সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে টানা আন্দোলন শুরু হয় ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে। অহিংস এই আন্দোলন সহিংস হয় ১৫ জুলাই থেকে। পরে তা গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। প্রবল আন্দোলনের মুখে টানা ১৬ বছর ক্ষমতা ধরে রাখা আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। সহিংস গণ-অভ্যুত্থানে বেগতিক পরিস্থিতিতে দেশ ছেড়ে পাশের দেশ ভারতে গিয়ে অবস্থান নেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও ভিন্নমত দমনে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ ও জনমতের বাইরে স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল অনেক আগেই। সরকার পতনের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল সাংবিধানিক সংকট। সুপ্রিম কোর্টের মতামতের ভিত্তিতে সেই সংকট কাটিয়ে এবং গত দেড় বছরে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় ফিরতে যাচ্ছে দেশ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হওয়ার পর, তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সেই রাজনৈতিক সরকারের অধীনে পরপর আরও তিনটি (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সাল) জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটই জয়লাভ করে। সেই নির্বাচনগুলোতে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ ওঠে। এর মাঝে ২০১৮ সালের নির্বাচন ছাড়া বাকি দুটো নির্বাচন বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল বয়কট করেছিল। সেই সময় ক্ষমতাসীন সরকার বিএনপিসহ বিরোধী রাজনীতিকদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন ও ধরপাকড় চালায়, বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের বিভিন্ন মামলায় সাজা দেওয়ার মাধ্যমে তাদের নেতৃত্বশূন্য করে ফেলা হয়। বেশির ভাগ গণমাধ্যমে তথ্য প্রচার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করে জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
সেই সময় রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিকসহ অধিকাংশ আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে সরকার পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনকে ব্যবহার করে। সরকারের তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগের ছোট থেকে কেন্দ্রের বেশির ভাগ নেতা ও সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠেছিল। বাংলাদেশ থেকে পাচার করা অর্থে কানাডায় বাংলাদেশিদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেগমপাড়া তৈরি, বাংলাদেশের রেকর্ড মূল্যস্ফীতি, রাষ্ট্রীয় রিজার্ভের ঘাটতি, দুর্নীতির বিস্তার, অর্থ পাচার ও ব্যাংকিং খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ অনিয়মের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে দিন দিন জীবনযাপন কঠিন হয়ে উঠেছিল। এসব কারণে দেশের অধিকাংশ মানুষ সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। জুলাই আন্দোলনের আরেকটি মূল কারণ হিসেবে দেখা হয় ভারতীয় আধিপত্যবাদকে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জুন-২০২৪-এ ভারত সফরকালে যে ১০টি সমঝোতা স্মারক সই করেছিলেন, সেগুলোর একটি হচ্ছে রেল ট্রানজিট। এটি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের ভূ-খণ্ড ব্যবহার করে রেলযোগে দেশের এক অংশ থেকে আরেক অংশে সরাসরি নিজেদের পণ্য পরিবহনের সুবিধা পেত ভারত। বাংলাদেশের বুক চিরে কলকাতা থেকে ত্রিপুরায় ভারতীয় রেল যাতায়াত করত। এর ফলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হতে পারত। এর ফলে দেশের জনগণের একটি বড় অংশ একযোগে ওই গণ-অভ্যুত্থানে যোগ দেন বলে মনে করা হয়।
২০২৪-এ সরকার পতন বা গণ-অভ্যুত্থানের নিশ্চিত লক্ষ্য নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়। শুরুটা হয় দেশে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন দিয়ে। ২০১৮ সালেও সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন হয়, যা সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল। ওই আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে চলমান কোটাব্যবস্থা সংস্কার করা। আন্দোলনের ধারাবাহিকতা এবং শিক্ষার্থীদের চাপে সরকার ৪৬ বছর ধরে চলা সেই কোটাব্যবস্থা বাতিলের ঘোষণা দেয়। তবে ২০২১ সালে এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে সাতজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, অহিদুল ইসলামসহ কয়েকজন হাইকোর্টে রিট করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ৫ জুন এক আদেশে হাইকোর্টের বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি খিজির হায়াতের বেঞ্চ কোটাব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করেন। রায় প্রকাশের পরই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই রায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন।
জুলাই মাসে এই আন্দোলন তীব্রতর হয়, আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা ‘বাংলা ব্লকেড’সহ অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। আন্দোলন দমাতে পুলিশ অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের ফলে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলন চলাকালে ১৬ জুলাই রংপুরে শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এ ঘটনায় আন্দোলন আরও জোরালো হয়। এরপর ঢাকাসহ সারা দেশে আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠে। বিভিন্ন জায়গায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও বাংলাদেশ যুবলীগের মতো সংগঠনের নেতা-কর্মীদের হামলায় অনেক মানুষ হতাহত হয়। সরকার বাধ্য হয়ে সারা দেশে কারফিউ জারি করে। একপর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করতে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এদিকে তখন কোটা সংস্কার নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতে আপিলের শুনানি চলছিল। আন্দোলনের প্রেক্ষিতে আপিল বিভাগের শুনানির তারিখ এগিয়ে আনা হয়।
সরকারি চাকরির প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহাল করে হাইকোটের দেওয়া রায় স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। এ আবেদনের ওপর শুনানি না করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় আপাতত বহাল রেখে রাষ্ট্রপক্ষকে ‘লিভ টু আপিল’ দায়ের করতে বলেন আপিল বিভাগ। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, ‘আন্দোলন হচ্ছে, হোক। রাজপথে আন্দোলন করে কি হাইকোর্টের রায় পরিবর্তন করবেন?’ পরে ১০ জুলাই রাষ্ট্রপক্ষ ও দুই শিক্ষার্থীর করা আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্টের রায়ের ওপর চার সপ্তাহ স্থিতাবস্থা জারির আদেশের পাশাপাশি কিছু পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা জারি করেন আপিল বিভাগ। পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭ আগস্ট। ১৪ জুলাই হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে রাষ্ট্রপক্ষ ও দুই শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে লিভ টু আপিল দায়ের করা হয়। ১৮ জুলাই অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিনের আবেদনের ভিত্তিতে শুনানির তারিখ ৭ আগস্টের পরিবর্তে এগিয়ে এনে ২১ জুলাই দিন ধার্য করেন। ২১ জুলাই কোটা পুনর্বহাল করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বাতিল করেন আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারণী বিষয় হলেও সংবিধান অনুযায়ী সম্পূর্ণ ন্যায়বিচারের স্বার্থে সরকারি চাকরিতে ৯৩ শতাংশ মেধাভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই দিন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কারফিউয়ের মধ্যেও সর্বোচ্চ আদালত বসে কার্যক্রম চালিয়েছিলেন।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে সরকারের ব্যাপক দমন-পীড়ন, গণগ্রেপ্তার ও বহু মানুষকে হতাহত করার পর আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে, যা পরে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। একপর্যায়ে ১৯ জুলাই আন্দোলনকারীরা ৯ দফা দাবি ঘোষণা করে। সরকারের পক্ষ থেকে ওই সব দাবি মেনে না নেওয়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা ৩ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার থেকে সরকার পতনের চূড়ান্ত এক দফা দাবি উত্থাপন করেন। এই ঘোষণার মাধ্যমে কোটা সংস্কারের আন্দোলন দেশব্যাপী সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। এক দফা দাবি আদায়ের চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা প্রথমে ৬ আগস্ট সারা দেশ থেকে ছাত্র-জনতাকে নিয়ে মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচির ঘোষণা দেন। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সারা দেশ থেকে ছাত্র-জনতাকে এনে রাজধানীতে একত্রিত করে সরকারের ওপর চূড়ান্ত চাপ সৃষ্টি করা। তবে দেশজুড়ে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকায় ও আন্দোলন তীব্রতর হওয়ায়, ৪ আগস্ট রাতে আরেক ঘোষণায় এক দিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানানো হয়। এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ সকল বাধা উপেক্ষা করে রাজধানীর গণভবন অভিমুখে রওনা দেয়। এই গণজোয়ারই শেখ হাসিনা সরকারের পতনকে ত্বরান্বিত করে। আর ওই দিনই তিনি পদত্যাগ ও দেশত্যাগে বাধ্য হন।
শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর দেশে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়। এ সময় রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শে ডক্ট্রিন অব নেসেসিটির কারণে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে সম্মতি দেন। তবে সাংবিধানিক সংকট সমাধানে ডক্ট্রিন অব নেসেসিটি নিয়ে কিছু মহলে বিতর্ক রয়েছে বলে জানা গেছে।