয়া উচিত এই কলবকে পরিশুদ্ধ রাখা। কেননা, কলবই হলো সেই নিয়ন্তা, যা মানব অস্তিত্বের সব কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক