আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রথমবারের মতো বৃত্ত ভেঙে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশের ওপরে ওঠার জোরালো আভাস মিলেছে। বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এই বরাদ্দ বৃদ্ধিকে ইতিবাচক মনে করা হচ্ছে।
তবে স্বাস্থ্য খাতের আমূল সংস্কার, মাঠপর্যায়ে গুণগত সেবা নিশ্চিত, দুর্নীতি-স্বচ্ছতা ও বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা।
- স্বাস্থ্য বাজেট জিডিপির ১% ছাড়াতে পারে, তবে বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
- চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সরকারি হাসপাতালে জনবল, ওষুধ, ডায়াগনস্টিক সেবা ও পরিচ্ছন্নতা বাড়ানোর দাবি উঠেছে।
- ই-হেলথ কার্ড, ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ ও জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে চিকিৎসার জন্য সাধারণ মানুষের নিজের পকেট থেকে খরচ (আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার) সবচেয়ে বেশি। এটি প্রায় ৬৮ থেকে ৭০ শতাংশ। এই বিশাল ব্যয় না কমিয়ে এবং সরকারি হাসপাতালের জনবল সংকট, ডায়াগনস্টিক সেবার অভাব ও ওষুধের পর্যাপ্ততা নিশ্চিত না করে কেবল ‘কাগুজে বরাদ্দ’ বাড়ালে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার এ দেশে কোনোদিনই পূরণ হবে না।
একই সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়াতে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ‘জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল’ গঠন এবং বেসরকারি খাত থেকে ‘কৌশলগত ক্রয়ের’ মাধ্যমে বিনামূল্যে সেবা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ছে, খরচের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ এবং ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল উভয়েই নিশ্চিত করেছেন যে, এবার বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশের কিছু ওপরে (১ পয়েন্ট সামথিং) যাচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি।
ড. হামিদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত অর্থবছরের স্বাস্থ্য বাজেট ছিল প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। এবার তা বেড়ে ৫০ হাজার কোটি টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু এবার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার একটি বড় অঙ্কের বিশেষ থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ২৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। এই থোক বরাদ্দ যুক্ত হলে প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য বাজেটের আকার কম-বেশি ৭০ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে এটি শেষ পর্যন্ত সরকার সংস্থান করতে পারবে কি-না এবং তা খরচের সক্ষমতা মন্ত্রণালয়ের আছে কি-না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
‘পকেট খরচ’ কমাতে সরকারি হাসপাতালের ৪ দফা সংস্কার প্রস্তাব
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দ হওয়া উচিত এবং সরকারের পরিকল্পনাও রয়েছে পর্যায়ক্রমে তা ৫ শতাংশে উন্নীত করার।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ খবরের কাগজকে বলেন, ‘২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার যে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার রয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
দেশের সিংহভাগ মানুষকে এখনো চিকিৎসার জন্য নিজস্ব পকেট থেকে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করতে হচ্ছে। প্রান্তিক ও নগরবাসীর কাছে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে না পারলে এই লক্ষ্যের কোনো অর্থ থাকবে না।’ তিনি সরকারি হাসপাতালের ফ্লোরে রোগী উপচে পড়া এবং বেসরকারি হাসপাতালে বিপুল খরচের বৈষম্য তুলে ধরে কঠোর মনিটরিং ও স্বচ্ছতার তাগিদ দেন।
এই ‘আউট অব পকেট পেমেন্ট’ কমাতে ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ সরকারি হাসপাতালের মানোন্নয়নে চার দফা অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন। এই চার দফা প্রস্তাবনা হলো; ১) চিকিৎসা খাতে জনবল সংকট দূরীকরণ ২) ডায়াগনস্টিক সেবা সচল রাখা ৩) ওষুধের পর্যাপ্ততা এবং ৪) হাসপাতালের সার্বিক পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতার মান বৃদ্ধি করা।
বেসরকারি খাত থেকে ‘কৌশলগত ক্রয়’ ও শুল্ক ছাড়ের শর্ত
অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ জানান, প্রতিবছর প্রায় ৩০ লাখ প্রসূতি মায়ের প্রসবকালীন সেবা, ক্যানসার কেয়ার এবং ডায়ালাইসিস সেবার ক্ষেত্রে সরকারি সক্ষমতা অপ্রতুল। এই সংকট মোকাবিলায় সরকারকে ‘কৌশলগত ক্রয়’ বা বেসরকারি খাত থেকে সেবা কেনার নীতি গ্রহণ করতে হবে।
তিনি বলেন, প্রতিটি এলাকায় মানসম্পন্ন বেসরকারি হাসপাতালকে তালিকাভুক্ত (ইমপ্যানেলড) করে চুক্তি করতে হবে। মায়েরা সেখানে বিনামূল্যে প্রসবকালীন সেবা নেবেন এবং কিডনি রোগীরা বিনামূল্যে ডায়ালাইসিস পাবেন, যার বিল সরাসরি সরকারি তহবিল থেকে পরিশোধ করা হবে। একই সঙ্গে তিনি মূল্যস্ফীতির এই সময়ে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, চিকিৎসাসামগ্রী ও ডায়াগনস্টিক ইকুইপমেন্ট আমদানিতে শর্তসাপেক্ষ শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব করেন।
চিকিৎসায় নতুন উদ্যোগ: ‘ই-হেলথ কার্ড’ ও ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী
ড্যাব মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল জানান, চিকিৎসা ব্যয় কমিয়ে আনতে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ হিসেবে ‘ই-হেলথ কার্ড’ প্রজেক্ট ও রেফারেল সিস্টেম চালুর বিশেষ পরিকল্পনা করছে সরকার। এটি পুরোপুরি কার্যকর হলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাওয়া যাবে।
তিনি আরও জানান, স্বাস্থ্যসেবা বিকেন্দ্রীকরণের অংশ হিসেবে ইউনিয়ন ও জেলা পর্যায়ে ডায়াগনস্টিক সুবিধা ব্যাপক হারে বাড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে প্রায় ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে ৮০ শতাংশই থাকবেন শিক্ষিত নারী কর্মী। চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের জন্যও এবার বিশেষ বাজেট রাখা হয়েছে। চিকিৎসায় সুশাসন ও সমন্বয় আনতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অবকাঠামো ও জনবলকে একীভূত করে একসঙ্গে কাজে লাগানোর প্রক্রিয়াও পরিকল্পনাধীন রয়েছে।
সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধির চ্যালেঞ্জ এবং ‘জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল’
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ও ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে রোগ নির্ণয় পদ্ধতি আধুনিক করার পাশাপাশি অসংক্রামক ব্যাধি ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং ওয়াটার, স্যানিটেশন ও হাইজিন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি জানান অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ।
ড্যাব মহাসচিব ডা. শাকিল অবশ্য জানান, সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবারের বাজেটে আলাদা থোক বরাদ্দ ও বিশেষ তহবিলের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে এই প্রচলিত বাজেট কাঠামো (লাইন আইটেম) দিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে দ্রুত টাকা ছাড় করা যায় না বলে উল্লেখ করেন ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ।
তিনি মহামারি ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় একটি স্বাধীন ‘জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল’ গঠনের প্রস্তাব করেন, যার আকার হবে ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা। তহবিলের অর্থায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি বলেন, এই তহবিলের মোট অর্থের ২৫ শতাংশ আসবে সরকারি বাজেট থেকে। বিদেশি অর্থায়নে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প না করে এই মূল তহবিলে অর্থায়নের অনুরোধ জানানো যেতে পারে। করপোরেট প্রতিষ্ঠানের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) ফান্ডের ৫ বা ১০ শতাংশ এখানে যুক্ত করা যেতে পারে।
চিকিৎসা শিক্ষা ও ওষুধ শিল্পের সংকট
শুধু ভর্তি, বদলি আর পদায়ন নিয়ে ব্যস্ত না থেকে পিসিআর বা মলিকুলার টেস্টের মতো আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন ও কারিকুলামের আমূল সংস্কারের দাবি জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ।
পাশাপাশি, ডলার সংকট ও ওষুধের কাঁচামাল আমদানির বিষয়ে তিনি সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশ যখন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে, তখন পেটেন্ট বা শুল্কের অনেক আন্তর্জাতিক সুবিধা আর পাওয়া যাবে না। তাই ওষুধের গুণগত মান বজায় রেখে দেশেই যাতে অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস বা কাঁচামাল তৈরি করা যায়, সেই প্রস্তুতি ও নীতিগত সহায়তা এই বাজেট থেকেই শুরু করা দরকার।