ঢাকা ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, রোববার, ১৪ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
কচুয়ায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগে ধর্ষক গ্রেপ্তার ক্যানভাসে নৃবিজ্ঞান: দৃশ্যপটে বাস্তবতার সমকালীন রূপ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রয়োজন প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি দাসত্বের আদেশনামা, বাজেটে ঠাঁই হয়নি শ্রমিক-কৃষকের: ওয়ার্কার্স পার্টি এজিই তৈরি করবে জেফ বেজোসের এআই স্টার্টআপ গোপালগঞ্জে ১০ শয্যার আইসিইউ উদ্বোধন: ১০ ভেন্টিলেটরের ৯টিই নষ্ট! মায়ের সঙ্গে অভিমান করে ভারতে যাওয়া সেই কিশোরীকে ফেরত রোমানিয়ার নেতৃত্বে নতুন মুখ, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত আদ্রিয়ান ভেস্তেয়া ‘নতুন কুঁড়ি’ জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে যাওয়ার বাতিঘর: কবীর আহমেদ ভূঁইয়া প্রাকৃতিক ভূগোল অধ্যায়ের ১১টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ২য় পর্ব, এইচএসসির ভূগোল ১ম পত্র সফল হয়েও অপরাধবোধে ভোগেন? জেনে নিন ১০টি লক্ষণ সীমান্তে বৃদ্ধকে পুশইনের চেষ্টা, জয়পুরহাটে উত্তেজনা ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে চার শিশুর মৃত্যু কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে ৯ জনকে পুশইনের চেষ্টা গণমাধ্যমকে অন্ধকার থেকে মুক্ত আকাশে বের করেছেন শহিদ জিয়া: তথ্যমন্ত্রী জাহাঙ্গীরনগরে শিবিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ছাত্রদলের বিক্ষোভ যুদ্ধবিরতি আলোচনায় তেহরানে কাতারের প্রতিনিধি দল বন্ধুর ফাঁদে কিশোরী, দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেপ্তার ৩ কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন শাকিব, পূর্ণিমার ‘চাঁদ তারার গুঞ্জরণ’ মানবতার এক ফোঁটা রক্ত জীবন বাঁচায় নতুন রূপে ফিরছে ঐতিহ্যবাহী আগ্রাবাদ জাম্বুরী মাঠ দেশব্যাপী ‘Go For Gold’ রাইডিং ক্যাম্প শুরু করল উত্তরা মোটর্স প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো গেলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে: স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশের বেসরকারি সমাজ উন্নয়ন কার্যক্রম অধ্যায়ের ১টি প্রশ্ন ও উত্তর, ২য় পর্ব, এইচএসসির সমাজকর্ম দ্বিতীয় পত্র ধামরাইয়ে সরকারি টাকায় ব্যক্তিগত যাত্রী ছাউনি, উপকার হচ্ছে না যাত্রীদের উদ্ভাবনের উৎসবের পর্দা নামল মাগুরায়, জাতীয় পর্যায়ে লড়বে বিজয়ী দল বেনজীরকে দ্রুত ফেরাতে সরকার কাজ করছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিশ্বকাপ উন্মাদনায়ও রুটিন থাকুন নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রামে ২০০ দোকান উচ্ছেদ
Nagad desktop

বারবার ভূমিকম্প, আতঙ্ক এখনো কাটছে না

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ০২:৫১ পিএম
আপডেট: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ০২:৫৭ পিএম
বারবার ভূমিকম্প, আতঙ্ক এখনো কাটছে না

ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের এলাকা ভূমিকম্পে কাঁপল। ঘুমিয়ে থাকায় অনেকেই কম্পন টের পাননি, আবার কেউ কেউ টের পেয়ে আতঙ্কে বিছানা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করেন। 

বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর) সকাল ৬টা ১৪ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে এ ভূমিকম্প হয় বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। 

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ৩৮ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে নরসিংদীর শিবপুরে। এটি ছিল হালকা মাত্রার ভূমিকম্প; রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ১। 

রাজধানী ঢাকার আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র থেকে ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থলের দূরত্ব ছিল ৩৮ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে।

ইউরোপিয়ান মেডিটেরিয়ান সিসমোলজিক্যাল সেন্টার জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল গাজীপুরের টঙ্গী থেকে ৩৩ কিলোমিটার পূর্ব ও উত্তর-পূর্বে, আর নরসিংদী শহর থেকে তিন কিলোমিটার উত্তরে। ভূপৃষ্ঠ থেকে এর গভীরতা ছিল ৩০ কিলোমিটার।

এর আগে সর্বশেষ সোমবার (১ ডিসেম্বর) মধ্যরাত ১২টা ৫৫ মিনিট ১৬ সেকেন্ডে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৯। মায়ানমারের মিনজিনে ছিল এর কেন্দ্রস্থল। চট্টগ্রামসহ দেশের কিছু অংশে এই ভূমিকম্প অনুভূত হয়।

তার আগে গত ২৭ নভেম্বর রাজধানী ঢাকায় ভূমিকম্প হয়। ওই দিন বিকেল ৪টা ১৫ মিনিট ২০ সেকেন্ডে এ ভূমিকম্প হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৬। এর উৎপত্তিস্থল নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ঘোড়াশালে। ওই দিন ভোরের দিকে সিলেটে ও কক্সবাজারের টেকনাফে দুই দফা ভূকম্পন অনুভূত হয়।

তবে এর আগে গত ২১ নভেম্বর সকালে সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানে বাংলাদেশে। ওই ভূমিকম্পে তিন জেলায় অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয় এবং ছয় শতাধিক মানুষ আহত হন। রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ওই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দূরে নরসিংদীর মাধবদীতে এবং এর কেন্দ্র ছিল ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে।

পরদিন সকালে নরসিংদীর পলাশে ৩ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। তার রেশ না কাটতেই সন্ধ্যায় সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি ভূমিকম্প হয়, যার একটির উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার বাড্ডা, আরেকটি সেই নরসিংদীতেই।

কেন নরসিংদীতেই বারবার ভূমিকম্প হচ্ছে?
ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ভূমিকম্পেরই উৎপত্তিস্থল নরসিংদী। এর কারণ হিসেবে ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আক্তার খবরের কাগজকে বলেন, ভূমিকম্পের প্রধান উৎস হচ্ছে সাবডাকশন জোন অর্থাৎ এমন একটি অঞ্চল, যেখানে দুটি টেকটোনিক প্লেট একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খায় এবং একটি প্লেট অন্যটির নিচে চলে যায়। দেশের পূর্ব প্রান্তটা হচ্ছে বার্মা প্লেট, পশ্চিমটা হচ্ছে ইন্ডিয়ান প্লেট; এই সংযোগস্থলে ভূমিকম্প হয়েছে। এই সংযোগটা এতদিন আটকে ছিল। এখন এই সংযোগটা গত ২১ নভেম্বরের ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে খুলে গেছে। অর্থাৎ আটকানোটা বা লকটা খুলে গেছে। তিনি বলেন, দেশের সিলেট, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, হাওর হয়ে মেঘনা নদী বরাবর ইন্ডিয়ান প্লেটটা পশ্চিম দিকে। এই বরাবর ইন্ডিয়ান প্লেটটা যে অংশে সেখানে তলিয়ে যাচ্ছে। এখন এই দুটি প্লেট পরস্পরমুখী গতি। ইন্ডিয়ান প্লেটটা পূর্ব দিকে সরে যাচ্ছে, বার্মা প্লেট দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে সরে যাচ্ছে। তাহলে পরস্পর মুখেই সংঘর্ষ হচ্ছে। ফলে ভূত্বকের মধ্যে সে শক্তি সঞ্চিত করতে থাকে। এখন এই শক্তি যখন শিলারাশির মানে সক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তখন সেখানে ফাটল হয়ে সেই শক্তিটা বের হয়ে যায়, সেটা আগের কোনো ফাটল দিয়েও বের হতে পারে আবার নতুন করে নতুন ফাটল দিয়েও বের হতে পারে। 

একই স্থান থেকে বারবার ভূমিকম্পের কারণের বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর একই স্থান থেকে বারবার উৎপত্তি হওয়াকে আফটার শক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

গতকাল সকালে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবির গণমাধ্যমে বলেন, ‘দেশে একটি বড় ভূমিকম্প হওয়ার পর ছোট ছোট মৃদু অনেক ভূমিকম্প হয়েছে, এগুলো আমরা এখন পর্যন্ত আফটার শক হিসেবে দেখতে পেয়েছি।’

আগামীতে বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা আছে কি না
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আক্তার বলেন, ‘আমাদের গবেষণায় দেখেছি, সাবডাকশন জোনে ৮ দশমিক ২ থেকে ৯ মাত্রার শক্তি জমা হয়ে আছে, তাহলে এই শক্তিটাকে তো বের হতে হবে। ২১ নভেম্বর যে বড় ভূমিকম্প দেশে অনূভূত হয়েছে, সেখানে মোট শক্তির শূন্য দশমিক ১ শতাংশেরও কম শক্তি বের হয়েছে। আরও কয়েক হাজার গুণ শক্তি এখনো জমা হয়ে আছে। ওই শক্তিটাও যে বের হবে, ২১ নভেম্বরের ভূমিকম্প সেটারই আলামত। ওই দিনের ভূমিকম্পটা ওই সংযোগস্থলেই হয়েছে। ফলে আবশ্যিকভাবে বলা যায়, আগামীতে আরও বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সেটা কবে, কখন হবে, মৃদু, মাঝারি না বড় আকারে হবে, সে বিষয়ে কেউ কিছুই বলতে পারবে না। কারণ বৈজ্ঞানিকভাবে ভূমিকম্পের কোনো পূর্বাভাস দেওয়ার সুযোগ এখনো তৈরি হয়নি। 

এখনো আতঙ্কে দেশের অধিকাংশ মানুষ
এখনো ভূমিকম্পের আতঙ্কে রয়েছেন দেশের অধিকাংশ মানুষ। তারা ভূমিকম্প না হলেও ভূমিকম্প টের পাচ্ছেন। অর্থাৎ মানুষ ট্রমায় পড়ছেন। ভয়ে অনেকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতেও ভয় পাচ্ছেন। গতকালের ভূমিকম্পেও ছোট বাচ্চা থেকে বৃদ্ধ মানুষের অনেকেই আতঙ্কে চিৎকারে ঘুম থেকে জেগে উঠেছেন। সোহেল হোসেন নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমার বাচ্চা ভোরে এমন চিৎকার দিয়ে জেগে উঠেছে, তাকে আমরা কিছুতেই থামাতে পারছি না।’ বনানী ঘোষ নামের একজন মধ্যবয়স্ক নারী বলেন, ‘আমার চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসা দরকার। কিন্তু ভূমিকম্পের আতঙ্কে আমি আসার সাহস পাচ্ছি না।’ 

ভূমিকম্পে করণীয় 
বারবার ভূমিকম্পের পর এখনই করণীয় ঠিক করতে তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বড় ধরনের একটি ভূমিকম্পের বিপদ বাংলাদেশের সামনে অপেক্ষা করছে। এ জন্য জনগণের সচেতনতা, সরকারের পরিকল্পনা এবং সামাজিক মহড়ার মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে তারা। 

এ বিষয়ে ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘ভূমিকম্প ঠেকানো যাবে না, প্রতিরোধ করা সম্ভব না, আগাম সংকেতও দেওয়া যাবে না; কিন্তু এর ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব- যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। আমাদের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধ বা ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।’

একই বিষয়ে অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘আমরা তো দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছি ভূমিকম্পে আতঙ্কিত না হতে। এ জন্য মহড়ার কোনো বিকল্প নেই। ভূমিকম্পের মহড়া নিয়মিত করতে হবে। বিভিন্ন গেমের মাধ্যমে এই বিষয়ে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে হবে। এটা সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে গবেষণার কারণে আমি জানি ভূমিকম্পে কী করতে হবে। কিন্তু চর্চা না থাকায় আমিও ঘাবড়ে গিয়েছি। এ জন্যই নিয়মিত মহড়া করা দরকার।’

দুই সপ্তাহে ৫ বার ভূমিকম্প, আতঙ্কে নরসিংদীবাসী

নরসিংদী থেকে প্রতিনিধি শাওন খন্দকার শাহিন জানান, দুই সপ্তাহে জেলায় পাঁচবার ভূমিকম্প  হয়েছে। এসব ভূমিকম্পের বেশির ভাগের উৎপত্তিস্থলই ছিল নরসিংদী। গতকাল পঞ্চম দফায় ৪ দশমিক ১ মাত্রার ভূকম্পন অনুভূত হয়, যার উৎপত্তিস্থল ছিল জেলার শিবপুরে। এতে আবার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে জেলাবাসীর মধ্যে।  

গত ২১ নভেম্বর ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে নরসিংদী জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ভবন, ঘোড়াশাল রেলসেতু ও মাটিতে ফাটল সৃষ্টি হয়। ওই দিন এ জেলায় শিশুসহ পাঁচজন মারা যান এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। নতুন করে ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মাঝে আবার তীব্র আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

প্রথম ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল মাধবদীতে। যেখানে রয়েছে ১৬ তলা ভবনসহ অসংখ্য আবাসিক ভবন। ফলে স্থানীয়রা পরিবার-পরিজন নিয়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে সময় পার করছেন।

মাধবদী পৌরসভায় চাকরি করেন ফজলুল হক ও হানিফ মিয়া। তাদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, পরিবার নিয়ে তারা শঙ্কার মধ্যে আছেন। এর মাঝে ফজলুল হক আটতলা ভবনে বসবাস করেন। ভূমিকম্পের নাম শুনলে তিনি এখন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন।  

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, আতঙ্কের মাঝেও নরসিংদীতে গতকাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম চলেছে। তবে মাধবদী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ক্লাস করতে এসে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন অনেক শিক্ষার্থী।

এ সময় কথা হয় শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে। সফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘কলেজের পুরোনো ভবনে ফাটল ধরেছে। আমরা কিছুটা ঝুঁকিতে রয়েছি। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য শ্রেণিকক্ষের গেটগুলো খোলা রাখা হয়েছে।’ 

পাঁচ দফা ভূমিকম্পের পর নরসিংদীর সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। বহুতল ভবনগুলো বিল্ডিং কোড মেনে নির্মাণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

মাধবদী বাজার ফায়ার সার্ভিসের ইনচার্জ মো. রায়হান বলেন, ‘আমরা অগ্নিনির্বাপণে যেমন ভূমিকা রাখি। তেমনি ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াই।’ তিনি যেকোনো দুর্যোগে আতঙ্কিত না হয়ে সরকারি নির্দেশ মেনে চলার পরামর্শ দেন।

পরিদর্শন নেই, অরক্ষিত রেলপথ

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৮:৫৮ এএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৬, ০৯:৩০ এএম
পরিদর্শন নেই, অরক্ষিত রেলপথ
ছবি: খবরের কাগজ

কাগজে-কলমে জনবল শতভাগ পূর্ণ থাকলেও বাস্তবে মাঠপর্যায়ে তাদের দেখা মেলে না। নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকির অভাবে অরক্ষিত থেকে যাচ্ছে রেলপথ, যার ফলে যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের রেল দুর্ঘটনা। দায়িত্বে অবহেলা করলেও কর্মকর্তাদের নিয়মিত ‘মাসোহারা’ বা উৎকোচ দেওয়ার কারণে চাকরি হারানোর কোনো ঝুঁকি থাকে না। বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে (সিআরবি) এ ধরনের অনিয়মই যেন এখন এক স্বাভাবিক চিত্র।

কতিপয় কর্মকর্তা ও সিন্ডিকেটের যোগসাজশে ভেঙে পড়েছে সিআরবির চেইন অব কমান্ড, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের। সিআরবির বিভিন্ন নথি বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।

কাজ না করে হাজিরা, প্রশাসনের চোখে ধুলো

সিআরবির আওতাধীন উচ্চমান উপসহকারী প্রকৌশলী (এসএসএই-ওয়ে) এবং চট্টগ্রাম বন্দরসংলগ্ন রেলওয়ের প্রধান পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনার ইয়ার্ডের (সিজিপিওয়াই) অধীনে মোট ১৪টি ওয়ার্কিং টিম বা গ্যাং কাগজে-কলমে পূর্ণাঙ্গ জনবল নিয়ে চলছে। সূত্র বলছে, এখানে কোনো শূন্যপদ নেই।

এ ছাড়া মিরসরাইয়ের চিনকি আস্তানায় ১৪টি, ফেনীতে ১৪টি, লাকসামে ১৪টি এবং কুমিল্লায় ১৪টি গ্যাং চালু রয়েছে। প্রতি গ্যাংয়ে মেইট, কিম্যান ও ওয়েম্যানসহ সর্বোচ্চ ১১ জন এবং সর্বনিম্ন ৯ জন সদস্য থাকার কথা।

কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, অধিকাংশ ওয়েম্যান লাইনে নিয়মিত কাজ করছেন না। তারা সহকারী প্রকৌশলী চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রকৌশলী-৩, চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যবস্থাপকের দপ্তরসহ সিআরবির বিভিন্ন অফিসে কর্মরত।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রকৌশলী-১-এর অধীনে গ্যাং নং ১৪-তে মাত্র ৩-৪ জন কর্মী কাজ করছেন। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বাংলাবাজার এলাকায় এসআরভি রেলস্টেশনে সিজিপিওয়াই গ্যাংয়ের অধীনে ৯ জন রেলপথকর্মী নিয়োজিত থাকার কথা। কিন্তু তার বিপরীতে কাজ করতে দেখা গেছে মাত্র ১ জন ওয়েম্যানকে। অন্য গ্যাংয়ে ১১ জনের বিপরীতে কাজ করতে দেখা গেছে মাত্র ২ থেকে ৩ জনকে। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী এসব জেনেও কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না বলে রেলওয়ে মহাপরিচালকের দপ্তরে অভিযোগ জমা পড়েছে।

রেলের পূর্বাঞ্চলের (চট্টগ্রামের মিরসরাই) চিনকি আস্তানার ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী এবং ফেনীর সহকারী প্রকৌশলী কার্যালয়ের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, রেলপথ তদারকি কার্যক্রমে তারা দায়িত্বের সঙ্গে কাজ করছেন না। একই চিত্র দেখা গেছে, এসএসএই (ওয়ে)-চট্টগ্রাম ও এসএসএই (ওয়ে)-ষোলশহরসহ প্রতিটি দপ্তরে। প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে এই নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের ফলে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে রেলপথ। এর আগে ২০২৪ সালে রেলওয়ের মহাপরিচালক দপ্তর থেকে ওয়েম্যানদের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফেরার আদেশ জারি করা হয়েছিল। কিন্তু সে নির্দেশ মানেননি রেলের অসাধু কর্মচারীরা। এতে যারা রেলপথে নিয়মিত কাজ করছেন, তাদের ওপর বাড়তি কাজের চাপ পড়ছে।

ওয়েম্যানরাই রেলপথের মূল তদারককারী। তাদের অনুপস্থিতিতে লাইনের নাট-বল্টু ঢিলা হওয়া বা ফাটল শনাক্ত না হওয়ায় লাইনচ্যুত হওয়া ও বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে যায়।

শাস্তির হাত থেকে বাঁচতে ‘নিয়মিত মাসোহারা’

অনুসন্ধানে জানা যায়, এসএসএই (ওয়ে), সিজিপিওয়াই এবং গ্যাং মেইটের (রেললাইনের রক্ষণাবেক্ষণকারী দল বা ‘গ্যাং’-এর দলনেতা) যোগসাজশে অনেক ওয়েম্যান বা গ্যাংম্যান গরহাজির থাকছেন। শাস্তির হাত থেকে বাঁচতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘মাসোহারা’ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এই মাসোহারার জন্য গ্যাং মেইটদেরও ‘চাপে রাখা হয়’ বলে জানিয়েছেন ওয়েম্যানদের একাংশ।

চট্টগ্রাম গ্যাং নং ৮, ৯, ১০, ১১, ১২–এই ‘মাসোহারা সিস্টেম’-এর বিরুদ্ধে গ্যাং মেইটরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন।

কর্মস্থলে না গিয়েও বেতন-ভাতা তুলে নিচ্ছেন নিয়মিত

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগে রেললাইন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ওয়েম্যানদের একটি বড় অংশ কর্মস্থলে না গিয়ে নিয়মিত বেতন-ভাতা তুলে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। লাইনে কঠোর শ্রম দেওয়ার কথা থাকলেও অনেকে বিভিন্ন নেতার দপ্তরে কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বাসাবাড়িতে অবস্থান করে মাস শেষে বেতন তুলছেন, আর মাসোহারা দিয়ে বছরের পর বছর চাকরি ধরে রেখেছেন।

রেলওয়ের মাঠপর্যায়ের একাধিক সাধারণ কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে খবরের কাগজকে জানান, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ফাঁকিবাজ কর্মীরাও রাতারাতি খোলস বদল করেন। বিগত সরকারের আমলে যারা আওয়ামী লীগের পরিচয় দিয়ে সুবিধা নিয়েছেন, তারা এখন শ্রমিক দলের নাম ভাঙিয়ে কিংবা তথাকথিত ‘সংস্কারপন্থি’ গ্রুপের ‘লেবাস’ ধরে একই ধারা বজায় রাখছেন।

কর্মচারীদের অভিযোগ, এই কর্মীরা সপ্তাহে বড়জোর এক দিন কিংবা ১৫ দিনে একবার এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে যান, যাতে কাগজে-কলমে তাদের অনুপস্থিতি ধরা না পড়ে। মাস শেষে ঠিকই তারা পুরো মাসের বেতন তুলে নিচ্ছেন। একে রেলওয়ে ও রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জন্য বড় ধরনের লোকসান ও ক্ষতি হিসেবে দেখছেন সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

একজন রেল কর্মচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ব্যক্তিগত লাভের জন্য একটা মানুষ পুরো রেলের ক্ষতি করছেন। অথচ এদের দেখার যেন কেউ নেই।’

নিয়মিত বিরতিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের নিয়ম থাকলেও কেন এই অনিয়ম ধরা পড়ছে না–এমন প্রশ্নে মাঠপর্যায়ের কর্মচারীরা জানান, রেলের ব্রিটিশ আমলের নিয়ম অনুযায়ী প্রধান প্রকৌশলীর ছয় মাসে একবার ট্রলিযোগে লাইন পরিদর্শনে আসার কথা। পূর্বাঞ্চলের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী তানভীরুল ইসলাম কাজের বিষয়ে সচেতন হলেও এই পরিদর্শনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

কর্মচারীরা বলছেন, এখন অনলাইনের যুগ। প্রধান প্রকৌশলী পরিদর্শনে বের হওয়ার আগেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে বার্তা পৌঁছে যায় যে ‘আগামীকাল স্যার ট্রলি করবেন’। ফলে পরিদর্শনের দিন সকাল সকাল সব ফাঁকিবাজ কর্মী লাইনে গিয়ে হাজির হন। তিনি পরিদর্শনে গিয়ে সবাইকে কাজ করতে দেখেন। কিন্তু তিনি চলে গেলেই পরিস্থিতি আবার আগের মতো হয়ে যায়।

সাধারণ কর্মচারীদের মতে, অনিয়মের মূল গোড়াটি রয়েছে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের স্তরে। স্থানীয় এসএসএই (সিনিয়র সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার) বা এইএন (অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার) পর্যায়ের কর্মকর্তারা যদি কঠোরভাবে তদারকি না করেন, তবে প্রধান প্রকৌশলীর একক সচেতনতা দিয়ে এই দীর্ঘদিনের ফাঁকিবাজির সংস্কৃতি বন্ধ করা সম্ভব নয়।

যা বলছেন প্রধান প্রকৌশলী

পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলী তানভীরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, রেলওয়ের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভ্যন্তরীণ এসব তথ্য বেশ সময়সাপেক্ষ। ফোনে সব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর দেওয়া মুশকিল। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি। 
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের অনেকেই জানিয়েছেন, রেলপথে জনবলে নিয়োগ ও পরিচালনার পুরো বিষয়টি চট্টগ্রামের সহকারী কর্মকর্তা (এএন) পর্যায় থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ক্রমান্বয়ে বিভাগীয় প্রকৌশলী (ডিএন) এবং প্রধান পার্সোনেল অফিসার (সিপিও) উইংয়ের অধীনে পুরো পূর্বাঞ্চলের এই জনবল কাঠামো পরিচালিত হয়ে থাকে।

টেলিফোনে এই প্রশাসনিক কাঠামোর বিস্তারিত তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে প্রধান প্রকৌশলী তানভীরুল ইসলাম বলেন, ‘টেলিফোনে আমি কোনো তথ্য দিতে পারব না। আপনি যদি চট্টগ্রামের কার্যালয়ে আসতে পারেন তবে ভালো, অন্যথায় স্থানীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।’

খবরের কাগজের এই প্রতিবেদক পরে চট্টগ্রাম বিভাগীয় দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের বার্তাও পাঠান। কিন্তু তারা কেউ সাড়া দেননি। ঢাকায় রেল ভবনের প্রধান পার্সোনেল কর্মকর্তা জাকির হাসানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হবে।’ বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি ফোন কেটে দেন।

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীনও খবরের কাগজের বার্তায় কোনো সাড়া দেননি।

গৌরীপুর ও মুক্তাগাছায় পানির প্রকল্প: ২ বছরে অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:৪২ এএম
আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:৪৪ এএম
গৌরীপুর ও মুক্তাগাছায় পানির প্রকল্প: ২ বছরে অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার পাইকেশমোড়ে ‘লার্জ পাইপড ওয়াটার সাপ্লাই স্কিম’ প্রকল্পের কাজ মেঝে পর্যন্ত হয়েই বন্ধ রয়েছে। ছবি: খবরের কাগজ

গ্রামীণ মানুষের জন্য নিরাপদ ও আর্সেনিকমুক্ত পানি সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল সাড়ে ১২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প। ১৮ মাসের মধ্যে এই পানি সরবরাহ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রায় দুই বছর পার হয়ে গেলেও কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের বড় অংশের বিল তুলে নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী কার্যাদেশ বাতিলের জন্য প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠালেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। 

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় ‘লার্জ পাইপড ওয়াটার সাপ্লাই স্কিম’ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে। দুই উপজেলায় বাস্তবায়ন হতে যাওয়া এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ১২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স নূর অ্যান্ড কোং এই কাজ পায়।

সম্প্রতি সরেজমিনে গৌরীপুর উপজেলার পুম্বাইল গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্পের কাজ বন্ধ রয়েছে। সেখানে কোনো শ্রমিক নেই। নির্মাণকাজের কোনো তৎপরতাও দেখা যায়নি। গৌরীপুরে শুধু একটি ঘরের আংশিক ইটের গাঁথুনি দাঁড়িয়ে আছে।

মুক্তাগাছার পাইকেশ মোড় এলাকায় প্রকল্প স্থানে গিয়েও দেখা যায়, নির্মাণকাজ কেবল মেঝে পর্যন্ত হয়েছে। অথচ দপ্তরের নথিতে কাজের অগ্রগতি ২০ শতাংশ দেখানো হচ্ছে।

বাস্তবে কাজের অগ্রগতি খুব কম হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে বড় অঙ্কের বিল তুলে নিয়েছে। কত টাকা ছাড় করা হয়েছে, সেই তথ্য গোপন রাখা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, প্রকল্প ব্যয়ের মোটা অংশ এরই মধ্যে ঠিকাদারের হাতে চলে গেছে।

ময়মনসিংহ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঠিকাদারকে একাধিকবার মৌখিক ও লিখিতভাবে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় কার্যাদেশ বাতিলে প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে রহস্যজনক কারণে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় গৌরীপুর এবং মুক্তাগাছায় পাম্প স্থাপন ও ট্যাংক নির্মাণ শেষ হলে মোট ৭০০ পরিবার বিশুদ্ধ পানি পাবে। উপকারভোগীরা মিটার অনুযায়ী পানির বিল পরিশোধ করবেন। স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করেই মাসিক বিল নির্ধারণ করা হবে। 

কিন্তু প্রকল্প এলাকার বাসিন্দারা জানান, এ বিষয়ে তারা তেমন কিছু জানেন না। কেউ তাদের সঙ্গে কথা বলেননি। তবে লোকমুখে তারা জেনেছেন পানি সরবরাহের জন্য পাম্প স্থাপন করা হবে। মাসে ১০০ টাকার বিনিময়ে পানি ব্যবহার করতে পারবেন গ্রামের মানুষ।

গৌরীপুরের পুম্বাইল গ্রামের বাসিন্দা আজিজ মিয়া বলেন, ‘আমাদের বাড়িতে মোটর আছে। বিশুদ্ধ পানিই খাই। আবার সরকারি পানি নেওয়ার দরকার কী?’ মুক্তাগাছার পাইকেশমোড় এলাকার বাসিন্দা ইউসুফ আলী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে নামেমাত্র কাজ হয়। পরে আবার বন্ধ হয়ে যায়। এলাকার মানুষও এখন আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।’

মুক্তাগাছা প্রকল্পে কাজ করা শ্রমিক শফিকুল ইসলাম জানান, শ্রমিকদের সঙ্গে ২৬ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছে। কিন্তু নির্মাণসামগ্রী সময়মতো সরবরাহ না করায় কাজ দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। রড, সিমেন্টসহ প্রয়োজনীয় মালামাল ঠিকমতো না এলে কাজ এগোবে না।

নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, মুক্তাগাছা ও গৌরীপুরের এই প্রকল্পের জমি কেনা হয়নি। দুটি ইউনিটেই জমি নেওয়া হয়েছে স্থানীয়দের দানের মাধ্যমে। ফলে জমি পেতেই অনেক সময় লেগে যায়। এরপর কাজ শুরু হলেও তা চলছে ধীরগতিতে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর ঠিকাদার দ্বিতীয় দফায় মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেন। কিন্তু সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক নূর আলম টিটু কাজের ধীরগতির কথা স্বীকার করেছেন। তবে তিনি দাবি করেন, কাজে কোনো অনিয়ম হয়নি। বিল উত্তোলনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর দেননি। তবে ঠিকাদারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বিল উত্তোলনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ বিভাগের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জামাল হোসেনের দায়িত্বে থাকাকালীন এই প্রকল্প শুরু হয়েছিল। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে ফোন কেটে দেন। এরপর একাধিকবার চেষ্টা করলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ময়মনসিংহ বিভাগের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ছামিউল হক স্বীকার করেন, ঠিকাদারকে বারবার মৌখিক ও লিখিত তাগাদা দেওয়া হয়েছে। অগ্রগতি না হওয়ায় কার্যাদেশ বাতিলে প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো সিদ্ধান্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

অর্থবিল বিশ্লেষণ: পার পাচ্ছেন সম্পদশালীরা

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:০১ এএম
আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:০৩ এএম
অর্থবিল বিশ্লেষণ: পার পাচ্ছেন সম্পদশালীরা
বাজেট ২০২৬-২০২৭

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী খুব কায়দা করে প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব জাল বিছিয়েছেন। মোটাদাগে এ জালে সাধারণ মানুষকেই আটকে ফেলে বড়দের এড়িয়ে গেছেন। সম্পূরক শুল্ক কমবেশি করে হাজারের বেশি পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন। ব্যবসায়ী অর্থমন্ত্রী অর্থনীতির টানাপোড়নেও দেশি শিল্প বিকাশের অনেক পদক্ষেপ নিয়েছেন। তবে ছাড় দিলেও ছেড়ে দিলেন না। করপোরেট করহার বাড়ালেন না। 

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের অর্থবিল বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য মিলেছে। 

অর্থবিলে উপজেলা থেকে পাড়ার মোড়ের দোকানও ভ্যাটের আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে। খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্য সরবরাহের ওপর দশমিক ২ শতাংশ হারে অগ্রিম কর আরোপের কথা বলা হয়েছে। এতে প্রতি ১ হাজার টাকায় ২ টাকা অগ্রিম কর কেটে রাখা হবে। 

অর্থবিলে সাধারণ মানুষ রাজস্ব পরিশোধ না করলে বিদ্যমান আইনের কঠোরতা বহাল রাখা হয়েছে। করমুক্ত আয়সীমা আগামী পাঁচ অর্থবছর কয়েক ধাপে বাড়ানোর কথা বলে বাহবা পাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আগামী অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ছে মাত্র ২৫ হাজার টাকা, যা মূল্যস্ফীতির জাঁতাকলে পিষ্ট মানুষের জন্য তেমন স্বস্তির হবে না। অথচ সম্পদশালীদের কর ফাঁকি ও অর্থ পাচার বন্ধ করতে সেই পুরোনো ঢিলেঢালা পথেই হেঁটেছেন। প্রতিবেশী দেশ ভারতের মতো বিভিন্ন দূতাবাসে রাজস্ব দপ্তর স্থাপন করে বিদেশে পাচারকারীদের সম্পদ চিহ্নিত করা এবং সেই দেশে আইন (ল ফার্ম) সংস্থা নিয়োগে পদক্ষেপ নিতে খোদ এনবিআরের সুপারিশ থাকলেও তা বাজেটে আনা হয়নি।

ঋণদানকারী সংস্থা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে (আইএমএফ) খুশি করতে অর্থবিলে রাজস্ব অব্যাহতির সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। এতে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক বাড়লেও জনজীবনে চাপ কমবে না, বরং বাড়বে। 

এতদিন ই-টিআইএন নিয়েও অনেকে করযোগ্য আয় না থাকলে শুধু রিটার্ন দাখিল করেছেন, একটি টাকার কর দিতে হয়নি। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত অর্থবিল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, করদাতার আয় যা-ই হোক না কেন, অতি জরুরি অনেক সেবা নিতে হলে শুধু ই-টিআইএন থাকলেই হবে না, রিটার্ন জমার বাধ্যবাধ্যকতায় কঠোরতা আনা হয়েছে। শূন্য রিটার্ন নিরুৎসাহিত করে শূন্য রিটার্নধারীর আয়-ব্যয় খতিয়ে দেখার আইনি বিধান আনা হয়েছে। 

অর্থবিলে ব্যাংক হিসাব খুলতে ও ব্যাংকঋণ পেতে, পাসপোর্ট করতে, বিদেশ ভ্রমণ সম্পর্কিত কাগজপত্র সংগ্রহ করতে, বাড়ি, ফ্ল্যাট বা জমি কেনা, গাড়ি কেনা এবং এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র নবায়ন করা থেকে যেকোনো ব্যবসায়ে লাইসেন্স পাওয়া বা নবায়ন করতে ই-টিআইএন নেওয়া ও রিটার্ন জমার পক্ষে প্রমাণপত্র জমায় কঠোরতা থাকছে। বাড়ির গ্যাস, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন ইউলিটি সংযোগ নেওয়া থেকে এককালীন ৩ লাখ টাকার বেশি মূল্যের সোনা, মুক্তা বা মূল্যবান গহনাসহ যেকোনো কেনাকাটায়ও একই কঠোরতা থাকছে। অর্থবিলে সরকারি সব কাজে বা সেবা পেতে বাধ্যতামূলকভাবে ই-টিআইএন ও রিটার্ন দাখিলের পক্ষে প্রমাণপত্র দেখাতে হবে। 

আগামী প্রস্তাবিত অর্থবিলে হিমায়িত মাছ, গুঁড়া দুধ, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, মাখন, টমেটো, তাজা বা শুকনা আঙুর, কমলালেবু, আম, লেবুসহ প্রায় সব ধরনের ফল আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। সব ধরনের বিস্কুট, চকলেট ও ময়দাজাতীয় খাবার আমদানিতেও শুল্ক বাড়ানো হতে পারে। ফলে এসব পণ্যের দাম বাড়বে।

আয়কর অধ্যাদেশের ৬৮৮বি ধারা অনুসারে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থা (বিআরটিএ) ১৯৮৪ ধারায় ব্যক্তিগত যানবাহনের মালিকদের কাছ থেকে যানবাহন নিবন্ধন বা বার্ষিক ফিটনেস নবায়নের জন্য অগ্রিম আয়কর সংগ্রহ করে থাকে। ধাপে ধাপে এই অগ্রিম কর বাড়ানো হয়েছে। আগামীতে এই কর কমানোর আবেদন জানালেও অর্থবিলে গাড়ির ইঞ্জিনের ধারণক্ষমতা এবং গাড়ির মডেলের ধরনের ওপর অগ্রিম কর আগের মতোই বেশি থাকছে। 

সাধারণ আয়ের অনেক করদাতা বলেছেন, খাবারের খরচ অনেক বেড়েছে। বাসা ভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা সবকিছুই এখন বেশি। এর মধ্যে সাধারণ আয়ের মানুষের ওপর কর পরিশোধে চাপ দেওয়া হলে ভোগান্তি বাড়বে।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, বাজেট বক্তৃতায় অনেক কিছু আনা হয়নি। কিন্তু অর্থবিলে উল্লেখ করা হয়েছে। সমালোচনা এড়াতেই সরকার এটা করেছে। 

অর্থবিলে সৃজনশীল অর্থনীতি হিসেবে অনেক খাত নতুনভাবে যুক্ত করে করের আওতায় আনা হয়েছে। 

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সৃজনশীল খাত হিসেবে বিদেশে সরকার অনেক অর্থ আয় করে। ভারতেও এমন ব্যবস্থা আছে। 

অর্থবিল থেকে জানায় যায়, সৃজনশীল খাত হিসেবে উপজেলা পর্যায়ের কুটির শিল্প উৎপাদনকারীকেও আগামী অর্থবছর থেকে কর দিতে হবে। নাটক, সিনেমা বা স্টেডিয়ামে খেলা দেখার টিকিটেও কর বসানো হয়েছে। এমনকি কেউ কোনো রিসোর্টে বেড়াতে গেলেও বাড়তি কর গুনতে হবে। 

বাজেট ২০২৬-২৭ উত্থাপন আজ: আকাঙ্ক্ষা বনাম বাস্তবতার টানাপোড়েন

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ০৮:১১ এএম
আপডেট: ১১ জুন ২০২৬, ০৮:১২ এএম
বাজেট ২০২৬-২৭ উত্থাপন আজ: আকাঙ্ক্ষা বনাম বাস্তবতার টানাপোড়েন
অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক। আগামী বাজেটে বিপর্যস্ত অর্থনীতি থেকে উত্তরণ, বৈশ্বিক চাপ মোকাবিলা, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা, জ্বালানিসংকট ও বিনিয়োগে স্থবিরতা দূর করার চাপ আছে। সরকার পড়েছে বেকায়দায়। অর্থনীতির টানাপোড়েনে জন-আকাঙ্ক্ষা কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা। 

খোদ অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্বীকার করেছেন, বিগত দুই সরকারের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছেন। তলিয়ে যাওয়া অর্থনীতি আগামী বাজেটে টেনে তোলার চেষ্টা করা হবে। গতি আনতে আরও সময় লাগবে। 

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেশে কয়েক বছর ধরে শিল্পে বিনিয়োগে গতি নেই। বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি কমেছে। রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ঘাটতি হয়েছে। বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। নতুন কর্মসংস্থান নেই। মূল্যস্ফীতি বিগত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। ব্যাংক খাতে অস্থিরতা, খেলাপি ঋণ বেড়েছে, রপ্তানি আয়ে ধস নেমেছে। সবকিছু মিলিয়ে অর্থনীতিতে নাজুক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তারেক রহমান সরকারের একদিকে জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণের চাপ, অন্যদিকে বিপর্যস্ত অর্থনীতির বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সীমাবদ্ধতার মধ্যেই সরকারকে চাহিদা পূরণের চেষ্টা করতে হবে, যা কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা। 

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, এটি নতুন সরকারের প্রথম বাজেট। খুব স্বাভাবিকভাবে সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের অনেক প্রত্যাশা আছে। কিন্তু দেশের অর্থনীতি খুব খারাপ সময় পার করছে। নাজুক পরিস্থিতিতে সরকার জন-আকাঙ্ক্ষার অনেক কিছুই বাস্তবায়ন করতে পারবে না। এতে সরকারের কঠোর সমালোচনা হলেও কিছু্‌ই করার নেই। 

অর্থনীতির আরেক বিশ্লেষক এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে সরকারের নতুন ঋণচুক্তি করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। সংস্থাটি সরকারকে অনেক কঠিন শর্ত দিয়েছে। এসব শর্ত পূরণ করতে হলেও জনগণের অনেক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না। বিপর্যস্ত অর্থনীতিতে আয় বাড়ানো, আইএমএফের শর্ত মানা এবং জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণের চাপ–এই তিন মিলিয়ে সরকারকে কৌশলী বাজেট করতে হবে, যা অত্যন্ত কঠিন। তিনি বলেন, বাজেটে টানাপোড়েন তো থাকবেই।

ব্যয়ের খাত ও বেশির ভাগ খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঙ্কের বাজেট দিতে যাচ্ছে তারেক রহমানের সরকার। বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।

এই বাজেটে রাজস্ব ও অনুদান ধরা হয়েছে ৭ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এখানে মোট রাজস্ব ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে কর রাজস্ব ধরা হয়েছে ৬ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছ থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, এনবিআরবহির্ভূত কর ২৫ হাজার কোটি টাকা, করবহির্ভূত রাজস্ব ৬৬ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। বিদেশি অনুদান ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।

আসন্ন বাজেটে পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা, এ খাতে অভ্যন্তরীণ সুদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি ও বৈদেশিক সুদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। মূলধনি ব্যয় ৫৪ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা, উন্নয়ন ব্যয় ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ৩ লাখ কোটি টাকা। বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে (অনুদান বাদে) ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। 

বৈদেশিক ঋণ ১ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে নিট বৈদেশিক ঋণ ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যমাত্রা ৪৬ হাজার কোটি টাকা। 

অভ্যন্তরীণ ঋণ ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা এবং স্বল্পমেয়াদি ৬ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। ব্যাংকবহির্ভূত ঋণ ১৫ হাজার কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা ৬৮ হাজার ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আসন্ন বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা শতাংশের হিসাবে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল। বাংলাদেশের নতুন সরকার উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের এক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ঘাটতি অর্থায়নে সরকারকে বরাবরের মতো আগামীতেও বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ খাতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। 

চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ লাখ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য ছিল। সংশোধিত বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১৪ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। আগামী অর্থবছর উচ্চসুদের সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়া কমাবে সরকার। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ খাত থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১৯ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, বিএনপি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট দিতে গিয়ে প্রায় সব হিসাবেই উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা প্রাক্কলন করেছে। ঘাটতিও বড়। ব্যয়ের হিসাবও বেশি। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও উচ্চাভিলাষী। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর ব্যাপকভাবে কর আরোপ করতে হবে। অনেক মানুষকে রাজস্ব-জালে আনতে হবে। এসব মানুষের মধ্যে সাধারণ আয়ের মানুষ থাকবেন বেশি। 

তিনি আরও বলেন, সরকারকে অনেক নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতেই হবে। কারণ সরকারপ্রধান এসব অঙ্গীকার করেই ক্ষমতায় এসেছেন। এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে গিয়েও সরকারকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। ফলে আগামী বাজেট হবে সাধাণ মানুষকে চেপে ধরার বাজেট। 

অর্থসংকটে আছে সরকার। এর মধ্যেও সরকারি কর্মচারীর বেতন-ভাতা বাড়ানো হবে। আগামী বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন, নির্বাচনি ইশতেহারের বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষাজালের সম্প্রসারণ, কল্যাণকর অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপনে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড কর্মসূচির বাস্তবায়ন এবং ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ ১৩টি ইস্যু সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এর সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু করেছে সরকার, যা বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ। 

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর খবরের কাগজকে বলেন, দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের পথে। ব্যাংকগুলোতে সীমাহীন দুর্নীতি, অর্থ পাচার, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ প্রদানসহ আরও হাজারও অপতৎপরতার ফলে মাথা সোজা করে দাঁড়াতে পারছে না, খেলাপি ঋণ বেড়ে প্রায় ৩৬ শতাংশ হয়েছে এবং মূলধন ঘাটতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। রাজস্ব আদায় ২০ বছরের বেশি সময় ধরে একই জায়গায় স্থবির হয়ে আছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাজেট দেওয়া হচ্ছে। সরকারের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকছে জনপ্রত্যাশা বা জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণে।

ক্লিন ইমেজের আলী রেজাও দুদকের জালে

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ১০:২৭ এএম
ক্লিন ইমেজের আলী রেজাও দুদকের জালে
ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক এমডি ও সিইও আলী রেজা ইফতেখার

অনিয়ম-দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের (ইবিএল) সাবেক এমডি ও সিইও আলী রেজা ইফতেখারের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দেশের ইতিহাসে কোনো বেসরকারি ব্যাংকে সর্বোচ্চ মেয়াদে এমডি পদে থাকার রেকর্ড রয়েছে তার। ক্লিন ইমেজের কর্মকর্তা হিসেবেও পরিচিত রয়েছে তার। তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ আগে শোনা গেলেও এবারই প্রথম অনুসন্ধান শুরু হলো। মূলত পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফতের বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে দুদকের চলমান অনুসন্ধানের একপর্যায়ে আলী রেজা ইফতেখারের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। সেই তথ্যের ভিত্তিতে সম্প্রতি তার বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। 

দুদক সূত্রে জানা গেছে, অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে আলী রেজা ইফতেখারের বিষয়ে ৬ রকমের নথিপত্র চেয়ে ইস্টার্ন ব্যাংকের কর্তৃপক্ষের কাছে গত মাসে চিঠি দেন অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা ও উপপরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান। ওই চিঠিতে ইস্টার্ন ব্যাংকে আলী রেজা ইফতেখারের ব্যক্তিগত নথির সত্যায়িত কপি, জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের কপি, মোবাইল ও টেলিফোন নম্বরসহ বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বেতন-ভাতার সমুদয় হিসাব বিবরণী, তার নামে পরিচালিত সব ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য (চালু ও বন্ধ) এবং এ পর্যন্ত তাকে দেওয়া অবসরকালীন সুবিধাসহ সব আর্থিক লেনদেনের নথিপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে।

নথি সরবরাহের জন্য ইস্টার্ন ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে ১৭ মে পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে ইস্টার্ন ব্যাংক নথি সরবরাহে ব্যর্থ হয়। পরে গত ৩ জুন আরও ১০ কর্মদিবস সময় চেয়ে দুদকে আবেদন করে ইস্টার্ন ব্যাংক। সার্বিক বিবেচনায় ৭ কর্মদিবস সময় মঞ্জুর করে দুদক। সে অনুসারে আগামী ১৪ জুনের মধ্যে সব নথি দুদকে দাখিল করার কথা রয়েছে। 

আলী রেজা ইফতেখার ২০০৪ সালে ইবিএলের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। ২০০৬ সালে পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হন। ২০০৭ সালে তিনি ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিযুক্ত হন। চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল তিনি অবসরে যান। বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি কোনো ব্যাংকেই কোনো এমডি এত দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। দীর্ঘ সময়ে অন্তত ৫ বার তাকে এমডি পদে পুনর্নিয়োগ দেওয়া হয়। 

আলী রেজা ইফতেখার ২০১২ সালে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত এশিয়ান লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড ‘সিইও অব দ্য ইয়ার-২০১২’ পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০২০-২১ এবং ২০১৪-১৫ মেয়াদে দেশের ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

এদিকে ব্যাংকের ৮৮৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে চৌধুরী নাফিজ সরাফত ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুদক। সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের জানুয়ারি মাসে তাদের ২২টি ফ্ল্যাট জব্দের নির্দেশ দেন ঢাকা মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. জাকির হোসেন। 

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদ্মা ব্যাংকের (পূর্বে ফারমার্স ব্যাংক) চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেন নাফিজ সরাফত। ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানের পর দুই বছরে তার বিরুদ্ধে অন্তত দেড় হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে কয়েকটি মামলা দায়ের হয়েছে। একটি মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও একাধিক মামলা করেছে দুদক।