অতি আশ্চর্যের বিষয় হলো এই যে, ২০১২ সালে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় মিথ্যা মামলাবাজ চক্রের অন্যতম হোতা সাইফুল ইসলাম ওরফে বাহার চৌধুরী একটি মামলা করেছিলেন।
হত্যার উদ্দেশ্যে লাঠিসোটা দিয়ে পিটিয়ে, ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও এলোপাতাড়ি মারধর করে গুরুতর জখম এবং চুরি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগে এ মামলা করেন। এ মামলার আসামি করা হয় বনশ্রী থানাধীন রামপুরার বাসিন্দা মোছাম্মৎ নাজমা বেগম ও তার দুই ছেলে ওসমান গনি ও ওবায়দুল হক বাবুসহ ৭ জনকে।
মামলাটি তদন্ত করে তদন্ত কর্মকর্তা চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করেন যার নম্বর ছিল ৪৭, তারিখ ২০১৪ সালের ৩০ মে। রিপোর্টে বলা হয়, মিথ্যা অভিযোগে মামলাটি করা হয়েছে। পরে ২০১৫ সালের ২৭ নভেম্বর চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি আদালতে গৃহীত হয় এবং এ মামলার আসামিরা খালাস পান। ততদিনে আদালতের বারান্দায় তাদের কেটে যায় ৩ বছর।
দীর্ঘ ১২ বছর পর গত বছরের ২১ ডিসেম্বরের একটি ঘটনায় সেই ওসমান গনি, ওবায়দুল হক বাবু, ফরচুন শপিং মল দোকান মালিক সমিতির নেতৃস্থানীয় জাহাঙ্গীর হাসান মানিক, গাউছি আজম চঞ্চলসহ চারজনকে আসামি করে গত ৯ জানুয়ারি চাঁদাবাজির হুমকি, গুরুতর জখম ও হত্যার অভিযোগে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় নিয়মিত (জিআর) মামলা করেন জনৈক রুবেল সরকার। যার নম্বর-১১।
লক্ষণীয় বিষয় এই যে, মামলায় সাক্ষীর তালিকায় রয়েছেন চক্রের আরেক সদস্য জুলহাস হাওলাদারের ছেলে শাহেদ হাওলাদারসহ পাঁচজন।
সেক্ষেত্রে বংশপরম্পরায় এরা মিথ্যা মামলা করে জনসাধারণকে হয়রানি করে অর্থ উপার্জন করাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন বলা যেতে পারে বৈকি!
এ মামলার বিষয়ে ওসমান গণির সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বললে জানান, রুবেল সরকার সাইফুল ইসলাম ওরফে বাহার চৌধুরী ওরফে হাত কাটা বাহারের ইন্ধনে মিথ্যা মামলা করেছেন। তিনি এ মামলার অপর আসামি দুজন ফরচুন শপিং মলের কাউকে চেনেন না। তিনি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিন দিন জেল খেটে আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়েছেন। রুবেল সরকার মামলা প্রত্যাহারের বিনিময়ে তার কাছে এক কোটি টাকা দাবি করেছিলেন। স্ট্যাম্প ডিড করতে বলেছিলেন। কিন্তু তাতে তিনি রাজি হননি। এ মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে।
এই সাইফুল ইসলাম ওরফে বাহার চৌধুরী সম্প্রতি ওই ওসমান গনি, তার ভাই ওবায়দুল হক বাবু, তার দুই বোন রেহানা আক্তার রেখা ও রোকসানা আক্তার লাকি, গোলাম সারোয়ার, নির্বাহী প্রকৌশলী সাবেক ডিপিডিসি এন ও সি এস, শাহানুর রশিদ সরকারি প্রকৌশলী ডিপিডিসি, উভয়ের ঠিকানা- তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, বিকাশ দেওয়ান, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রধান কার্যালয়, ডিপিডিসি, বিদ্যুৎ ভবন আবদুল গনি রোড ঢাকা, তানভীর হোসেন সিদ্দিক, নির্বাহী প্রকৌশলী ডিপিডিসি ও অর্চন শপিংমল মালিক সমিতির জাহাঙ্গীর হাসান মানিকসহ অজ্ঞাত কয়েকজনের বিরুদ্ধে আদালতে একটি নালিশি (সিআর) মামলা করেছেন।
এ মামলায় সাইফুল ইসলাম তার ঠিকানা ২৮০ জিপিপি স্টাফ কোয়ার্টার তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল উল্লেখ করেছেন। লক্ষণীয় বিষয় এই যে, এই মামলায় সাক্ষীর তালিকায় রয়েছেন রুবেল সরকার ও বেগমগঞ্জের আবু হানিফের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়েরকারী সালমা আক্তার।
এ মামলা দায়েরের পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডিকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এমন বহু মামলা করে সমাজের বহু নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা হয়েছে।
মিথ্যা মামলা করার ক্ষেত্রে ১৮৬০ সালে ৪৫ নম্বর দণ্ডবিধি আইন প্রণীত হয় যা ১৮৬৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়।
এই আইনের ২১১ ধারায় বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো ব্যক্তির ক্ষতি সাধনের অভিপ্রায়ে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা বা অভিযোগের জন্য কোনো ন্যায্য বা আইনানুগ কারণ নাই বলিয়া জানিয়াও, ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা করে বা করায়, অথবা কোনো অপরাধ করিয়াছে বলিয়া মিথ্যাভাবে ওই ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করে, সেই ব্যক্তি দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয়বিধ দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন; এবং যদি অনুরূপ ফৌজদারি মামলা মৃত্যুদণ্ডে, যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর দণ্ডে বা সাত বৎসর বা তদূর্ধ্ব মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় কোন অপরাধের মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করা হয়, তাহা হইলে যেকোনো বর্ণনার কারাদণ্ডে- যাহার মেয়াদ সাত বৎসর পর্যন্ত হইতে পারে- দণ্ডিত হইবেন এবং অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হইবেন।’
এই আইনের বিশ্লেষণে বলা যায়, ফৌজদারি আদালতে মিথ্যা অভিযোগ আনা এই ধারায় অপরাধমূলক। পুলিশের কাছে মিথ্যা খবর দেওয়াও এই ধারায় অপরাধমূলক। মূলত ক্ষতি করার অভিপ্রায় মিথ্যা অভিযোগ করলে এই ধারার অপরাধ হয়।
সেক্ষেত্রে এই ধারার প্রয়োগ যথাযথভাবে প্রতিপালন করা হলে মিথ্যা মামলা করার প্রবণতা রোধ করা সম্ভব হতো।
দেশে এই মিথ্যা মামলা দায়েরকারী চক্রের বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হলেও তা প্রতিপালিত হয়নি। ফলে মিথ্যা মামলা করার হার বেড়েছে।
অপরাধী চক্র এই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আদালতের আদেশ উপেক্ষা করে এক শ্রেণির অসাধু কর্মচারী, কর্মকর্তার যোগসাজশে জনসাধারণের ক্ষতিসাধনে তৎপর রয়েছে।
মিথ্যা মামলা দায়েরকারীর শাস্তি দেওয়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ প্রসিকিউটোরিয়াল উপদেষ্টা এহসানুল হক সমাজী বলেন, দণ্ডবিধির ২১১ ধারার কার্যক্রম শুরু করার ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৫ ধারায় উল্লিখিত বিধান অনুসরণ করা আবশ্যক। প্রচলিত পন্থায় ফৌজদারি কার্যবিধি ১৯৫ ধারার বিধান উপেক্ষা করে কিংবা লঙ্ঘন করে পেনাল কোডের দণ্ডবিধির ২১১ ধারার অধীনে কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা হলে আইনত প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
মিথ্যা মামলা দায়েরের প্রবণতা কমাতে আইনের বিধানে বর্ণিত শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোর হওয়া উচিত বলে মনে করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডিশনাল অ্যাটর্নি জেনারেল মুহাম্মদ অনিক রুশদ হক। তিনি বলেন, ‘মিথ্যা মামলা দায়েরের শাস্তির বিধান দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় বর্ণিত রয়েছে যা প্রদান করা বিচারকের এখতিয়ারাধীন। তবে মৃত্যুদণ্ডের বা যাবজ্জীবন শাস্তিযোগ্য অপরাধে মিথ্যা মামলা দায়েরকারী বাদীকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে লঘুদণ্ডের পরিবর্তে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া উচিত।’
যে ক্ষেত্রে মিথ্যা মামলা দায়েরকারী বাদী দোষ স্বীকার করেন সেক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি ২৫০ ধারা মতে লঘুদণ্ডের বিপরীতে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করলে এই মিথ্যা মামলা করার প্রবণতা রোধ করা যেতে পারে।
এ প্রসঙ্গে ফৌজদারি মামলা পরিচালনাকারী সিনিয়র আইনজীবী আমিনুল গনি টিটো বলেন, মিথ্যা মামলা দায়েরকারী চক্রে অসাধু পুলিশ সদস্য ছাড়াও আইনজীবীদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। মিথ্যা মামলা করার আগে সংশ্লিষ্টদের সচেতন হতে হবে। যেসব আইনজীবী ও পুলিশ চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের শনাক্ত করে স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলে এ চক্রের কার্যক্রম রোধ করা সম্ভব হবে। দেশের জনগণ হয়রানি হওয়া থেকে মুক্তি পাবে।
আরও পড়ুন:
> মিথ্যা মামলা দায়েরকারী সিন্ডিকেটের হয়রানি অব্যাহত
> মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার আরও অনেকে
> মিথ্যা মামলা দায়েরকারী সিন্ডিকেট আবারও সক্রিয়
(শেষ)