কিছু আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে বাজারে পেঁয়াজের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন। মজুত করে রাখা পেঁয়াজ চাহিদার তুলনায় কম পরিমাণে বাজারে ছাড়া হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতারা বেশি দামে পেঁয়াজ কিনে ক্রেতাদের কাছে বেশি দামেই বিক্রি করছেন। খুচরা বিক্রেতারা যার কাছ থেকে যা পারছেন দাম নিচ্ছেন। একই বাজারে ভিন্ন ভিন্ন দামেও বিক্রি করছেন তারা।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রতিবেদনে পেঁয়াজের বাজার নিয়ে এসব তথ্য আছে। এই প্রতিবেদন দেখে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে জরুরিভাবে পেঁয়াজের দাম কমাতে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে। শুধু তাই নয়, দাম বাড়ানোর কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। প্রয়োজনে জড়িতদের ব্যবসার লাইসেন্স বাতিল করা হবে।
পেঁয়াজের দাম বাড়তে থাকলে সরকারপ্রধানের নির্দেশে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) থেকে দাম বাড়ার কারণ চিহ্নিত করতে কাজ শুরু করে। তদন্ত করতে তিন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের নিয়ে তিনটি টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করা হয়। এসব কমিটি আলাদাভাবে পেঁয়াজের দাম বাড়ার কারণ খুঁজতে আমদানিকারক, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। টাস্কফোর্সের সদস্যরা কৃষক পর্যায়েও খোঁজ নিয়েছে। তিন টাস্কফোর্স কমিটি পৃথকভাবে তদন্ত করে যে যার মতো করে প্রতিবেদন প্রণয়ন করে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পাঠায়। তিন তদন্ত প্রতিবেদন সমন্বয় করে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন করেছে।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতিকেজি দেশি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৪০ টাকার বেশি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন কলি পেঁয়াজ বাজারে আসতে শুরু করেছে। শিগগিরই পেঁয়াজের দাম কমার কথা। তবে সিন্ডিকেটের হাত থেকে মুক্ত না হলে পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। তাই সিন্ডিকেটে কারা জড়িত তাদেরও চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
এনবিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক আমদানিকারক কম দামে পেঁয়াজ আমদানি করে এরই মধ্যে মজুত করেছেন। তিন মাস আগে পর্যন্ত যারা পেঁয়াজ আমদানি করেছেন তাদের আমদানির তথ্য জোগাড়ে নামে এনবিআর। চলতি সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ আমদানি করেছেন এমন ৫০ আমদানিকারক কত করে পেঁয়াজ আমদানি করেছেন, কত করে পাইকারি বাজারে বিক্রি করেছেন, আর কী পরিমাণ মজুত আছে তার তথ্যও খতিয়ে দেখছে।
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস খবরের কাগজকে বলেন পাবনা, কুষ্টিয়া, ফরিদপুরের মজুতদার ও কিছু কৃষক পুরো পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। তারা অল্প অল্প করে পেঁয়াজ বেশি দামে বাজারে ছাড়ছেন। পণ্যটির বাজার ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছে। এ কারণে খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের সরবরাহ কমে গেছে। পাশাপাশি দাম বাড়ার কারণে বেচাবিক্রিও কমে গেছে। ডিসেম্বরে মুড়িকাটা জাতের নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসবে। সেটা দেরি আছে। পেঁয়াজের দাম সহনীয় পর্যায়ে আনতে অন্তত এক মাসের জন্য হলেও আমদানি অনুমতি দেওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।
দেশের বিভিন্ন জেলার মোকাম থেকে পেঁয়াজ আড়তে আসছে। তবে চাহিদার তুলনায় কম। কিন্তু দাম বেশি। এক সপ্তাহ ধরে একই দামে চলছে পেঁয়াজের বাজার। ১১৫ থেকে ১২০ টাকা কেজি পাইকারি বিক্রি করা হচ্ছে। মোকাম থেকেই দাম বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। সেই দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে। আমরা শুধু কেজিতে দেড় টাকা কমিশন পাচ্ছি। কাজেই দাম বেশি কেন, এটা জানতে হলে মোকামে ধরতে হবে। কারণ তারাই সিন্ডিকেট করে দাম নির্ধারণ করে দিচ্ছে। পাইকারিতে দামের ব্যাপারে এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন কারওয়ান বাজারের মিনহাজ বাণিজ্যালয়ের স্বত্বাধিকারী মো. খলিল। অন্য আড়তের পাইকারি বিক্রেতাদেরও একই অভিযোগ, মোকাম থেকেই পেঁয়াজের দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে।
অথচ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, সারা দেশে এখনো সাড়ে তিন লাখ টন পেঁয়াজ মজুত রয়েছে। আবার নতুন পেঁয়াজ খুব তাড়াতাড়ি বাজারে চলে আসবে। তার পরও এক সপ্তাহ ধরে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দামে লাগামহীন হয়ে গেছে। ১২০ টাকা কেজি ছুঁয়েছে। এ অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে গত বৃহস্পতিবার পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি)। ট্যারিফ কমিশন বলেছে, সম্প্রতি স্থানীয় বাজারে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধিতে সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, কতিপয় মধ্যস্বত্বভোগী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজার অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। প্রতি কেজি পেঁয়াজ এই সময়ে ৯০ টাকার মধ্যে থাকার কথা। কিন্তু বাজারে এখন ১১৫-১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশে এই পেঁয়াজের দাম এখনো ৩০ রুপির মধ্যে রয়েছে। বর্তমানে পেঁয়াজের ওপর মোট ১০ শতাংশ শুল্ককর প্রযোজ্য। পার্শ্ববর্তী দেশে পেঁয়াজের দাম কম থাকায় শুল্ককর হ্রাসের প্রয়োজন নেই। যতদ্রুত এই আমদানি হবে তত কম সময়ে স্থানীয় বাজারে এর সরবরাহ ও মূল্য স্বাভাবিক হবে।
পাইকারি বিক্রেতারাও বলছেন, মোকাম থেকেই পেঁয়াজের দাম বাড়ানো হচ্ছে। আমাদের করার কিছুই নেই। কেজিতে যে দেড় টাকা কমিশন পাই তা থেকে দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতন ও অন্য খরচ মেটাতে হয়। এ ব্যাপারে কৃষিপণ্যের পাইকারি বাজার কৃষি মার্কেটের কালু ব্যাপারী খবরের কাগজকে বলেন, ‘বেশ কয়েক দিন ধরেই পেঁয়াজের বাজার চড়া। ফরিদপুরের পেঁয়াজ ১০০ টাকা কেজি ও পাবনারটা ১০৫ টাকা পাইকারি বিক্রি করা হচ্ছে। এ কারণে বিক্রি কমে গেছে। ফলে আমাদের লাভও কমে গেছে। নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসতে কয়েক দিন লাগবে। আমদানি করলে হয়তো দাম কমবে। আমরাও কম দামে বিক্রি করতে পারব।’
এদিকে রাজধানীর শ্যামবাজারের পেঁয়াজ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও শ্যামবাজার কৃষিপণ্য আড়ত বণিক সমিতির সহসভাপতি মো. মাজেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা ব্যবসা করি। মোকাম থেকেই দাম বেঁধে দেয়। সেই দামে বিক্রি করতে রাজি না হলে পেঁয়াজ পাঠায় না সিন্ডিকেট চক্র বা ব্যাপারীরা। কাজেই তাদের ধরলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। গতকাল শ্যামবাজারে পাইকারি পর্যায়ে ৯৫ থেকে ১০০ টাকা কেজি বিক্রি হয়। আমাদের বাজারে গড়ে ২৫ গাড়ি পেঁয়াজ আসে। কয়েক দিন ধরে ব্যাপারীরা পেঁয়াজ সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন। গতকাল ৫ ট্রাকও আসেনি শ্যামবাজারে। তাই দাম বাড়ছেই। এ অবস্থায় সরকারকে আমদানির অনুমতি (আইপি) দিতে হবে। ভারতের পেঁয়াজ এলে ৪০ থেকে ৫০ টাকায় নেমে আসবে। কারণ বর্তমানে ভারতে পেঁয়াজের দাম খুবই সস্তা।’
পাইকারিতে যে দামে বিক্রি হচ্ছে তার সঙ্গে আরও ১৫ থেকে ২০ টাকা যোগ হচ্ছে ভোক্তাদের কাছে যেতে। তাদের ১১০ থেকে ১২০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। মোহাম্মদপুরের টাউন হল বাজারের পেঁয়াজ বিক্রেতা মো. রফিকুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘কয়েক দিন দাম বাড়ার পর আর কমে না। ১০৫ থেকে ১১০ টাকা কেনা। বিক্রি করছি ১১০-১২০ টাকায়। বস্তায় কিছু তো নষ্ট হয়ই।