বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হয়েও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। দেশের জনগণের মধ্যে সুন্দর একটি স্বপ্ন লুকিয়ে আছে, তা হলো গণতান্ত্রিক উপায়ে নতুন একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করা। সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র ফিরে আসুক- এটা দেশবাসীর একমাত্র চাওয়া। দেশে যখন জরুরি অবস্থা বজায় থাকে তখন রাষ্ট্রপতির হাতে ক্ষমতা থাকে। দেশে জরুরি অবস্থা জারি থাকলে কোনো উন্নয়ন হয় না। তার পরও আমাদের দেশে অনেকবার জরুরি অবস্থা আরোপ হয়েছে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও জিয়াউর রহমানের শাসনামলে কয়েকবার জরুরি অবস্থা জারি হয়েছিল। সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশের ততটা উন্নয়ন সম্ভব হয়নি। দেশের অতীত ইতিহাসের এসব দৃষ্টান্ত কখনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারেনি। দেশে যখন নতুন কোনো সরকার আসে, তখন আগের সরকারের সঙ্গে মৌলিক কিছু পার্থক্য থাকে। কিন্তু রাষ্ট্র উন্নতির দিকে যাবে সেটা কখনো হয়নি। অতি অল্প সময়ে দেশ যে ভালোর দিকে যাবে তা কখনো সম্ভব নয়। দেশের উন্নয়ন সুদূরপ্রসারী ব্যাপার।
দেশে যখন সরকার থাকে না তখন অন্তর্বর্তী সরকার আসে। দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক সরকারের প্রতি যখন মানুষ বিরক্ত হয়, তখন সেই সরকারের পতনের জন্য জনগণ তখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আস্থা নিয়ে আসে। রাজনীতির অবস্থা উন্নতির দিকে যেতে হলে আধুনিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দল অপরিহার্য। ইরান ইসলামিক রিপাবলিকান একটি মুসলিম রাষ্ট্র। সেই মুসলিম রাষ্ট্রেও রাজনৈতিক দল আছে। ইরানের মতো দেশেও নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়। নেপালে ১০-১২ বছর আগেও তাদের রাজধর্ম ছিল হিন্দু ধর্ম। তখনো নেপালে রাজনৈতিক দল ছিল। তবে এখন ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে। নেপালে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতেই দেশ পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি নেপালে অনেক সমাজতান্ত্রিক দলও রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন করতে হলে সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এত অল্প সময়ে কোনোভাবেই ভালো রাজনৈতিক দল গড়ে উঠবে না। দেশের সার্বিক উন্নয়ন রাতারাতি করা সম্ভব নয়। দেশ ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে গেলেও তা চলমান থাকতে হবে।
দেশে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সে ক্ষেত্রে দেশের উন্নয়ন নিয়ে মানুষ চিন্তিত। জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে কিছুটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হলে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া দরকার। সে ক্ষেত্রে দেশে ভালো রাজনৈতিক দল লাগবে। যে দল ক্ষমতায় আসবে তাদের আগামী পাঁচ বছরের কর্মসূচি জনগণের সামনে উন্মোচন করতে হবে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও পশ্চিমা শক্তি বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলকে নিয়ন্ত্রণ করতে যাওয়াটা মোটেও ঠিক হবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও পশ্চিমা শক্তির প্রভাব আমাদের দেশে চলমান। আমরা বৈশ্বিক কোনো রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য অবলম্বন করে চলতে পারি না। বাংলাদেশ পশ্চিমা বড় শক্তির আদেশ, নির্দেশ ও রীতিনীতি দ্বারা পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের নিজস্ব শক্তি গড়ে উঠতে হবে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভৌগলিক অবস্থান বুঝে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। গতানুগতিক ধারায় এ দেশ যেভাবে চলছে তা কাটিয়ে উঠতে হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও পশ্চিমা শক্তির প্রভাব আমাদের দেশে চলমান। আমরা বৈশ্বিক কোনো রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য অবলম্বন করে চলতে পারি না। বাংলাদেশ পশ্চিমা বড় শক্তির আদেশ, নির্দেশ ও রীতিনীতি দ্বারা পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের নিজস্ব শক্তি গড়ে উঠতে হবে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভৌগলিক অবস্থান বুঝে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।...
বর্তমানে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি চলমান তা শৃঙ্খলার মধ্যদিয়ে যাচ্ছে না। বাংলাদেশকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হলে ভালো রাজনৈতিক দলের কোনো বিকল্প নেই। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও বামপন্থি যে রাজনৈতিক দলগুলো আমাদের দেশে রয়েছে, আমি সেসব রাজনৈতিক দলের কথা বলছি না। নতুনভাবে রাজনৈতিক দল গঠন করে এবং দলের ঘোষণাপত্র ও কর্মসূচি জনসম্মুখে উন্মোচন করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে সরকার প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করতে হবে। দেশকে উন্নয়ন করতে হলে দীর্ঘ সময় লাগবে।
অন্তর্বর্তী সরকার আগামী বছর ফেব্রুয়ারির মধ্যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার ঘোষণা দিয়েছে। জাতীয় নির্বাচন হবে, নাকি হবে না তা নিয়ে জনগণের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আমার মতে, জাতীয় নির্বাচন ঘোষিত সময়ে বা কাছাকাছি সময়েই অনুষ্ঠিত হবে। এ সময়ের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার রাজনীতি উন্নয়নে কী সংস্কার কাজ করেছে? জনগণের কাছ থেকে তেমন কোনো উন্নয়নের খবর পাচ্ছি না। গত ২৫ বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক যে টানাপোড়েন চলেছে, আগামী ২৫ বছরও রাজনৈতিক পরিস্থিতি একই টানাপোড়েনের মধ্যদিয়ে যাবে। দেশের আমূল পরিবর্তন আনতে হলে ভালো রাজনৈতিক দলের বিকল্প নেই। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মানসিকতা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো এগিয়ে এলে তবেই দেশের উন্নয়ন সম্ভব।
শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর দেশে সংস্কারের কাজ চলছে এবং ছয়টি কমিশন গঠন করা হয়েছে। দেশের সংস্কার কাজ একটি চলমান প্রক্রিয়া। সংস্কার কাজের জন্য দেশের নির্বাচন পিছিয়ে থাকবে না। যতটুকু সংস্কার না করলেই নয় ততটুকু করা প্রয়োজন। এতকিছু সংস্কার করে তার পর নির্বাচনে যাওয়াটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এভাবে সময় ক্ষেপণ করলে দেশ অনেক পিছিয়ে পড়বে। দেশের উন্নয়নে এবং জণগণের স্বার্থে নির্বাচন দ্রুত দরকার। যতটুকু সংস্কার করা দরকার ততটুটু করলেই হবে। দেশে যখন নির্বাচিত সরকার আসবে তখন তারা সংস্কারের কাজে মনোনিবেশ করবে। এখন যতটুকু সংস্কার করা হয়েছে তা রাজনৈতিক দলের বিশেষ প্রয়োজনে করা হয়েছে। নতুন রাজনৈতিক দল গঠনে বিপ্লবী দলও হতে পারে। রাশিয়া ও কিউবার মতো আমাদের দেশ নতুনভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। বাংলাদেশে তেমন কোনো বিপ্লবের কথা বলছি না। তবে বিবেক ও চিন্তাচেতনাকে অবলম্বন করে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশে প্রকৃত রাজনৈতিক পরিচয় অর্জন করতে হবে।
বাংলাদেশে এখন উত্তম সময় এসেছে নতুন কোনো রাজনৈতিক দলের উত্থান হওয়ার।
মওলানা ভাসানীর সময়ে রাজনৈতিক দলের যে ভূমিকা ছিল, তার এক ভাগ গুণাবলি বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক দলের মধ্যে দেখি না। নেতা বলে অভিহিত করা যায়, এমন কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক দলের মধ্যে নেই। দেশের উন্নয়নের জন্য জনগণের সচেতন থাকতে হবে। স্বাধীনতা অর্জন করতে দেশের মানুষের রক্ত দিতে হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে কারা চায়? দেশে যারা উচ্চবিত্ত আছেন, তাদের ছেলেমেয়ে ইউরোপ ও আমেরিকায় প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য দেশ ছাড়ছেন। বাংলাদেশ নিয়ে তাদের কোনো চিন্তা নেই। তাদের দিয়ে বাংলাদেশে তেমন কিছু করা সম্ভব নয়। এসব লোক বিদেশে অনেক টাকা উপার্জন করে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের দলকে চাঁদা দিয়ে দেশের রাজনীতি পরিচালনা করতে চায়। এভাবে দেশের রাজনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এজন্য দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন দরকার এবং নতুন দল গঠন করতে হবে। ভালো রাজনৈতিক দল ছাড়া অথবা রাজনৈতিক আদর্শ ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
লেখক: বাংলা একাডেমির সভাপতি ও রাষ্ট্রচিন্তক