আশ্রয়কেন্দ্রগুলো দুর্যোগকালে নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করে প্রাণহানি ও সম্পদহানি কমাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত হয়েছে। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের জীবনরক্ষা সহজ হয়েছে। শুধু তাই নয়, আশ্রয়কেন্দ্রগুলো স্কুল, মাদ্রাসা ও কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ফলে স্থানীয় ছেলে-মেয়েদের শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। অধিকাংশ এলাকায় নিরাপদ ও আর্সেনিকমুক্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি কমেছে। তবে সব সৌরবিদ্যুৎ অকেজো হয়ে পড়েছে। ৩ বিভাগের ১৬ জেলার ৮৬টি উপজেলায় ‘উপকূলীয় ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি ছয় বছরে অর্থাৎ ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুনে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
এতে খরচ হয়েছে ৪৪৮ কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
আইএমইডি সূত্রে জানা গেছে, দরিদ্র ও সহায় সম্বলহীন জনগোষ্ঠীকে দুর্যোগকালে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে বিগত শেখ হাসিনার সরকার ২০১৬ সালের ২০ জুলাই প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়।
প্রধান প্রধান কাজ ধরা হয়– ২২০টি বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, পানি সরবরাহের জন্য প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে ১টি করে মোট ২২০টি গভীর নলকূপ স্থাপন, প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে দেড় হাজার ওয়াটের করে ২২০টি সোলার সিস্টেম স্থাপন, আশ্রয়কেন্দ্রে সহজে যাতায়াতের জন্য ২৯ কিলোমিটার আরসিসি অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ, প্রতিটি আশ্রয় কেন্দ্রের পাশে দুর্যোগকালে গবাদি পশুর আশ্রয়ের জন্য ক্যাটল শেল্টার নির্মাণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
প্রথমে প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছিল ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থে খরচ ধরা হয়েছিল ৫৩৩ কোটি টাকা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ৩ বিভাগের ১৬ জেলার ৮৬টি উপজেলায় কাজও শুরু হয়।
জেলাগুলো হলো- সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলানা, বরিশাল, বরগুনা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, ভোলা, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, চাঁদপুর, কুমিল্লা ও ফেনী। পরে দুই বার সংশোধন করে ৩ বছর সময় বাড়িয়ে ২০২২ সালের জুনে তা শেষ করা হয়। একই সঙ্গে খরচ বাড়িয়ে ধরা হয় ৫৫৬ কোটি টাকা।
লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সব কাজ শেষ হয়েছে। এতে ৩০৫টি প্যাকেজের মাধ্যমে প্রকৃত খরচ হয়েছে ৫৪৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৯৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ। প্রকল্পটির এই আর্থিক বাস্তবায়ন সন্তোষজনক। প্রকল্পটি গ্রহণের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হলেও যথাযথ গভীরতা, বাস্তব চাহিদা নিরূপণের দিক থেকে পর্যাপ্ত ছিল না। আবার সময়মতো বাস্তবায়িত না হওয়ায় উপকারভোগী জনগণ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় প্রত্যাশিত সুরক্ষা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
আইএমইডি সম্প্রতি ১৬টি উপজেলায় সরেজমিন পরিদর্শন করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রায় ১ হাজার জনের সঙ্গে কথা বলে প্রকল্পটির প্রভাব নিরূপণ করে খসড়া প্রতিবেদন তৈরি করেছে। ৯৬ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের ফলে দুর্যোগকালে নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত হয়েছে, যা প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল। ৫৫ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
এগিয়েছে শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্র
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলো স্কুল, মাদ্রাসা ও কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় এটি একটি বহুমুখী সামাজিক অবকাঠামোতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে উপকূলীয় ও দুর্গম এলাকায় শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে। নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হয়েছে। প্রায় ৭৯ শতাংশ পরিবারের শিক্ষার্থীরা স্থানীয়ভাবে শিক্ষাগ্রহণ করেছে।
শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার কমার প্রবণতা দেখা গেছে। ২৫০ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী রয়েছে কোনো কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো শিক্ষা বিস্তার ও সামাজিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে।
এ ব্যাপারে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার পল্লী জাগরণী মাধ্যমিক বিদ্যালয় বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের প্রধান শিক্ষক মো. হালিম উদ্দিন বলেন, ‘আশ্রয়কেন্দ্রটি নির্মিত হওয়ায় এলাকায় উল্লেখযোগ্য উপকার সাধিত হয়েছে। তবে সোলার প্যানেল অকার্যকর হয়ে পড়েছে। অন্য আশ্রয়কেন্দ্রের শিক্ষকরাও একই মত প্রকাশ করেন।
ক্যাটল শেল্টার ব্যবস্থার মাধ্যমে গবাদি পশু ও গৃহস্থালির মূল্যবান সম্পদ সুরক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে পানিতে ভেসে যাওয়া, মৃত্যু, চুরি বা কম দামে বিক্রি করার মতো আর্থিক ক্ষতি তুলনামূলকভাবে অনেক কমেছে। কোন নেতিবাচক পরিবেশগত প্রভাব সৃষ্টি হয়নি। ১০০ শতাংশ মানুষই জানিয়েছেন তারা ঘূর্ণিঝড় ও অন্য দুর্যোগের সময় নির্মিত আশ্রয়কেন্দ্রে অন্তত একবার হলেও আশ্রয় গ্রহণ করেছেন।
আশ্রয়কেন্দ্রকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন অর্থনৈতিক কার্যক্রম গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে আশ্রয়কেন্দ্রে স্কুল ও মাদ্রাসা কার্যক্রম চলাকালে ফুচকা, ঝালমুড়ি, চা ও ছোট খাবারের দোকান গড়ে উঠেছে।
৯১ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন দুর্যোগকালে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে তারা বিভিন্ন ধরনের প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছেন। ৯৯ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন তাদের আশ্রয়কেন্দ্রে গভীর নলকূপ কার্যকর রয়েছে। এটা নিরাপদ পানির উৎস হিসেবে কাজ করছে। ৫৩ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন সামগ্রিকভাবে আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবহারে তারা অনেক সন্তুষ্ট।
৪ বছরেই সোলার প্যানেল অকার্যকর
১০০ ভাগ মানুষ জানিয়েছেন, আশ্রয়কেন্দ্রে স্থাপিত সব সোলার বিদ্যুৎব্যবস্থা সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বর্তমানে কোনো আলোর সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। চাঁদপুর সদরের চরফতেজংপুর ছালেহীয়া ইবতেদায়ী মাদ্রাসা কাম বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে ময়লা আবর্জনার স্তূপ জমেছে।
সোলার প্যানেল অকার্যকর হয়ে পড়েছে। দেওয়ালে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। এই জেলার দক্ষিণ মতলবের লামচরী উচ্চবিদ্যালয় বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, রসুলপুর আন-নিছা দক্ষিণ মাদ্রাসার আশ্রয়কেন্দ্র, কালিকাপুর আদর্শ দাখিল বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, উত্তর মতলবের দুর্গাপুর জনকল্যাণ উচ্চবিদ্যালয় বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের সোলার প্যানেলও অকার্যকর হয়ে গেছে।
এভাবে সব আশ্রয়কেন্দ্রের সোলার প্যানেল অকার্যকর হয়ে গেছে। অনেক আশ্রয়কেন্দ্রের পাম্পমোটর নষ্ট হয়ে গেছে। দেওয়াল স্যাঁতসেঁতে হয়ে প্লাস্টার উঠে গেছে। অতিবৃষ্টিতে জানালা দিয়ে রুমে পানি ঢুকে পড়ে। দেওয়ালে ফাটল।
পরিচালক নিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব
প্রকল্পটি ৫০ কোটি টাকার উপরে হওয়া সত্ত্বেও সরকারি পরিপত্র মেনে পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ২০১৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ৪ জন যুগ্ম ও অতিরিক্ত সচিবকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় তিন তলাবিশিষ্ট এসব আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে।
এর ফলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, তদারকি ও আন্তসংস্থার সমন্বয় কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় মোট ৯টি অডিট আপত্তির একটি– চাঁদপুর জেলার আপত্তি অনিষ্পন্ন রয়েছে।
প্রকল্পের সার্বিক ব্যাপারে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘কোন প্রকল্প প্রণয়ন করা হয় জনগণের জন্য এবং তাদের স্বার্থে। উপকূলীয় এলাকার জনগণের জন্য এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র হয়েছে, শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে। এসব ভালো দিক। তবে কয়েক বছর যেতে না যেতেই সোলার প্যানেল অকার্যকর হয়ে গেছে। এটা নেতিবাচক দিক। দ্রুত তা সক্রিয় করা দরকার।’