মানুষের জমি, কবরস্থান থেকে শ্মশান- কোনো কিছুই দখল করা বাদ দেননি সাদেক খান। মাত্র একবার সংসদ সদস্য হয়েই মোহাম্মদপুর এলাকার সবকিছুতেই তার দখলদারত্ব কায়েম হয়েছিল। এলাকাবাসীর ভাষায়, আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়েছিলেন তিনি।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অবৈধ ব্যবসা করার পাশাপাশি জমি দখল, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ করতেন ঢাকা-১৩ আসনের সাবেক এমপি ও মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সাদেক খান। মোহাম্মদপুরের কাঁটাসুর, জাফরাবাদ, রায়েরবাজারের বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, গদিঘর, বছিলা ও ঢাকা উদ্যান এলাকায় জমি দখল ও কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে তিনিই ছিলেন সর্বেসর্বা। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে গ্রেপ্তার হন সাদেক খান। এরপর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে তার নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে অনেকটা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঢাকা-১৩ আসনের এমপি হয়েছিলেন সাদেক খান। এরপর মোহাম্মদপুরে একক আধিপত্য গড়ে ওঠে তার। নিজের জায়গার পাশে থাকা হিন্দু সম্পত্তি দখল করে কয়েক একর জায়গায় গড়ে তুলেছেন ‘সাদেক খান বস্তি’। সে বস্তিতে চলত মাদকের রমরমা কারবার। ওই এলাকার অধিকাংশ কিশোর গ্যাং সদস্য সাদেক খানের বস্তি থেকেই তৈরি। এদের দিয়েই এলাকায় মাদকের কারবার, দখলদারি ও চাঁদাবাজি করতেন। এর বাইরেও ছিল তার নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী। এসব ক্যাডার দিয়ে সরকারি খালের জমি দখল করে সাদেক ফিলিং স্টেশন, সাদেকনগর মডেল টাউন গড়ে তোলেন তিনি।
ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন সাদেক খান। তখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে দেশি-বিদেশি নানা জিনিস উপহার দিতেন সাদেক খান। নৌকার মনোনয়ন পেতে তিনি এতই মরিয়া ছিলেন যে, নিজ দলের প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ক্যাডারদের দিয়ে একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটান তিনি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল পরিমাণ টাকা দিয়ে ওবায়দুল কাদেরকে ম্যানেজ করে নৌকার মনোনয়নে এমপি নির্বাচিত হন তিনি। ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক রাস্তারও নামকরণ করেছিলেন সাদেক।
মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে সাদেক খান ফিলিং স্টেশন পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার রাস্তার দুই পাশে সাদেকের দখলদারত্ব রয়েছে। এখানে নিজের দুই বিঘা জমি থাকলেও সরকারি প্রায় ৫ বিঘা জমি দখল করেছেন তিনি। সেখানে সাদেক খান কৃষি মার্কেট, সাদেক খান হাঁস-মুরগির মার্কেট, সাদেক খান শুঁটকি মার্কেট, সাদেক খান ইট মার্কেট, সাদেক খান বালি মার্কেট, ইটের মার্কেট, সাদেক খান বস্তিসহ একাধিক স্থাপনা গড়ে তোলা হয়।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বেড়িবাঁধসংলগ্ন একাধিক খালের কথা ইতিহাসের পাতায় থাকলেও বাস্তবে চিহ্নও নেই। সেসব খাল দখলের মূল হোতা জমিখেকো সাদেক খান। এসব খাল-নদী ভরাট করে ঢাকা উদ্যান এলাকায় আবাসন গড়ে উঠেছে। অভিযোগ আছে, এর নেপথ্যে কাজ করেছেন সাবেক এই সংসদ সদস্য। প্রতিটি আবাসন কোম্পানি তাকে প্রতি মাসেই মোটা অঙ্কের ‘প্রোটেকশন মানি’ দিত।
শ্মশানের জায়গা দখল
মোহাম্মদপুরের বর্তমান আজিজ খান রোডটি নব্বইয়ের দশকে খাল ও ডোবা ছিল। সেখানকার প্রায় ১০ কাঠার ওপর জমি হিন্দুদের শ্মশানের জন্য দান করেছিলেন স্থানীয় দানবীর ঈসমাইল খাঁ। তখন স্থানীয়রা জায়গাটি চিতার পাড় বলেই জানতেন। তার পাশে ছিল কবরস্থান। ওই এলাকায় সাদেক খানের আধিপত্য শুরু হলে আস্তে আস্তে কবরস্থানের জায়গা দখল হয়ে যায়। আর শ্মশানটি দখল হতে হতে এখন প্রায় দুই কাঠায় ঠেকেছে। সেখানে গড়ে উঠেছে সাদেক খানের ভাই নাদের খানের বস্তি ও দোকানপাট। এসব তথ্য জানিয়েছেন শ্মশানের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা একজন তত্ত্বাবধায়ক । তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘শ্মশানের জায়গাটি মূলত দান করা সম্পত্তি। তবে সাদেক খান প্রভাব খাটিয়ে নিজের দখলে নিয়েছেন। প্রথমে পুরোটাই দখল করে নেন, পরে কিছু অংশ ছেড়ে দিয়েছেন। তাই এখন শ্মশানের চারপাশে দেয়াল তুলে ঘেরাও দেওয়া হয়েছে।’
শুধু দেশে নয়, এমপি নির্বাচিত হয়ে ২০১৯ সালে দেশের বাইরে মালয়েশিয়াতেও অনেক সম্পত্তি করেছেন সাদেক খান। সেখানে বাড়ি-গাড়ি সবই আছে তার। মোহাম্মদপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাটের তথ্যও পেয়েছে দুদক। রায়েরবাজার এলাকার ৫৪ নম্বর বহুতল ভবনে তিনি বসবাস করতেন। এর আশপাশের অনেক বাড়িও সাদেক খানের। লোকজনের কাছ থেকে নিজের এত সম্পদ আড়াল করতে তার ঘনিষ্ঠ অনেকের নামে বাড়ি লিখে দিয়ে রাখলেও এসবের মূল মালিক যে সাদেক খান এটি এলাকাবাসী সবারই জানা আছে।
রায়েরবাজারের প্রধান সড়কের পাশে গড়ে তোলা ‘সাদেক ফিলিং স্টেশনে’র পুরোটাই পানি উন্নয়ন বোর্ডের খালের জায়গা ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন। তারা জানান, পুরো পশ্চিম ধানমন্ডির পানি নিষ্কাশনের পানি বের হওয়া খালের জায়গার ওপর গড়ে তোলা হয়েছে এটি। এই ফিলিং স্টেশনের পেছনেই রয়েছে ‘সাদেকনগর মডেল টাউন’ নামে বিশাল আবাসন প্রকল্প। এই প্রকল্পের বেশির ভাগ জায়গাই দখল করেছেন তিনি। নামমাত্র মূল্য দিয়ে জায়গা জোর করে দখল করার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। একাধিক হিন্দু পরিবার এর ভুক্তভোগী। ওই প্রকল্পে যাওয়ার রাস্তায় এখনো পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাইনবোর্ড টাঙানো রয়েছে।
মার্কেট ও আবাসন থেকে প্রতি মাসে বিপুল টাকা আসত সাদেক খানের। এমপি থাকাকালীন অবৈধ এসব স্থাপনা থেকে মাসে দুই কোটি টাকার ওপরে ভাড়া পেতেন তিনি। এভাবে বছরে প্রায় ২৫ কোটি টাকা আয় ছিল সাদেক খানের। এ ছাড়া মোহাম্মদপুরের ‘সাদেক খান বস্তি’ থেকে কয়েক কোটি টাকা আসত তার। দখলের দেখভাল ও ভাড়া ওঠানোর কাজ করতেন তারই ছেলে ফাহিম খান।
সাদেকের টাকা কালেকশনের জন্য ৮ থেকে ১০ জন ম্যানেজারও নিয়োগ করা ছিল। এদের মধ্যে প্রধান ম্যানেজার ছিলেন জুলহাস ব্যাপারী, তার সঙ্গে ছিলেন ম্যানেজার জাকির। তারা একেকজন একেক সাইড থেকে টাকা কালেকশন করতেন। তারা দৈনিক সংগৃহীত টাকা বুঝিয়ে দিতেন সুমন নামে আরেক ম্যানেজারের হাতে। সুমন রাতে চাঁদার টাকা নিয়ে হাজির হতেন এমপিপুত্র ফাহিমের কাছে। কেউ তাদের দখল ও চাঁদাবাজিরর বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে সাদেকের বস্তিতে থাকা ক্যাডার বাহিনী দিয়ে তাকে শায়েস্তা করা হতো।
সাদেক খানের ক্যাডার বাহিনীর হাতে হেনস্তা হওয়া কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা হয় খবরের কাগজের। মোহাম্মদপুরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এমন এক ভুক্তভোগী খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই এলাকায় ছয় দশক ধরে বসবাস করছি। সাদেক খান ও তার পরিবারের কাজই ছিল গরিব মানুষের জমি দখল করা। এই এলাকায় (সাদেক খান রোড) একসময় অসংখ্য হিন্দু পরিবার বসবাস করত। কিন্তু তাদের জমি দখল করে বস্তির ছেলেদের দিয়ে অত্যাচার করে এলাকাছাড়া করেন সাদেক।’
তিনি বলেন, ‘এই রোডে অনেক বাড়ি অন্য মানুষের নামে রয়েছে ঠিকই, কিন্তু এগুলোর মূল মালিক সাদেক খান।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘এটি তার একটি কৌশল।’
ওই ভুক্তভোগী আরও জানান, এমপি থাকাকালীন সরকারি টিআর ও কাবিখা প্রকল্পের বরাদ্দ সব নিজেই ভোগ করেছেন সাদেক খান। এলাকায় কাজের বদলে করেছেন লুটপাট। নদীর ওই পাড়ে কেরানীগঞ্জে বিপুল সম্পত্তি গড়েছেন। সেখানে ইটভাটা, বালুমহাল, আবাসন ব্যবসাসহ অনেক ব্যবসা তার। সরকার পতনের পর সাদেক খান ধরা পড়েন। তবে তার অবৈধ ব্যবসা চলমান রয়েছে। এখনো তার পরিবারের ঘনিষ্ঠরা ওসব স্থাপনা থেকে ভাড়া তোলেন। সাদেক খানের এসব অপকর্ম দুদকের তদন্তেও ধরা পড়েছে।
২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনের সময় দাখিল করা নির্বাচনি হলফনামায় নিজ নামে ১ কোটি ৪১ লাখ টাকা অকৃষি জমি, যৌথ নামে ১ কোটি ৩১ লাখ ৫২ হাজার টাকার জমি দেখিয়েছেন সাদেক খান। এ ছাড়া ১১ লাখ ৯০ হাজার টাকার অ্যাপার্টমেন্ট, বাড়ি, ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকার পরিবহন ও অন্যান্য সম্পদ দেখিয়েছেন। স্ত্রীর নামে ৩৯ লাখ ৫০ হাজার টাকার গাড়ি, ১ কোটি ১২ লাখ ৩ হাজার টাকা মূল্যের জমি ও অন্যান্য সম্পদ দেখিয়েছেন। এছাড়া হলফনামায় নগদ ৫২ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং জমিসহ দুটি একক বাড়ি ও একটি যৌথ বাড়ি দেখিয়েছেন, যার মূল্য সাড়ে ৫ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে। তবে হলফনামার বাইরেও সাদেক খান, তার স্ত্রী ও পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য উঠে এসেছে দুদকের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে।