ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে প্রথমবারের মতো ব্যাপক পরিসরে চালু হওয়া আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাকে ঘিরে একের পর এক বিতর্কে পড়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দুই পৃষ্ঠার পোস্টাল ব্যালটে প্রতীক বিন্যাসে অব্যবস্থাপনা, প্রার্থীর নাম ও ছবি না থাকা এবং দেশে ও বিদেশে একই ধরনের ব্যালট সরবরাহ– এই তিনটি বিষয় ঘিরেই মূলত রাজনৈতিক অঙ্গনে অসন্তোষ দানা বেঁধেছে।
পোস্টাল ব্যালট নিয়ে মূল অভিযোগ বিএনপির। ইসির সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করে এসব বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে দলটির নেতারা জানান, দেশে ও বিদেশে একই ধরনের ব্যালট ব্যবস্থাপনা ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে পারে এবং জালিয়াতির আশঙ্কা করছেন তারা। একই সঙ্গে দেশে আসনভিত্তিক প্রার্থীর নাম ও ছবি দিয়ে পোস্টাল ব্যালট পুনর্বিন্যাস করতে বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) ইসির কাছে দাবি জানান দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
পোস্টাল ব্যালট নিয়ে বিতর্ক মোকাবিলায় গতকাল বৃহস্পতিবার নির্বাচন ভবনে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও মিশন প্রধানদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি মিটিং করে কমিশন। পরে মিডিয়া সেন্টারের সামনে সাংবাদিকদের ইসি সানাউল্লাহ জানান, পোস্টাল ব্যালটের সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তি জড়িত। তাই পোস্টাল ব্যালট নিয়ে অনিয়মের ঘটনায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে সংশ্লিষ্ট প্রবাসীকে দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি দেওয়া হবে। দেশের ভেতরে একই ব্যালটে সাধারণ ও পোস্টাল ভোট গ্রহণের দাবি বিএনপি জানিয়েছে। এ বিষয়ে কমিশনের অবস্থান কি- জানতে চাইলে ইসি সানাউল্লাহ বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা চিন্তা করছি। আগামীকাল (আজ শুক্রবার) কমিশন বৈঠকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে।’
সংশোধিত আরপিও (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ) এবং সংসদ নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা অনুযায়ী, এবার পোস্টাল ব্যালটে কোনো আসনভিত্তিক প্রার্থীর নাম রাখা হয়নি। বরং দুই পৃষ্ঠার ব্যালটে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সব প্রতীক গেজেটের ক্রমধারা অনুসারে সাজানো হয়েছে। প্রতিটি প্রতীকের পাশে একটি করে চেক বক্স রাখা হয়েছে, যেখানে ভোটার পছন্দের প্রতীকে চিহ্ন দেবেন। এই বিন্যাসে ‘না’ ভোটের অপশনও অন্তর্ভুক্ত থাকায় মোট প্রতীকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২০টি।
বিতর্কের মূলে দেশে-বিদেশে একই প্রতীক বিন্যাস
নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের ভেতরে ও বিদেশে অবস্থানরত সব পোস্টাল ভোটারের কাছে একই ধরনের ব্যালট পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি, দেশের অভ্যন্তরে পোস্টাল ভোটের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আসনের প্রার্থীদের নাম ও প্রতীকসংবলিত সাধারণ ব্যালটই ব্যবহার করা উচিত। বিশেষ করে বিএনপি বলছে, দেশের ভেতরে পোস্টাল ভোটার সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। সেখানে সব আসনের সব প্রতীক একসঙ্গে দিয়ে ব্যালট পাঠানো অযৌক্তিক এবং ভোটারদের জন্য বিভ্রান্তিকর।
বৃহস্পতিবার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘যে নির্বাচনি এলাকায় যতজন প্রার্থী আছেন, তাদের নাম ও প্রতীকসহ একই ব্যালট পোস্টাল ভোটে ব্যবহার করলে ভোট দেওয়া সহজ ও স্বচ্ছ হবে। সব প্রতীক দিয়ে ব্যালট পাঠানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই।’
প্রতীক বিন্যাসে ‘ধানের শীষ’ নিয়ে বিতর্ক
পোস্টাল ব্যালট বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয় বিএনপির প্রতীক ‘ধানের শীষ’ ব্যালটের ভাঁজে পড়ে যাওয়ার অভিযোগে। দলটির অভিযোগ, ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতীকটি এমন স্থানে রাখা হয়েছে, যাতে ভাঁজ করলে সহজে চোখে না পড়ে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন অবশ্য ব্যাখ্যা দিয়েছে– প্রতীকগুলোর ক্রম সরকারি গেজেট অনুযায়ী সাজানো হয়েছে। বুধবার ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘পোস্টাল ব্যালটে দলীয় প্রতীকের নামের ক্রমধারা অনুসরণ করা হয়েছে। গেজেটের ধারাবাহিকতা অনুযায়ীই প্রতীক সাজানো হয়েছে।’ তবে তিনি এটিকে একটি ‘মিস’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ছাপার দায়িত্বে থাকা পক্ষের সঙ্গে কথা না বলে বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
প্রবাসে পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাপনাও প্রশ্নবিদ্ধ
দেশের বাইরে পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বাহরাইন ও কাতারে প্রবাসীদের বাসায় একসঙ্গে শতাধিক ব্যালট পৌঁছানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে জালিয়াতির আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। বিএনপির অভিযোগ, কোথাও নির্ধারিত সময়ের আগেই ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে এবং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে এসব ব্যালট ব্যবহারের আলামত পাওয়া যাচ্ছে। ইসি এসব অভিযোগ নাকচ করে বলেছে, কোনো খাম খোলা হয়নি এবং পোস্টাল ব্যবস্থার স্থানীয় বাস্তবতার কারণে একই জায়গায় একাধিক ব্যালট রাখা হয়েছে। বাহরাইন পোস্ট ও সংশ্লিষ্ট দূতাবাসকে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দেশের ব্যালট পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্ত ইসির
রাজনৈতিক চাপ ও বিতর্কের মুখে শেষ পর্যন্ত আংশিকভাবে অবস্থান বদলাতে বাধ্য হয়েছে নির্বাচন কমিশন। গতকাল পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিএনপির প্রতিনিধি দলের অভিযোগ ও দাবি নিয়ে বিকেলে বৈঠক করেছে কমিশন। বৈঠক শেষে নির্বাচন কমিশনার মো. সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, দলগুলোর দাবি বিবেচনায় নিয়ে দেশের ভেতরে পোস্টাল ভোটের জন্য আসনভিত্তিক আলাদা ব্যালট ছাপানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে প্রবাসীদের ক্ষেত্রে বর্তমান বিন্যাস বহাল থাকবে।
সতর্কতা ও এনআইডি ব্লকের হুঁশিয়ারি
বিতর্কের মধ্যেই পোস্টাল ব্যালটের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ব্যালট খামের ওপর কোনো ধরনের রাজনৈতিক লেখা, স্লোগান বা প্রতীক ব্যবহার করলে সংশ্লিষ্ট ভোটারের এনআইডি ব্লক করার ঘোষণা দিয়েছে ইসি। ‘Postal Vote BD’ অ্যাপে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ব্যালট অবশ্যই নিজে সংগ্রহ ও নিজে পূরণ করতে হবে। ইসি মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা জালিয়াতি সহ্য করা হবে না। প্রবাসে বসে কেউ যদি হীন স্বার্থে ভোট জালিয়াতির চেষ্টা করে, তবে তার এনআইডি ব্লক করাসহ প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে বাংলাদেশে ফেরত আনা হবে।
এবার প্রথমবারের মতো প্রবাসী, নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও কারাবন্দিসহ মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে দেশের ভেতরের ভোটারই ৭ লাখ ৬১ হাজারের বেশি। এ ছাড়া ৭ লাখ ৬৭ হাজার ৮৪টি ব্যালট পেপার বাংলাদেশ পোস্ট অফিসের মাধ্যমে প্রবাসী ভোটারদের উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ট্রানজিটে আছে ৫৯ হাজার ৫৮৪টি ব্যালট। সংশ্লিষ্ট দেশে পৌঁছেছে ৭ লাখ ৭ হাজার ৫০০টি ব্যালট। ভোটারের হাতে পৌঁছেছে ১ লাখ ৪০ হাজার ৮৭৩টি। প্রবাস থেকে ফেরত এসেছে ৪ হাজার ৫২১টি ব্যালট। এর মধ্যে বেশির ভাগই এসেছে মালয়েশিয়া থেকে এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ইতালি থেকে। ঠিকানা ভুল হওয়ার কারণে এগুলো ডেলিভারি করা সম্ভব হয়নি।
তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। হিসাব বলছে, ভোটের বাকি আর মাত্র ২৬ দিন। ভোটের আগে পোস্টাল ব্যালট নিয়ে বিতর্ক অনাকাঙ্ক্ষিত মনে করছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা। পোস্টাল ব্যালট নিয়ে চলমান বিতর্কের ঘটনায় নির্বাচন বিশ্লেষক ও ফেমার প্রেসিডেন্ট মুনিরা খান খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘প্রথমবার এত বড় পরিসরে পোস্টাল ভোট আয়োজনে কিছু ভুলত্রুটি থাকতেই পারে। তবে বিতর্কের কারণে প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রশ্নবিদ্ধ বা বাধাগ্রস্ত করা যাবে না।’
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, পোস্টাল ব্যালট একটি আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ হলেও এর প্রতীক বিন্যাস ও ব্যবস্থাপনায় সামান্য অব্যবস্থাপনাও বড় আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল প্রক্রিয়ায় ভোটারদের জন্য সহজ করা ও বিশ্বাসযোগ্যতাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।