দুই দশক ধরে কর্মক্ষেত্রে বাড়ছে নারীর অংশগ্রহণ। পারিবারিক এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং সরকারি-বেসরকারি নীতির কারণেই এই পরিবর্তন সম্ভব হচ্ছে। ব্যাংকখাতসহ বর্তমানে অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাড়ছে নারীর অংশগ্রহণ। ব্যাংকিং খাতে শুরুর পর্যায়ে নারী কর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও উচ্চপদে নারীর সংখ্যা কম। তবে সম্প্রতি বিশেষায়িত খাতের দুটি ব্যাংকে নারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা উচ্চপদে নারী নেতৃত্ব বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ব্যাংক খাতে কর্মরত নারীর সংখ্যা ৩৭ হাজার ৬৪৯ জন। তবে উচ্চপদ অর্থাৎ ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বা উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদে নারী এখনো হাতে গোনা। দেশে বর্তমানে পরিচালিত ৬১ ব্যাংকের মধ্যে অতি সম্প্রতি দুটি ব্যাংকে নারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হুমায়রা আজম নামে একজন নারী এমডি আছেন। তিনি এর আগে, ট্রাস্ট ব্যাংকে একমাত্র নারী এমডি ছিলেন। এ ছাড়া ডিএমডি পদেও বেশ কয়েকজন নারী রয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব বলছে, বিদায়ী বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মোট জনবল ২ লাখ ১৪ হাজার ২৪৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭৬ হাজার ৫৯৬ আর নারীর সংখ্যা ৩৭ হাজার ৬৪৯ জন। সেই হিসাবে ব্যাংকে নারী কর্মীর অনুপাত মাত্র ১৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এর আগে, গত জুন শেষে ব্যাংকে নারী কর্মী ছিল ৩৪ হাজার ৩৬৮ জন। অর্থাৎ ছয় মাসে ব্যাংকে নারী কর্মী বেড়েছে ৩ হাজার ২৮১ জন বা ১ দশমিক ০৪ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকে যোগদানের সময় কর্মরত নারী কর্মীর অনুপাত ১৭ দশমিক ১৯ শতাংশ হলেও উচ্চপর্যায়ে এই অনুপাত ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ শুরু থেকে উচ্চপর্যায়ে যেতে যেতে নারীর অনুপাত অর্ধেকে নেমে গেছে। এর কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্যারিয়ারের মাঝামাঝি সময়ে পুরুষের তুলনায় নারীদের ব্যাংকের চাকরি ছাড়ার হার বেশি। পারিবারিক, সামাজিক এবং কর্মস্থলে মূল্যায়নের অভাবে অনেকে মাঝপথে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। নারী ব্যাংকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পারিবারিক ও সামাজিক নানা চাপে তারা ব্যাংকের চাকরি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন নারী কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, একজন নারী ব্যাংকারকে আবশ্যিকভাবেই ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি দিতে হয়। অনেক ব্যাংক ওই সময়ে বা ওই বছরে তার র্যাংকিং কমিয়ে দেয়। যদিও একজন মা নারী হিসেবে পরিবারে যেমন শ্রম দিচ্ছেন তেমনি তার প্রতিষ্ঠানেও শ্রম দিচ্ছেন। তারপরও র্যাংকিং কমে যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই তাকে হতাশা গ্রাস করে। শুধু তাই নয়, সমান যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও নারী কর্মীদের বেশির ভাগ সময়ই সমান মূল্যায়ন করা হয় না।
এ ছাড়া সব ব্যাংকের সব শাখায় শিশু দিবাযত্নকেন্দ্রের মতো সুবিধা পাওয়া যায় না। এতে বাধ্য হয়ে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অনেক নারী কর্মী মাঝপথে চাকরি ছেড়ে দেন। এসব কারণেই উচ্চপর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে না। তাদের মতে, নারীদের কাজের সঠিক মূল্যায়ন হলে এবং সব ব্যাংকে পর্যাপ্ত শিশু দিবাযত্নকেন্দ্র ও যাতায়াতের ব্যবস্থা থাকলে নারী ব্যাংকারের সংখ্যা আরও বাড়ত। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর পর্ষদকেও উদ্যোগ নিতে হবে।
এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ড. ফাহমিদা খাতুন খবরের কাগজকে বলেন, গত দুই দশকে মেয়েদের পড়াশোনার হার অনেক বেড়েছে। এর ফলে পড়াশোনা শেষ করে মেয়েদের অনেকেই ব্যাংকিং খাতে ক্যারিয়ার গড়ছে। কিন্তু বিয়ে এবং সন্তান লালন-পালনের প্রতিবন্ধকতার কারণেই অনেকে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাধ্য হয়ে মাঝপথে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার হার বাড়ছে।
আমাদের দেশে এখনো পর্যাপ্ত ডে কেয়ার সেন্টার নেই। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক সহযোগিতাও পাওয়া যায় না। মূলত এই কারণেই কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়, পরিচালক, বড় ধরনের উচ্চপদে নারীর সংখ্যা এখনো অনেক কম। কর্মক্ষেত্রে নারীর এ অগ্রগতি টেকসই করতে হবে। কর্মপরিবেশ আরও নিরাপদ করতে হবে।
তিনি বলেন, সম্প্রতি দুটি ব্যাংকে নারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ পেয়েছেন। এ ছাড়া একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবেও একজন নারী কাজ করছেন। অর্থাৎ নারীরা যদি তাদের প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে আসতে পারেন, তা হলে তাদেরও উচ্চপদে আসার সুযোগ রয়েছে। যারা এই পর্যায়ে এসেছেন, তারা নিশ্চয়ই তাদের প্রতিবন্ধকতা পেরিয়েই এগিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, আমাদের দেশে সন্তান লালন-পালনের কাজটি এখনো নারীদেরই করতে হয়। যদিও বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলেই এই দায়িত্ব পালন করে থাকেন। আমাদের দেশেও সেই চর্চা শুরু হলে সামগ্রিকভাবে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ার পাশাপাশি উচ্চপদেও নারী নেতৃত্ব বাড়বে। এ জন্য পারিবারিক, সামাজিক সহযোগিতা এবং রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ দরকার।
সম্প্রতি রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ওয়াহিদা বেগম। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, পারিবারিক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি উচ্চপর্যায়ে নারী কর্মীদের কাজের জন্য যে পরিবেশ দরকার সেটা হয়তো সব ব্যাংকে সমানভাবে নেই। সে ক্ষেত্রে আমি সৌভাগ্যবান যে আমার সংসার-সন্তান আমাকে সহযোগিতা করেছে, ভালো সহকর্মী পেয়েছি এবং পরিশ্রম করতে আমার ভালো লাগে।
আমি মনে করি আগামী দিনে শুধু বিশেষায়িত ব্যাংক নয়, সব ব্যাংকের সব পর্যায়ে, বিশেষত উচ্চপর্যায়ে নারী কর্মীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে। আমার মতে নারী বা পুরুষ নয় মানুষ হয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করা উচিত। ব্যাংকগুলোর উচ্চপর্যায়ে নারীদের পদায়ন ক্ষমতায়ন বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে নেবে বলে আমি মনে করি। সেই বিবেচনায় উচ্চপর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ দেশের সমৃদ্ধিকেই ইঙ্গিত করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুন নাগাদ দেশের ব্যাংক খাতে বোর্ড সদস্য বা পরিচালক হিসেবে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল ১৪ দশমিক ০৫ শতাংশ। ২০২৪ সালের জুনে সেটা কমে হয়েছে ১৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এ সময় বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে নারী পর্ষদ সদস্যদের অংশগ্রহণের হার সবচেয়ে বেশি হলেও বিশেষায়িত বাণিজ্যিক ব্যাংকে নারী বোর্ড সদস্যের অংশগ্রহণ শূন্য। আর রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকে নারী বোর্ড সদস্যের হার ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ।
রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও পরিচালক নিয়োগসংক্রান্ত নীতিমালায় বলা হয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের এক-তৃতীয়াংশই থাকবেন নারী। এ ছাড়া সরকারের শেয়ার রয়েছে, এমন বেসরকারি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এ নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। সরকারি ব্যাংকগুলোয় নীতিনির্ধারণের জন্য পরিচালক নিয়োগ দেয় সরকার। নারী উদ্যোক্তা, সাবেক নারী ব্যাংকার, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। আর বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় মালিকদের স্ত্রী, কন্যা, পুত্রবধূ ও ঘনিষ্ঠজনদের পরিচালক হিসেবে দেখা যায়।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ব্যাংকগুলোতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন, বিশেষায়িত ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের চেয়ে বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক নারী কর্মকর্তা বা কর্মচারী কাজ করছেন। নারী কর্মীর সংখ্যা সবচেয়ে কম বিশেষায়িত ব্যাংকে। বিদেশি ব্যাংকে নারী কর্মীর অংশগ্রহণ ২৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ, বেসরকারি ব্যাংকে ১৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে ১৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এ ছাড়া বিশেষায়িত ব্যাংকে ১৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ নারী কর্মী রয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, নারীদের জন্য দেশের সব ব্যাংকে ৬ মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি কার্যকর আছে। এসব ব্যাংকে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালা প্রণয়ন করা আছে। ৫৮টি ব্যাংক লিঙ্গসমতা বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছে। ৪০টি ব্যাংক তাদের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য শিশু দিবাযত্নকেন্দ্র স্থাপন করেছে। নারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে ৫২টি ব্যাংকের আছে নিজস্ব পরিবহন সুবিধা।