নজরুলের আবির্ভাব যেন মহাবিশ্বে আলোর ঝলকানি! এক বিদ্রোহী কবিতাই তাকে শিখরে তুলে দিয়েছে। তার পর আর তাকে পেছনে তাকাতে হয়নি। টানা দশ বছর তিনি কবিতা লিখেছেন। তার পর তেরো বছর গান লিখেছেন। অসুস্থতার পর আর লিখতে পারেননি। তেইশ বছরের লেখালেখির জীবনে কবি নজরুল বাংলা সাহিত্যকে যা দিয়েছেন তা পরিমাপ করা কঠিন। তিনি না জন্মালে বাংলা সাহিত্য হয়তো অপূর্ণই থাকত।...
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম এবং জীবনানন্দ দাশ- এই তিন কবি আমার লেখক জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছেন। তাদের লেখা এবং জীবনাচার আমার মনোজগতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটিয়েছে; লেখক হয়ে ওঠার প্রেরণা জুগিয়েছে। বিশেষ করে কবি নজরুলের জীবনসংগ্রাম আমাকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে, অনুপ্রেরণার অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করেছে। সেই ছোটবেলা থেকে লেখক হওয়ার তাড়না অনুভব করেছি। এ তাড়নার নেপথ্যে কাজ করেছে কবি নজরুলের সংগ্রামী চেতনা।
ছোটবেলা থেকেই কবি নজরুলকে জানার চেষ্টা করেছি। তার কঠিন জীবনসংগ্রামের দিনলিপি যতই পড়েছি ততই আবেগতাড়িত হয়েছি। দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিষ্ট হয়েও তিনি স্তব্ধ হয়ে যাননি। তিনি সর্বাবস্থায় বীরের মতো অবিচল ছিলেন। কঠিন বিপদেও তিনি ধৈর্য হারাননি।
একবার কবি নজরুল বিশেষ কাজে পূর্ববাংলায় এসেছিলেন। তখন তিনি পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগরে থাকতেন। বাড়িতে ফিরেই জানতে পারলেন তার সন্তানসম্ভাবা স্ত্রী দুই দিন ধরে তেমন কিছুই খেতে পারেননি। তার শাশুড়ি গিরিবালা রেগে আগুন। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো কোনো অবস্থাই ছিল না তার। পকেট যেন গড়ের মাঠ। অর্থ সংস্থানের কোনো পথও পাচ্ছিলেন না! সেরকম একটি অস্থির সময়ে প্রমীলার বুকজুড়ে এল নতুন শিশু। আনন্দে মাতোয়ারা কবি তার নাম দিলেন বুলবুল।
বুলবুলের জন্ম যেন কবিকে নতুন আলোর সন্ধান দেয়। তিনি নবসৃষ্টির উন্মাদনায় মেতে ওঠেন। তিনি দারিদ্র্য নামে দীর্ঘ কবিতা লিখলেন। ‘হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান। তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিষ্টের সম্মান।’ কেবলমাত্র নজরুলের পক্ষেই হয়তো এটা লেখা সম্ভব হয়েছে। ক্ষুধার যন্ত্রণাও তাকে দমাতে পারেনি, তার লেখালেখি স্তব্ধ করতে পারেনি!
যদিও কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছেন, ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি। কিন্তু কবি নজরুল ক্ষুধাকে অন্যভাবে গ্লোরিফাই করেন। তার হয়তো এমন ধারণা জন্মেছে, ক্ষুধার কষ্টই তার অসামান্য সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
যাই হোক, নজরুলকে সব সময়ই আমার কাছে মনে হয়েছে ‘গড গিফটেড’ প্রতিভা। তার মতো বিরল প্রতিভা নিয়ে পৃথিবীতে খুব কম মানুষই জন্মায়। তিনি মাত্র ২২ বছর বয়সে বিদ্রোহী কবিতা লিখে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মহাবিপ্লব ঘটিয়েছেন। কবিতাটি বিজলী পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর পত্রিকার কপি নিয়ে তিনি শান্তি নিকেতনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দেখানোর জন্য ছুটে যান। সাহিত্যে নোবেলজয়ী কবির তখন বিশ্বব্যাপী খ্যাতি। তার বাড়িতে গিয়ে নিচতলা থেকে চিৎকার দিয়ে বিশ্বকবিকে ডাকাডাকি শুরু করেন। চিৎকার শুনে কবিগুরু এগিয়ে এলেন। বিশ্বকবিকে দেখে নজরুল উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, গুরুদেব! দেখুন আমি কী করে ফেলেছি! আপনাকে আমি খুন করে ফেলেছি!
তার পর নজরুল গড়গড় করে কবিতাটি পড়তে শুরু করেন। কবিতা পড়া শেষ হলে কবিগুরু নজরুলকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন, সত্যিই তুই আমাকে খুন করেছিস।
নজরুলের আবির্ভাব যেন মহাবিশ্বে আলোর ঝলকানি! এক বিদ্রোহী কবিতাই তাকে শিখরে তুলে দিয়েছে। তার পর আর তাকে পেছনে তাকাতে হয়নি। টানা দশ বছর তিনি কবিতা লিখেছেন। তার পর তেরো বছর গান লিখেছেন। অসুস্থতার পর আর লিখতে পারেননি। তেইশ বছরের লেখালেখির জীবনে কবি নজরুল বাংলা সাহিত্যকে যা দিয়েছেন তা পরিমাপ করা কঠিন। তিনি না জন্মালে বাংলা সাহিত্য হয়তো অপূর্ণই থাকত।
এই বিরল প্রতিভার কবিকে নিয়ে লিখতেই হবে। কিন্তু কী লিখব, কীভাবে শুরু করব তা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই অনেকটা সময় পার হয়ে যায়। তবে আমার গবেষণা চলতে থাকে। নজরুলকে নিয়ে লেখা কিছু বই সংগ্রহ করলাম। অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের লেখা কবি নজরুলের জীবন ও সৃজন বইটি পড়তে পড়তে ভেবেছি সবই তো লেখা হয়ে গেছে। আমি কী লিখব। তার পর আরও আরও বই পড়লাম। কবির ঘনিষ্ঠ বন্ধু মুজফ্ফর আহমদ, কাজী মোতাহার হোসেনসহ অনেকের লেখা বই পড়েছি। কয়েকটা উপন্যাসও পড়েছি। ভাবছি আর পড়ছি। ভাবতে ভাবতে একটা সময় মনে হলো, নজরুলকে বিদ্রোহী কবি হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে। তিনি তো শুধুই দ্রোহের কবি নন, প্রেমিক কবিও। তিনি অসংখ্য প্রেমের কবিতা লিখেছেন। হাজারো গান লিখেছেন। তার লেখালেখির একটা বড় অংশজুড়ে আছে প্রেম। অথচ সে দিকটার প্রতি তেমন আলো ফেলেনি কেউ। আমি এই দিকটা নিয়ে কাজ করতে পারি।
এরপর শুরু হলো মানসিক প্রস্তুতি। সে অনুযায়ী বই সংগ্রহ করছি। পড়ছি আর নোট নিচ্ছি। ইতিহাস কিংবা অতীত-আশ্রয়ী কিছু লিখতে গেলে গবেষণা করতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর অনেক বই পড়তে হয়। গবেষণার একপর্যায়ে মনে হলো, অল্প পরিসরে নজরুলের প্রেমের দিকটা ঠিকঠাক ফুটিয়ে তোলা যাবে না। বড় কোনো কাজ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে উপন্যাস লেখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কিন্তু কোথা থেকে কীভাবে শুরু করব তা নিয়ে ভাবনার কোনো কূলকিনারা পাচ্ছিলাম না। একপর্যায়ে মাথায় এল, নজরুলের গানের কলি দিয়েই হতে পারে উপন্যাসের নাম। মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী, দেবো খোঁপায় তারার ফুল। নজরুলের প্রেমের গান। এই গানের মর্মার্থ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় নজরুলের প্রেম কিংবা তার কল্পনাশক্তি কতটা গভীর!
অতঃপর উপন্যাসের নাম ঠিক করলাম, দেবো খোঁপায় তারার ফুল। দীর্ঘ সময়ের প্রস্তুতির পর এক বছর ধরে লিখেছি। তার পর অন্যপ্রকাশ থেকে বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে। নজরুল যে শুধুমাত্র বিদ্রোহী কবি নন, তিনি প্রেম, মানবতা ও সাম্যের কবি; সেই দিকটিতেই আলো ফেলেছি।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সম্পাদক, খবরের কাগজ