এ বছরের মার্চ মাসে অনেকটা হঠাৎ করেই দুর্বল কয়েকটি ব্যাংক আর্থিকভাবে সবল ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার বিষয় আলোচনায় আসে। বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের উদ্যোগে সে সময় শুরু হয় এই আলোচনা। তখন অনেকটা ‘গরম তেলে ঘি ঢালা’র মতো করে এক্সিম ব্যাংক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার তড়িঘড়ি ঘোষণা দেন, ‘পদ্মা ব্যাংক একীভূত হবে এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে।’ তিনি এও জানান, পদ্মা ব্যাংক পর্ষদের সঙ্গে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত কথা হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ব্যাংক পরবর্তী সময়ে একটি ‘মার্জার ও একীভূতকরণ নীতিমালা’ ঘোষণা করে। ব্যাংক দুটির একীভূতকরণের বিষয়টি এগিয়ে নিতে নীতি সহায়তাও দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
গত আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানে পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠজন হিসেবে এক্সিম ব্যাংক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার ও গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার আত্মগোপনে চলে যান। এরই মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন গভর্নর নিয়োগ দিয়ে ব্যাংক খাতে সংস্কার শুরু করে। পরিবর্তিত হয় এক্সিম ব্যাংক পর্ষদও। এই ধারাবাহিকতায় নতুন ঘোষণা এল, পদ্মা ব্যাংক পিএলসিকে একীভূত করছে না এক্সিম ব্যাংক। ব্যাংকটির (এক্সিম ব্যাংক) নতুন পর্ষদ গত সোমবার অনুষ্ঠিত সভায় পদ্মা ব্যাংককে একীভূত করতে পূর্ববর্তী পর্ষদের সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে। এক্সিম ব্যাংক পর্ষদের এই সিদ্ধান্ত নিয়মানুযায়ী ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) জানিয়েও দিয়েছে।
এক্সিম ব্যাংক কী কারণে পদ্মা ব্যাংককে একীভূত করছে না তা জানতে ফোনে যোগাযোগ করা হয় ব্যাংকটির বর্তমান পর্ষদ চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম স্বপনের সঙ্গে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘৯ মাস আগে পূর্ববর্তী পরিচালনা পর্ষদ দুর্দশাগ্রস্ত পদ্মা ব্যাংককে একীভূত বা অ্যাকুইজিশন করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিল। তখন জানতাম এক্সিম ব্যাংকের অবস্থা ভালো। কিন্তু গত কয়েক মাসে ব্যাংকটির ভেতরের প্রকৃত অবস্থা পর্যায়ক্রমে উঠে এসেছে। একদম ডিজাস্টার হয়ে গেছে। এখন নিজেকে বাঁচতে হবে, অর্থাৎ এক্সিম ব্যাংককে বাঁচতে হবে। তাই এই মুহূর্তে আমরা পারছি না পদ্মা ব্যাংকের দায় নিতে।’
নজরুল ইসলাম স্বপন বলেন, ‘কথা ছিল পদ্মা ব্যাংকের দায় একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি করে সরকার ওই কোম্পানিকে দেবে। সেখানে এক্সিম ব্যাংককে কোনো দায় নিতে হবে না। এখন তো সেই সম্ভাবনা নেই।’
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র হোসনে আরা শিখা এ প্রসঙ্গে খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের নতুন গভর্নর ব্যাংক একীভূতকরণ নিয়ে কোনো বক্তব্য দেননি। তিনি যেটা বলেছেন সেটা হলো দুর্বল ব্যাংকগুলোকে তারল্য সুবিধা দেওয়া হবে, যাতে তারা নিজেদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারে।’
পদ্মা ব্যাংক একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে যাওয়ায় এক্সিম ব্যাংক কোনো বিধি লঙ্ঘন করল কি না- এমন প্রশ্নের উত্তরে মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা যেহেতু এক্সিম ব্যাংক বা অন্য কোনো ব্যাংককে একীভূত হওয়ার কথা বলিনি, সেহেতু এখানে বিধি লঙ্ঘনেরও কিছু নেই।’
তিনি বলেন, ‘আমি আবারও বলছি, বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ব্যাংককে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত দেয়নি। তার মানে এই নয় যে ভবিষ্যতে বলবে না। আমরা জানুয়ারি থেকে ব্যাংকগুলোতে নিরীক্ষক নিয়োগ দেব। অ্যাসেসমেন্ট করব এবং সেই অ্যাসেসমেন্টের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত হবে। কী সিদ্ধান্ত হবে, সেটাও এখন বলা যাবে না।’
এ বছরের শুরুতে দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভূত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে সাড়া দিয়ে এক্সিম ব্যাংকের তৎকালীন পর্ষদ চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার পদ্মা ব্যাংককে অধিগ্রহণ বা দুটি ব্যাংক একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত জানান। ওই একীভূতকরণকে বাস্তবায়ন করতে এ-সংক্রান্ত নীতিমালাও জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নিয়মানুযায়ী দুই ব্যাংকের পর্ষদ গত ১৪ মার্চ গৃহীত একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত তিন দিন পর ১৮ মার্চ দুই স্টক এক্সচেঞ্জ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে জানিয়ে দেয়। কিন্তু ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতন হলে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক আইএমএফ কর্মকর্তা ড. আহসান এইচ মনসুর। এরপর ব্যাংক খাতে সংস্কারের অংশ হিসেবে অন্য ১০ ব্যাংকের মতো এক্সিম ব্যাংকের পর্ষদও ভেঙে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর কিছুদিন পরই ব্যাংক একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার বিষয়টি ডিএসইর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের জানিয়ে দিল এক্সিম ব্যাংক।