পরীক্ষায় ফেল করার আশঙ্কায় বগুড়ায় প্রায় ৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়ে। বাংলা ও ড্রইং-এর মতো বিষয়েও প্রাইভেট পড়তে হচ্ছে নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে। এ ছাড়া পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য বগুড়া শহর ও শহরতলির সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অন্তত ৯০ শতাংশই নির্ভর করে প্রাইভেট টিউটরের ওপর।
ফ্রিল্যান্সার কোচিং সেন্টার অ্যাসোসিয়েশন বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি জিয়াউল হক জিয়া ও সাধারণ সম্পাদক মো. নূরুজ্জামান জুয়েল এসব তথ্য দিয়ে জানান, ৭০টি সেন্টার তাদের সংগঠনের সদস্য। এ ছাড়া জেলা শহরে আরও অন্তত সাড়ে ৯০০ কোচিং সেন্টার রয়েছে যেখানে নিয়মিত প্রথম শ্রেণি থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা পড়তে যায়। আর প্রাইভেট পড়াতে গিয়ে শ্রেণি ও বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি শিক্ষার্থীর পেছনে অভিভাবকদের ব্যয় হয় গড়ে ৩ হাজার টাকা থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত।
সংগঠনটির প্রাথমিক হিসাবে বলা হয়েছে, শহরের জলেশ্বরীতলা এলাকা কোচিং অথবা শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়তে আসে প্রতিদিন অন্তত ১৫ হাজার শিক্ষার্থী। এ ছাড়া অন্যান্য এলাকায় কোচিং সেন্টারে যায় আরও অন্তত ৫ হাজার।
বগুড়া ইয়াকুবিয়া স্কুল ও কলেজে শিক্ষকতা করেন ইকবাল হোসেন। তিনি জানান, তার স্কুলের প্রথম শ্রেণি থেকে ৪র্থ শ্রেণির প্রায় ১ হাজার শিক্ষার্থী তার কাছে আর্ট শেখে। কতজন শিক্ষার্থীকে তিনি ব্যক্তিগত ভাবে আর্ট শেখান এ প্রশ্নের জবাবে ইকবাল হোসেন সেলফোনে বলেন, ‘সব সময় ৬০ থেকে ৭০ জন থাকে কখনো কখনো ১৫০ জন পর্যন্ত হয়’। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রাইভেট কোচিংয়ে আর্ট শিখতে মাসে নেয় কমপক্ষে ৫০০ টাকা। ভালোমানের স্কুলের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে টাকার অঙ্ক আরও বেশি। তা ১ হাজার টাকা পর্যন্ত।
জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলায় ছয়দিঘিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন মো. সুমন হোসেন। থাকেন বগুড়া শহরে আর কোচিং সেন্টারে ক্লাস নেন। তিনি জানান এ পেশায় আছেন ২০১৪ সালে থেকে। মো. সুমন হোসেন বলেন,‘আমি তৃতীয় থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াই আর কোচিং ফি হিসাবে পাই ৫০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত।’
সবচেয়ে বেশি চাপে আছেন প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা। কোচিং সেন্টার বা টিউটর ভেদে মাসে অভিভাবকদের ব্যয় করতে হয় ২ হাজার টাকা থেকে ৩ হাজার পর্যন্ত।
বগুড়া বিয়াম স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে গৃহবধূ শামীমা নাসরিন মিতুর ছেলে। তার বন্ধুদের অনেকেই হাতের লেখা শিখতে কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছে। তার ছেলে চায় বন্ধুদের মতো হাতের লেখা, ধর্ম, বাংলা ও সমাজবিজ্ঞানে কোচিং করতে। শামীমা নাসরিন মিতু বলেন, ‘আমরা যখন স্কুলে পড়তাম তখন শ্রেণি শিক্ষকসহ অন্য শিক্ষকদের কাছে হাতের লেখা জমা দিতে হতো প্রতিদিন। আর ওই চর্চা থেকেই আমাদের লেখা দিন দিন সুন্দর হতো, এ জন্য কোনো কোচিং তখন ছিল না, বাংলা, ধর্ম, সমাজবিজ্ঞান বাড়িতে পড়াতেন বাবা-মা বা বড় ভাইবোন’। বগুড়া শহরের জলেশ্বরীতলায় হাতের লেখা শেখানোর কোচিং সেন্টার চালু হয়েছে অনেক দিন আগে। আর্টের কোচিং সেন্টারও রয়েছে বেশ কয়েকটি আর বেশ কয়েকটি স্কুলের শিক্ষক বাড়িতেই শুরু করেছেন আর্ট শেখানোর ক্লাস।
জেলা শিক্ষা অফিসার মো. রমজান আলী বলেন, ‘এ ধরনের কোচিং বা প্রাইভেট টিউশনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুক্রবার সব কোচিং বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে কোচিং সেন্টারগুলোতে দেওয়া শিক্ষার মানও যাচাই করা হবে’।
ফ্রিল্যান্সার কোচিং সেন্টার অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি জিয়াউল হক জিয়া বলেন, ‘পরীক্ষায় পাস আর ভালো নাম্বার পেতে নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে যাওয়া শিক্ষার্থীদের অনেকেই পাইভেট পড়েন বাংলা, সমাজবিজ্ঞান ও আর্টের মতো বিষয়গুলো। অথচ এসব বিষয়ে মাসের পর মাস প্রাইভেট পড়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু পড়তে হয় শুধমাত্র ভালো নাম্বার পাবার জন্য।’
ফ্রিল্যান্সার কোচিং সেন্টার অ্যাসোসিয়েশন সাধারণ সম্পাদক মো. নুরুজ্জামান জুয়েল জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোতে সঠিকভাবে পাঠদান নিশ্চিত করা যায়নি বলেই শিক্ষার্থীদের কোচিং সেন্টার বা প্রাইভেট টিউটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। মো. নুরুজ্জামান বলেন,‘আমরা কোচিং সেন্টারকে দুই ভাগে ভাগ করেছি। একটি অ্যাকাডেমি সেকশন, আরেকটি অ্যাডমিশন সেকশন। অ্যাকাডেমি সেকশনে ভর্তি হওয়া ৯০ শতাংশই আসে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে।
বিদ্যালয়ে সঠিক পাঠদান নিশ্চিত করতে পারলে অনেককেই আর কোচিং সেন্ট্রারে আসতে হবে না।’
তিনি আরও জানান, পরীক্ষায় ফেল করার আশঙ্কার পাশাপাশি ভালো নাম্বার পেতে প্রায় ৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়ে। কোন এলাকায় কোচিং সেন্টার সবচেয়ে বেশি এ প্রশ্নের জবাবে মো. নুরুজ্জামান বলেন, ‘বগুড়া শহরের জলেশ্বরীতলা, কামারগাড়ি, উপশহর, কালিতলা আর কলেজ বটতলা এলাকায় এখন সবচেয়ে বেশি।
আর এ চারটি এলাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি জলেশ্বরীতলায়’। জলেশ্বরীতলা এলাকায় কালীমন্দির থেকে জেলা কারাগারের মোড় পর্যন্ত ২০০ মিটার এলাকার মধ্যে কোচিং সেন্টার রয়েছে অন্তত ২৭টি। আর এই ২০০ মিটারের মধ্যে কোচিং সেন্টারের ব্যানার, সাইনবোর্ড বা ফেস্টুন আছে ২ শতাধিক। অফিস টাইমে এ সড়কটুকু পার হতে কখনো কখনো সময় লাগে ৪৫ মিনিট পর্যন্ত।