দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ক্ষয়ে যাওয়া আর্থিক খাতকে ঠিক করতে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের কথা বলে আসছে অন্তর্বর্তী সরকার। দীর্ঘ ৯ মাস পর গত শুক্রবার উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ বৈঠকে সেই অধ্যাদেশ পাস করা হয়েছে, যা বর্তমান সরকারের বড় একটি অর্জন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে অধ্যাদেশ পাস করলেই হবে না, এটা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এই সরকারকেই সেটা শুরু করতে হবে। তা না হলে অর্জন ম্লান হয়ে যাবে। আগামী বাজেট বক্তৃতায় এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য থাকা প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তারা।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তাফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে অন্তত সমস্যা সমাধানের রাস্তাটা তৈরি হয়েছে। এখন সেটা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেই রাস্তায় চলাচল শুরু করতে হবে। অধ্যাদেশে যে পরিবর্তনগুলো করা হয়েছে, সেটা অবশ্যই ভালোর জন্য করা হয়েছে। তবে শুধু আইন করলেই তো হবে না, সঠিক সময়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করাটাই বড় বিষয়। অতীতেও অনেক ভালো আইন ছিল। আইনে সব সময় ভালো কথাই থাকে। কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়ন আমরা খুব একটা দেখিনি। অর্থাৎ বাস্তবায়নে অনীহা ছিল। এই অনীহার কারণেই এত বড় সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। কাজেই কেবল আইন প্রণয়ন করলেই হবে না বা সংশোধন করলেই হবে না, সঠিক সময়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। অতীতের মতো এবারও সঠিক বাস্তবায়ন না হওয়ার আশঙ্কা আছে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আশঙ্কার জায়গা তো সব সময় থেকেই যায়। বাস্তবিক প্রয়োগ যতক্ষণ পর্যন্ত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তো কিছু বলা যাবে না।’
জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে দেশের ব্যাংক খাতে নানা ঘাত-প্রতিঘাত চলছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এর সর্বোচ্চ প্রসার ঘটে। ২০১৩ সালে রাজনৈতিক বিবেচনায় ৯টি ব্যাংক অনুমোদন দেওয়া হয়। এর অধিকাংশ ব্যাংক থেকেই রাজনৈতিক নেতাদের মদদে অর্থ লোপাট করা হয়েছে। ফলে এসব ব্যাংক দুর্বল হয়ে পড়ে। দুর্বল হওয়া এসব ব্যাংক নিষ্পত্তির কোনো বিধান এতদিন ছিল না। প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিভিন্ন সময়ে দুর্বল ব্যাংক অবসায়নে আইন পাস করা হবে- এমন বক্তব্য দিলেও তা করতে পারেননি। এরপর অন্য কোনো সময়েও এই বিষয়ে কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে দুর্বল ব্যাংকগুলোর দায় পড়ে ভালো ব্যাংকের ওপরেও। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করে। সেখানে দেখা যায়, দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি ব্যাংকে লুটপাটের থাবা পড়েছে। পরিচালনা পর্ষদের সহযোগিতায় ব্যাংকের এমডি-চেয়ারম্যানরাই এসব লুটপাটে জড়িত ছিলেন।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, এতদিন দুর্বল ব্যাংককে নিষ্পত্তির দিকে নিয়ে যাওয়ার আইনি কোনো ভিত্তি ছিল না। এই অধ্যাদেশে নিষ্পত্তির একটা পথ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। এটা প্রস্তুতিমূলক একটা অর্জন। এই অর্জন তখনই সফল হবে, যখন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হবে। তিনি বলেন, এই অধ্যাদেশে দুর্বল ব্যাংক নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কী কী ধরনের পথ হতে পারে, সেগুলোকে পরিষ্কার করা হয়েছে। প্রথমত, যেসব দুর্বল ব্যাংক রয়েছে তাদের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংক একটা প্রস্তাবনা চাইবে। তারপর বাংলাদেশ ব্যাংকে নতুন একটা বিভাগ হবে যারা এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করবে। তিনি আরও বলেন, ‘লুটপাটের কারণে এত ব্যাংক এর আগে দেউলিয়া হতে আমরা কখনোই দেখি নাই, যা আইনি ভিত্তি ছাড়া কোনোভাবেই সমাধান হবে না। আবার আইন করলেই যে সমস্যার সমাধান হবে, সেটারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা থাকতে হবে। এই সরকার হয়তো পুরোটা বাস্তবায়ন করতে পারবে না। তবে দুই একটা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত রাখতে হবে। এই সরকারের সময়ে অধ্যাদেশের কোন বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করতে পারবে আগামী বাজেট বক্তৃতায় অন্তত এই বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার থাকতে হবে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন খবরের কাগজকে বলেন, এটা অবশ্যই ভালো দিক। এতদিন পর এই অধ্যাদেশ পাস করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে এটা প্রাথমিক ধাপ। সঠিকভাবে বাস্তবায়নটাই মূল চ্যালেঞ্জ। সেটাই হবে চূড়ান্ত ধাপ। এই সরকারকেই বাস্তবায়নের কাজটা শুরু করতে হবে। যাতে পরবর্তী সরকার সেটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। আর যদি না নেয় তাহলে পরবর্তী সরকারকে দায়ী করা যাবে।
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, এখন থেকে কোনো ব্যাংকের তহবিল প্রতারণামূলকভাবে ব্যবহারে যারাই চিহ্নিত হবেন, তারাই [ব্যাংকের চেয়ারম্যান বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বা ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রত্যেক স্তরের কর্মকর্তারাও] দায়ী হবেন। এরূপ ব্যক্তিদের প্রতারণামূলকভাবে ব্যবহৃত বা অপব্যবহৃত ব্যাংকের সম্পদ বা তহবিল সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে পরিশোধ করতে হবে। যদি পরিশোধ না করেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবে। সেই সঙ্গে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক মিলে ইসলামি ধারাসহ যেকোনো তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সাময়িকভাবে সরকারি মালিকানায় নিতে পারবে। সুনির্দিষ্ট কারণ দেখিয়ে দুর্বল যেকোনো ব্যাংকে অস্থায়ী প্রশাসক নিয়োগ দিতে পারবে বাংলাদেশ ব্যাংক- অধ্যাদেশে এমন ধারাও যুক্ত করা হয়েছে। অধ্যাদেশে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক যদি মনে করে, কোনো ব্যাংক আর কার্যকর নয় বা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা নেই, দেউলিয়া হয়ে গেছে বা দেউলিয়া হওয়ার পথে, আমানতকারীদের পাওনা দিতে পারছে না বা না দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তখন এ ধরনের ব্যাংকের ভালো করার স্বার্থে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাস হয়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন আলাদা বিভাগ গঠন করবে, অধ্যাদেশেই এ কথা বলা রয়েছে।
অধ্যাদেশ পাস করাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও কিছু জায়গায় দ্বিমত প্রকাশ করেছেন ব্যাংকের এমডি ও চেয়ারম্যানরা। তারা বলছেন, সব ব্যাংককে ঢালাওভাবে বিচার করা ঠিক না। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিও বড় বিষয়।
এই বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আইন করা অবশ্যই ভালো হয়েছে। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। তবে এই আইনের অনেক বিষয়ে আমাদের আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক নিশ্চয়ই আমাদের সঙ্গে বসে সেই ব্যাখাগুলো পরিষ্কার করবে।’
এই অধ্যাদেশের সঙ্গে দ্বিমতের কোনো জায়গা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঋণ জালিয়াতির দায় ব্যাংকের এমডি এবং চেয়ারম্যানকে নিতে হবে। সব ক্ষেত্রে হয়তো তারা দায়ী নন। কিন্তু আইনের কারণে অনেক সময় নিরপরাধ ব্যক্তিও এতে জড়িত হয়ে যেত পারেন।
একই বিষয়ে ব্যাংকের মালিক তথা চেয়ারম্যানদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার বলেন, অধ্যাদেশ নিয়ে বিএবি বিশ্লেষণ করবে। তারপর প্রতিক্রিয়া জানাবে।
প্রাথমিকভাবে তিনি বলেন, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে অধিকাংশই ভালোভাবে চলছে। গুটিকয়েক ব্যাংকে সমস্যা হয়েছে। সেই ব্যাংকগুলোকে নিয়ে আলাদাভাবে কাজ করতে হবে। ঢালাওভাবে সব ব্যাংকে একই আইন প্রয়োগ করা ঠিক হবে কি না, তা বিবেচনা করা দরকার। তিনি আরও বলেন, বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ে সরকারি ব্যাংকের দিকে নজরদারি বৃদ্ধি করা দরকার।