সারা বিশ্বের মুসলমানদের হৃদয়ে তাকওয়া আর আত্মশুদ্ধির রং ছড়াতে আবারও ফিরে এসেছে পবিত্র মাহে রমজান। সিয়াম সাধনা কেবল আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসই বাড়ায় না, বরং মানুষের প্রতি প্রীতি ও মমত্ববোধকেও শাণিত করে। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকার এই প্রক্রিয়া মূলত ক্ষুধার্ত ও দুঃখী মানুষের কষ্ট অনুভবের এক ঐশ্বরিক প্রশিক্ষণ। আর তাই অন্য সময়ের চেয়ে রমজানে মানুষের হৃদয় অন্যের প্রতি বেশি উদার ও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
দানশীলতায় মহানবির (সা.) আদর্শ: অসহায় ও কর্মহীন মানুষের প্রতি ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেওয়া একটি অনন্য গুণ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করো। আল্লাহ অনুগ্রহকারীদের ভালোবাসেন’ (সুরা বাকারা, ১৯৫)। দান-সদকার মহিমা বোঝাতে গিয়ে বিশ্বনবি (সা.) বলেছেন, ‘খেজুরের একটি টুকরো দান করে হলেও তোমরা জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার চেষ্টা করো।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন জগতের শ্রেষ্ঠ দানশীল। কিন্তু রমজান এলে তাঁর দানের হস্ত আরও প্রসারিত হতো। হাদিস অনুযায়ী, এ মাসে প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব ৭০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। ফলে রমজানে দান করলে তার প্রতিদানও হয় বহুগুণ।
রোজা ও শ্রমজীবীর জীবনসংগ্রাম: আমাদের চারপাশে অসংখ্য দিনমজুর রয়েছেন—রিকশাচালক, ভ্যানচালক, হকার কিংবা কুলি। যারা ‘দিন এনে দিন খায়’। রোজা রেখে প্রচণ্ড গরমে বা রোদে হাড়ভাঙা খাটুনি দেওয়া অনেকের পক্ষেই অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক শ্রমজীবী পরিবারে চুলা জ্বলে না। অর্থাভাবে অনেকের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও রোজা রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার কেউ কেউ অভাবের তাড়নায় মানবেতর জীবনযাপন করেও সিয়াম পালন করেন। এই কঠিন মুহূর্তে তাদের পাশে দাঁড়ানো কেবল সামাজিক দায়িত্বই নয়, বরং একজন মুমিনের ঈমানি দাবি।
প্রতিবেশীর হক ও ইফতারের সওয়াব: রমজানে সাহরি ও ইফতারে আমাদের প্লেটে যখন বিলাসিতার সমারোহ, তখন প্রতিবেশীর ঘরে খাবার আছে কি না, তার খোঁজ রাখা অত্যন্ত জরুরি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, তার আমলনামাতেও রোজাদারের সমান সওয়াব লেখা হবে।’ আমাদের সমাজে ইফতার পার্টির জাঁকজমকপূর্ণ সংস্কৃতি রয়েছে। যদি রাজনৈতিক বা সামাজিক সংগঠনগুলো এই ইফতার পার্টির আড়ম্বর কমিয়ে সেই অর্থ দিয়ে অসহায় মানুষের ঘরে ঘরে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেয়, তবে তা হবে সত্যিকারের ইবাদত।
সমাজের বিত্তবান শ্রেণি যদি তাদের হৃদয়ের ভালোবাসা আর সামান্য সহযোগিতা প্রকাশ করেন, তবেই নিম্নআয়ের মানুষগুলো নিশ্চিন্তে রোজা রাখতে পারবেন। আসুন, এই রমজানে আমরা বিলাসিতা নয়, বরং মানবিকতাকে অগ্রাধিকার দিই। আমাদের সামান্য সাহায্য হতে পারে কর্মহীন কোনো দিনমজুরের নির্বিঘ্ন সিয়াম সাধনার অবলম্বন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক