এক চোখে দেখেন না। চোখটি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। নাকের কোনো অস্তিত্ব নেই। মুখ প্রায় মিলে গেছে আরেক চোখের সঙ্গে। মুখের ওপরের পাটির দাঁত নেই। নিচেরও কয়েকটি দাঁত ফেলে দিতে হয়েছে। কথা বলতে গেলে দেখা যায় তার গলা পর্যন্ত। শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে একটি ক্যানুলা। যেটি নাক বরাবর কপালে স্কচটেপ দিয়ে লাগানো। যা কানের পাশ নিয়ে নেমে ঝুলে আছে গলার কাছে। এভাবেই বেঁচে আছেন ২৩ বছরের খোকন চন্দ্র বর্মণ। তার চেহারা দেখলে এখন বেশির ভাগ মানুষই ভয় পান। পেশায় প্রাইভেটকার চালক খোকনের স্বাভাবিক জীবনে ফেরা এখন অনিশ্চিত।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন খোকন। আর সেজন্য চরম মূল্য দিতে হলো তাকে। বেঁচে আছেন মনের জোরে আর সৃষ্টিকর্তার কৃপায়। তবে যেভাবে বেঁচে আছেন, তা খুবই কষ্টের। গত ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ী থানার পাশে পুলিশ তাকে খুব কাছ থেকে গুলি করে।
সম্প্রতি খোকনের সঙ্গে কথা হয় জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। গত ১৫ আগস্ট থেকে তিনি এখানে চিকিৎসাধীন। এর আগে ১০ দিন ছিলেন মিরপুরের ঢাকা ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতালে।
খোকন শেরপুর জেলার উত্তর কাপাসিয়া উপজেলার নালিতাবাড়ি গ্রামের কিনা চন্দ্র মণ্ডলের ছেলে। পেশার কারণে খোকন থাকতেন নারায়ণগঞ্জে। পরিবারের অন্যরা থাকেন ঢাকার মহাখালী। খোকনের বড় ভাই খোকা চন্দ্র বর্মণও পেশায় প্রাইভেটকার চালক। ভাইয়ের চিকিৎসায় পাশে থাকতে তাকেও চাকরি ছাড়তে হয়েছে। বাবা খাবার সরবরাহের কাজ করেন। সেই টাকায় এখন তাদের সংসার চলছে। তিনজনের আয়ে চলা সুখের সংসারে এখন অভাব আর অনিশ্চয়তার ছাপ। খোকনকে চিকিৎসার জন্য রাশিয়া নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সেই বিষয়ে আলাপ-আলোচনাও চলছে। তবে কবে নেওয়া হবে বা কত দিনে খোকন স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে সেই নিশ্চয়তা না পেয়ে পরিবারের সবাই খুব চিন্তিত।
খোকন অল্প অল্প কথা বলতে পারেন। যা অস্পষ্ট হলেও বোঝা যায়। না বুঝলেও খোকন আকার ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেন। নিজেই বর্ণনা করেন ওই দিনের ঘটনা।
গত ৫ আগস্ট সকালে নারায়ণগঞ্জের বাসা থেকে বের হন তিনি। যুক্ত হন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে। সাইনবোর্ড পর্যন্ত এলে সেখানে দায়িত্বরত বিজিবি তাদের পথ আটকে দেয়। তখন বৃষ্টি হচ্ছিল। খোকনের ধারণা মানুষ প্রায় লাখের কাছাকাছি। তারা বিজিবির বাধা ভেঙে রওনা দেন যাত্রাবাড়ীর দিকে। বেলা ১২টার দিকে পৌঁছান যাত্রাবাড়ী। সেখানে আবার বাধার মুখে পড়েন। যাত্রাবাড়ী থানার সামনে থেকে পুলিশ গুলি চালানো শুরু করে। এ সময় গুলিতে সাত থেকে আটজন নিহত হন। কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে সেনাবাহিনী আসে। তারা জনগণকে রক্ষার জন্য পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। তখন পুলিশ থানার ভেতরে ঢুকে যায়। এরপর উত্তেজিত জনতা যাতে থানায় হামলা চালাতে না পারে সেজন্য সেনাবাহিনী থানা ঘিরে রাখে।
কিছুক্ষণ পর শোনা যায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে পালিয়ে গেছেন। এরপর সেনাবাহিনী থানা গেট থেকে চলে যায়। এর ২/৩ মিনিটেই পুলিশ থানা থেকে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো শুরু করে। পুলিশের গুলিতে লোকজন ছোটাছুটি করতে থাকেন।
থানা থেকে পূর্ব দিকে ফ্লাইওভারের একটি পিলারের পাশে গিয়ে খোকনসহ আরও ১৫-২০ জন আশ্রয় নেন। সেখানেও পুলিশ গুলি চালায়। তখন খোকন দৌড় দেয়। আর তখন তার পায়ে গুলি লাগে। রাস্তার পাশে রাখা যাত্রাবাড়ী মাছের আড়তের ড্রামের পাশে গিয়ে বসে পড়েন খোকন। সেখানে গিয়েই তার মুখ বরাবর গুলি চালায় পুলিশ। গুলি চালানোর আগে হাত জোড় করে অনুরোধ করেছিলেন যাতে গুলি না চালায়। কিন্তু কে শোনে কার কথা। নিষ্ঠুর সেই পুলিশ তার মুখে গুলি চালিয়ে দেয়। খোকন লুটিয়ে পড়েন। তার মৃত্যু হয়েছে ভেবে পুলিশ সরে গেলে কয়েকজন ছাত্র গিয়ে খোকনকে উদ্ধার করেন। এ ঘটনা বেলা আড়াইটার দিকের। তখনও খোকনের জ্ঞান ছিল। পরিবারকে খবর দেওয়ার জন্য নিজেই ফিঙ্গার দিয়ে ফোন খুলে দেন। তারপর তার পরিবারকে খবর দেওয়া হয়। এরই মধ্যে ছাত্ররা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
খোকনের বড় ভাই খোকা বলেন, ‘এমন অবস্থা ছিল তার মুখের কিছুই বোঝা যেত না। বেঁচে থাকবে এটাই ছিল অনিশ্চিত। ঢাকা মেডিকেল থেকে পাঠানো হয় ঢাকা ডেন্টালে। সেখানে ১০ দিন চিকিৎসার পর এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। সেই থেকে এখানেই তার চিকিৎসা চলছে। শুনেছি বিদেশ নেওয়ার বিষয়ে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। আমরা সেই অপেক্ষায় আছি।’
খোকন বলেন, ‘দেশকে ভালোবাসি বলে দেশের জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে আহত হয়েছি। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি। সৃষ্টিকর্তাই বাঁচিয়েছেন। তবে এভাবে থাকতে খুব কষ্ট হয়। তিন মাস হয়ে গেল। আমাকে দেশের বাইরে হোক, আর দেশে হোক- যেন খুব দ্রুত একটা ব্যবস্থা করা হয়।’