সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালানোর নির্দেশ দেওয়ায় আসন্ন গণভোটের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্বাচন পরিচালনা ও তত্ত্বাবধান, তথা নির্বাচনে রক্ষকের ভূমিকা পালন করবেন, তাদেরই একটি নির্দিষ্ট পক্ষে অবস্থান নিতে বাধ্য করায় গণভোট আর প্রকৃত অর্থে জনমত যাচাইয়ের প্রক্রিয়া থাকছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে প্রশাসনের ভেতরেই।
সরকারের নির্দেশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘গণভোট’ তথা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারে যুক্ত করা হয়েছে। অথচ গণভোটের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জনগণের ‘স্বাধীন মতামত’ জানা। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের এমন অবস্থানের ফলে ‘ভোট যার, সিদ্ধান্ত তার’ এই গণতান্ত্রিক নীতিই এখন প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এক সচিব খবরের কাগজকে বলেন, সরকার নিজেই যখন একটি পক্ষ হয়ে দাঁড়ায় এবং নির্বাচন পরিচালনাকারী কর্মকর্তাদের সেই পক্ষে প্রচারে নামতে বলে এবং যেখানে পোলিং এজেন্ট রাখার কোনো অবকাশ নেই, অর্থাৎ কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করার কেউ থাকবে না, তখন এই গণভোটের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। যাদের দিয়ে নির্বাচন করানো হবে, তাদের দিয়ে প্রচার করানো সম্ভবত সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। তিনি বলেন, নির্বাচনের প্রচারকারীরা যে নিজ পক্ষে ভোটের ফল নেওয়ার জন্য কাজ করবেন না, সে নিশ্চয়তা দেওয়ারও কেউ থাকছে না।
সেই সচিব আরও বলেন, ব্যালট পেপারে চারটি বিষয়ের ওপর একসঙ্গে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা থাকায় ভোটারের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও সীমিত হচ্ছে। কোনো ভোটার যদি চারটির মধ্যে এক বা দুটিতে ভিন্নমত পোষণ করেন, তাহলে তার মতামত প্রতিফলনের সুযোগ নেই। এই পদ্ধতিও ভবিষ্যতে প্রশ্নের মুখে পড়বে।
গত ১৮ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে দেওয়া এক ব্যাখ্যায় বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারমূলক ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেওয়া গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়, দ্বিধা ও নীরবতাই বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি। সংস্কারে সমর্থন না এলে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হবে এবং পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা নষ্ট হবে। তবে একই ব্যাখ্যায় বলা হয়, শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণেরই।
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি ২৫-এর উপবিধি ৩-এ বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী বাংলাদেশ অথবা অন্য কোথাও কোনো আইন পরিষদের নির্বাচনে কোনো প্রকার প্রচার অথবা অন্য কোনোভাবে হস্তক্ষেপ বা প্রভাব প্রয়োগ অথবা অংশগ্রহণ করবেন না।
কর্মকর্তারা বলেন, গণভোট আইন পরিষদের নির্বাচন নয়, তবুও একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
প্রশাসনের মাঠপর্যায়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ইউএনও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তারাই আবার সরকারের নির্দেশে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারে যুক্ত হচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, যাদের রক্ষকের ভূমিকা পালন করার কথা, তারা যদি সরকারের নির্দেশে অন্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তাহলে জনমত যাচাই হবে কীভাবে? এমন প্রশ্ন রাখেন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন এই কর্মকর্তা।
স্থানীয় সরকার বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সরকারি কর্মচারীদের গণভোটের প্রচারে যুক্ত করার সিদ্ধান্তটি সঠিক হয়নি। সরকার নির্দেশ দিলেও আচরণবিধি অনুযায়ী অনেক কর্মকর্তা তা মানতে বাধ্য নন, বলেন তিনি।
এ বিষয়ে সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, গণভোট আইন পরিষদের নির্বাচন নয়, তাই আইনগত বাধা নাও থাকতে পারে। তবে নৈতিকভাবে নিজে একটি পক্ষ হয়ে কর্মকর্তাদের সেই পক্ষে নামানো সরকারের উচিত হয়নি। এটি জনগণের ওপর ছেড়ে দিলে ভালো হতো। তার মতে, এ কারণে গণভোটের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
প্রশাসনের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যদি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার বৈধ হয়, তাহলে অতীতে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের অভিযোগে কর্মকর্তাদের শাস্তি, বাধ্যতামূলক অবসর বা ওএসডি করার সিদ্ধান্তগুলো ছিল স্ববিরোধী, কারণ সে সময়ও তারা তৎকালীন সরকারের নির্দেশ পালন করেছেন। পাশাপাশি ২০১৮ সালের নির্বাচনে যেসব কর্মকর্তা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা (এআরও) পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, এসব কর্মকর্তাকেও এবার মাঠ প্রশাসনের কোথাও নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এমন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যোগ্য, দক্ষ ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের প্রতি অবিচার করা হয়েছে। এতে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও জানিয়েছেন অনেক কর্মকর্তা।
সাবেক ওই সচিব আরও বলেন, সরকারি নির্দেশ পালনের অভিযোগে এবার বেশ কিছু কর্মকর্তাকে যে ওএসডি করা হয়েছে এবং বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর নজির স্থাপন করা হয়েছে, ভবিষ্যতেও বর্তমান সরকারের নির্দেশে ভোটে সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নিরপেক্ষ না থেকে একটি পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়ায় কর্মকর্তাদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
প্রসঙ্গত, গত ১৯ জানুয়ারি ময়মনসিংহে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গণভোটে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে প্রচার চালাতে পারবেন এবং এতে কোনো বাধা নেই। একইভাবে ২৩ জানুয়ারি মেহেরপুরে এক সভায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট মানেই গণতন্ত্র ও ইনসাফের পক্ষে অবস্থান।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে দেশের সব সরকারি দপ্তরকে গণভোট ২০২৬ বিষয়ে ব্যাপক প্রচারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার, জনবহুল স্থানে ব্যানার-পোস্টার, যানবাহনে লিফলেট প্রদর্শনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা প্রশ্ন করেছেন, সরকার নিজেই একটি পক্ষ হয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করছে। এ অবস্থায় গণভোট আদৌ জনমত যাচাইয়ের নিরপেক্ষ মাধ্যম থাকবে না অন্যকিছু হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ তৈরি হতে পারে।