ঢাকা ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪

এমপি আনার হত্যাকাণ্ডে আরও ২ নেতা জড়িত!

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৪, ১০:৫৩ এএম
আপডেট: ১১ জুন ২০২৪, ১২:১৩ পিএম
এমপি আনার হত্যাকাণ্ডে আরও ২ নেতা জড়িত!
এমপি আনোয়ারুল আজীম আনার

ঝিনাইদহের এমপি আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যাকাণ্ডে স্থানীয় নেতা কাজী কামাল আহমেদ ওরফে বাবু গ্রেপ্তার হওয়ার পর এ খুনের জট খোলা শুরু হয়েছে। আনার হত্যার ঘটনায় মামলার পর জেলা পুলিশ ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম স্থানীয় নেতাদের নজরদারিতে রেখেছিল। কার কার সঙ্গে এমপি আনারের বিরোধ ছিল তাদের বিস্তারিত বায়োডাটাও সংগ্রহ করা হয়েছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ে তদন্ত সম্পন্ন করেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ ছিল পুলিশের। পরে এ খুনের সঙ্গে জড়িত তানভীর ভূঁইয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদে স্থানীয় একাধিক ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের জড়িত হওয়ার বিষয়টিও উঠে আসে। পরে তানভীর আদালতে জবানবন্দিতে ঝিনাইদহ জেলার আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক কাজী কামাল আহমেদ ওরফে বাবুর নাম বলার পরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরই মধ্যে বাবুকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। 

তিনি এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে প্রাথমিকভাবে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন। তবে তার দেওয়া কিছু তথ্যে পুলিশের পিলে চমকেছে। 

এ খুনের সঙ্গে আরও দুজন নেতা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত আছেন বলে জানিয়েছেন বাবু। তার মধ্যে একজন জেলা যুবলীগের কার্যনির্বাহী সদস্য। ওই নেতার বাড়ি কালীগঞ্জ এলাকায়। আরেকজন কালীগঞ্জ পৌরসভার ছাত্রলীগের নেতা। ওই ছাত্রলীগের নেতা আনারের সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে ২ বছর আগে টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তাকে নিজ দল থেকে এমপি আনার বাদ দেন। তার বিরুদ্ধে থানায় প্রতারণার অভিযোগ দিয়েছিলেন। পরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের মধ্যস্থতায় সালিশি বৈঠকে বিরোধ মিটে গেলেও ভেতরে ভেতরে তার এই ক্ষোভ পুঞ্জীভূত করে রেখেছিলেন কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। মামলার তদন্তকারী এক কর্মকর্তা সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। 

গত ১৩ মে কলকাতার একটি ফ্ল্যাটে খুন হন ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার। তার আগে ২২ মে আনোয়ারুল আজীম আনারকে হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণের অভিযোগে তার মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন বাদী হয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন। পরে পুলিশ এ মামলায়  গ্রেপ্তার করেন শিলাস্তি, আমানুল্লাহ ওরফে শিমুল ভূঁইয়া ও তানভীর ভূঁইয়া ওরফে ফয়সাল সাজিকে। পরে আদালত শিলাস্তিসহ মোট তিনজনকে আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। প্রথম দফায় রিমান্ডে কিছু তথ্যের ঘাটতি থাকার কারণে ডিবি পুলিশ গত ৩১ মে পুনরায় আদালতে আসামিদের হাজির করে আবার রিমান্ডের আবেদন করে। শিমুল ভূঁইয়া তার জবানবন্দিতে কাজী কামাল আহমেদের কথা বলেন। তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, এ হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী  আক্তারুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছেন। তাকে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওয়ারি বিভাগের ডিসি আব্দুল আহাদ গতকাল সন্ধ্যায় খবরের কাগজকে জানান, ‘আনার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলছে।’

মামলার তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে, আনার হত্যাকাণ্ডে কাজী কামাল আহমেদ ওরফে বাবুর সংশ্লিষ্টতা আসার পর পুলিশ মাঠপর্যায়ে আরও কাজ করা শুরু করেছে। বাবু দুই নেতার নাম বলেছেন। তবে ওই দুই নেতা কোন প্রক্রিয়ায় এ খুনের সঙ্গে জড়িত তা জানতে পারেনি পুলিশ। আনারের সঙ্গে স্থানীয় একাধিক রাজনৈতিক নেতার বিরোধ থাকার কারণে গ্রুপভিত্তিক কিছু নেতাও এ খুনের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। তবে বাবু পুলিশকে জানিয়েছেন যে, এ হত্যাকাণ্ডে ওই দুই নেতা প্ররোচনা ও খুনিদের অর্থ প্রদান করে থাকতে পারেন।

সূত্র জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবু পুলিশকে জানিয়েছেন আনার ও শাহীনের দ্বন্দ ছিল প্রকাশ্যে। তাদের এই দ্বন্দ্বের কথা সবাই জানত। স্থানীয় নেতারা এই বিরোধকে মেটানোর জন্য নানা উদ্যোগ নিলেও তা কোনো কাজে আসেনি। একাধিক সালিশি বৈঠকেও এই বিরোধ মেটেনি। এই বিরোধের জেরে আনারকে খুন হতে হয়েছে। 

মামলার তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আনার বিএনপির রাজনীতি থেকে আওয়ামী লীগে আসার কারণে স্থানীয় কিছু আওয়ামী লীগের নেতাও তাকে নির্বাচনি মাঠ থেকে সরাতে তৎপর ছিলেন। কিন্তু এরপরও আনার ৩ বার এমপি নির্বাচিত হন। আর হত্যাকারীদের নানাভাবে প্ররোচনা প্রদানে এই আনারের বিদ্রোহী গ্রুপ সক্রিয় ছিল বলে জানা গেছে। 

শেরেবাংলা নগরের জরাজীর্ণ ভবনে হবে ১৫১২টি সরকারি ফ্ল্যাট

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৪, ০১:১৪ পিএম
আপডেট: ১৩ জুন ২০২৪, ০১:১৪ পিএম
শেরেবাংলা নগরের জরাজীর্ণ ভবনে হবে ১৫১২টি সরকারি ফ্ল্যাট

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ৪৭টি জরাজীর্ণ বিল্ডিং ভেঙে নির্মাণ করা হবে দেড় হাজারেরও বেশি আলিশান ফ্ল্যাট। সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসিক সুবিধা নিশ্চিত করতে ১২৯ বিঘা জমিতে ৪২টি ভবনে হবে এসব ফ্ল্যাট। সব ভবনেই থাকবে সুইমিংপুল। এসব ফ্ল্যাট নির্মাণে ৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা খরচ ধরা হয়েছে। প্রতি বর্গমিটারে খরচ ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৪৫০ থেকে ৫ হাজার ৬৪৬ টাকা, যা অত্যধিক।

লিফট কেনায় বেশি খরচ ধরা হয়েছে। কিসের ভিত্তিতে এত বেশি খরচ ধরা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে ‘ঢাকাস্থ শের-ই-বাংলা নগরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসন নির্মাণ’ প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে তা যাচাই-বাছাই করতে গতকাল বুধবার প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় এই ব্যাপারে আপত্তি তুলে তা যৌক্তিক পর্যায়ে এনে সংশোধন করতে বলা হয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৭ সালের এপ্রিলের মধ্যে বাস্তবায়ন করবে গণপূর্ত অধিদপ্তর। 

বেসরকারিভাবে আবাসন খাতে বিভিন্ন ডিজাইনের ফ্ল্যাট তৈরি করে তা বিক্রি করা হয়। কিন্তু তাতেও এত বেশি খরচ ধরা হয় না। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রিহ্যাবের সিনিয়র সহসভাপতি মো. আক্তার বিশ্বাস খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা জায়গা ধরে বিভিন্ন এলাকায় এ ক্যাটাগরির ফ্ল্যাটও করি। তাতে বেশি খরচ পড়ে। কিন্তু জমি ছাড়া শুধু ফ্ল্যাট করা হলে বর্তমানে রড, সিমেন্ট, ইটসহ অন্যান্য উপাদানের খরচ বেশি হওয়ায় প্রতি বর্গফুটে ২ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার টাকার মতো খরচ হচ্ছে। তবে কনসোর্টিয়াম করা হলে কিছু বেশি খরচ হতে পারে। গণপূর্ত অধিদপ্তর জমি ছাড়াই প্রতি বর্গফুটে যে ৫ হাজার ৪৫০ থেকে ৫ হাজার ৬৪৬ টাকা খরচের প্রস্তাব করেছে, এটা বেশি খরচ। এর কারণ তারাই বলতে পারবে। 

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন না ধরায় কোনো মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। 

পরিকল্পনা কমিশন এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, উন্নত ও স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৯ সালে নির্দেশ দেন। তারপর বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষ করে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এই প্রকল্পটি তৈরি করে। ঢাকা শহরে প্রায় দেড় লাখ সরকারি কর্মকর্তার জন্য মাত্র ১৩ হাজার ফ্ল্যাট রয়েছে, যা মোট চাহিদার মাত্র ৮ শতাংশ। এটা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৮ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশে উন্নীতকরণে নির্দেশ দেন। এরপর নড়েচড়ে বসে। ২০১৯ সালের ২৬ মে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় বহুতল ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর শেরেবাংলা নগরে তাদের নিজস্ব জায়গায় একতলা ও দ্বিতীয় তলা জরাজীর্ণ ৪৭টি ভবন ভেঙে ১ হাজার ২৫০ থেকে ১ হাজার ৮০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।

প্রকল্পের প্রধান কাজ ও লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১ হাজার ২৫০ বর্গফুটের ২০টি ১০ তলা ভবনে ৭২০টি ফ্ল্যাট নির্মাণ। ২১ লাখ ৫৭ হাজার ৪০৬ বর্গফুটের ফ্ল্যাট করতে খরচ ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৮১ কোটি টাকা। এই হিসাবে প্রতি বর্গফুটে খরচ পড়বে ৫ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা। ১ হাজার ৫০০ বর্গফুটের ১১টি ১০ তলা ভবন হবে। এতে ৩৯৬টি ফ্ল্যাটে খরচ হবে ৬৮৫ কোটি টাকা। ১২ লাখ ৫৫ হাজার ৯০১ বর্গফুটের এই ফ্ল্যাটে খরচ ধরা হয়েছে প্রতি বর্গফুটে ৫ হাজার ৪৫০ টাকা। ১ হাজার ৮০০ বর্গফুটের ১১টি ১০ তলা ভবনে ৩৯৬টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। এতে ১২ লাখ ৫৫ হাজার বর্গফুটে খরচ ধরা হয়েছে ৮৫৪ কোটি টাকা। প্রতি বর্গফুটে খরচ পড়বে ৫ হাজার ৬৪৬ টাকা।

এসব ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের সুবিধার্থে চারটি তিনতলা ফ্যাসিলিটি ভবন নির্মাণ করা হবে। একটি কমিউনিটি ফ্যাসিলিটি জোনও করা হবে। যেখানে ছয়তলাবিশিষ্ট পাঁচটি ভবনে থাকবে স্কুল, কলেজ, মসজিদ, শপিংমল ও কমিউনিটি সেন্টার। একটি ছয়তলা ডরমেটরি গণপূর্ত ভবনও নির্মাণ করা হবে। ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা খরচ করে পুরো এলাকায় ৪৮টি জলাধারও করা হবে। একটি কমিউনিটি সেন্টারের ছাদে করা হবে সুইমিংপুল। এর জন্য খরচ ধরা হয়েছে ২ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এক হাজার কেজির ৮৮টি লিফ্টও কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই খরচ কিসের ভিত্তিতে করা হয়েছে, তা জানতে চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।

খরচ যাচাই করতে বুধবার (১২ জুন) প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। তাতে এসব ফ্ল্যাটের খরচের ব্যাপারে প্রশ্ন ওঠে। জানতে চাওয়া হয়, কিসের ভিত্তিতে এসব খরচ ধরা হয়েছে? লিফটের খরচও কিসের ভিত্তিতে প্রাক্কলন করা হয়েছে, তা জানতে চাওয়া হয় সভায়। প্রকল্পটি সংশোধন করতে বলা হয়েছে। সংশোধিত ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে এলে সব প্রক্রিয়া শেষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।

দিনে মিলন খান, রাতে ‘চিনি খান’!

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৪, ১২:৫৫ পিএম
আপডেট: ১৩ জুন ২০২৪, ০১:০৩ পিএম
দিনে মিলন খান, রাতে ‘চিনি খান’!
বোগলাবাজার ইউপি চেয়ারম্যান মিলন খান ও ধনপুর ইউপি চেয়ারম্যান মিলন খান

সুনামগঞ্জের বোগলাবাজার ও ধনপুর ইউনিয়ন পরিষদের দুই চেয়ারম্যানেরই নাম মিলন খান। শুধু চেহারা ও শারীরিক গঠন ছাড়া আর আনুষঙ্গিক সব বিষয়ে তাদের মিল রয়েছে। দুজনই প্রবাসফেরত। ২০২১ সালে উভয়ই প্রথমবার ভোটে জিতে চেয়ারম্যান হন। বর্ডার হাট ও গরুর হাটের ব্যবসার সঙ্গে দুজনই জড়িত। তবে তাদের একটি গোপন পরিচয় রয়েছে। দুজনই সীমান্ত পেরিয়ে আসা চোরাই চিনির কারবারে ভাগ বসিয়েছেন। একই নামের দুজনকেই নিজ নিজ এলাকার বাসিন্দারা আড়ালে ‘চিনি খান’ বলে ডাকেন। ভারতের মেঘালয় রাজ্যঘেঁষা সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার ও বিশ্বম্ভরপুরের সীমান্তবর্তী এই দুই ইউনিয়নে দুটি বর্ডার হাট রয়েছে। বর্ডার হাট বসার সূত্র ধরে চোরাচালান বিস্তৃত হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। দুটি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের হিসাবে গত বছরের অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত চার মাসে সীমান্ত পথ দিয়ে অন্তত ৫০০ কোটি টাকার চিনি চোরাচালান হয়েছে। তখন ছিল চিনি চোরাচালানের পিক টাইম। ঘটনাস্থল ঘুরে সিলেট ব্যুরোপ্রধান উজ্জ্বল মেহেদীর বিশেষ রিপোর্ট

মিলন খান। এক নামের দুই ইউপি চেয়ারম্যান। এক মিলন সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার বোগলাবাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, আরেকজন বিশ্বম্ভরপুরের ধনপুর ইউপির। নামের মতো তাদের ইউনিয়নের ভৌগোলিক অবস্থানেও মিল রয়েছে। দুটি ইউনিয়ন বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী। ওপারে মেঘালয় রাজ্যের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে পড়েছে বোগলা-ধনপুর। দুজনের নামের মিল কাকতালীয় হলেও তাদের কাজেও অনেক মিল। এসব মিলমিশের সর্বশেষ নজির হচ্ছে, দুজনের বিরুদ্ধে রয়েছে একই অভিযোগ। সাম্প্রতিক সময়ে সিলেট সীমান্তপথে চিনির চোরাচালানে মিলন খান নামের এ দুই ইউপি চেয়ারম্যানের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।

দুজনই প্রবাসফেরত। ইউপি চেয়ারম্যান হওয়ার আগে ধনপুরের মিলন খান আফ্রিকাপ্রবাসী ছিলেন। আর বোগলাবাজার ইউপি চেয়ারম্যান মিলন খান ছিলেন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী। ২০২১ সালের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়ে ইউপি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন দুজন। নিজ ইউনিয়নে উভয়েরই গরুর হাটের ব্যবসা আছে। বর্ডার হাট পরিচালনায়ও সম্পৃক্ত দুজন। সেখানেও রয়েছে দুজনের একচ্ছত্র আধিপত্য।

দুই মিলন একই রাজনৈতিক আদর্শের। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য পদে আছেন বোগলার মিলন। ধনপুরের মিলন দলীয় কোনো পদে নেই। দুজনই পরিচয় দেন তারা সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল হুদা মুকুটের ‘লোক’।

অভিযোগ রয়েছে, দুই মিলন তাদের এলাকায় চোরাচালান ঠেকানোর নামে দিনের বেলায় নানা রকম প্রচার চালান। আর রাতে চোরাচালানে নিজেরাই জড়িয়ে পড়েন। ইউনিয়ন পরিষদের নামে চোরাচালানের বস্তাপ্রতি উৎকোচ নির্ধারণ করে দিয়েছেন তারা। ‘ইউপি-ফি’ নামে সেই টাকা উত্তোলন করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে চিনি চোরাচালানে দুই মিলনের সমান সক্রিয়তার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যবেক্ষণ থেকে জানা গেছে। গোয়েন্দা তালিকায় দুটি ইউনিয়নের সঙ্গে তাদের নামও রয়েছে। নিজ এলাকায় দুজন ‘মিলন চেয়ারম্যান’ নামে পরিচিত হলেও চোরাচালান ও প্রভাব বিস্তারে তাদের ইউনিয়নের বাসিন্দারা কটাক্ষ করে আড়ালে দুজনকে ‘চিনি খান’ নামে ডাকেন!

রুট টু বোগলা-চিনাকান্দি
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, সিলেটের ১১ ও সুনামগঞ্জের ৫টি ইউনিয়নে ৫৭টি চোরাচালানের রুট রয়েছে। চোরাচালান চক্রে পুরো ইউনিয়ন বিস্তৃত কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, দোয়ারাবাজার ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সাতটি। এর মধ্যে সুনামগঞ্জের দুটি হচ্ছে বোগলা ইউনিয়নের বোগলাবাজার ও ধনপুরের চিনাকান্দি। গত ৯ মাসের চোরাচালান পর্যবেক্ষণ পরিস্থিতি সূত্রে জানা গেছে, বোগলা থেকে চিনাকান্দি রুটটি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বালাটের সঙ্গে যুক্ত। বোগলার ওপারে ভারতের রেঙ্গা সীমান্ত এলাকা। চিনাকান্দির ওপারে রয়েছে রাঙাছড়া। ভারতের দুই এলাকা থেকে নেমে এসেছে দুটি সীমান্ত নদী। বোগলা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে খাসিয়ামারা, ধনপুরে মনাইছড়া। 

জানা গেছে, এ দুটি নদী ঘিরেই চোরাচালানির রুট। এ পথে পশুসহ নানা ধরনের পণ্য বছরজুড়ে নামে। এর মধ্যে চিনি চোরাচালান শুরু হয় ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানা গেছে, ধনপুর ইউনিয়ন থেকে রাজাপুর, মাছিমপুর, তাহিরপুরের লাউড়েরগড় ও দিঘারতলা সীমান্তের চোরাই পথ নিয়ন্ত্রিত হয়। বোগলা ইউনিয়ন থেকে নিয়ন্ত্রণ হয় পেকপাড়া, ইদিকুনা, কইয়ারাজুরি, কলাউড়া, বাঁশতলা, মুকামছড়া, লক্ষ্মীপুরের ভাঙাপাড়া, মাঠগাঁও এলাকা। দুই ইউনিয়নে দুটি বর্ডার হাট বসার সূত্র ধরে চোরাচালান বিস্তৃত হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। দুটি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের হিসাবে অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত চার মাসে সীমান্তপথ দিয়ে অন্তত ৫০০ কোটি টাকার চিনি চোরাচালান হয়েছে।

‘চিনি খান’ যেভাবে
সুনামগঞ্জ জেলায় তিনটি বর্ডার হাট রয়েছে। প্রথমটি সুনামগঞ্জ সদরের ডলুরা। এই হাটের সঙ্গে ভারতের বালাট সীমান্ত এলাকা সংযুক্ত। দ্বিতীয় বর্ডার হচ্ছে বোগলার বাগানবাড়ি। এ হাটের সঙ্গে যুক্ত মেঘালয় রাজ্যের রিংকু এলাকা। তৃতীয় বর্ডার হাট তাহিরপুর সীমান্তের লাউড়েরগড়। এ হাটে ভারতের পশ্চিম হিল সীমান্তের সায়েদাবাদ যুক্ত। অবস্থানগত কারণে লাউড়েরগড় ও ডলুরা হাটের একাংশ নিয়ন্ত্রিত হয় ধনপুর ইউনিয়ন থেকে। আর বাগানবাড়ি হাট পুরোটাই বোগলা থেকে।

স্থানীয় ইউপি সদস্যরা বলছেন, বর্ডার হাট পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে ধনপুর ও বোগলার মিলন জড়িয়ে পড়েন চোরাই কারবারে। সরেজমিন অনুসন্ধানে বিভিন্ন মাধ্যমে চিনি চোরাচালানের একাধিক ভিডিও এ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। এসব ভিডিওর মধ্যে অধিকাংশ বোগলা ও চিনাকান্দি এলাকার। প্রতি বৃহস্পতিবার বর্ডার হাটবার শেষে রাতভর চলে চোরাই পণ্যের লেনদেন। এ সময় চাহিদাসম্পন্ন পণ্যের মধ্যে কেবল চিনির আদান-প্রদান হয়।

বর্ডার হাটের জন্য কাভার্ড ভ্যানে থাকে বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী। এসব পণ্যের প্রতিটি কনটেইনারে ‘ইউপি-ফি’ নামে ৮০ টাকা নেওয়া হয়। চিনির বস্তাপ্রতি ‘লাইন খরচ’ বাবদ যে ৩০০ টাকা উত্তোলনের রেওয়াজ রয়েছে, সেখান থেকে ৭০ টাকা রাখা হয় ইউপি চেয়ারম্যানের নামে। নিজ ইউনিয়নে পশুর হাটে নিজের ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে দুজনের। বর্ডার হাটে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুই চেয়ারম্যানের লোকদের মধ্যে প্রায়ই বিবাদ হয়।

গত ১৪ এপ্রিল দিনে ও রাতে বিশ্বম্ভরপুরের পলাশ থেকে চিনাকান্দি হয়ে ধনপুরের স্বরূপগঞ্জ বাজারে গিয়ে সরেজমিনে চোরাচালান-চিত্র দেখা গেছে। এ সময় চোরাই চিনি পরিবহনের জন্য পলাশবাজারে রাতের বেলা রীতিমতো ট্রাকের যানজট লেগে যায়। স্বরূপগঞ্জ ও পলাশবাজারে সরেজমিন অবস্থানকালে একাধিক ব্যক্তিকে তখন মিলনকে ‘চিনি খান’ বলে অভিহিত করতে দেখা গেছে। 

২৮ মে ছাতকের নোয়ারাই হয়ে বাংলাবাজার ও বোগলাবাজার ঘুরে ‘ইউপি-ফি’ উত্তোলন-চিত্র প্রায় প্রকাশ্যেই দেখা গেছে। এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে দুটি ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সের নির্ধারিত কক্ষ। বিভিন্ন সূত্রসহ সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে জানা গেছে, দুই ইউপি চেয়ারম্যান সপ্তাহান্তে ১৫ থেকে ২২ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন কেবল চোরাচালানের নিরাপদ পথনির্দেশনা থেকে। এর মধ্যে বোগলা ইউপি চেয়ারম্যান মিলন খানের একটি সমবায় সমিতির মাধ্যমে চোরাই কারবারে আর্থিক বিনিয়োগ রয়েছে। গত ৯ মাসে সমিতির মাধ্যমে ৬ কোটি টাকার বিনিয়োগ থেকে চক্রবৃদ্ধি সুদের হারে টাকা আদায় হয়েছে। চোরাই চিনি খাতে আর্থিক বিনিয়োগের জন্য মিলন খানের আরেক পরিচিতি ‘চিনি খান’।

পছন্দ ‘ক্যাশ’ টাকা
দুই চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠজনদের মাধ্যমে জানা গেছে, তাদের হাতে প্রচুর ক্যাশ টাকা রয়েছে। চোরাকারবার নিয়ন্ত্রণে যখন তখন টাকার দরকার পড়ে বলে ক্যাশ টাকা নিয়েই ঘোরেন তারা। বোগলার মিলন খানের ক্যাশ টাকার কিছু অংশ সংরক্ষিত রয়েছে সমবায় সমিতিতে। এ সমিতি চক্রবৃদ্ধি সুদের সমিতি। নাম ‘স্বপ্ন’। ২০২১ সালের নির্বাচনে মিলন খান বোগলা ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এর আগে ২০১৬ সালের নির্বাচনে প্রথমবার অংশ নিয়ে হেরে যান। ২০১৬ ও ২০২১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি ‘স্বপ্ন’ নামের সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। এখন অবশ্য এটা অনেকটা গুটিয়ে রেখেছেন। ‘স্বপ্ন’সংশ্লিষ্ট দুজন ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে ‘স্বপ্ন’ কার্যক্রমকে ‘সুদের জাল’ বলে চিহ্নিত করেন। তারা বলেন, ‘মিলন চেয়ারম্যান ভোটে জিতেছেন স্বপ্নের জাল ফেলে। এখন এটি গুটিয়ে এককভাবে চোরাচালানে নিমজ্জিত করে রেখেছেন। তার ক্যাশ টাকার শক্তি এটিই।’
 
‘আমার ইউনিয়ন চোরাচালানমুক্ত’
দিনের বেলা অনেক চেষ্টা করেও দুজনের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। মঙ্গলবার রাত পৌনে ৯টার দিকে বোগলা ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মিলন খানের ফোন নম্বরে কল ঢুকলেও ফোন রিসিভ হচ্ছিল না। স্থানীয় একজন সংবাদকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করে তার ফোনের মাধ্যমে সরাসরি কথা হয়।

গরু নিয়ে জানতে চাইলে মিলন বিস্তারিত মন্তব্য করলেও চিনি প্রসঙ্গ তুললেই তার কথা বলার ধরন পাল্টে যায়। জবাব দেন সংক্ষিপ্ত। ফোন রেখে দেওয়ার তাগাদা দিয়ে তিনি এ প্রতিবেদককে এলাকায় আসার আমন্ত্রণ জানান। ‘চিনি খান’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কতজনই তো কত কথা কয়! এসব শুনলে কাজ করা যায় না।’ 

বর্ডার হাট ও স্থানীয় গরুর হাটে প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি মিলন অস্বীকার করেন। বলেন, ‘আমি নিজে দেখেছি, দেশি গরু প্রতিপালন করে আমাদের হাটে গরু তোলা হয়। একটা গরুও ইন্ডিয়ান পাবেন না। আমার ইউনিয়ন চোরাচালানমুক্ত আছি, এটাই। এর বেশি কিছু নাই।’ 

কথা বলার সময় মিলন তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এড়িয়ে যান। ‘স্বপ্ন’ নামের সমিতির বিষয়টিও এড়িয়ে যেতে কথা বলার মধ্যেই তিনি ফোন কেটে দেন।

‘কে কয় চিনি খাই?’
ধনপুর ইউপি চেয়ারম্যান মিলন খানও দিনের চেয়ে রাতে বেশি ব্যস্ত থাকেন। মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে ফোন করলে তিনি জরুরি একটি মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে ১০ মিনিট পর ফোন দিতে বলেন। এরপর ১০ মিনিট গড়িয়ে আধা ঘণ্টা পর ফোন দিলে তাকে ব্যস্ত পাওয়া যায়। শেষে রাত ৯টা ৫৭ মিনিটে ফোনে কথা বলা সম্ভব হয়। 

বোগলার মিলনের মতো ধনপুরের মিলনেরও দাবি, তার এলাকায় আগে চোরাচালান হতো, এখন হয় না। কেন হয় না? এ প্রশ্নে বলেন, ‘মুক্ত করে রাখছি!’ তিনি জানান, এক-দুই মাস তার ইউনিয়নে চিনির চোরাচালান হয়েছিল। এরপর চিনির সঙ্গে মাদক ও অস্ত্র আসার বিষয়টি তিনি নিজে দেখে এসব বন্ধ করে দিয়েছেন। লোকমুখে ‘চিনি খান’ প্রসঙ্গে মিলন বলেন, ‘কে কয় আমি চিনি খাই? খাই না বইলাই কয়। আপনি এত কিছু কই থাকি পাইলেন! সব ভুয়া কথা।’

বর্ডার হাট দেখিয়ে চোরাচালান হচ্ছে- এ প্রশ্নে তিনি কিছুটা রেগে যান। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাম ধরে বলেন, ‘এগুলো তারাই বিভ্রান্ত করে। কিছু চোরাচালান হইতেছে, এসব রাইতের দুইটা-তিনটায়। আমি তখন ঘুমিয়ে থাকি। প্রচুর চেষ্টা করতাছি ভাই! পারতাছি না। এই কদিন আগে ডলুরায় মারামারি পর্যন্ত অইছে।’

জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের কড়া হুঁশিয়ারি
সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল হুদা মুকুটের সঙ্গে দুই মিলন খানের বিষয়ে কথা হয়। তিনিও জানান, এ দুজনের বিরুদ্ধে সীমান্তে চোরাচালানসহ নানা অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। স্থানীয় রাজনীতিতে দুই মিলন তার ‘লোক’ পরিচয় প্রসঙ্গে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে জেলা পরিষদের সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের যোগাযোগ তো থাকেই। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও রাজনৈতিক কারণে সব জনপ্রতিনিধিই তো আমার লোক। তবে এই পরিচয়ে কোনো ক্রাইম বরদাশত করব না। কারও ব্যক্তিগত অপরাধের দায় আমি বহন করব না। আওয়ামী লীগও বহন করবে না।’

এমপি আনার হত্যাকাণ্ড: ফেঁসে যাচ্ছেন মিন্টু, বাঁচাতে নেতাদের দৌড়ঝাঁপ

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৪, ১১:৪৫ এএম
আপডেট: ১৩ জুন ২০২৪, ১২:১৯ পিএম
এমপি আনার হত্যাকাণ্ড: ফেঁসে যাচ্ছেন মিন্টু, বাঁচাতে নেতাদের দৌড়ঝাঁপ

সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যাকাণ্ডে ফেঁসে যাচ্ছেন ঝিনাইদহ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু। এ খুনে মদদ, কিলিং মিশনের ছবি তার মোবাইলে এলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে না জানিয়ে গা ঢাকা দেওয়া, খুনিদের সঙ্গে আঁতাত, আনার হত্যাকাণ্ডের পর এলাকায় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিবাদ না করা ও রাজনৈতিক বিরোধে মাঠ থেকে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী আনারকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ইত্যাদি নানা কারণে ফেঁসে যাচ্ছেন মিন্টু।

গত মঙ্গলবার (১১ জুন) রাজধানী থেকে মিন্টুকে আটক করা হয়। ডিবির টিম তাকে আটক করতে গেলে তিনি বিভিন্নজনকে ফোন করেন। কিন্তু কোনো সাড়া পাননি। তার সঙ্গের লোকজন অবশ্য ডিবির টিমকে বাধা দেন। পরে ডিবির টিম তার লোকজনকে বুঝিয়ে বলে, তাকে শুধু জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য নিয়ে যাওয়া হবে। এরপর তাকে ডিবির গাড়িতে উঠতে দেওয়া হয়। তবে তিনি প্রভাবশালী নেতা হওয়ার কারণে ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিবির কার্যালয়ে রাতে বিভিন্ন শ্রেণির নেতা-কর্মী ভিড় করেন। 

ভিড়ের কারণে ডিবি গেটের প্রবেশের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও বাড়ানো হয়। পাশাপাশি তাকে ছাড়াতে গতকাল ক্ষমতাসীন দলের দুই শীর্ষ নেতার দৌড়ঝাঁপ ছিল লক্ষণীয়। তারা দুজনই হচ্ছেন চলতি সংসদের এমপি। মিন্টু জেলা ও কেন্দ্রের রাজনীতির অঙ্গনে তাদের অনুসারী বলে পরিচিতি। তাকে ছাড়াতে দুই নেতা আলাদা আলাদা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও দেখা করেছেন। যোগাযোগ করেছেন ঊর্ধ্বতন মহলের সঙ্গে। এ দুই নেতা দাবি করেছেন, মিন্টুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। কিন্তু তারা কোনো পক্ষ থেকেই খুব একটা সাড়া পাননি। মিন্টুর গ্রামের বাড়ি থেকেও লোকজন এসে ডিবি অফিসের সামনে ভিড় করেন। 

মিন্টুকে গ্রেপ্তার করার পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তাকে আনার হত্যাকাণ্ডের নানা বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। কিন্তু তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর যৌক্তিকভাবে দিতে পারেননি। কোনো কোনো প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন। আবার কোনো কোনো প্রশ্নে নীরবতা অবলম্বন করেছেন। 

এ কারণে আনার হত্যাকাণ্ডে তার জড়িত হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই গোয়েন্দাদের। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কয়েকজন নেতাকে আটক করার জন্য ঝিনাইদহ ও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে অনেকেই গা ঢাকা দিয়েছেন। তদন্তের স্বার্থে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করবে পুলিশ। এদিকে এমপি আনারের মেয়ে ডরিন অভিযোগ করেছেন, আসামিদের ছেড়ে দিতে চাপ দেওয়া হচ্ছে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আনার হত্যার তদন্ত বাধাগ্রস্ত করতে কোনো চাপ নেই।

গত ১৩ মে কলকাতার একটি ফ্ল্যাটে খুন হন ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার। ২২ মে আনোয়ারুল আজীম আনারকে হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণের অভিযোগে তার মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন বাদী হয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন। পরে পুলিশ এ মামলায় গ্রেপ্তার করেন শিলাস্তি, আমানুল্লাহ ওরফে শিমুল ভূঁইয়া ও তানভীর ভূঁইয়া ওরফে ফয়সাল সাজিকে। পরে আদালত শিলাস্তিসহ মোট তিনজনের আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। প্রথম দফায় রিমান্ডে কিছু তথ্যের ঘাটতি থাকার কারণে ডিবি পুলিশ গত ৩১ মে পুনরায় আদালতে আসামিদের হাজির করে আবার রিমান্ডের আবেদন করে। 

শিমুল ভূঁইয়া তার জবানবন্দিতে ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগ নেতা কাজী কামাল গিয়াস আহমেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবুর কথা বলেন। গ্যাস বাবু আবার ঝিনাইদহ জেলার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টুর এ খুনে জড়িত হওয়ার কথা মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের জানান। পরে রাজধানী থেকে মিন্টুকে আটক করে ডিবি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তবে গতকাল পর্যন্ত তার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। জানা গেছে, কাউকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাকে আদালতে হাজির করতে হয়। ডিবি জানিয়েছে, আজ বৃহস্পতিবার মিন্টুর ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে তারা পুলিশসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গ্রিন সিগন্যালের অপেক্ষায় রয়েছেন।

এ বিষয়ে আনার হত্যা মামলার তদন্তের মুখ্য সমন্বয়কারী ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ গতকাল বিকেলে খবরের কাগজকে বলেন, ‘একটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর বিভিন্ন প্রেক্ষাপট রয়েছে। কেন এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে তার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য সময় নেওয়া হচ্ছে। মিন্টুকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।’

মামলার তদন্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক কর্মকর্তা জানান, আনার হত্যাকাণ্ডে তানভীর যেসব তথ্য দিয়েছিলেন সেই তথ্যগুলো তারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করেছেন। এতে করেই এখন থলের বিড়াল বের হয়ে আসছে। এ হত্যাকাণ্ডে আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক কাজী কামাল গিয়াস আহমেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবু গ্রেপ্তার হওয়ার পর খুনের মোটিভ ঘুরে যায়। পরে মিন্টুকে আটক করা হলে এ খুনের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। 

সূত্র জানায়, মিন্টুর কাছে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানতে চান, আনার হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার তানভীর যে তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেছেন, তখন তাদের মধ্যে কী কথা হয়েছে। কিন্তু মিন্টু তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। হত্যার মিশন সম্পন্ন হওয়ার পর কলকাতা থেকে তার মোবাইলে ছবি এলেও তিনি কেন থানা-পুলিশ বা জেলার এসপিকে জানালেন না- এমন প্রশ্নে তিনি নীরব ছিলেন। 

সূত্র জানায়, এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ঝিনাইদহের আরও কয়েকজন নেতার নাম এসেছে। মিন্টু জিজ্ঞাসাবাদে নিজেকে এড়িয়ে গিয়ে আনারের সঙ্গে আর কার কার বিরোধ ছিল তাদের কয়েকজনের নাম বলেছেন। তাদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। 

এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের কাছে বাবা হত্যার বিচার চেয়েছেন নিহত সংসদ সদস্য (এমপি) আনোয়ারুল আজীম আনারের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন। তিনি বলেন, অপরাধীদের বাঁচাতে তদবির হচ্ছে। গতকাল বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে দেখা করতে এসে এ দাবি করেন। ডরিন দাবি করেন, বড় বড় জায়গা থেকে ফোন দেওয়া হচ্ছে আসামিদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে বাবার হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার চেয়ে তিনি বলেন, যারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তারা কেউ যেন ছাড় না পায়। অনেক জায়গা থেকে আসামিদের ছাড় দেওয়ার জন্য তদবির করা হচ্ছে। চাপ দেওয়া হচ্ছে। ‘গ্যাস বাবু’ আমার বাবার প্রতিপক্ষ। মিন্টু চাচাকে ধরেছে। অবশ্যই তার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পেয়েছে ডিবি। তিনি জানান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিন্টু আটকের পর তাকে ছাড়ানোর জন্য তদবির ও চাপ দেওয়া হচ্ছে। ডরিন আরও বলেন, রাজনীতি নিয়ে এখন চিন্তা করছি না। আগে হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশ্বাস দিয়ে বলেন, প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। 

আনোয়ারুলের মেয়ে আরও বলেন, ডিএনএ টেস্টের জন্য এখনো ডাকেনি ভারত। ডাকলে যেতে প্রস্তুত আছি যাওয়ার জন্য। 

পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের জানান, এমপি আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যার তদন্ত বাধাগ্রস্ত করতে কোনো চাপ বা তদবির নেই । তিনি বলেন, তদন্ত সঠিক পথেই এগোচ্ছে। আনারের মেয়ে বাবা হত্যার বিচার চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। তদন্তে কেউ যাতে পার পেয়ে না যায় তিনি সেই অনুরোধ করেছেন। এই হত্যার তদন্তে কোনো তদবির বা চাপ নেই। কে চাপ দেবে? তদন্তে যা বেরিয়ে আসবে সেভাবেই বিচার প্রক্রিয়া এগোবে।

খাতুনগঞ্জে চোরাই চিনির বাজার নিম্নমুখী

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৪, ১১:২৩ এএম
আপডেট: ১৩ জুন ২০২৪, ১২:০০ পিএম
খাতুনগঞ্জে চোরাই চিনির বাজার নিম্নমুখী
ছবি: খবরের কাগজ

চোরাই চিনির বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের প্রভাব পড়েছে খাতুনগঞ্জে। ১০ দিনের ব্যবধানে খাতুনগঞ্জে চোরাই চিনিতে মণপ্রতি দাম কমেছে ৩২০ টাকা। ফলে নতুন করে চোরাই চিনির চালান আনতে আগ্রহ হারিয়েছেন অনেকেই। চোরাই চিনির বিরুদ্ধে সীমান্তের পাশাপাশি চট্টগ্রামের বৃহত্তর ভোগ্যপণ্যের বাজার খাতুনগঞ্জেও চলছে একের পর এক অভিযান। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাহিদা বাড়ায় কয়েক মাস ধরে চোরাই চিনিতে সয়লাব হয়ে ওঠে খাতুনগঞ্জ। অতি মুনাফার লোভে খাতুনগঞ্জ ও পাহাড়তলী বাজারে চোরাই চিনি মজুত করেছেন অনেক ব্যবসায়ী। আলু ও পেঁয়াজ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে কাঠ ব্যবসায়ী সবাই জড়িয়েছেন চোরাই চিনির কারবারে। খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বেশির ভাগ চিনি সংগ্রহ করেন সিলেট অঞ্চল থেকে। 

এসব চিনি আনতে প্রতি ট্রাকে ব্যয় করতে হচ্ছে ৩৬ হাজার টাকা। পরিবহন ভাড়া যোগ করে গত ৩ জুন খাতুনগঞ্জে চোরাই পথে আসা চিনি প্রতি মণ (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) বিক্রি হয় ৪ হাজার ২০০ টাকায়। অর্থাৎ সে সময় প্রতি কেজি চিনি পাইকারি এই বাজারে বিক্রি হয়েছিল ১১৫ টাকায়। আর দেশীয় প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত চিনি বিক্রি হয়েছিল ৪ হাজার ৯০০ টাকায়, যা কেজিপ্রতি দাম পড়ে ১৩২ টাকা। 

বর্তমানে প্রশাসনের অভিযান তৎপরতার কারণে দ্রুত চোরাই চিনি বিক্রি করে দিতে দাম কমিয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে খাতুনগঞ্জে প্রতি মণ চোরাই চিনি ৩ হাজার ৮৮১ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সে হিসাবে প্রতি কেজি চোরাই চিনি বিক্রি হচ্ছে ১০৪ টাকায়। অন্যদিকে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পরিশোধিত চিনি মণপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ৪০৪ টাকায়। সে হিসাবে পাইকারি বাজারে কেজিপ্রতি পরিশোধিত চিনির দাম পড়ছে ১১৮ টাকা। 

খাতুনগঞ্জের চিনি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সীমান্তে চিনি ধরা পড়ছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে খাতুনগঞ্জে। কম দামে পাওয়ায় ব্যবসায়ীরা কিনে রেখেছিলেন চোরাই চিনি। কিন্তু সরকারের বিভিন্ন দপ্তর তৎপর হয়ে ওঠায় খাতুনগঞ্জে কমতে শুরু করেছে চোরাই চিনির দাম। পাশাপাশি সরবরাহ বাড়ায় খাতুনগঞ্জে পরিশোধিত চিনি পাওয়া যাচ্ছে আগের তুলনায় কম দরে। শুধু তাই নয়, ব্যবসায়ীরা আরও জানিয়েছেন, খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা এখন চোরাই চিনি কেনার প্রতি অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন। ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিশোধন করা চিনির ওপর নির্ভর করতে হবে বলে জানিয়েছেন তারা। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাতুনগঞ্জের এক চিনি ব্যবসায়ী খবরের কাগজকে বলেন, সরকারি বিভিন্ন সংস্থার তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা চোরাই চিনিতে আর আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। বিশেষ করে সিলেটে ১৪ ট্রাক চোরাই চিনির চালান ধরা পড়ার পর চিনির দাম কমতে শুরু করে। খাতুনগঞ্জে এখন প্রতিনিয়ত অভিযান চলছে। তাই ব্যবসায়ীরা এখন দাম কমিয়ে দ্রুত এসব চিনি বিক্রি করে দিতে চাইছেন। 

খাতুনগঞ্জের চিনি ব্যবসায়ী মো. শহীদুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, খাতুনগঞ্জে এখনো পরিশোধিত চিনির পাশাপাশি চোরাই পথে আসা চিনি রয়েছে। তবে সিলেটে চোরাই পথে আসা ১৪ ট্রাক চিনির চালান পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর সবাই সতর্ক হয়ে যান। এরপর থেকেই খাতুনগঞ্জে চোরাই পথে আসা চিনির দাম কমতে থাকে। 

খাতুনগঞ্জ সুগার ডিলার সমিতির সদস্য কামাল উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ভারত থেকে চিনি আসার কারণে মিলগুলোতে পরিশুদ্ধ চিনির উৎপাদন এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছিল। বর্তমানে চিনির দাম কমতির দিকে। চোরাই চিনি বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের মিলগুলোর কার্যক্রমে গতি আসবে। তবে চিনির বেচা-বিক্রিও কমে গেছে। আগে দিনে চোরাই চিনি ৫০ বস্তা বিক্রি হলে এখন ২০ বস্তা বিক্রি হচ্ছে।’ 

তবে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিলেন চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, এখন চোরাই চিনির চালান ধরা পড়ছে। এরপর থেকে দাম কমতে শুরু করে। তবে খাতুনগঞ্জে এখন চিনির সরবরাহ বেশ ভালো। আমি মনে করি, সরবরাহ ভালো থাকার কারণে চিনির দাম কমে গেছে।’ 

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন খবরের কাগজকে বলেন, ‘সীমান্তের বিভিন্ন জায়গায় সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার কারণে চোরাই চিনির চালান ধরা পড়ছে। এভাবে চিনি আসতে থাকলে একদিকে সরকার হাজার হাজার কোটি টাকার শুল্ক হারাত, অন্যদিকে আমাদের দেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ত। তাই এভাবে চোরাই চিনির চালান যাতে ভবিষ্যতে আসতে না পারে, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সে বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে বলে আমি মনে করি।’ 

এর আগে গত ৩ জুন চোরাই চিনির চালানসংক্রান্ত ভিডিও (অনলাইন সংস্করণে) ও ৪ জুন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে দৈনিক খবরের কাগজ। সংবাদ প্রকাশের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গত ৬ জুন সকাল ৬টার দিকে সিলেটের জালালাবাদ থানা এলাকায় উমাইরগাঁওয়ে অস্থায়ী চেকপোস্ট বসিয়ে ১৪ ট্রাক ভারতীয় চিনি জব্দ করে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ। গত ৫ জুন সন্ধ্যায় সিলেটে শাহপরাণ (রহ.) থানা-পুলিশের অভিযানে একটি ট্রাকসহ ১৩ হাজার ৭২০ কেজি ভারতীয় চিনি জব্দ ও একজনকে আটক করা হয়। 

সম্পদের ‘খনি’ বেনজীর

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৪, ১০:৪০ এএম
আপডেট: ১৩ জুন ২০২৪, ১০:৪০ এএম
সম্পদের ‘খনি’ বেনজীর
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ যেন সম্পদের খনি। প্রতিদিনই কোনো না কোনো মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আসছে বেনজীর ও তার পরিবারের অর্থ-সম্পদের তথ্য। সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও ভূমি অফিস ছাড়াও ব্যক্তি পর্যায়ে অনেকেই স্বপ্রণোদিত হয়ে দুদকে এসে তথ্য দিচ্ছেন। আবার অনেকেই দুদকের হটলাইনে ফোন করেও তথ্য দিচ্ছেন। দুদক কর্মকর্তারা এসব তথ্যের দালিলিক প্রমাণ সংগ্রহ করে সেগুলো ক্রোক ও ফ্রিজের আদেশ পেতে আদালতে আবেদন করছেন। এমন অবস্থায় উপযুক্ত তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল বুধবার তৃতীয় দফায় বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদ ফ্রিজ (অবরুদ্ধ) ও ক্রোকের আদেশ দিয়েছেন আদালত। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মোহাম্মদ জগলুল হোসেন এ আদেশ দেন। এর আগে গত ২৩ ও ২৬ মে দুই দফায় ২০২টি দলিলে থাকা ৪টি ফ্ল্যাট ও ৬২১ বিঘা জমি ক্রোক এবং বিও অ্যাকাউন্টসহ ৩৭টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার নির্দেশ দেন একই আদালত। 

বুধবার (১২ জুন) ক্রোক ও ফ্রিজ আদেশ দেওয়া সম্পদগুলোর মধ্যে রয়েছে উত্তরায় ৩ কাঠার প্লট, মোহাম্মদপুরের আদাবরে পিসি কালচার সোসাইটিতে বেনজীরের ৬টি ফ্ল্যাট (স্ত্রী জিশান মির্জার নামে), বাড্ডায় ২টি ফ্ল্যাট, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ২৪ কাঠার প্লট, বান্দরবানে ২৫ একর জমি, সিটিজেন টিভির মালিকানা ও টাইগার এপারেল কোম্পানির (বায়িং হাউস) শেয়ার মালিকানা। 

এ ব্যাপারে দুদকের আইনজীবী মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর খবরের কাগজকে বলেন, ‘দালিলিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পত্তি তিন দফায় ক্রোক ও ফ্রিজ করার আদেশ দিয়েছেন আদালত। এর আগে গত মাসে দুই দফায় বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদ ফ্রিজ ও ক্রোকাদেশ দেওয়া হয়েছিল। ইতোমধ্যে সেই আদেশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। স্থাবর সম্পদ (জমি, প্লট, ফ্ল্যাট, রিসোর্ট, স্থায়ী অবকাঠামো ইত্যাদি) দেখভালের জন্য রিসিভার নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া অস্থাবর সম্পদের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং লেনদেন স্থগিত ও বিভিন্ন ব্যবসা শেয়ার ও মালিকানা হস্তান্তর বন্ধ রাখা হয়েছে। একইভাবে তৃতীয় দফার ক্রোক ও ফ্রিজ আদেশ বাস্তবায়ন হবে। তাদের নামে আরও অর্থ-সম্পদ আছে কি না, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তারা। প্রয়োজনীয় দালিলিক তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে আবারও ক্রোক ও ফ্রিজের আদেশ চেয়ে আদালতে আবেদন করা হবে।’ 

এদিকে দুদকের কর্মকর্তারা খবরের কাগজকে জানান, বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে অর্থ-সম্পদের বিভিন্ন রকম তথ্য প্রায় প্রতিদিনই দুদকে আসছে। এই তথ্যগুলো যাচাইয়ের জন্য বিভিন্ন ভূমি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দালিলিক তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়ে থাকে। যেসব তথ্যের অনুকূলে দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোই ক্রোক ও ফ্রিজের আদেশ চেয়ে আদালতে আবেদন করা হচ্ছে। এভাবে তিন দফায় ক্রোক ও ফ্রিজের আদেশ চেয়ে তিন দফা আবেদন করা হয়েছে এবং আদালত সেসব আবেদন মঞ্জুর করেছেন।

গত ২৩ মে বেনজীর ও তার পরিবারের নামে থাকা অন্য ৮৩টি দলিলে গোপালগঞ্জ সদর, কোটালীপাড়া, টুঙ্গিপাড়া, কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় অন্তত প্রায় ৪০০ বিঘা জমি ক্রোক এবং ৩৩টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজের আদেশ দেন আদালত। এরপর ২৬ মে আরেক আদেশে ১১৯টি দলিলের ভিত্তিতে রাজধানীর গুলশানে চারটি ফ্ল্যাট, মাদারীপুরে ১৭৬ বিঘা জমি, রাজধানীর সাভার ও কক্সবাজারের বান্দরবানে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ক্রোকের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে শতভাগ মালিকানাধীন আটটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আংশিক মালিকানাধীন ১৫টি কোম্পানিতে থাকা শেয়ার এবং ৪টি বিও অ্যাকাউন্ট অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।