ঢাকা ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
দৌলতদিয়ায় বাস নদীতে পড়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার ৩ শরীয়তপুরে মাটির নিচ থেকে উঠছে ধোঁয়া, এলাকায় চাঞ্চল্য চট্টগ্রামে নিষিদ্ধ সংগঠনের ১৩ জন গ্রেপ্তার দৌলতদিয়ায় বাস নদীতে পড়ার ঘটনায় মামলা, গ্রেপ্তার ৩ এক টুকরো হৃদয়ের নাম বাংলাদেশ রামিসার  মামলার  দ্রুত রায় মা হচ্ছেন সোহিনী গাজায় ৪৮ ঘণ্টায় নিহত পাঁচজন চামড়া নিয়ে দুর্ভোগ আর দুর্গতির শেষ কোথায় লালমনিরহাটে ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিলের পর রাতেই গ্রেপ্তার ১৫ বাংলাদেশ লোক গবেষণা পরিষদের বার্ষিক সম্মেলন কেমন ছিল প্রিয় রাসুল (সা.) এর পোশাক ও রূপ? ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ জনের মৃত্যু সাপ্তাহিক ২দিন ছুটিসহ নগদে চাকরির সুযোগ আরাকান আর্মির গুলিতে রোহিঙ্গা যুবক আহত জামালপুরে জমি নিয়ে বিরোধে ভাতিজার হাতে চাচা খুন সন্তোষজনক জবাব না পেলে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা: স্বাস্থ্যমন্ত্রী গাইবান্ধায় ট্রেনে কাটা পড়ে যুবকের দুই পা বিচ্ছিন্ন How to learn English বিষয়ক Writing Paragraph, ৩০তম পর্ব, এইচএসসির ইংরেজি ২য় পত্র জনস্বার্থে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিল করুন: বাংলাদেশ ন্যাপ তারার দেশে সাইকেল যাত্রা মহেশপুর সীমান্তে পুশইন রোধে বিজিবি-আনসার-গ্রামবাসীদের যৌথ টহল কুড়িগ্রামে বিজিবির অভিযানে ১৯১ বোতল ভারতীয় মদ ও ৪২ বস্তা জিরা জব্দ সরকারদলীয় এমপিদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ফাইনালে যে একাদশ নিয়ে নামছে বাংলাদেশ সোনারগাঁওয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে র‌্যালি ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান নতুন সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন রবিবার দারাজ ৬.৬ মিড-ইয়ার শপিং ফেস্টে থাকছে আকর্ষণীয় অফার, এক্সক্লুসিভ ব্র্যান্ড ডিসকাউন্ট ও পুরস্কার গোপালগঞ্জে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জন সচেতনতামূলক র‌্যালি যৌক্তিক মূল্যে জ্বালানি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব
Nagad desktop

গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল অনেক আগেই

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:২৭ এএম
গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল অনেক আগেই
ছবি: সংগৃহীত

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে টানা আন্দোলন শুরু হয় ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে। অহিংস এই আন্দোলন সহিংস হয় ১৫ জুলাই থেকে। পরে তা গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। প্রবল আন্দোলনের মুখে টানা ১৬ বছর ক্ষমতা ধরে রাখা আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। সহিংস গণ-অভ্যুত্থানে বেগতিক পরিস্থিতিতে দেশ ছেড়ে পাশের দেশ ভারতে গিয়ে অবস্থান নেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও ভিন্নমত দমনে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ ও জনমতের বাইরে স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল অনেক আগেই। সরকার পতনের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল সাংবিধানিক সংকট। সুপ্রিম কোর্টের মতামতের ভিত্তিতে সেই সংকট কাটিয়ে এবং গত দেড় বছরে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় ফিরতে যাচ্ছে দেশ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। 

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হওয়ার পর, তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সেই রাজনৈতিক সরকারের অধীনে পরপর আরও তিনটি (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সাল) জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটই জয়লাভ করে। সেই নির্বাচনগুলোতে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ ওঠে। এর মাঝে ২০১৮ সালের নির্বাচন ছাড়া বাকি দুটো নির্বাচন বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল বয়কট করেছিল। সেই সময় ক্ষমতাসীন সরকার বিএনপিসহ বিরোধী রাজনীতিকদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন ও ধরপাকড় চালায়, বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের বিভিন্ন মামলায় সাজা দেওয়ার মাধ্যমে তাদের নেতৃত্বশূন্য করে ফেলা হয়। বেশির ভাগ গণমাধ্যমে তথ্য প্রচার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করে জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

সেই সময় রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিকসহ অধিকাংশ আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে সরকার পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনকে ব্যবহার করে। সরকারের তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগের ছোট থেকে কেন্দ্রের বেশির ভাগ নেতা ও সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠেছিল। বাংলাদেশ থেকে পাচার করা অর্থে কানাডায় বাংলাদেশিদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেগমপাড়া তৈরি, বাংলাদেশের রেকর্ড মূল্যস্ফীতি, রাষ্ট্রীয় রিজার্ভের ঘাটতি, দুর্নীতির বিস্তার, অর্থ পাচার ও ব্যাংকিং খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ অনিয়মের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে দিন দিন জীবনযাপন কঠিন হয়ে উঠেছিল। এসব কারণে দেশের অধিকাংশ মানুষ সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। জুলাই আন্দোলনের আরেকটি মূল কারণ হিসেবে দেখা হয় ভারতীয় আধিপত্যবাদকে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জুন-২০২৪-এ ভারত সফরকালে যে ১০টি সমঝোতা স্মারক সই করেছিলেন, সেগুলোর একটি হচ্ছে রেল ট্রানজিট। এটি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের ভূ-খণ্ড ব্যবহার করে রেলযোগে দেশের এক অংশ থেকে আরেক অংশে সরাসরি নিজেদের পণ্য পরিবহনের সুবিধা পেত ভারত। বাংলাদেশের বুক চিরে কলকাতা থেকে ত্রিপুরায় ভারতীয় রেল যাতায়াত করত। এর ফলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হতে পারত। এর ফলে দেশের জনগণের একটি বড় অংশ একযোগে ওই গণ-অভ্যুত্থানে যোগ দেন বলে মনে করা হয়। 

২০২৪-এ সরকার পতন বা গণ-অভ্যুত্থানের নিশ্চিত লক্ষ্য নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়। শুরুটা হয় দেশে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন দিয়ে। ২০১৮ সালেও সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন হয়, যা সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল। ওই আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে চলমান কোটাব্যবস্থা সংস্কার করা। আন্দোলনের ধারাবাহিকতা এবং শিক্ষার্থীদের চাপে সরকার ৪৬ বছর ধরে চলা সেই কোটাব্যবস্থা বাতিলের ঘোষণা দেয়। তবে ২০২১ সালে এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে সাতজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, অহিদুল ইসলামসহ কয়েকজন হাইকোর্টে রিট করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ৫ জুন এক আদেশে হাইকোর্টের বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি খিজির হায়াতের বেঞ্চ কোটাব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করেন। রায় প্রকাশের পরই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই রায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন।

জুলাই মাসে এই আন্দোলন তীব্রতর হয়, আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা ‘বাংলা ব্লকেড’সহ অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। আন্দোলন দমাতে পুলিশ অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের ফলে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলন চলাকালে ১৬ জুলাই রংপুরে শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এ ঘটনায় আন্দোলন আরও জোরালো হয়। এরপর ঢাকাসহ সারা দেশে আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠে। বিভিন্ন জায়গায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও বাংলাদেশ যুবলীগের মতো সংগঠনের নেতা-কর্মীদের হামলায় অনেক মানুষ হতাহত হয়। সরকার বাধ্য হয়ে সারা দেশে কারফিউ জারি করে। একপর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করতে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এদিকে তখন কোটা সংস্কার নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতে আপিলের শুনানি চলছিল। আন্দোলনের প্রেক্ষিতে আপিল বিভাগের শুনানির তারিখ এগিয়ে আনা হয়।

সরকারি চাকরির প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহাল করে হাইকোটের দেওয়া রায় স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। এ আবেদনের ওপর শুনানি না করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় আপাতত বহাল রেখে রাষ্ট্রপক্ষকে ‘লিভ টু আপিল’ দায়ের করতে বলেন আপিল বিভাগ। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, ‘আন্দোলন হচ্ছে, হোক। রাজপথে আন্দোলন করে কি হাইকোর্টের রায় পরিবর্তন করবেন?’ পরে ১০ জুলাই রাষ্ট্রপক্ষ ও দুই শিক্ষার্থীর করা আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্টের রায়ের ওপর চার সপ্তাহ স্থিতাবস্থা জারির আদেশের পাশাপাশি কিছু পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা জারি করেন আপিল বিভাগ। পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭ আগস্ট। ১৪ জুলাই হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে রাষ্ট্রপক্ষ ও দুই শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে লিভ টু আপিল দায়ের করা হয়। ১৮ জুলাই অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিনের আবেদনের ভিত্তিতে শুনানির তারিখ ৭ আগস্টের পরিবর্তে এগিয়ে এনে ২১ জুলাই দিন ধার্য করেন। ২১ জুলাই কোটা পুনর্বহাল করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বাতিল করেন আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারণী বিষয় হলেও সংবিধান অনুযায়ী সম্পূর্ণ ন্যায়বিচারের স্বার্থে সরকারি চাকরিতে ৯৩ শতাংশ মেধাভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই দিন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কারফিউয়ের মধ্যেও সর্বোচ্চ আদালত বসে কার্যক্রম চালিয়েছিলেন। 

কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে সরকারের ব্যাপক দমন-পীড়ন, গণগ্রেপ্তার ও বহু মানুষকে হতাহত করার পর আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে, যা পরে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। একপর্যায়ে ১৯ জুলাই আন্দোলনকারীরা ৯ দফা দাবি ঘোষণা করে। সরকারের পক্ষ থেকে ওই সব দাবি মেনে না নেওয়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা ৩ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার থেকে সরকার পতনের চূড়ান্ত এক দফা দাবি উত্থাপন করেন। এই ঘোষণার মাধ্যমে কোটা সংস্কারের আন্দোলন দেশব্যাপী সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। এক দফা দাবি আদায়ের চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা প্রথমে ৬ আগস্ট সারা দেশ থেকে ছাত্র-জনতাকে নিয়ে মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচির ঘোষণা দেন। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সারা দেশ থেকে ছাত্র-জনতাকে এনে রাজধানীতে একত্রিত করে সরকারের ওপর চূড়ান্ত চাপ সৃষ্টি করা। তবে দেশজুড়ে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকায় ও আন্দোলন তীব্রতর হওয়ায়, ৪ আগস্ট রাতে আরেক ঘোষণায় এক দিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানানো হয়। এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ সকল বাধা উপেক্ষা করে রাজধানীর গণভবন অভিমুখে রওনা দেয়। এই গণজোয়ারই শেখ হাসিনা সরকারের পতনকে ত্বরান্বিত করে। আর ওই দিনই তিনি পদত্যাগ ও দেশত্যাগে বাধ্য হন।

শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর দেশে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়। এ সময় রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শে ডক্ট্রিন অব নেসেসিটির কারণে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে সম্মতি দেন। তবে সাংবিধানিক সংকট সমাধানে ডক্ট্রিন অব নেসেসিটি নিয়ে কিছু মহলে বিতর্ক রয়েছে বলে জানা গেছে।

রাজধানীবাসীকে ফেরাতে সিটি বাসও গেছে ঢাকার বাইরে

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ০৮:৩০ এএম
রাজধানীবাসীকে ফেরাতে সিটি বাসও গেছে ঢাকার বাইরে
এভাবেই গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন যাত্রীরা। ছবি: খবরের কাগজ

গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল সকাল থেকে। তা উপেক্ষা করেই শহরতলির উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন রাজধানীর হাতিরপুল এলাকার বাসিন্দা ফাতেমা কাউসার। কারওয়ান বাজার মোড়ে ঘণ্টা দেড়েক অপেক্ষার পরে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের উদ্দেশে বাসের দেখা পান। কিন্তু সেই বাসে ওঠার জো নেই, বাদুরঝোলা হয়ে গন্তব্যে ছুটছেন অনেক যাত্রী। সাভারের রেডিও কলোনি যেতে ফাতেমাকে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়।

এই চিত্র গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টার। ফাতেমার মতো আরও অনেক যাত্রীকে গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। বিশেষ করে সাভার-নবীনগর, উত্তরা, টঙ্গী-কামারপাড়া, গাজীপুরসহ শহরতলির বিভিন্ন এলাকায় যেতে যাত্রীদের বেশ ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।

রাজধানীর কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, প্রগতি সরণি, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, মিরপুর রোড, বিমানবন্দর সড়ক ঘুরে খবরের কাগজের প্রতিনিধিরা দুর্ভোগের চিত্র দেখেছেন।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদুল আজহার পরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো বন্ধ থাকায় রাজধানীবাসীর ‘বড় অংশ’ রয়ে গেছে ঢাকার বাইরে। ৭ জুন থেকে সেই প্রতিষ্ঠানগুলো খুলবে। তাই আজ শনিবার রাজধানীমুখী যাত্রীদের ঢল দেখা যাবে। তাদের ঢাকায় ফিরিয়ে আনতে সিটি বাসগুলোও বিভিন্ন গন্তব্যে গেছে।

খবরের কাগজের একজন প্রতিবেদক বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর বাংলামোটর থেকে সাভারগামী ওয়েলকাম পরিবহনের বাসে উঠেন। সেই বাসে পা ফেলার জায়গাও ছিল না। পথে যেতে যেতে কথা হয় ষাটোর্ধ্ব একজন যাত্রীর সঙ্গে।

তিনি জানান, নোয়াখালীর সোনাপুর থেকে বেলা সাড়ে ৯টার দিকে তিনি গুলিস্তান এসে পৌঁছান। সাভারগামী বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে। আরেকজন নারী যাত্রী বলেন, ‘জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে অনেকটা জোর করে বাসে উঠেছি। বাসে সিট ছিল না বলে নারী যাত্রীদের উঠাতে চাইছিল না হেল্পার।’

ওই বাসে আসন না পেয়ে নারী যাত্রী দাঁড়িয়েই যাচ্ছিলেন হেমায়েতপুরে। বাসটির হেল্পার মিল্টন বলেন, ‘ঈদের পরে অনেক যাত্রীই তো রইয়া গেছে বাড়ি। তারা তো ফিরে নাই। আজকের (শুক্রবার) রাতের পরে তারা সবাই ফিরতে শুরু করবে। তাদের আনতে টাউন সার্ভিসের বাসগুলো বিভিন্ন গন্তব্যে গেছে।’

রাজশাহীর আলোকচিত্রী রায়হান বিশ্বাস গতকাল ঢাকায় এসেছেন জরুরি কাজে। তিনি জানান, সিরাজগঞ্জের এলেঙ্গার মোড়ে তিনি ঢাকার সিটি সার্ভিসের বেশ কয়েকটি মিনিবাসে ঢাকামুখী যাত্রী দেখেছেন। ঠাকুরগাঁও থেকে রাজধানীতে ফেরার পথে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে ঢাকার ‘টাউন সার্ভিস’ বাস দেখার কথা জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাসেল রহমান। পথে-পথে সেসব বাস বিকল হয়ে থাকার কথাও জানান তিনি।

তাদের কথার সত্যতা পাওয়া যায় শুক্রবার বেলা ২টার দিকে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কেও টাউন সার্ভিসগুলো গেটলক হয়ে রাজধানীর দিকে ফিরছিল। সাভার পরিবহন, সেলফি, মিরপুর লিঙ্ক, রাজধানী, নীলাচল নামের বেসরকারি বাসগুলো তো বটেই;  এমনকি শহরতলি রুটে চলাচল করা বিআরটিসির এসি বাসও দূরপাল্লায় যাত্রী পরিবহন করছে।

এসব বাসে ঢাকায় ফিরতে যাত্রীদের দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হচ্ছে। ঈদের ফিরতি যাত্রার দ্বিতীয় পর্বে এসব অনিয়ম দেখার জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) বা হাইওয়ে পুলিশের কোনো অভিযান নজরে পড়েনি বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) এবং ঢাকা যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির (আরটিসি) সদস্য সচিব শহিদুল ইসলামকে ফোন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বার্তা পেয়েও সাড়া দেননি হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি দেলোয়ার হোসেন মিঞা।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী জুবায়ের মাসুদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে এখনো যারা বাড়ি রয়ে গেছেন, তাদের ঢাকায় ফিরিয়ে আনতে দূরপাল্লার বাস পর্যাপ্ত নয়। তাই ঢাকার ভেতরে চলাচল করা অনেক বাস সুযোগ বুঝে দূরপাল্লার রুটে গেছে।

আরটিসির নিয়ম অনুযায়ী এসব বাস দূরপাল্লার রুটে চলাচলের অনুমতি পায় না। কিন্তু প্রশাসনের চোখে ধুলা দিয়ে অনেক মালিক বাস দূরের জেলায় পাঠিয়েছেন। এখন স্থানীয় প্রশাসনও নীরব। কারণ, বাসগুলো তো যাত্রী পরিষেবা দিচ্ছে। আমরাও সমিতিতে আলোচনা করেছি, এসব বাস দূরপাল্লার রুটের জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়।’

রাজধানীর ভেতরে বা শহরতলিতে চলাচল করা অধিকাংশ বাসের ফিটনেস নেই, চালকদেরও ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায় না। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান জানান, ঈদযাত্রা বা ফিরতি যাত্রায় ঢাকার এসব টাউন বাসই দুর্ঘটনা ও যানজটের কারণ।

পরিবহন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আসিফ রায়হান খবরের কাগজকে বলেন, ‘যদিও দুই চালকেরই ভারী যান পরিচালনার লাইসেন্স থাকে, কিন্তু ইন্টারসিটি চালক হুট করে মহাসড়কে নেমে এলে সেই সড়কের চরিত্র বুঝতে পারবেন না। দুই ধরনের সড়কের চরিত্র ভিন্ন। হুট করে চালকের যানবাহনের ধরন (ট্রান্সপোর্ট মুড) পরিবর্তন হলে বিপদের সমূহ শঙ্কা থাকে।’

প্রান্তিক ধাপের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিলের সুবিধা পাবেন না বস্তিবাসী

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০৩:৪১ পিএম
প্রান্তিক ধাপের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিলের সুবিধা পাবেন না বস্তিবাসী
আবাসিকের প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বিইআরসি

সরকার গত বুধবার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। নতুন দাম নির্ধারণের এক দিনের মাথায় বৃহস্পতিবার (৪ জুন) আবাসিকের প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। শূন্য থেকে ৫০ ইউনিট ব্যবহারকারী (লাইফলাইন) প্রান্তিক গ্রাহক এবং শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারী প্রথম ধাপের আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম আগের হারেই থাকছে। এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে বিইআরসি।

তবে বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিম্ন আয়ের বা বসতিতে বসবাস করা গ্রাহকরাও এই সুবিধা পাবেন না। কারণ তারা পরিবার নিয়ে কমপক্ষে দুটি ঘরে বসবাস করেন। অন্ধকার এড়াতে ও একটু স্বস্তি পেতে দুটি ফ্যান, দুটি লাইট, একটি টিভি ও একটি ফ্রিজ ব্যবহার করেন। এতে মাসে ৩০ কিলোওয়াট বিদ্যুতের ব্যবহার হয়, যা কমপক্ষে ১৯২ ইউনিটে গিয়ে দাঁড়াবে। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচ ১ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

ডিপিডিসির এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘মানুষ অনেক বিলাসী হয়ে গেছেন। কাজেই যে মানুষটি বসতিতে থাকেন বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করেন তিনিও দুটি রুম নিয়ে থাকেন। পরিবারের একটু স্বস্তির জন্য দুটি ফ্যান ব্যবহার করেন। ফ্রিজ ব্যবহার করেন। অধিকাংশ পরিবার সারা দিন টিভি দেখে। কাজেই পুরো মাসে এসব পরিবারে ৩০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার হতেই পারে। এই বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে মাসে ৭৫ ইউনিটের বেশি বিল আসবে। এ জন্য তাকে প্রতি মাসে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হবে।’

বিইআরসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রান্তিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা এবং প্রথম ধাপের গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ২৬ পয়সা বহাল থাকবে। জুন থেকে এ হার কার্যকর হবে। এর আগে গত বুধবার বিইআরসি খুচরা বিদ্যুতের যে নতুন মূল্যহার ঘোষণা করেছিল, সেখানে প্রান্তিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সা এবং প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ১৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। সে হিসাবে প্রান্তিক গ্রাহকদের ইউনিটপ্রতি ৬৯ পয়সা এবং প্রথম ধাপের গ্রাহকদের ৯২ পয়সা বেশি গুনতে হতো।

বিইআরসি জানায়, বুধবার জারি করা আদেশে নির্ধারিত এ দুই শ্রেণির মূল্যহার পুনর্বিবেচনার জন্য ৪ জুন বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলো আবেদন করে। পরে শুনানি শেষে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন, ২০০৩-এর ধারা ২২(খ) ও ৩৪ এবং বিদ্যুৎ বিতরণ (খুচরা) ট্যারিফ প্রবিধানমালার বিধান অনুযায়ী বর্ধিত মূল্যহার কার্যকর না করে আগের মূল্যহার বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য বর্ধিত মূল্যহার প্রত্যাহারের ফলে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর আয় কমবে। সেই ঘাটতি সরকারকে অতিরিক্ত ভর্তুকি দিয়ে সমন্বয় করতে হবে। তবে বুধবার জারি করা খুচরা বিদ্যুতের নতুন দাম-সংক্রান্ত আদেশের অন্য সব অংশ অপরিবর্তিত থাকবে বলে জানিয়েছে বিইআরসি। এর ফলে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট, ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট, ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট, ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট এবং ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারী আবাসিক গ্রাহকদের জন্য ঘোষিত নতুন মূল্যহার বহাল থাকছে। শিল্প, বাণিজ্যিক, সেচ ও অন্যান্য গ্রাহক শ্রেণির ক্ষেত্রেও নতুন দামে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।

বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবের ওপর গত ২০ ও ২১ মে গণশুনানি করে বিইআরসি। পরে বুধবার বিদ্যুতের পাইকারি, সঞ্চালন ও খুচরা মূল্যহার পুনর্নির্ধারণ করা হয়। সেখানে বেশি ইউনিট ব্যবহারকারীদের মতো আবাসিক গ্রাহকদের সব স্তরেই দাম বাড়ানো হয়েছিল। তবে প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম বাড়ানো নিয়ে আলোচনা শুরু হলে এই দুই শ্রেণির বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়নি। তার পরও নিম্ন আয়ের গ্রাহকরা সেই সুবিধা পাবেন না। কারণ সারা দেশে অধিকাংশ গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল আসে ৫০ থেকে ৭৫ ইউনিটের।

জীবনধারা বদলান, বিদ্যুৎ সাশ্রয় করুন

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০২:০১ পিএম
আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬, ০২:০২ পিএম
জীবনধারা বদলান, বিদ্যুৎ সাশ্রয় করুন
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

আধুনিক জীবনের অন্যতম অপরিহার্য অনুষঙ্গ বিদ্যুৎ। ঘর-বাড়ি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের সব ক্ষেত্রই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রাকৃতিক জলাশয় ধ্বংস, গাছপালা নিধন, খাল-নদী-নালা ভরাট করে গড়ে ওঠা আধুনিক সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে বিদ্যুতের ব্যবহার যেমন বেড়েছে, তেমনি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে এর অপচয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতার অভাব, অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার, পরিবর্তিত জীবনযাত্রা এবং পরিকল্পনাহীন অবকাঠামো নির্মাণের কারণে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে। এর আর্থিক ক্ষতি বহন করতে হচ্ছে রাষ্ট্রকে, যা যাচ্ছে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে। বছর বছর বাড়ছে বিদ্যুতের দাম।

সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, জনপ্রিয় ইংরেজি প্রবাদ ‘আর্লি টু বেড অ্যান্ড আর্লি টু রাইজ’, এখনো যথেষ্ট পালনীয়। এর বাংলা অর্থ দাঁড়ায়, ‘তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যাও, তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠো’। পাঠ্যবইয়ের এই শিক্ষা শুধু শিশুদের জন্য নয়, সব বয়সী মানুষের জন্যই এখন সমানভাবে প্রযোজ্য। কেননা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনধারা ও অভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।

বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেটের বিস্তারের কারণে মানুষ রাত জেগে থাকতে বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে অনেকেই সকালে দেরিতে ঘুম থেকে ওঠেন। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের জীবনেও। গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশোনা বা অনলাইন কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকার কারণে তাদেরও সকাল শুরু হয় দেরিতে।

একসময় শিক্ষার্থীরা ভোরে উঠে প্রাকৃতিক আলো-বাতাসে পড়াশোনা করত। কিন্তু এখন অধিকাংশ শিক্ষার্থী দিনের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার পর পড়তে বসে। ফলে ফ্যান, লাইট বা এসির ব্যবহার প্রয়োজন হয়। ফলে যে কাজ একসময় প্রাকৃতিক পরিবেশে সম্পন্ন হতো, তা এখন অনেকটাই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এতে দিন-রাতে সমান তালে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে।

এ ছাড়া বিদ্যুতের অপচয়ের আরেকটি বড় ক্ষেত্র সরকারি ও বেসরকারি অফিস। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা অফিসে পৌঁছানোর আগেই কক্ষের লাইট, ফ্যান এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) চালু করে রাখা হয়। অনেক ক্ষেত্রে অফিস শেষ হওয়ার পরও এসব যন্ত্র দীর্ঘ সময় চালু থাকে। দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে লাখের বেশি অফিস রয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে সামান্য অপচয়ও জাতীয় পর্যায়ে বিশাল ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

একই চিত্র দেখা যায়– হাসপাতাল, ব্যাংক, মার্কেট, শপিং মল এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক ভবনেও। দিনের আলো পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম আলোর ব্যবহার অব্যাহত থাকে। অনেক ভবনে জানালা থাকা সত্ত্বেও ভারী পর্দা টেনে রাখা হয়, ফলে দিনের বেলায়ও লাইট জ্বালিয়ে রাখতে হয়। এতে বিশাল অঙ্কের বিদ্যুতের অপচয় হচ্ছে।

নানা সংকটে ভবন নির্মাণের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। শহরাঞ্চলের নতুন অফিস কিংবা বাসাবাড়িতে ক্রমেই কমে আসছে প্রাকৃতিক আলো ও বাতাসের ব্যবহার। বাংলাদেশ গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলে অবস্থিত। তবে বেশ কয়েক বছর ধরে এই দেশে শীতপ্রধান দেশের মতো ভবন নির্মাণের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বহু ভবন নির্মিত হচ্ছে শীতপ্রধান দেশের নকশার আদলে। ফলে পর্যাপ্ত বাতাস ও সূর্যের আলো প্রবেশের সুযোগ থাকছে না সেসব ভবনে। এতে বাসিন্দাদের সারা বছর ফ্যান, এসি ও বৈদ্যুতিক আলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবন নির্মাণে স্থানীয় আবহাওয়া ও পরিবেশকে গুরুত্ব দেওয়া হলে বিদ্যুতের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব।

ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতেও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের প্রবণতা কমে গেছে। অনেক সময় দেখা যায়, উপাসনালয়ে মানুষের সংখ্যা কম থাকলেও একাধিক ফ্যান, এসি ও লাইট দীর্ঘ সময় ধরে চালু রাখা হয়। শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, বাসাবাড়িতেও বিদ্যুতের অপচয় উদ্বেগজনক মাত্রায় বেড়েছে। অনেক পরিবারে দিনে এবং রাতে অপ্রয়োজনীয় লাইট জ্বালিয়ে রাখা হয়। ব্যবহারের পর টেলিভিশন, কম্পিউটার, চার্জার কিংবা অন্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বন্ধ করা হয় না। সবার মাঝে ধারণাটা এমন যে– ‘আমার বিল তো আমি দিই, সমস্যা কোথায়?’ প্রকৃত সত্য হলো, ভোক্তার এই বিল জমা দেওয়ার পরও রাষ্ট্রকে বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে জনগণের করের টাকা থেকে।

নগরবিদদের মতে, বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযমী হতে জনসাধারণকে আহ্বান করা যেতে পারে। অযথা বিদ্যুৎ ব্যবহার থেকে সরে আসার জন্য সতর্কতামূলক প্রচারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সরকারি পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি ধনাঢ্যদের প্রতি বাড়তি বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিকল্প জ্বালানির উৎসের সন্ধান করার আহ্বান জানানো যেতে পারে।

নগর পরিকল্পনাবিদ এবং ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের শহরগুলোতে প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ব্যবহার বাড়াতে এবং বিদ্যুতের অপচয় কমাতে ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় পরিবর্তন আনা দরকার। ভবনের চারপাশে নির্দিষ্ট পরিমাণ খোলা জায়গা রাখা বাধ্যতামূলক করা, যাতে পাশের ভবন আলো-বাতাসে বাধা না দেয়। একই সঙ্গে ভবনের দেয়ালে জানালার সঠিক অনুপাত নির্ধারণ করা, যা দিনের আলো ঘরের ভেতরে পৌঁছাতে সাহায্য করবে। ভবনের উচ্চতা ও চারপাশের ফাঁকা জায়গার অনুপাত এমনভাবে নির্ধারণ করা দরকার যাতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল করতে পারে ভবনের ভেতর, যা বিদ্যুতের চাহিদা কমিয়ে দেবে।’

উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করা না গেলে সেই ঘাটতি পূরণে সরকারকে বিপুল অর্থ ভর্তুকি হিসেবে দিতে হয়। গত বুধবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) বৈঠকে জানানো হয়, পাইকারি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পরও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ঘাটতি পূরণে সরকারকে বছরে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে বকেয়াসহ মোট ভর্তুকি ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সম্ভাব্য আর্থিক ঘাটতি প্রায় ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। 

প্রতিবছর বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েও আর্থিক ক্ষতির সমাধান হচ্ছে না। গত বুধবারও নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ, গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং সঞ্চালন (হুইলিং) চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। চলতি জুন মাস থেকেই নতুন মূল্যহার কার্যকর হবে।

এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী আদেশে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সাড়ে ৮ শতাংশ বাড়ানো হয়। একই সময় পাইকারি পর্যায়ে ৬ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৭ টাকা ৪০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য প্রতি ইউনিট ৭ টাকা। নতুন সিদ্ধান্তে তা ১ টাকা ৩৯ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। অন্যদিকে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বেড়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সায় উন্নীত হবে। অর্থাৎ গ্রাহক পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি গড়ে ১ টাকা ৫২ পয়সা বেশি গুনতে হবে। এ ছাড়া বিদ্যুতের সঞ্চালন মূল্যহার বা হুইলিং চার্জ ৩১ দশমিক ৩৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩৮ দশমিক ৮৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি অপচয় কমানো গেলে জাতীয় পর্যায়ে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব। 

সংকট সমাধান করতে লাভের চেয়ে গ্রাহককে গুরুত্ব দিতে বললেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, “বিদ্যুৎ খাতে বর্তমানে বড় সংকট রয়েছে। এ খাতের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ‘চোরদের নিয়ন্ত্রণে’। এসব চোর ভোক্তাবিরোধী এবং গণবিরোধী। তাই সংকটের সমাধান হচ্ছে না।”

তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যুৎ ঘাটতি মেটানোর জন্য বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে কিন্তু ঘাটতি কি কমেছে? উল্টো প্রতিবছর বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে কম খরচে উৎপাদন এবং সরকারকে মুনাফা অর্জনের চিন্তা থেকে সরে আসতে হবে। তারা দাম বাড়াতে চায়; কিন্তু সাধারণ মানুষের হয়ে দাম কমানোর জন্যও আইন করা প্রয়োজন। আর যারা চুরি করে কাঠামোগতভাবে সংকট তৈরি করে রেখেছে সেই চোরদের ধরে ধরে বিচার করতে হবে, না হলে এই ঘাটতি থেকেই যাবে।’

খবরের কাগজে পদোন্নতি-বাণিজ্যের প্রতিবেদন প্রকাশ: তদন্তে নেমেছে আইন মন্ত্রণালয়

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম
খবরের কাগজে পদোন্নতি-বাণিজ্যের প্রতিবেদন প্রকাশ: তদন্তে নেমেছে আইন মন্ত্রণালয়
ছবি: সংগৃহীত

ভূমি হস্তান্তরসংক্রান্ত নিবন্ধন অধিদপ্তরের অধীন ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের অস্থায়ী নকলনবিশদের পদোন্নতি ঘিরে ঘুষ লেনদেনের তদন্তে নেমেছে আইন মন্ত্রণালয়। গত ৭ এপ্রিল খবরের কাগজে ‘ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার অফিসে পদোন্নতি-বাণিজ্য/টাকা দিলেই নাম ওপরের দিকে, না দিলে বাদ’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই তদন্ত শুরু করা হয়েছে। তদন্তের অংশ হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার তেজগাঁওয়ে ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স ভবন পরিদর্শনে যান তদন্ত কর্মকর্তা এবং আইন ও বিচার বিভাগের সহকারী সচিব (সিভিল জজ) মো. জিয়া উদ্দীন। 

খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পদোন্নতি পেতে ইচ্ছুক নকলনবিশদের কাছ থেকে দফায় দফায় ঘুষ দাবি করা হয়। টাকা দিলেই তালিকার ওপরের দিকে নাম উঠে আসে, আবার টাকা না দিলে তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়। গত দুই বছরে কয়েকটি খসড়া তালিকা করা হলেও দাপ্তরিকভাবে দুটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। 

প্রতিবেদনটির ভিত্তিতে ঘুষ লেনদেন বিষয়ে পদোন্নতির তালিকায় থাকা নকলনবিশদের তাদের বক্তব্য লিখে এনে সরেজমিনে হাজির থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন তদন্ত কর্মকর্তা মো. জিয়া উদ্দীন। যাতে সংশ্লিষ্ট নকলনবিশরা নির্ভয়ে তাদের বক্তব্য পেশ করতে পারেন। নির্দেশনা অনুসারে অন্তত ১১ জন নকলনবিশ তাদের লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন। 

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, তদন্ত কর্মকর্তা উপস্থিত হওয়ার আগেই ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার অফিস থেকে নির্দিষ্ট ফরম্যাটে বক্তব্য দেওয়ার জন্য নকলনবিশদের মৌখিকভাবে জানানো হয়। ফলে নির্দিষ্ট ফরম্যাট মেনে একই ধরনের বক্তব্য পেশ করেছেন ১১ জন নকলনবিশ। 

খবরের কাগজে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, শূন্যপদ থাকা সাপেক্ষে অস্থায়ী নকলনবিশরা রাজস্ব খাতে স্থায়ী নকলনবিশ হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে থাকেন। এ জন্য প্রতিটি জেলায় জেলা রেজিস্ট্রারের নেতৃত্বে নিয়োগ পদোন্নতি ও বাছাই কমিটি রয়েছে। ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমানের সভাপতিত্বে ওই কমিটির বৈঠকে গত দুই বছরে পদোন্নতির যোগ্যদের কয়েকটি খসড়া তালিকা করা হলেও গত বছরের ১৬ মার্চ দাপ্তরিকভাবে প্রথম তালিকা প্রকাশ করা হয়। প্রস্তাবিত পদোন্নতির ওই তালিকায় ১০ জন অস্থায়ী নকলনবিশের নাম আনা হয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নকলনবিশদের ১০ বছরের কাজের বিবরণ ও বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহ করতে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারদের নির্দেশ দেন জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমান। কাগজপত্র সরবরাহের জন্য তিন দিন সময় বেঁধে দেওয়া হয়। ওই তালিকায় নকলনবিশ মো. শামীম, মোসা. পারভীন আক্তার, মো. আতাউর রহমান, মোসা. কামরুন নাহার, মো. রফিকুল ইসলাম, মো. শফিকুর রহমান, মোসা. আনোয়ারা আক্তার, মো. আবু সাঈদ মিয়া, মোসা. মাসুদা আক্তার ও মো. মারুফ আহম্মদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু কোনো কারণ উল্লেখ ছাড়াই কয়েক মাস পদোন্নতির বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখে আরও কয়েকটি খসড়া তালিকা করা হয়। তবে দাপ্তরিকভাবে ওই তালিকাগুলো প্রকাশ করা হয়নি। পরে একই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর দাপ্তরিকভাবে আরেকটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। এবারও নকলনবিশদের প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে পাঁচ দিন সময় বেঁধে সাব-রেজিস্ট্রারদের চিঠি দেন জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমান। এই তালিকায় ১১ জন নকলনবিশের নাম উল্লেখ করা হলেও আগের তালিকা থেকে মো. শামীম ও আতাউর রহমানের নাম বাদ দেওয়া হয়। তালিকায় নতুন যুক্ত হন বেলাল হোসেন, মনির হোসেন ও পারুল আক্তার। এই তালিকা আবারও সংশোধনের উদ্যোগ নেন জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমান। 

সে সময় ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ঘুষ লেনদেনের বিষয় অস্বীকার করে খবরের কাগজকে বলেন, ‘পদোন্নতি নীতিমালার আলোকে নকলনবিশদের ১০ বছরের ধারাবাহিক কাজের বিবরণ প্রয়োজন হয়। কিন্তু তালিকায় যাদের নাম পাওয়া গেছে তাদের ধারাবাহিক কাজের বিবরণ সন্তোষজনক নয়।’

তারা (নকলনবিশ) কি কাজ করেন না? এমন প্রশ্নের উত্তরে জেলা রেজিস্ট্রার বলেন, নকলনবিশদের কাজই হলো ‘বালামে দলিল লিপিবদ্ধ করা, দলিলের অবিকল নকল (সার্টিফায়েড কপি) করা।’ কিন্তু সাব-রেজিস্ট্রার অফিসগুলোতে লোকবল কম থাকায় তাদের দিয়ে অন্য কাজও করা হয়। ফলে তাদের মূল কাজের ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত হয়। এখন মোহরার-টিসি মোহরারসহ অন্তত ১২টি পদ শূন্য রয়েছে। নীতিমালা অনুসারে প্রকৃত যোগ্যদের নিয়োগ দেওয়ার জন্য নতুন তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি: জীবনযাত্রা হবে আরও ব্যয়বহুল

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:১৬ পিএম
আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:১৭ পিএম
বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি: জীবনযাত্রা হবে আরও ব্যয়বহুল
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও দেশে উল্টো বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানোর তীব্র সমালোচনা করেছেন অর্থনীতিবিদ ও ভোক্তা অধিকার কর্মীরা। তারা আশঙ্কা করছেন, এই অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তের ফলে দেশে চলমান ৮ শতাংশের ওপর থাকা মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র আকার ধারণ করবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়বে। 

বিদ্যুৎ খাতের অপচয় ও চুরি বন্ধ না করে মাত্র তিন কার্যদিবসের মধ্যে তড়িঘড়ি করে সব শ্রেণির গ্রাহক পর্যায়ে এই দাম বাড়ানোকে ‘অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দিয়েছেন তারা। বিশেষ করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) আপত্তি সত্ত্বেও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) প্রস্তাবে প্রান্তিক গ্রাহক ও কৃষিতে দাম বাড়ানোর কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি ও ক্ষুদ্রশিল্প বড় ধাক্কার মুখে পড়বে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. শওকত আলী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে দেশে চলমান মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

তিনি মনে করিয়ে দেন, দেশে এমনিতেই মূল্যস্ফীতি এখন ৮ শতাংশের ওপরে (বিগত মাসগুলোতে যা ছিল প্রায় ৮.২২ শতাংশ)। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। খুচরা বা গ্রাহক পর্যায়ে (০ থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারী) প্রতি ইউনিটে ৯২ পয়সা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ‘যুগোপযোগী নয়’ বলে আখ্যা দেন অধ্যাপক শওকত আলী। আগে খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ছিল ৫ টাকা ২৬ পয়সা, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ টাকা ১৮ পয়সায়। এ ছাড়া কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতেও বিদ্যুতের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে।

ভোক্তা অধিকারের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গবেষণায় দেখা গেছে, মানসম্মত সেবার জন্য মানুষ কিছুটা বাড়তি টাকা দিতেও রাজি থাকে। কিন্তু আরইবির অধীনে থাকা গ্রামীণ গ্রাহকরা বাড়তি দাম দিয়েও ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছেন। বিদ্যুৎ গেলে আর আসার নাম থাকে না, সেবার মানও অত্যন্ত নাজুক। এই অবস্থায় যদি লোডশেডিং থেকেই যায়, তবে বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে দেশের বাজারে অকটেনের দাম প্রতি লিটারে ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে অধ্যাপক শওকত আলী বলেন, ‘কিছুদিন আগে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি কমলেও আমাদের দেশে সেই অনুপাতে দাম কমানো হয়নি। উল্টো সরকারের পক্ষ থেকে দাম আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যার কোনো যৌক্তিকতা নেই।’

ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হলেও সার্বিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব থেকে কৃষি ও পরিবহন খাত রেহাই পাবে না বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি কৃষকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। এর পাশাপাশি পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে যাবে। আর পরিবহন খরচ বাড়লে তার চূড়ান্ত প্রভাব গিয়ে পড়বে সাধারণ পণ্যের ওপর, যার ফলে বাজারে বড় ধরনের মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে।’

দফায় দফায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শাহাদাৎ হোসেন সিদ্দিকী। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘কিছুদিন আগেই পত্রিকায় দেখলাম আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে। নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশেও তেলের দাম কমার কথা ছিল। কিন্তু তা না করে সরকার উল্টো অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা করেছে।’ জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে হলে জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম অপরিবর্তিত রাখা জরুরি ছিল।

অধ্যাপক মুহাম্মদ শাহাদাৎ হোসেন সিদ্দিকী সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘এমনিতেই দেশের ইনফ্লেশন বা মূল্যস্ফীতি ৮ ডিজিটের (৮ শতাংশ) ওপরে, গত মাসের আগের মাসে যা ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। এখন নতুন করে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় স্বাভাবিকভাবেই পরিবহন খরচ বেড়ে যাবে, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে বাজারে এবং ইনফ্লেশন আরও বাড়বে।’

খুচরা গ্রাহক পর্যায়ে (০ থেকে ৭৫ ইউনিট) প্রতি ইউনিটে ৯২ পয়সা বাড়িয়ে নতুন দাম ৬ টাকা ১৮ পয়সা নির্ধারণের প্রসঙ্গে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পিডিবির (পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড) আপত্তি থাকা সত্ত্বেও আরইবির (পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড) প্রস্তাবে এই দাম বাড়ানো হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ড. শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘গ্রাহকরা ভালো সেবার জন্য বেশি টাকা দিতে রাজি থাকেন। কিন্তু আরইবির অধীনে থাকা গ্রামের সাধারণ গ্রাহকরা এমনিতেই ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের শিকার। বিদ্যুৎ গেলে আর আসতে চায় না। এই অবস্থায় সেবার মান না বাড়িয়ে হুট করে দাম বাড়ানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ তিনি যোগ করেন, যদি এই বাড়তি দাম দেওয়ার পরও লোডশেডিং থেকেই যায়, তবে সাধারণ মানুষ তা মেনে নেবেন না।

কৃষি খাতে বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ৫ টাকা ২৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ৪ পয়সা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) ১১ টাকা ৭৬ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৭৩ পয়সা করার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই অধ্যাপক। তার মতে, কৃষকরা ইরিগেশন বা সেচব্যবস্থার জন্য ডিজেল ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। এই দুই খাতের খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাবে। এসএমই খাতের অবস্থা দেশের বাজারে এমনিতেই নাজুক, তার ওপর এই বাড়তি বিদ্যুতের বিল তাদের আরও বড় সংকটে ফেলবে।

বিদ্যুতের দাম দফায় দফায় বৃদ্ধির তীব্র প্রতিবাদ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। ক্যাবের সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ও পরিবহনসহ প্রতিটি খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কাঠামোর সমালোচনা করে এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘এবারের বিদ্যুতের দাম একদম নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত–সব পর্যায়েই বাড়ানো হয়েছে। যার ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ সবচেয়ে বেশি পড়বে।’ তিনি সরকারের দ্বিমুখী নীতির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘একদিকে সরকার কৃষকদের ধান চাষ বা কৃষিকাজের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভর্তুকি ও টাকা দিচ্ছে, আর অন্যদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।’