গত বছরের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের ওপর ব্যাপক হামলা হয়। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয় থানাসহ পুলিশের নানা স্থাপনায়। লুট হয় অস্ত্র-গোলাবারুদ। বহু পুলিশ সদস্য কর্মস্থল থেকে পালিয়ে যান। বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে পুলিশ। সেই অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রধান এই বাহিনী। এর মাঝেও সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন সংকট। বর্তমানে চারদিকে মব সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক অস্থিরতা। সাধারণ মানুষের মনে এখনো পুলিশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা। এ রকম আরও নানা প্রতিকূলতার মাঝে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রধান দায়িত্ব নিয়ে মাঠে নামতে হচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশকে।
জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, সেই বিপর্যস্ত পুলিশ বাহিনী আদৌ কি জাতীয় নির্বাচনে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারবে?
সম্প্রতি ফরিদপুরের ভাঙ্গাসহ আরও একাধিক স্থানে পুলিশকে বেশ বেকায়দা অবস্থায় পড়তে হয়েছে।
গতকাল রাজধানী ঢাকার বেশ কয়েকটি থানা ঘুরে দেখা যায়, থানা ভবন ও ব্যারাকসহ স্থাপনাগুলো সংস্কার বা নতুন করে তৈরি করা হয়েছে। আগের মতো পরিপাটি অবস্থা না থাকলেও মোটামুটিভাবে কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। তবে অস্ত্র-সরঞ্জামের ঘাটতিসহ বেশ কিছু সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তার মধ্যে রাজধানীর তথা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৫০ থানায় কর্মরতদের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল-সমাবেশ ঠেকানো। এর বাইরেও মব সন্ত্রাস, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতিসহ নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে পুলিশকে। সেখানে নির্বাচনের সময় মাঠের আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখার বিষয়টি নিয়ে অনেক পুলিশ কর্মকর্তাও রয়েছেন সংশয়ে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা খবরের কাগজকে বলেন, ‘৫ আগস্টের প্রেক্ষাপটে যে রকম বিরাট পরিবর্তন হয়েছে, সেটা আর কোথাও দেখা যায়নি। এত মানুষের মৃত্যু, পুলিশ সদস্যদের প্রাণহানি, থানায় হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ- এসব মিলে যে অবস্থা হয়েছিল সেই সংকট কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।
পুলিশের সক্ষমতা বা সবল হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক এই আইজিপি বলেন, ‘পুলিশ এখন তো নানা রকম কাজকর্ম করছে, সেটা দেখাও যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু এলাকায় (ফরিদপুরসহ) পুলিশের ওপর যেভাবে চড়াও হওয়ার ঘটনা দেখা গেছে, সেগুলো মূলত স্থানীয় ইস্যু। জাতীয় নির্বাচনে পুলিশের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতার বিষয়গুলো তফসিল ঘোষণার পর আরও স্পষ্ট হবে।’
এদিকে নির্বাচনি দায়িত্ব পেশাদারত্বের সঙ্গে সম্পাদনের লক্ষ্যে পুলিশ সদস্যদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানান পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম। গত সপ্তাহের ডিএমপির কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নিয়ে আইজিপি বলেন, নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনে সক্ষম করতে সারা দেশের দেড় লাখ পুলিশ সদস্যকে বিভিন্ন ভেন্যুতে তিন দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
এদিকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সক্ষমতা প্রদর্শনের পাশাপাশি পুলিশের নিরপেক্ষ ভূমিকা প্রমাণ দেওয়ারও চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করেন সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের এই সহযোগী অধ্যাপক খবরের কাগজকে বলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে পুলিশ বাহিনী যে পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিল, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়াটি খুব সহজ নয়। তার পরও হিসাব করলে দেখা যায়, পুলিশ বিভিন্ন অভিযান, মামলা প্রক্রিয়া, গ্রেপ্তারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেকটা সফল হয়েছে। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের মতো এত বিশাল আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে পুলিশ কতটা ভূমিকা রাখতে পারবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
সংশয়ের কারণ উল্লেখ করে ড. তৌহিদুল হক বলেন, নির্বাচনের সময় সাধারণত রাজনৈতিক মাঠ অনেক উত্তপ্ত হয়। মাঠে নানা রকম প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তা ছাড়া বর্তমানে মব সন্ত্রাস ও গুজব যে হারে বেড়েছে, সেটা নিয়েও নতুন শঙ্কা রয়েছে। এই জাতীয় কিছু অপতৎপরতা পুলিশকে আরও বেশি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করতে পারে। ফলে নির্বাচনি মাঠে পুলিশের সক্ষমতা প্রদর্শনের বিষয়টি সময়সাপেক্ষ বিষয়। তবে নির্বাচনের মাঠে যেহেতু সেনাবাহিনী বা সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন থাকবে, সেই ক্ষেত্রে পুলিশের জন্য দায়িত্ব পালন অনেক সহজ হবে বলেই ধরে নেওয়া যায়।
এদিকে গতকাল সোমবার দুপুর সোয়া ১টায় উত্তরা পূর্ব থানায় গেলে সেখানে প্রবেশদ্বারে একজন পুলিশ কনস্টেবলকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। ভবনের নিচতলায় বাম পাশে ডিউটি অফিসারের কক্ষ, সামনে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কক্ষ। ডিউটি কক্ষের পেছনেই হাজতখানার অবস্থান দেখা গেলেও ভেতরে তখন কোনো আসামি ছিলেন না।
ওই সময়ে ডিউটি অফিসার ছিলেন উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শওকত। তার পাশের চেয়ারে বসেছিলেন একজন এএসআই এবং সেবাপ্রত্যাশী দু্জন। তারা একটি স্কুলভ্যান চুরি যাওয়া সংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলছিলেন।
দায়িত্বরত একাধিক পুলিশ সদস্য জানান, প্রধান সড়কে প্রায় মিটিং-মিছিল ও আন্দোলনের জন্য পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব বেশি থাকে। টহলের জন্য পাঁচটি পুলিশ ভ্যান রয়েছে। এখনো কিছু দুষ্কৃতকারী পুলিশের কাজে বাধা দিয়ে থাকে। তবে পুলিশ শক্তভাবে কাজ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
গতকাল বেলা ২টা ৫ মিনিটে রাজধানীর ভাটারা থানায় ঢুকতেই চোখে পড়ে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক পুলিশ সদস্যকে। থানা ভবনের বাম পাশে ডিউটি অফিসারের কক্ষ। তার পেছনেই হাজতখানা। ডিউটি কক্ষের বিপরীত পাশে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কক্ষ।
জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার রোষানলে পড়েছিল এই থানাটিও। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে পুরো থানা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে এরপর নতুন করে সংস্কার করা হয় থানা ভবনটি। গতকাল ডিউটি কক্ষে ছিল সেবাপ্রত্যাশীদের ভিড়। পুলিশের তিনজন সদস্য বসে কাজ করছিলেন ওই কক্ষে। ডিউটি অফিসার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মাসুদ ভুক্তভোগীদের একের পর এক জিডি দায়েরে সাহায্য করতে ব্যস্ত ছিলেন।
এসআই আব্দুল ওয়াদুত অন্যদের অভিযোগ শুনছিলেন এবং এএসআই ফিরোজ অভিযোগ কম্পোজ করছিলেন। তবে সার্ভার না থাকায় তাদের কাজ করতে বেগ পেতে হচ্ছিল। তারা জানান, সার্ভার অনেক দুর্বল। এ ছাড়া কারও জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করা যাচ্ছে না দীর্ঘদিন।
পরে বেলা সাড়ে ৩টার দিকে রমনা থানা ভবনে গেলে সেখানেও কয়েকজন সেবাপ্রত্যাশীকে দেখা যায়। ডিউটি অফিসার এসআই আফসানা এবং এএসআই বিল্লাল সেবাপ্রত্যাশী মানুষের কথা শুনে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছিলেন।
ডিএমপির মাঠপর্যায়ে দায়িত্বরত পুলিশের একাধিক সদস্য আলাপকালে খবরের কাগজকে বলেছেন, পুলিশকে একটা শ্রেণির মানুষ এখনো সহজভাবে নিতে পারেননি। অনেকে ইচ্ছাকৃত ঝামেলা করে বা সঠিকভাবে কাজ করতে নানা জটিলতা সৃষ্টি করছেন। এদের অধিকাংশই রাজনৈতিক দলের প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন। তাদের অনেকে পুলিশ সদস্যদের হেয় করে কথা বলেন। যেমন- থানায় প্রবেশ করেই বিভিন্ন নেতা রাজনৈতিক পরিচয় ও পোস্টের জানান দিয়ে অতিরিক্ত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেন। সেটির সুযোগ-সুবিধা না দেওয়া হলেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে নালিশ বা আওয়ামী লীগের পুলিশ বলে ‘ট্যাগ’ দেন। এসব কারণে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। সামনে নির্বাচনের সময় কীভাবে দায়িত্ব পালন করা যাবে, সেটা নিয়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরাও সংশয়ে রয়েছেন বলে জানান তারা।
এ প্রসঙ্গে আলাপকালে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘এটা খুব চ্যালেঞ্জিং বিষয়। এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে সবকিছু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। জনগণের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি এখনো আমরা সুনিশ্চিত করতে পারিনি। পুলিশের একক সক্ষমতায় কখনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না। এতে সমন্বিত প্রয়াস লাগবে। অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেমন সেনাবাহিনী, বিজিবি যদি সমন্বিতভাবে কাজ করে এবং জনগণের সহযোগিতা যদি থাকে, তবেই শান্তিপূর্ণ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হবে। আর এখানে যদি অন্য কোনো অপশক্তি কাজ করে এবং বিদেশি শক্তিগুলোর সঙ্গে সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করে, তবে পুলিশের চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবে।’
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (গণমাধ্যম) এ এইচ এম শাহাদাৎ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের মূল টার্গেট এখন সুষ্ঠু-সুন্দর নির্বাচনের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। সে লক্ষ্যে যখন যেটা প্রয়োজন সে বিষয়ে সরকারকে জানানো হচ্ছে। সরকার থেকেও সে অনুসারে সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে। নির্বাচনি মাঠে পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে ইতোমধ্যেই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। নানা সীমাবদ্ধতার মাঝেও যতটা সম্ভব ভালোভাবে দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে পুলিশ।
গণ-অভ্যুত্থানে পুলিশের স্থাপনায় হামলা
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় থানা, ফাঁড়িসহ পুলিশের ২২৪টি স্থাপনা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৫৮টি থানা, ২৬টি ফাঁড়ি, ২টি তদন্তকেন্দ্র, ১০৬টি পুলিশ বক্স, ২৯টি অফিস ও ৩টি অন্যান্য স্থাপনা ছিল। এ ছাড়া ভাঙচুর করা হয় পুলিশের আরও ২৩৬টি স্থাপনা। ওই সময় দেশের প্রায় ৫০০ থানার গাড়ি পোড়ানো হয়। এসব হামলায় দেশের ৪৪ পুলিশ সদস্য নিহত হন। বর্তমানে অধিকাংশ থানা ভবন বা স্থাপনার সংস্কারকাজ করা হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও অস্ত্র-গোলাবারুদসহ নানা সরঞ্জামের সংকট রয়েছে বলে জানা যায়।