ঢাকা ১ আষাঢ় ১৪৩১, শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪

মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি কর্মীদের টাকা ফেরত দিতে সময় চেয়েছে বায়রা

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৪, ০৯:৫৬ এএম
আপডেট: ১১ জুন ২০২৪, ০৯:৫৬ এএম
কর্মীদের টাকা ফেরত দিতে সময় চেয়েছে বায়রা
বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং অ্যাজেন্সিজ (বায়রা)

নিজেদের মতো করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং অ্যাজেন্সিজ (বায়রা)। এ জন্য সরকারের কাছে কিছু সময় চেয়েছে সংগঠনটি। মালয়েশিয়ায় যেতে না পারা কর্মীরা যাতে টাকা ফেরত পান সেই চেষ্টা করছেন সংগঠনটির নেতারা। পাশাপাশি সরকারের প্রতি কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোরও আহ্বান জানিয়েছে বায়রা।

অন্যদিকে, সোমবার (১১ জুন) রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত বায়রার বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) তুমুল হট্টগোালের ঘটনা ঘটেছে। নির্বাহী কমিটির একটি পক্ষ সভাপতি মোহাম্মদ আবুল বাশার ও মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরীর বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটে যুক্ত থাকার অভিযোগ তুলে এজিএম বয়কট করে। পরে একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করে বয়কট করা নেতারা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ৩১ মের মধ্যে মালয়েশিয়ায় ঢুকতে না পারায় চরম হতাশ এসব কর্মী যাতে টাকা ফেরত পান সেই চেষ্টাই করছে বায়রা। সরকারি হিসাবে এমন কর্মীর সংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে বায়রার একজন শীর্ষ নেতা বলেছিলেন যে এমন কর্মীর সংখ্যা ৩০ থেকে ৪০ হাজার। 

মালয়েশিয়ায় যেতে না পারার কারণ অনুসন্ধানে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (কর্মসংস্থান) নূর মো. মাহবুবুল হককে প্রধান করে ছয় সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। ভুক্তভোগীরা তদন্ত কমিটির কাছ থেকে প্রতিকারও চাইতে পারবেন। টাকা ফেরত পেতে কমিটির কাছে অভিযোগ করতে হবে।

কিন্তু বায়রার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ক্ষেত্রে সংগঠনের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে বলা হয়েছে, কিছুদিন সময় পেলে দায়ী অ্যাজেন্সিগুলোর সঙ্গে কথা বলে নিজেরাই টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারবে। আপাতত সরকারের পক্ষ থেকে যেন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অ্যাজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হয়। 

এ প্রসঙ্গে বায়রার যুগ্ম মহাসচিব-৩ টিপু সুলতান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বায়রা নেতৃবৃন্দ টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট অ্যাজেন্সিগুলোর সঙ্গে কথা বলছেন। আশা করি বিষয়টির একটি সমাধান আসবে। পাশাপাশি সরকারকে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতেও অনুরোধ করা হয়েছে বায়রার পক্ষ থেকে, যাতে এসব কর্মী মালয়েশিয়া যেতে পারেন।’

কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর আহ্বান
এদিকে যেতে না পারা কর্মীদের টাকা ফেরত পাওয়ার চেয়ে তারা যাতে যেতে পারেন, সেটাই তাদের জন্য সবচেয়ে ভালো বলে মনে করে বায়রা। কূটনৈতিক তৎপরতা সফল না হলে টাকা ফেরত দেওয়া হবে বলে বারবার বলছেন সংগঠনটির নেতারা।

সরকারের পক্ষ থেকে যদিও এ ব্যাপারে চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী। সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার হাজনাহ মো. হাশিমের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রতিমন্ত্রী।

তবে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ৩১মের পর মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অন্য ১৩টি উৎস দেশের জন্য যে আইন, বাংলাদেশের জন্যও সেই আইন। কাজেই বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়া প্রবেশের সময় বাড়বে না। 

৫ মে প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে মালয়েশিয়ার হাইকমিশনারও জানান, সময় বাড়ছে না। তবে ঢাকার বার্তাটি তিনি কুয়ালালামপুর পাঠাবেন বলে জানান।

এ প্রসঙ্গে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর খবরের কাগজকে বলেন, টাকা ফেরত দেওয়ার চাইতে ভালো হয় যদি সরকার কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে এসব কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পাঠাতে পারে। কারণ কর্মী টাকা পেলেও দেখা যাবে পুরো টাকা পাবেন না। এ ছাড়া যতটুকু টাকাই পাওয়া যাবে, সেটাও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।

তদন্ত প্রতিবেদন পেলে ব্যবস্থা: প্রতিমন্ত্রী
এদিকে গত রবিবার প্রবাসী কল্যাণ ভবনে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সে অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 

প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের আরও বলেন, ‘তদন্ত কমিটি এ বিষয়ে কাজ করছে। তদন্ত শেষ হওয়ার পর এ বিষয়ে আপনাদের বিস্তারিত জানানো হবে। আশা করছি, যারা দোষী আছে তাদের কী ধরনের সাজা দেওয়া যায়, সেই ব্যাপারে সুপারিশ থাকবে। এ ছাড়া মালয়েশিয়া যাওয়ার ক্ষেত্রে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

বায়রার সাধারণ সভায় হট্টগোল, লাঞ্ছনার অভিযোগ
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে শ্রমিক পাঠানোর কথা বলে প্রতারণার অভিযোগ ও সিন্ডিকেটসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিবাদ করায় বায়রার এজিএমে হট্টগোলের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংগঠনটির একাংশের নেতারা।

বায়রার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি রিয়াজ উল ইসলামসহ একাংশের সাধারণ সদস্যরা জানান, সোমবার (১১ জুন) সকালে সংগঠনের বার্ষিক সাধারণ সভায় তাদেরকে লাঞ্ছনা ও হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। লাঞ্ছিত হওয়ার অভিযোগ করা নেতাদের অভিযোগ, বর্তমান কমিটির সভাপতি ও মহাসচিব মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সেই সিন্ডিকেটের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই সংগঠনটির সাধারণ সদস্যদের দাবি অগ্রাহ্য করেছেন তারা।

তারা বলছেন, বায়রার মহাসচিব যে ৩-৪ হাজার কর্মী যেতে পারেননি বলে গণমাধ্যমে যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটি আসলে সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে এই সংখ্যা ৫০ হাজার।

উচ্চ মহলের সবুজ সংকেতে আসে গ্রেপ্তারের নির্দেশ ফোন চালাকিতে ধরা মিন্টু

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ০৫:১০ পিএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ০৫:১০ পিএম
ফোন চালাকিতে ধরা মিন্টু
এমপি আনোয়ারুল আজীম আনার ও ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু

অবশেষে এমপি আনোয়ারুল আজীম আনারকে হত্যার ঘটনায় ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টুর শেষরক্ষা হলো না। তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।

ঢাকার ধানমন্ডির এক নেতার বাসা থেকে গত মঙ্গলবার ডিবির টিম মিন্টুকে তুলে আনার পর তাকে আনার হত্যার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে নাকি ছেড়ে দেওয়া হবে, তা নিয়ে দোলাচল তৈরি হয়। চলে বহুমুখী তদবির ও দৌড়ঝাঁপ। খোদ গোয়েন্দা পুলিশের মধ্যে নানা ধরনের সংশয় লক্ষ করা গেছে। চাপেও ছিলেন তারা। 

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা মিন্টুকে জিজ্ঞাসাবাদের সব তথ্য রেকর্ড এবং খুনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার নানা ধরনের তথ্যপ্রমাণ উচ্চ মহলে পাঠান। অবশেষে উচ্চ মহলের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর গতকাল দুপুরে তাকে গ্রেপ্তার দেখায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরে তাকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হলে আদালত ৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। 

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ খুনের সঙ্গে ঝিনাইদহের আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতা জড়িত। জেলার ওপরের সারির নেতাদের নির্দেশে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে মিন্টুকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে। এ কারণে তাকে রিমান্ডের প্রয়োজন হয়েছে। মিন্টু এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত- ডিবি তার অকাট্য প্রমাণ পেয়েছে। আর তা হলো, মিন্টু ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক কাজী কামাল আহমেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবুর দুটি মোবাইল ফোন অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় নষ্ট করেছেন। দুটি ফোনের মধ্যে একটি আইফোন। আরেকটি স্যামসাং কোম্পানির স্মার্টফোন। গ্যাস বাবু পুলিশের রিমান্ডে বলেছেন, তিনি তার দুটি ফোন জেলা সেক্রেটারি মিন্টুকে দিয়েছেন। এতেই সন্দেহে হয় মামলার তদন্তকারীদের। পরে মিন্টুকে আটক করার পর তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, গ্যাস বাবুর মোবাইল ফোন দুটি কোথায়? তিনি উত্তরে বলেন, ওই দুটি মোবাইল ফোন তার কাছ থেকে হারিয়ে গেছে। কিন্তু মিন্টুর এই চালাকি গোয়েন্দাদের কাছে ধরা পড়ে যায়। এতে ফেঁসে যান তিনি। 

অবশেষে তিনি স্বীকার করেন, মোবাইল দুটি তিনি নষ্ট করে ফেলেছেন। কেন নষ্ট করে ফেলেছেন, ডিবির পাল্টা জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ছিলেন নীরব। পরে স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, ওই দুই মোবাইলে আনার হত্যাকাণ্ডের ছবি, হত্যার মিশন বাস্তবায়ন করার দিকনির্দেশনা, কল রেকর্ড ও খুনিদের নানা দিকনির্দেশনা থাকার কারণে তিনি ওই মোবাইল ফোন নষ্ট করে ফেলেছেন। মোবাইল ফোন নিয়ে চালাকিসহ আরও কিছু বিষয়ে তার এই খুনের সঙ্গে ইন্ধন থাকার প্রমাণ পাওয়ায় তিনি ফেঁসে গেছেন। ওই দুই ফোনের ডিভাইস থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি না, তার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন মামলার তদন্তকারীরা। অবশেষে উচ্চ মহলের গ্রিন সিগনালের পর তাকে গ্রেপ্তার দেখায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। পরে ডিবি পুলিশ তাকে আদালতে হাজির করলে আদালত ৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। 

গত ১৩ মে কলকাতার একটি ফ্ল্যাটে খুন হন ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম। ২২ মে আনোয়ারুল আজীম আনারকে হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণের অভিযোগে তার মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন বাদী হয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন। পরে পুলিশ এ মামলায় গ্রেপ্তার করেন শিলাস্তি, আমানুল্লাহ ওরফে শিমুল ভূঁইয়া ও তানভীর ভূঁইয়া ওরফে ফয়সাল সাজিকে। পরে আদালত শিলাস্তিসহ মোট তিনজনকে আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। প্রথম দফায় রিমান্ডে কিছু তথ্যের ঘাটতি থাকার কারণে ডিবি পুলিশ গত ৩১ মে পুনরায় আদালতে আসামিদের হাজির করে আবার রিমান্ডের আবেদন করে। শিমুল ভূঁইয়া তার জবানবন্দিতে গ্যাস বাবুর কথা বলেন। গ্যাস বাবু আবার মিন্টুর এ খুনের জড়িত হওয়ার কথা মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের জানান। পরে মঙ্গলবার ধানমন্ডি এলাকা থেকে মিন্টুকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তবে গত বুধবার পর্যন্ত তার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি পুলিশ। অবশেষে গতকাল বৃহস্পতিবার ডিবি পুলিশ মিন্টুকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। 

এ বিষয়ে আনার হত্যা মামলার মুখ্য সমন্বয়কারী ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ গতকাল বিকেলে খবরের কাগজকে বলেন, ‘সব তথ্য পর্যালোচনা করে আনার হত্যাকাণ্ডে মিন্টুকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। মিন্টু ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে অনেক তথ্য গোপন করার কারণে তাকে রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হয়েছে।’ 

মামলার তদন্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত ডিবির একাধিক কর্মকর্তা জানান, মিন্টু মোবাইল ফোন নিয়ে লুকোচুরি করায় তিনি ধরা পড়েছেন। গ্যাস বাবুর বিকাশ নম্বরে ৫ দিনে সাড়ে ৪ লাখ টাকা লেনদেনের কথা স্বীকার করেছেন মিন্টু। এই টাকা এমপি আনারকে খুনের জন্য বিভিন্ন কাজে তারা ব্যবহার করেছেন। ডিবির কর্মকর্তারা তদন্ত করে দেখেছেন, এই দুই মোবাইলে দীর্ঘক্ষণ কথা হয়েছে। আবার দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ফোনগুলো অফ ছিল। এতে সন্দেহ বাড়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাদের। 

সূত্র জানায়, আনার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মিন্টুকে জিজ্ঞাসাবাদের পর আরও তিন নেতার নাম উঠে আসে। তাদের ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে ডাকা হয়েছে। জানা গেছে, ওই তিন নেতা হলেন ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা, কালীগঞ্জ ছাত্রলীগের এক নেতা ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের এক নেতা। তবে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে একজনকে সন্দেহ হয়েছে ডিবির। ওই নেতা হলেন জেলা আওয়ামী লীগের নেতা। তার মোবাইল ফোনটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। তিনি ঘটনার পর কোথায় ছিলেন, তা জানতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি অসংলগ্ন কথা বলেছেন। 

সূত্র জানায়, দিনভর মিন্টুকে ছাড়াতে নানা তদবির করেন ক্ষমতাসীন দলের দুই শীর্ষ নেতা। একজন ঢাকার এমপি, আরেকজন খুলনা বিভাগের এমপি। তবে খুলনা বিভাগের এমপির দৌড়ঝাঁপ লক্ষ করার মতো ছিল। তিনি বিভিন্ন স্থানে দৌড়ঝাঁপ করে মিন্টুর নেতা-কর্মীদের আশ্বাস দিয়েছিলেন, মিন্টুর কিছু হবে না। ডিবি থেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছাড়া পাবেন। কিন্তু মিন্টুকে গতকাল ডিবি গ্রেপ্তার দেখানোর পর মিন্টুর অনুসারীদের মধ্যে হতাশা নেমে আসে। মিন্টু গ্রেপ্তার হওয়ার পর অনুসারীরা আর কারও কথায় আশা রাখতে পারেননি। অবশেষে হাল ছেড়ে দেন তারা। মিন্টুর অনুসারীদের ধারণা, খুনের সঙ্গে মিন্টুর সম্পৃক্ততার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েই তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছে ডিবি পুলিশ। 

নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ শুদ্ধাচার পুরস্কারে অশুদ্ধতা!

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ০৩:৩৩ পিএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ০৫:০২ পিএম
শুদ্ধাচার পুরস্কারে অশুদ্ধতা!

রাষ্ট্র-সমাজে ন্যায়-সততা প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে শুদ্ধাচার কৌশলের অংশ হিসেবে সরকারি কর্মকর্তাদের পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা চলে আসছে ২০১৭ সাল থেকে। সততা, ন্যায়-নিষ্ঠাসহ শুদ্ধাচার চর্চায় সেরাদের পুরস্কৃত করা হয়। কিন্তু পুরস্কারপ্রাপ্তদের অনেকেই অসৎ ও দুর্নীতিতে অভিযুক্ত। এ অবস্থায় এই পুরস্কার দেওয়ার প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। পুরস্কারপ্রাপ্তদের পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে, এ প্রক্রিয়ায় বিচারকের ভূমিকায় যারা আছেন তাদের সততা, নিরপেক্ষতা ও শুদ্ধতা নিয়ে। বিশেষ করে সম্প্রতি বহুল আলোচিত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেওয়া শুদ্ধাচার পুরস্কারের প্রক্রিয়া নিয়ে চলছে নেতিবাচক আলোচনা। 

এর আগে দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত থাকা অবস্থায় ঢাকা বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুনকে পুরস্কার দেওয়া নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল। তার আগে নৈতিক স্খলনের প্রেক্ষাপটে জামালপুরের সাবেক ডিসি আহমেদ কবীরের শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রত্যাহারের দাবি উঠেছিল জোরেশোরে। 

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পুরস্কার দেওয়ার ক্ষেত্রে বিচারকের ভূমিকায় যারা থাকবেন তাদের পরিপূর্ণ শুদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে এবং এ ধরনের পুরস্কার দেওয়ার আগে মনোনীত কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিষয়ে সার্বিক তথ্য সংগ্রহ ও প্রয়োজনীয় খোঁজখবর নেওয়া উচিত। বিশেষজ্ঞরা খবরের কাগজকে জানান, এসব পদক দেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু প্রক্রিয়াগত ত্রুটি নিয়ে ভাবলে চলবে না, ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থান করা  প্রভাবশালী, শক্তিধর ব্যক্তিদের নৈতিক মান নিয়েও প্রশ্ন তুলতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা ছাড়া এ ধরনের স্খলনের কোনো সুরাহা হবে না। 

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের দুর্নীতি ও বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পর শুদ্ধাচার পুরস্কার দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে দেশব্যাপী ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র যখন বেনজীর আহমেদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর সাড়ে ছয় মাস পর ২০২২ সালে তাকে সততা, নিষ্ঠা ও শুদ্ধতাসহ ১৮টি গুণাবলির ধারক হিসেবে ‘শুদ্ধাচার পুরস্কার’ দেওয়া হয়। তাকে দেওয়া শুদ্ধাচার পুরস্কার এখন প্রত্যাহারের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহলে।

এদিকে ২০২২ সালে ঢাকা বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুনকে দেওয়া শুদ্ধাচার পুরস্কার নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। যে সময় তাকে পুরস্কারটি দেওয়া হয় ঠিক সেই সময় তিনি দুর্নীতিতে অভিযুক্ত ছিলেন। তার অন্তত সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর মধ্যে ৩ কোটি ৬১ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ। দুদকে জমা দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে তিনি প্রায় দুই কোটি টাকার সম্পদের তথ্যও গোপন করেন। অথচ মামলার তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় সততা, নিষ্ঠাসহ ১৮টি গুণাবলির ভিত্তিতে তাকে দেওয়া হয় শুদ্ধাচার পুরস্কার।

এর আগে ২০১৯ সালের আগস্টে নারী অফিস সহকারীর সঙ্গে আপত্তিকর ভিডিও প্রকাশের ঘটনায় বরখাস্ত হন জামালপুরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক আহমেদ কবীর। এর মাত্র দুই মাস আগে বিভাগীয় শুদ্ধাচার পুরস্কার পান তিনি।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শৌচাগার নির্মাণ প্রকল্পে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করে ৩৬০ কোটি টাকা আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও চাকরিতে পদোন্নতির ক্ষেত্রে জালিয়াতিসহ ১০ ধরনের অভিযোগ অনুসন্ধান চলমান থাকা অবস্থায় ২০২০ সালে শুদ্ধাচার পুরস্কার পান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী (বর্তমানে অবসর) সাইফুর রহমান। এ নিয়ে দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মোনায়েম হোসেন ২০১৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সাইফুর রহমানের দুর্নীতির তথ্যউপাত্ত চেয়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি পাঠান। অনুসন্ধান শেষে মামলাও করা হয়। 

বিভাগীয় মামলায় অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় শাস্তি (তিরস্কার) দেওয়া হয় বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক মোহাম্মদ মাহফুজুল ইসলাম ভূঞা। তাকে ২০২০ সালে শুদ্ধাচার পুরস্কার দেওয়া হয়।

এ ধরনের অনেক কর্মকর্তা আছেন যারা দুর্নীতি, অনিয়ম ও নৈতিক স্খলনের দায়ে অভিযুক্ত হয়েও হাসিল করেছেন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ শুদ্ধাচার পুরস্কার। আবার পুরস্কার পাওয়ার পর অনেকেরই অনিয়ম, দুর্নীতি ও নৈতিক স্খলনের বিষয়গুলো প্রকাশ পেয়েছে।  

রাষ্ট্র-সমাজে ন্যায়-সততা প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকার ২০১২ সালে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল নির্ধারণ করে। কৌশলের অংশ হিসেবে ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত শুদ্ধাচার কর্ম-পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন অগ্রগতি পরিবীক্ষণ কাঠামো প্রণয়ন করা হয়। ২০১৭ সালে ‘সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়: জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল’ শীর্ষক নীতিমালা জারি করা হয়। রাষ্ট্রীয় নীতিমালার আওতায় দেশের সরকারি সব পর্যায়ে শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠায় সৎ, নিষ্ঠাবান ও দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারী বাছাই করতে শুদ্ধাচার পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়। 

এ জন্য ২০১৭ সালের ৬ এপ্রিল ‘শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রদান নীতিমালা’ জারি করা হয়। এ-সংক্রান্ত গেজেটের ৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নীতিমালায় বর্ণিত সূচকের ভিত্তিতে এবং প্রদত্ত পদ্ধতি অনুসরণ করে এ পুরস্কার দেওয়ার জন্য প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী বাছাই বা নির্বাচন করা হবে। পুরস্কার  দেওয়ার জন্য সুপারিশ করার ক্ষেত্রে শুদ্ধাচার চর্চার জন্য নির্ধারিত গুণাবলির ১৮টি সূচকের প্রতিটির জন্য ৫ নম্বর করে মোট ৯০ নম্বর এবং মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, দপ্তর বা সংস্থার ধার্য করা অন্যান্য কার্যক্রমে ১০ নম্বরসহ মোট ১০০ নম্বর বিবেচনা করা যেতে পারে।’ 

শুদ্ধাচার পুরস্কারের ১৮টি গুণাবলির মধ্যে রয়েছে, পেশাগত জ্ঞান, দক্ষতা ও সততার নিদর্শন স্থাপন করা, নির্ভরযোগ্যতা ও কর্তব্যনিষ্ঠা, শৃঙ্খলাবোধ, সহকর্মীদের সঙ্গে আচরণ, সেবাগ্রহীতার সঙ্গে আচরণ, প্রতিষ্ঠানের বিধিবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা, সমন্বয় ও নেতৃত্বদানের ক্ষমতা, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যাবহারে পারদর্শিতা, পেশাগত স্বাস্থ্য ও পরিবেশবিষয়ক নিরাপত্তা সচেতনতা, ছুটি গ্রহণের প্রবণতা, উদ্ভাবনী চর্চার সক্ষমতা, বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি বাস্তবায়নে তৎপরতা, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার, স্বতঃপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশে আগ্রহ, উপস্থাপন দক্ষতা, ই-ফাইল ব্যবহারে আগ্রহ, অভিযোগ প্রতিকারে সহযোগিতা করা। 

গেজেটে বলা হয়েছে, শুদ্ধাচার পুরস্কার পাওয়ার জন্য ১০০ নম্বরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অবশ্যই ৮০ নম্বর পেতেই হবে। ওই নম্বর না পেলে ওই কর্মচারী এই পুরস্কার পাওয়ার জন্য প্রাথমিকভাবে বিবেচিত হবেন না। তবে বিবেচিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া কর্মচারী শুদ্ধাচার পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হবেন। সিনিয়র সচিব বা সচিবদের মধ্যে এই পুরস্কার পাওয়ার জন্য যোগ্য কর্মচারী নির্বাচনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত বাছাই কমিটি শুদ্ধাচার পুরস্কারের জন্য কর্মচারী চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করবে। 

তবে আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধানদের ভেতর থেকে কর্মচারী বাছাইয়ের জন্য আঞ্চলিক প্রধানের নেতৃত্বে, জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা বাছাইয়ের জন্য আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধানের নেতৃত্বে, উপজেলা পর্যায়ের কর্মচারী বাছাইয়ের জন্য জেলা কার্যালয়ের প্রধানদের নেতৃত্বে পৃথক বাছাই কমিটি থাকবে। 

আরও পড়ুন : 

নির্বাচন-প্রক্রিয়া সৎভাবে মানা হচ্ছে না

শুদ্ধাচার পুরস্কার পাওয়া প্রশ্নবিদ্ধ

এটা এখন মূল্যহীন আনুষ্ঠানিকতা

জ্বালানি তেল চুরি রোধে বসানো হচ্ছে ট্র্যাকিং সিস্টেম

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ০২:০৫ পিএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ০২:১২ পিএম
জ্বালানি তেল চুরি রোধে বসানো হচ্ছে ট্র্যাকিং সিস্টেম

চুরি ও ভেজাল রোধে ট্যাংক লরিতে বসানো হচ্ছে ট্র্যাকিং সিস্টেম। মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে এই ট্র্যাকিং সিস্টেম বসানোর জন্য কাজ করছে দেশীয় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কল্পলোক টেকনোলজিস। চলতি মাসের শেষ নাগাদ এই ট্র্যাকিং সিস্টেম বসানোর কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। ১ জুলাই থেকে ট্যাংক লরিতে ট্র্যাকিং সিস্টেম না থাকলে কোনো ডিপো থেকে তেল নিতে পারবে না জ্বালানি তেল বহন করা এই পরিবহন।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য ২ হাজার ৮০০ নিবন্ধিত ট্যাংক লরি রয়েছে। এ ছাড়া আরও ১০০টি ট্যাংকার আছে।

সম্প্রতি খবরের কাগজকে এসব তথ্য জানিয়েছেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের পরিচালক (বিপণন) কবির মাহমুদ। তিনি জানান, জ্বালানি তেল পরিবহনের সময় চুরি হওয়ার মতো ঘটনা যেমন ঘটে, তেমনি এসব লরি ভেজাল তেল পরিবহন করলেও কারও কিছু করার থাকে না। তাই ট্যাংক লরিতে তেল চুরি ও ভেজাল প্রতিরোধে বসানো হচ্ছে ট্র্যাকিং সিস্টেম। গত মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে এই ট্র্যাকিং সিস্টেম বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত ৪০০ গাড়িতে এই ট্র্যাকিং সিস্টেম বসানো হয়েছে। এই ট্র্যাকিং সিস্টেম বসাতে প্রতি গাড়িতে খরচ পড়ছে ৩ হাজার ১০০ টাকার বেশি। এই খরচ বহন করবেন গাড়ির মালিকরা। প্রাথমিক অবস্থায় ২ হাজার ৮০০ নিবন্ধিত ট্যাংক লরিতে এই ট্র্যাকিং সিস্টেম বসানো হবে এবং চলতি মাসের শেষ নাগাদ কাজ শেষ হবে। ১ জুলাই থেকে ট্যাংক লরিতে ট্র্যাকিং সিস্টেম না থাকলে কোনো ডিপো থেকে তেল নিতে পারবে না।

তিনি আরও জানান, এ ছাড়া ট্যাংকারে বসানো হবে ডিজিটাল লক। ট্যাংক লরিতে ট্র্যাকিং সিস্টেম বসানো শেষ হলেই ট্যাংকারে ডিজিটাল লক বসানোর কাজ শুরু হবে।

জ্বালানি বিভাগে দুই মাস আগে ট্যাংক লরিতে ট্র্যাকিং সিস্টেম ও ট্যাংকারে ডিজিটাল লক সংযোজন করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে জ্বালানি সচিব নূরুল আমিন অবিলম্বে ট্যাংক লরিতে ট্র্যাকিং সিস্টেমের সঙ্গে ডিজিটাল লক স্থাপনের নির্দেশ দেন।

এ বিষয়ে জ্বালানি সচিব খবরের কাগজকে বলেন, ট্যাংক লরি ও ট্যাংকারের তেল চুরি এবং ভেজাল তেল মেশানোর ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন পেট্রল পাম্পে অভিযান চালিয়ে ওজনে কম দেওয়া ও ভেজাল তেল মেশানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের এই অবৈধ কারবার বন্ধে নতুন এই উদ্যোগ নিয়েছে সরকার, যা চলমান রয়েছে। প্রথমে ট্যাংক লরিতে ট্র্যাকিং সিস্টেম বসানো হচ্ছে। এরপর ট্যাংকারে ডিজিটাল লক বসানোর কাজ শুরু হবে।

জ্বালানি সচিব বলেন, ট্র্যাকিং সিস্টেম ও ডিজিটাল লক বসানো হলে কেউ ইচ্ছা করলেই ট্যাংক লরি খুলে তেল চুরি করতে পারবে না। লক খুললেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে দায়িত্বরত ব্যক্তির কাছে সংকেত পৌঁছে যাবে। এ ছাড়া একই সঙ্গে মালিক দেখতে পারবেন কোথায় ট্যাংক লরিটি রয়েছে।

জ্বালানি তেল ও সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য ইতোমধ্যে সরকার জ্বালানি বিক্রয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জিপিএস ম্যাপিং করেছে। এবার জ্বালানি পরিবহনকে ডিজিটালাইজেশন করার মধ্য দিয়ে চুরি ও ভেজাল ঠেকাতে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে এখন প্রশ্ন হচ্ছে চুরি ও ভেজাল ঠেকাতে এই ট্র্যাকিং সিস্টেম ও ডিজিটাল লক কতটা কাজে আসবে। চুরি ঠেকাতে এই ট্র্যাকিং সিস্টেম কতটা কাজে আসবে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের পরিচালক (বিপণন) কবির মাহমুদ বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জেনে-বুঝে ট্যাংক লরি ও ট্যাংকারে ট্র্যাকিং সিস্টেম ও ডিজিটাল বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই পদ্ধতি যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে চুরি ও ভেজাল রোধ করা যাবে বলে আমরা আশাবাদী।’

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ট্র্যাকিং সিস্টেম ও ডিজিটাল লক বসালেই যে চুরি বন্ধ হয়ে যাবে এমন নয়। এমনও হতে পারে দেখা যাবে, যারা চুরি করে তারা নিজেরাই এই ডিজিটাল লক বা ট্র্যাকিং সিস্টেম নষ্ট করে ফেলবে। দেখা যাবে পরে তারা নিজেরাই বলবে কোনো কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। তাই এ ধরনের উদ্যোগ শতভাগ সফল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

ট্যাংক লরি ও ট্যাংকারের একাধিক ব্যবসায়ী খবরের কাগজকে বলেন, ‘জ্বালানি তেল চুরি, ভেজাল মেশানো ও ওজনে কম দেওয়া নতুন নয়। কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ীর এই অবৈধ কারবারের কারণে আমরা যারা সততার সঙ্গে ব্যবসা করতে চাই তারা অনেক সমস্যায় আছি।’ তবে সরকারের নতুন এই উদ্যোগে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। এতে চুরি ও ভেজাল কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আসবে বলেও জানান তারা।

এ বিষয়ে কথা হয় আসাদগেট সোনার বাংলা সার্ভিস স্টেশনের ম্যানেজার হিমালয় মণ্ডলের সঙ্গে (ডিলার যমুনা অয়েল কোম্পানি)। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, সোনার বাংলা সার্ভিস স্টেশনের ট্যাংক লরিগুলোতে ট্র্যাকিং সিস্টেম লাগানোর কাজ চলছে। এ ছাড়া বেশ কয়েকটিতে লাগানো হয়েছে। জ্বালানি তেল ওজনে কম দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সবই ডিজিটাল মিটার, ওজনে কম দেওয়ার সুযোগ নেই।

কল্পলোক টেকনোলজিসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম নাজমুল হাসান খবরের কাগজকে জানান, জ্বালানি তেল বহনকারী সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের পরিবহনকে ট্র্যাকিং সিস্টেম ও ডিজিটাল লকের আওতায় আনবে সরকার। কল্পলোক এখন ট্যাংক লরিতে ট্র্যাকিং সিস্টেম বসানোর কাজ করছে। এই ট্র্যাকিং সিস্টেমের মাধ্যমে ট্যাংক লরি যে রুট দিয়ে চলবে তার অবস্থান জানা যাবে। তবে ট্যাংক লরি যদি নির্দিষ্ট রুট দিয়ে না গিয়ে অন্য রুট ব্যবহার করে, কোথায় দাঁড়িয়ে তেল চুরির চেষ্টা করে, তখন দায়িত্বরত ব্যক্তির কাছে একটি সংকেত যাবে। এই পদ্ধতিতে চুরি ও ভেজাল রোধ করা সম্ভব বলেও জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘একটি ট্যাংক লরি যদি তেল চুরি করতে চায়, তখন অবশ্যই তাকে একটি নিরাপদ জায়গায় পার্কিং করে তেল চুরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে যাত্রাপথে রাস্তায় দাঁড়িয়ে তেল চুরি না করাই স্বাভাবিক। পরিবহন করা কোনো গাড়ি যদি মূল রুট থেকে অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া হয়, সে ক্ষেত্রে অনুমান করা সহজ হবে চুরি হচ্ছে কি না। তাই ট্র্যাকিং সিস্টেম চুরি রোধে সহায়ক হবে বলে আমরা মনে করি।’

উপসচিবের অত্যাচারে অতিষ্ঠ প্রতিবেশীরা…

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ০১:০৫ পিএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ০১:০৬ পিএম
উপসচিবের অত্যাচারে অতিষ্ঠ প্রতিবেশীরা…
লোকমান আহমেদ

কোনো কিছুতেই হম্বিতম্বি থামছে না শিল্প মন্ত্রণালয়ের সাময়িক বরখাস্ত উপসচিব লোকমান আহমেদের। তার দুর্ব্যবহারে অতিষ্ঠ প্রতিবেশীরা। খারাপ আচরণের অভিযোগে ইতোমধ্যে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন। সরকারি কোয়ার্টার থেকে উচ্ছেদের নোটিশ পেয়েছেন। কিন্তু তা তিনি থোরাই কেয়ার করছেন।

কয়েক দিন আগে বাসার সামনে একজন প্রতিবেশীর দিকে থুথু নিক্ষেপ করেন লোকমান আহমেদ। শান্তিনগর বাজার থেকে বাসার নিচে ফিরে নিজেকে বড় কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে রিকশাওয়ালাকে ভাড়া কম দেন। নিরুপায় রিকশাচালক অনুরোধের সুরে কিছু বলতে চাইলে ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দেন। সর্বশেষ গত ২৩ মে বৃহস্পতিবার সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় প্রতিবেশী এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে গালাগাল করেন তিনি।

তার আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে এ পর্যন্ত রাজধানীর একাধিক থানায় ১৪টি জিডি করেছেন ভুক্তভোগী প্রতিবেশীরা। তার পরও কোনো সুরাহা না পেয়ে অনেকেই বাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। এসব ঘটনায় অভিযুক্ত উপসচিবকে কোয়ার্টার থেকে উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়া হলেও আমলে নিচ্ছেন না। যদিও গত ১৬ মার্চ ‘কোনো উপদ্রব তৈরি করব না’ উল্লেখপূর্বক চিঠি দিয়ে এক মাসের জন্য সময় বাড়িয়ে নেন। কিন্তু কথা রাখেননি তিনি। প্রায় দেড় মাস হতে চললেও একদিকে বাসা যেমন ছাড়ছেন না, অন্যদিকে নানা আপত্তিকর ও অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করেই যাচ্ছেন। যার শিকার হচ্ছেন প্রতিবেশীরা। তার আচরণে অতিষ্ঠ একাধিক প্রতিবেশী নানা ধরনের অভিযোগ জানালেও যেন প্রতিকার মিলছে না। তার বিরুদ্ধে হুমকি-ধমকি, গালিগালাজ, প্রতিবেশীর দরজায় লাথি মারা, মারতে উদ্যত হওয়া, নিরাপত্তারক্ষী ও গাড়িচালকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারসহ বিস্তর অভিযোগ রাজধানীর বেইলি রোডের সরকারি অফিসার্স কোয়ার্টারে বসবাসকারী অনেকের। এসব ঘটনায় আতঙ্কিত প্রতিবেশীরা নিজের ও সন্তানদের নিরাপত্তায় পুলিশের সহায়তা চেয়ে বিভিন্ন সময় রমনা ও মতিঝিল থানায় জিডি করেন। অনেক অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়।

লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালের ১৫ এপ্রিল লোকমান আহমেদকে সাময়িক বরখাস্ত করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। দণ্ড দেওয়ার প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপসচিব (সাময়িক বরখাস্ত হওয়া) লোকমান আহমেদ বেইলি স্কয়ার অফিসার্স কোয়ার্টারের একটি বাসায় বসবাস করেন। তার পার্শ্ববর্তী বাসায় বসবাসকারী ডা. শেখর কুমার মণ্ডল ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ এবং নিজেকে সচিব বা যুগ্ম সচিব বা এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয়ের মাধ্যমে পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’ অনুযায়ী ‘অসদাচরণের’ অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে বিভাগীয় মামলায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ২০২১-এর ১৫ এপ্রিল অভিযোগনামা ও অভিযোগ বিবরণী জারির মাধ্যমে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। ওই বছরের ৯ ডিসেম্বর লিখিতভাবে দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব দেন তিনি। পরে জবাব ও তদন্ত প্রতিবেদনসহ অভিযোগের গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি বিবেচনা করে ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’ অনুযায়ী তাকে ‘তিন বছরের জন্য বেতন গ্রেডের নিম্নতর ধাপে অবনমিতকরণ’-এর লঘুদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ওই সময় তার সাময়িক বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহার করা হয়।

এ ছাড়া ২০২১ সালের ১৩ এপ্রিল লোকমান আহমেদকে সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের সহকারী পরিচালক বুলবুল হাছান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়, আপনার বিরুদ্ধে উপদ্রব সৃষ্টি করে আবাসন এলাকায় বসবাসের পরিবেশ নষ্ট করার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ১৬/১১ বেইলি স্কোয়ারের বাসার বরাদ্দ নির্দেশক্রমে বাতিল করা হলো। পত্র জারির সাত কর্মদিবসের মধ্যে বাসা খালি করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করার অনুরোধ জানানো হয়। অন্যথায় পরবর্তী সময়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও উল্লেখ করা হয় ওই চিঠিতে। 

কিন্তু এ চিঠি আমলেই নেননি ২৪তম বিসিএসের প্রশাসন ক্যাডারের এই কর্মকর্তা। বরং কোয়ার্টারের বাসিন্দাদের নাজেহাল করছেন এখনো। তার ভয়ে স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারছেন না তারা। এর আগে তাকে উচ্ছেদ করতে গেলে তাদের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করেন।

ভুক্তভোগী এক সরকারি কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘নিরুপায় হয়ে জিডি করেছিলাম। কিন্তু লাভ হয়নি। তিনি মনে হয় কোনো দিন ভালো হবেন না। তার আচরণও ভালো হবে না। এমনভাবে তাকান, এমনভাবে চলাফেরা করেন, যা বলার নয়। সন্তানদের সামনে মা-বাবাকে গালাগাল করেন। আমরাই পাশ কাটিয়ে চলি। কেউ কেউ বাসা ছেড়ে গেছেন। কিন্তু চাইলেই তো সবাই অন্য কোথাও যেতে পারেন না। দারোয়ান, ড্রাইভার, গার্ড কেউই তার হাত থেকে রেহাই পান না। তিনি কিছুটা হয়তো মানসিকভাবে অসুস্থ; কিন্তু নিজের জায়গায় তিনি খুবই ঠিক থাকেন, সচেতন থাকেন। এটাকে কী বলবেন?’ 

আরেক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, ‘সবার সঙ্গে তিনি ঝামেলা করেন। এখানে সবার মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। কখন কী যে করে বসেন। তার হয়তো চিকিৎসা দরকার। কিন্তু পরিবারই তো দায়িত্ব নিচ্ছে না। বরং তারাও এখন অনেকটা তার মতোই হয়ে যাচ্ছে।’ 
তার বিরুদ্ধে জিডি করা কোয়ার্টারের আরেক বাসিন্দা জানান, অনেককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছেন লোকমান আহমেদ। অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করেছেন অনেককে। হত্যার হুমকি দেন। কেউ প্রতিবাদ করলেই বলেন তিনি অ্যাডমিন ক্যাডারের কর্মকর্তা। তার কিছুই হবে না। একজন চিকিৎসককে মারতে উদ্যত হয়েছেন। তার ব্যাচের দু-একজন পেছনে তাকে প্রশ্রয় দেন বলেও জানতে পেরেছেন তারা। 

আলাপকালে আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘তার কিছুটা মানসিক অসুস্থতা হয়তো আছে। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা ওনার মধ্যে অহংকার খুব কাজ করে। আমাদের এখানকার অনেকের অফিসের নম্বর নিয়ে নিজে ফোন করে বড় কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে হুমকি দেন। এক কথায় আমরা আসলে এক বাজে পরিস্থিতির মধ্যে আছি।’ 

এসব বিষয়ে কথা বলতে লোকমান আহমেদকে ফোন করার পর সাংবাদিক পরিচয় শুনে বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকেন। কয়েকবার প্রশ্ন করার পরও কথা না বলে নীরব থাকেন। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। 

এদিকে আবাসন অধিদপ্তরের পরিচালক শহীদুল ইসলাম ভূঁইয়া খবরের কাগজকে বলেন, ‘এটা নিয়ে আমরাও বেশ অসুবিধায় আছি। আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করব।’

রাজধানীর হাটে বাড়ছে পশু, ক্রেতা কম

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ১২:১১ পিএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ১২:২০ পিএম
রাজধানীর হাটে বাড়ছে পশু, ক্রেতা কম
রাজধানীতে বৃহস্পতিবার থেকে বসেছে পশুর হাট। তেজগাঁও তিব্বত বাসস্ট্যঅন্ডসংলগ্ন কলোনি বাজার হাটটি সড়কে বিস্তৃত হওয়ায় যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। ছবি: খবরের কাগজ

আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে গত বুধবার (১২ জুন) রাত থেকেই আসতে শুরু করেছে গরু, ছাগল, মহিষসহ অন্যান্য পশু। তবে হাটে ক্রেতার আনাগোনা কম থাকায় এখনো কেনাবেচা জমে ওঠেনি। তবে ব্যবসায়ী ও হাটের ইজারাদাররা আশা করছেন শুক্রবার (১৪ জুন) থেকে হাটে পশু বিক্রির ধুম পড়বে।

অন্যদিকে প্রতিবারের মতো এবারও রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে দালাল ও চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য রয়েছে। এক হাটের পশু অন্য হাটে নেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে হাটের ইজারা যারা নিয়েছেন তাদের কর্মীদের বিরুদ্ধে। তাদের ধরতে পুলিশ সচেষ্ট হয়েছে। এ ছাড়া হাটে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগও রয়েছে। ক্রেতা বলছেন দাম চড়া, বিক্রেতারা বলছেন ক্রেতা কম। 

গাবতলী পশুর হাটে রংপুর থেকে গরু নিয়ে ঢাকায় এসেছেন তারা মিয়া। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘দুই দিন আগে হাটে আসলাম। আমার গরুর দাম হবে ১০ লাখ। এর মধ্যে দুজন ৭ লাখ দাম বলেছেন।’ 

এদিকে তারা মিয়ার গরুর দরদাম করা খলিল জানান, গরুর দাম বেশি। এত দাম দিয়ে কেনা সম্ভব নয়। 

গরু নিয়ে হাটে এসে বিভিন্ন ভোগান্তিতে পড়ছেন বেপারিরা। একে তো পথে পথে দিতে হচ্ছে দফায় দফায় চাঁদা, তার ওপর আবার হাটের যে স্থানে পশু রাখা হবে, সেসব স্থানে গরু রাখার জন্য ভালো জায়গা পেতে একটি গরুতে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে। অতিরিক্ত এসব টাকা দেওয়া রীতিমতো অত্যাচার বলে জানান গরুর বেপারিরা। তবে হাট কর্তৃপক্ষ বলছে, বিক্রেতারা একটু বাড়িয়ে বলছেন।

গরুর বেপারি ও বিক্রেতারা বলছেন, দোলাইরপাড় রোডে গরুর ট্রাক এলেই ২০ থেকে ২৫ জন যুবক ট্রাকে হামলা করে। তাদের প্রত্যেকের হাতে থাকে ছোট ছোট লাঠি। বেশ কয়েকজনের গায়ে ইজারাদার লেখা এবং হলুদ পোশাক পরিহিত। তারা ট্রাক আটকে ঈদের খরচ দাবি করে। তবে তাদের ভাষ্য এটা চাঁদা না, ঈদের বোনাস! ট্রাকচালককে ওই যুবকরা হুমকি দিয়ে বলে, টাকা না দিলে ট্রাক ছাড়া হবে না।

ঢাকা মহানগর পুলিশও জানিয়েছে, হাটের লোক, গরু বিক্রেতা এবং ব্যবসায়ীরা বলেছেন ঢাকার কয়েকটি পথে গরু নিয়ে প্রবেশ করলে কিছু যুবক চাঁদা দাবিসহ সমস্যা তৈরি করছে। তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

বৃহস্পতিবার (১৩ জুন) গাবতলী পশুর হাট পরিদর্শন শেষে বিভিন্ন বিষয়ে ব্রিফ করেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন। হাটে কোনো হয়রানি হলে হটলাইনে ফোন দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে আইজিপি বলেন, হাটে জাল টাকা শনাক্তকরণ মেশিন আছে। সমস্যা মনে হলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হেল্প করবে। কোরবানির পশুর হাটে কোনো হয়রানির ঘটনা ঘটলেই পুলিশের হটলাইন ৯৯৯-এ ফোন করে অভিযোগ জানাতে পারবেন ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই।

গরুর হাটের চাঁদাবাজির বিষয়ে আইজিপি বলেন, ‘উত্তরায় চাঁদাবাজির একটা ঘটনার বিষয়ে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। সঙ্গে সঙ্গে সেখানে আমাদের সদস্যরা গিয়েছেন। ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চাঁদাবাজির মামলা নেওয়া হয়েছে। আমরা কাউকে ছাড় দেব না। তবে কেউ যদি চাঁদাবাজি করতে চায়, তারা যেন প্রস্তুত হয়ে আসে। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বৃহস্পতিবার সরেজমিনে রাজধানীর গাবতলী, পোস্তগোলা শ্মশান ঘাট ও দনিয়া পশুর হাট ঘুরে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কোরবানির পশু এলেও ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি তেমন নেই। এবারের হাটে বিদেশি গরু বেশি দেখা গেছে। ভারত, নেপাল, মায়ানমারের গরুর পাশাপাশি রয়েছে মহিষ, ষাঁড়, ভুট্টি, উট ও দুম্বা। এ ছাড়া হাটের ভেতর গরু বাঁধার জন্য বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে শেড তৈরি করা হয়েছে। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কথা মাথায় রেখে বাড়তি বালু রাখা হচ্ছে হাটের ভেতর, যেন বৃষ্টি হলেও নির্বিঘ্নে মানুষ চলাচল করতে পারে। 

সরেজমিনে আরও দেখা যায়, পশুর হাটগুলোতে সারা দিন অসহনীয় গরম ও ধুলাবালির কারণে স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হলেও সন্ধ্যার পর বৃষ্টি নামার পর কিছুটা স্বস্তি পেলেও ভোগান্তি বাড়ে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের। এ ছাড়া প্রতি হাটেই নিরাপত্তার জন্য র‌্যাব, পুলিশ, ডিবি পুলিশ ও হাট কর্তৃপক্ষের শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন। হাটগুলোতে জাল নোট শনাক্তে ব্যাংকের বুথগুলোতে মেশিন রয়েছে। যে কেউ চাইলে নোট শনাক্ত করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে কোনো চার্জ দিতে হবে না। 

দালাল-চাঁদাবাজ ধরতে পুলিশ সচেষ্ট
কোরবানির ঈদে একটু ভালো দামে পশু বিক্রি করতে ঢাকামুখী হন গ্রামে থাকা পশু ব্যবসায়ী ও গবাদিপশু পালন করা উদ্যোক্তারা। কিন্তু পথে পথে তারা চাঁদাবাজদের খপ্পরে পড়েন। এ ছাড়া আরও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হন তারা।

বৃহস্পতিবার সরেজমিনে রাজধানীর উত্তর শাহজাহানপুর খিলগাঁও রেলগেটের পশুর বাজার, পোস্তগোলা শ্মশান ঘাট, কমলাপুর স্টেডিয়াম, দনিয়া কলেজসংলগ্ন, যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর কদমতলী, দোলাইরখাল ট্রাক টার্মিনালসংলগ্ন পশুর হাট ঘুরে এসব এলাকার একাধিক গরুর মালিক, ব্যবসায়ী ও পশু নিয়ে আসা ট্রাকচালকদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

বাগেরহাট থেকে ট্রাকে করে সাতটি গরু নিয়ে পদ্মা সেতু পার হয়ে ঢাকায় আসেন গরু ব্যবসায়ী মো. ইব্রাহীম মিয়া ও আজম আলী।

দোলাইরপাড় ট্রাক টার্মিনাল গরুর হাটে বৃহস্পতিবার দুপুরে ইব্রাহীম ও আজমের সঙ্গে কথা হয় খবরের কাগজের। এ সময় তারা অভিযোগ করে বলেন, ‘আমরা গত বছরের কোরবানি ঈদের সময় নিজ বিভাগ খুলনার হাটে ৯টি গরু বিক্রি করেছি। এবার গ্রামের লোকজন আমাদের বললেন গরু ঢাকায় নিয়ে গেলে চড়া দামে বিক্রি করা যাবে। এ জন্য আমরা দোলাইরপাড় হয়ে গাবতলীর হাটে যাচ্ছিলাম। কিন্তু রাত ১২টার দিকে কিছু লোক মোটরসাইকেলে এসে আমাদের দোলাইরপাড় হাটে গরু ওঠাতে বলেন। পরে আমরা বাধ্য হয়ে এখানেই গরু নিয়ে আসি। তা ছাড়া রাস্তায় ছোটখাটো চাঁদা দিতে দিতে ঢাকায় প্রবেশ করেছি। এখন মনে হচ্ছে ঢাকায় গরু নিয়ে আসা ভুল হয়েছে।’

ছোট ট্রাক ভাড়া করে নড়াইল জেলা থেকে একটি গরু নিয়ে ঢাকায় আসেন আকতার হোসেন। তিনি বলেন, ‘গরুর ট্রাক অনেক জায়গায় আটকানো হয়। নামে-বেনামে রাস্তায় চাঁদা দিতে হয়েছে। আমাদের চালক ঢাকার রাস্তা ভালো চেনেন না। ভুলে যাত্রাবাড়ী ব্রিজে উঠে পড়লে কমলাপুর গরুর হাটের ইজারাদারের কিছু লোক আমাদের গরুর ট্রাক কমলাপুরের হাটে নিতে বাধ্য করেন।’

তিনি বলেন, ‘আমরা উত্তরার হাটে গরু নিতে চেয়েছি। সেখানে আমাদের পরিচিত লোক ছিল।’

যশোরের গরু ব্যবসায়ী আবুল মিয়া জানান, ঢাকায় আসতে সব মিলিয়ে রাস্তায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে। 

সাতক্ষীরার আরেক গরু ব্যবসায়ী নজরুল জানান, গরু নিয়ে রাস্তায় বের হলে চাঁদাবাজ ও ইজারাদারদের লোকরা নাজেহাল করেন। তাদের চাঁদা না দিলে পথেই ওই সব হাটে গরু নামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

এ বিষয়ে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার আরাফাত ইসলাম বলেন, কোরবানির পশু বহনের যানবাহন থেকে কেউ যাতে চাঁদা বা হয়রানি না করতে পারে সে জন্য প্রতিটি পার্টে গোয়েন্দা নজরদারি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো ইজারাদার বা কেউ জড়িত থাকলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

হাট ছাড়াও অলিগলিতে বিক্রি হচ্ছে গরু
নির্ধারিত হাটের বাইরেও রাজধানীর বিভিন্ন বাজারসংলগ্ন অলিগলিতে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির পশু। হাটে দালালদের দৌরাত্ম্যসহ নানা ঝামেলা এড়াতে স্থানীয়ভাবে গরু কেনায় আগ্রহ রয়েছে ক্রেতাদের। বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, খিলক্ষেত কাঁচাবাজারের পাশে কয়েকজন বেপারি গরু বিক্রির জন্য রেখেছেন। চলার পথে অনেকের চোখে পড়ায় তারা এসে দরদাম করছেন। এখানে রাখা গরুর মাংস প্রায় সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় মণের বেশি হবে বলে জানাচ্ছেন বিক্রেতারা। মাঝারি আকারের হওয়ায় এগুলোর চাহিদাও বেশি। দাম হাঁকা হচ্ছে দেড় থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। অনেকে ১ লাখ আর কোনোটি ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত দরদাম করছেন।

এখানে বিক্রির জন্য ছয়টি গরু রেখেছেন জামালপুরের বাসিন্দা হালিম। খবরের কাগজকে তিনি বলেন, ‘হাটে বিভিন্ন ধরনের লোক থাকে। যারা কেনেন তারাও ভালো করে দেখতে পারেন না। আমি প্রতিবছর এখানেই সব গরু বিক্রি করে ফেলি। হাটে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এখানে যদি এবার বিক্রি করতে না পারি তাহলে হাটে নেব।’

তবে গরু বিক্রিতে লাভ তেমন নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এটা আমরা শখ থেকে করি। এখন গরুর খাবারের দাম অনেক বেশি। ভুসির কেজি ৬০ টাকা, লবণ ৪০ টাকা, ফিড ৮০ টাকা। এক বছর পালার পর সেভাবে লাভ থাকে না। এটা অভ্যাস হয়ে গেছে। এখানে আনতে ট্রাক ভাড়া গেছে ১৫ হাজার টাকা, প্রতিদিন খাবারে যাচ্ছে ৩ হাজার টাকা। আর আমাদের দুজনের খরচ আছে বিক্রি পর্যন্ত ১০ হাজার টাকা। সব হিসাব করলে এখানে লাভ নেই। তবে কোরবানির জন্য পছন্দ হলে অনেকে বেশি দাম দিয়েও নেয়।’

এ ছাড়া খিলক্ষেতের কাওলা ও দক্ষিণখানের বিভিন্ন অ্যাগ্রো ফার্ম থেকেও গরু বিক্রি হচ্ছে। এখান থেকে একটা সুবিধার জন্য গরু কিনতে আগ্রহী ক্রেতারা। কোরবানি দেওয়ার আগ পর্যন্ত এসব ফার্মে রাখতে পারেন ক্রেতারা। দক্ষিণখানে হাইজেনিক অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রি প্রজেক্টে কোরবানি উপলক্ষে শতাধিক পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রজেক্টের পরিচালক মাওলানা কেফায়েত উল্লাহ জানান, ইতোমধ্যে অর্ধেক গরু বিক্রি হয়ে গেছে। আশা করি বাকি গরুও বিক্রি হয়ে যাবে। 

বৃষ্টিতে দুর্ভোগ 
আনুষ্ঠানিকভাবে হাট শুরু হলেও বৃহস্পতিবার বিকেলের বৃষ্টিতে ক্রেতাদের দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। তবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা গরু-ছাগলে হাট পরিপূর্ণ হয়েছে। কিছু গরুর দেওয়া হয়েছে বিশেষ নাম। তেমনই একজোড়া গরুর নাম রাখা হয়েছে হিরো আলম ও কাবিলা। দাম হাঁকা হয়েছে ৯ লাখ টাকা। নাটোরের গুরুদাসপুর থেকে আনা গরু দুটির ওজন প্রায় ১৫ মণ। সাড়ে ৭ লাখ টাকা দাম পেলে বিক্রি করে দেবেন বলে জানিয়েছেন গরুর মালিক।

গরুর হাটের তথ্যকেন্দ্রে থাকা ইমরান মাহমুদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘বৃষ্টিতে একটু দুর্ভোগ হয়েছে। তবে আমরা শামিয়ানার ব্যবস্থা করেছি।’