‘আমি তখন ক্লাস রুমের ভেতরে ছিলাম। বিকট শব্দে আমার কানে শোনা বন্ধ হয়ে যায়। হায়দার আলী ভবনের অনেক ছাত্র ও শিক্ষক আগুনে পুড়ছিলেন। আগুনে ঝলসে যাওয়ায় স্কুলের মাশুকা মিসের চেহারা বোঝা যাচ্ছিল না। তখন যা দেখেছি, সবকিছুই এখনো প্রায় সময় চোখে ভেসে উঠছে। এখনো অনেক ভয় লাগে আমার। রাতে ঘুমের মধ্যেও বিভীষিকা ভেসে ওঠে।’
কথাগুলো বলেছে মাইলস্টোন স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিয়ানা।
মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) দুপুরে উত্তরার দিয়াবাড়ীর ওই স্কুল ক্যাম্পাসে কাউন্সেলিং সেন্টারে সাইকোথেরাপি নেওয়া শেষে বের হওয়ার সময় রিয়ানা খবরের কাগজকে এসব কথা বলেছে।
কেবল রিয়ানা নয়, তার সহপাঠী বান্ধবী মুশফিকা তাবাসসুমের সঙ্গেও মঙ্গলবার সেখানে কথা হয়।
আলাপের একপর্যায়ে মুশফিকাও মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে কতটা আতঙ্কগ্রস্ত, সেটাও অনুধাবন করা যায়। মুশফিকার সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল ঠিক সে সময় মাথার ওপর দিয়ে অনেকটা অল্প উচ্চতায় পার্শ্ববর্তী শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে ল্যান্ডিং করতে যাচ্ছিল একটি উড়োজাহাজ। সেটি দেখেই কিছুটা আতঙ্ক ভর করে শিশুটির মনে। একরকম কৌতূহলে মুশফিকার কাছে জানতে চাইলে সে বলেছে, ‘এখন প্লেনের (বিমান) শব্দ শুনলে মনে হয় আবার পড়ে যাবে। অনেক ভয় লাগে।’
কখনো কি প্লেনে ভ্রমণ করেছ? জবাবে মুশফিকা বলে, ‘না, কখনো বিমানে উঠিনি। আর আমি কখন বিমানে উঠতেও চাই না। খুব ভয় লাগে।’
এদিকে শিশু শিক্ষার্থী রিয়ানাও যখন কথা বলছিল, তখন তার মধ্যেও অস্বাভাবিক কিছু যেন তাড়া করছিল। কথা বলতে গিয়ে শোক আর কষ্টে চোখ তার টলটল করছিল। এক মুহূর্তের জন্যও সে তার মায়ের হাত ছাড়ছিল না। গত ২১ জুলাই দুপুরে দিয়াবাড়ীতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় হতাহতদের বাইরে রিয়ানার মতো অনেক শিক্ষার্থী এখন মানসিক ‘ট্রমায়’ ভুগছে, যারা সেদিন সরাসরি সেই বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সাক্ষী হয়েছিল।
শিশু রিয়ানা বলেছে, ‘বিমানটা বিকট শব্দে বিধ্বস্ত হয়েছিল। বিকট শব্দের কারণে হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেছিলাম। এরপর চোখ খুলতেই দেখি, আমার ক্লাসের শিক্ষকের এক পাশ আগুনে পুড়ে গেছে। আরও অনেকেই দগ্ধ অবস্থায় ছুটছিল। এসব দেখে কিছুই বলতে পারছিলাম না। ক্লাস রুমের ভেতরে ছিলাম। পরে গ্রিল ভেঙে আমাকে বের করা হয়। মাশুকা মিসের (শিক্ষিকা) চেহারা বোঝা যাচ্ছিল না। চোখের সামনে যা দেখেছি, কী করে ভুলব?’
মঙ্গলবার ক্যাম্পাসের মাঠে আলাপকালে শিশু শিক্ষার্থী মুশফিকা তাবাসসুম বলে, ‘আমার বন্ধুরা সবাই শারীরিকভাবে আহত হইনি, এমনি ঠিক আছি। তবে মানসিক অবস্থা আমাদের কারোরই ভালো না। আমাদের অনেক বন্ধু, বড় ভাইয়া, আপু ও টিচাররা আগুনে পুড়ে গেছেন। এগুলো মনে হলে অনেক ভয় লাগে। ঘুমের মধ্যেও আগুন দেখি।’
মুশফিকা বলে, ‘আমি দুই দিন কাউন্সেলিংয়ে অংশ নিয়েছি। মা নিয়ে এসেছিলেন।’
কাউন্সেলিংয়ে কী জিজ্ঞাসা করে জানতে চাইলে মুশফিকা ও রিয়ানা জানায়, ‘এখানে ম্যামরা (শিক্ষিকা) আমাদের অনেক কিছু জিজ্ঞেস করেছেন। তোমরা কী দেখেছ, কী করেছ ? তোমরা কী বাইরে ছিলে, নাকি ক্লাস রুমে ? তারপর ড্রয়িং করতে দেন, কোনো কিছুতে সমস্যা হলে তাদের জানাতে বলেছেন। খুব সুন্দর করে ম্যামরা আমাদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়গুলো জিজ্ঞেস করছিলেন।’
এদিকে গতকাল দুপুরে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভেতরে শহিদ মিনারের পাশে কক্ষের বাইরে বসেছিলেন শিক্ষার্থীদের কয়েকজন অভিভাবক। সেটি ছিল কাউন্সেলিং সেন্টার কক্ষ। ভেতরেই চলছিল শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং। অন্য দিনের তুলনায় গতকাল কাউন্সেলিংয়ে আসা শিক্ষার্থীদের কিছুটা ভিড় ছিল।
চৌধুরী রিজওয়ান ও চৌধুরী রিজওয়া- এই দুই ভাইবোন মাইলস্টোন স্কুলের অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। এদিকে তাদের ছোট বোন চৌধুরী নাইলাত স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণিতে (ইংলিশ মিডিয়াম) পড়ে। গতকাল শুধু রিজওয়াকে নিয়ে কাউন্সেলিং সেন্টারে সাইকোথেরাপির জন্য নিয়ে এসেছিলেন তার মা নুরুন নাহার রুনা।
উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা নুরুন নাহার রুনা খবরের কাগজকে বলেন, ‘খোলামেলা পরিবেশে স্কুল ক্যাম্পাস হওয়ায় আমার সন্তানদের এখানে ভর্তি করেছি। ঘটনার দিন আমার মেয়ে স্কুলে এসেছিল। ছুটির পর ও কালচারাল প্রোগ্রামের প্রস্তুতির জন্য দ্রুত বের হয়ে বিপরীত পাশের ভবনে মারজান মিসের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিল। এর কিছু পরেই হায়দার আলী ভবনে বিমান বিধ্বস্ত হয়। এই ঘটনায় রিজওয়ার বান্ধবী মাহিয়া ওরফে মায়া মারা গেছে। আরেক বান্ধবী তাসনিয়া জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। ওরা সবাই ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। সব সময় একসঙ্গেই থাকত ওরা।’
রুনা বলেন, “ঘটনার পরপরই রিজওয়া ভবনের সামনে অন্য বান্ধবীদের খোঁজে এগিয়ে গেলে দগ্ধ অবস্থায় তাসনিয়া তাকে জড়িয়ে ধরেছিল। তাসনিয়া রিজওয়াকে বলেছিল, ‘ওর পুরো শরীর জ্বালাপোড়া করছে।’ রিজওয়াও বান্ধবী তাসনিয়াকে জড়িয়ে ধরেছিল। তাসনিয়ার পোড়া চামড়া রিজওয়ার পোশাকে লেগেছিল। বাসায় গিয়ে সেই পোশাকটি সযত্নে সেভাবেই রেখে দিয়েছে রিজওয়া। ধোয়া হয়নি, ওভাবেই আছে। আমিও বিষয়টি জেনে সেভাবেই রেখে দিয়েছি। তাসনিয়া বর্তমানে চিকিৎসাধীন। সব সময় দোয়া করছি, সে যেন আমাদের মাঝে ফিরে আসে।”
রুনা আরও বলেন, ‘ওই ঘটনায় রিজওয়ার মনের মধ্যেও একধরনের পরিবর্তন বা অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ করা যাচ্ছে। সারা দিন কিছু খায় না। জিজ্ঞেস করলে বলে, তানসিয়া কিছু খেতে পারে না, আমারও খাওয়া-দাওয়া ভালো লাগে না। হঠাৎ ঘরে হাঁটাহাঁটি করে। আবার ঝিমিয়ে বসে থাকে। কথা বলা কমে গেছে। রাতে ঘুমায় না। আমি অনেক রকম গল্প বলে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ঘুমাই। অন্যদিকে ছেলে রিজওয়ান ওই ঘটনার দিন জ্বরের কারণে স্কুলে যায়নি। তবে ওর দুই-তিনজন বন্ধু এই আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা গেছে। এতে রিজওয়ান ব্যাপক শোকাহত।’
মাইলস্টোন স্কুল ক্যাম্পাসে অপর একজন অভিভাবক নাজনীন নীলা খবরের কাগজকে বলেন, ‘মেয়ে তানহা জাহান রোজা মাইলস্টোন স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। এ ঘটনার পর থেকে খাওয়া-দাওয়া করে না। রাতে ঘুম নেই। চুপচাপ থাকে। স্কুলের কথা মনে হলেই কান্না করে। আমি ও আমার স্বামী মেয়েকে বোঝানোর চেষ্টা করি। কিন্তু ওর মনে সেই আতঙ্ক ও ভয় কাটছে না। তা-ই তাকে কাউন্সেলিং সেন্টারে নিয়ে এসেছি।’
মঙ্গলবার মাইলস্টোনের সামনে আগের তুলনায় উৎসুক জনতার আনাগোনা কিছুটা কম ছিল। স্কুল কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের ব্যস্ততা ছিল শিক্ষার্থীদের ট্রমা কাটিয়ে স্বাভাবিক করার। স্কুল শুরু হবে, আবার হাসবে-খেলবে ছোট ছোট শিশুরা। ক্যাম্পাস ভরে উঠবে আনন্দ-উল্লাসে- এমনই প্রত্যাশার কথা জানান সংশ্লিষ্টরা।