সম্পর্ক শুধু রক্তের যোগসূত্রে তৈরি হয় না, কখনো কখনো তা গড়ে ওঠে স্নেহ, মমতা আর পবিত্র এক বন্ধনের হাত ধরে। ইসলামি শরিয়তে এমন একটি সম্পর্ক হলো দুধ-সম্পর্ক বা রাযাআত, যা রক্তের সম্পর্কের মতোই পবিত্র ও চিরন্তন। শৈশবে কোনো নারীর দুধ পান করার মাধ্যমে যে সম্পর্ক তৈরি হয়, তা শুধু দুটি মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা বিস্তৃতি লাভ করে একটি পুরো পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে।
মায়ের স্থলাভিষিক্ত যিনি
শিশুদের হাড্ডি ও মাংস গঠনে মায়ের দুধের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এর চাইতেও বড় বিষয় হলো, এই দুধপানের ফলে শিশু ও দুধদাত্রী নারীর মধ্যে এক গভীর মাতৃসুলভ অনুভূতির জন্ম হয়। এটি এমন এক স্নেহ-ডোর, যা জীবনের প্রয়োজনে সুপ্ত থাকলেও কখনো শেষ হয় না। ইসলাম এই পবিত্র বন্ধনকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে। যিনি বাচ্চাকে দুধ খাওয়ান, তিনি মায়ের স্থলাভিষিক্ত বা মায়ের মর্যাদাপ্রাপ্ত হন। এর ফলস্বরূপ, শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, সেই দুধ-মায়ের সঙ্গে দুগ্ধপোষ্য সন্তানের জন্য বিবাহবন্ধন চিরতরে নিষিদ্ধ হয়ে যায়।
কখন সাব্যস্ত হয় এই দুধ-সম্পর্ক?
দুধ-সম্পর্ক কখন সাব্যস্ত হবে এ বিষয়ে ইসলামি ফিকহের বিখ্যাত মাযহাবগুলোর মধ্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। তবে মূলনীতি হলো, দুধপানের নির্দিষ্ট সময়সীমা অর্থাৎ শিশুর দুই বছরের মধ্যে এই ঘটনাটি ঘটতে হবে।
আল্লাহতায়ালার বাণী— ‘আর (হারাম করা হয়েছে তোমাদের জন্য) তোমাদের সেসব মাতা, যারা তোমাদেরকে দুধ পান করিয়েছেন’– এর সাধারণ অর্থের ওপর নির্ভর করে।
শুধু মা নন, নিষিদ্ধ হন আরও অনেকে
দুধ-সম্পর্কের কারণে শুধু দুধ-মা নয়, বরং দুধ-মায়ের পুরো পরিবারই দুগ্ধপোষ্য সন্তানের জন্য আত্মীয়তার সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ে যায়। হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বংশগত কারণে যা হারাম হয়, দুধ পানের কারণেও তা হারাম হয়।
দুধ-বোন: দুধ-মায়ের গর্ভজাত মেয়েরা দুগ্ধপানকারী ছেলেশিশুটির জন্য দুধ-বোন। এদের সঙ্গে বিবাহ আজীবনের জন্য হারাম।
দুধ-ফুফু, দুধ-খালা: দুধ-মায়ের বোনেরা শিশুটির জন্য দুধ-খালা এবং দুধ-বাবার বোনেরা দুধ-ফুফু হিসেবে বিবেচিত হবেন।
দুধ-ভাতিজি, দুধ-ভাগনি: দুধ-মায়ের অন্যান্য আত্মীয়ও এই সম্পর্কের আওতায় আসবেন।
ঠিক যেমন রক্ত-সম্পর্কের খালা, ফুফু, ভাতিজি ও ভাগনির সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ, তেমনি দুধ-সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই বিধান সম্পূর্ণরূপে প্রযোজ্য। এই বিধানের মূল লক্ষ্য হলো, একটি পবিত্র পারিবারিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা এবং স্নেহ-মমতার বন্ধনকে রক্তের সম্পর্কের মতোই উচ্চমর্যাদা প্রদান করা।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক