১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভের পর নতুন একটি রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ। এরপর দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় ১৯৭৩ সালে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমায় দেশের নির্বাচনব্যবস্থা সংসদীয় পদ্ধতি থেকে রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতিতে পরিবর্তন এবং পুনরায় সংসদীয় পদ্ধতিতে প্রত্যাবর্তন করেছে।
প্রথম নির্বাচন: ১৯৭৩
স্বাধীনতার দুই বছর পর, ১৯৭৩ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত এ দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন ছিল নতুন রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক যাত্রার সূচনা। এ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। সংসদীয় ৩০০টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পায় ২৯৩ আসন (ভোটের হার প্রায় ৭৩ শতাংশ)। আর বিরোধী দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) পায় মাত্র ৭টি আসন। এই নির্বাচন দেশের প্রথম গণতান্ত্রিক শাসনের সূচনা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও একদলীয় আধিপত্যের চিত্রও স্পষ্ট।
দ্বিতীয় নির্বাচন: ১৯৭৯
দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের তত্ত্বাবধানে। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের পর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন বহুদলীয় ব্যবস্থার সূচনা করে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপির আবির্ভাব হয়। প্রথমবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেই বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করে। এই নির্বাচনে বিএনপি পায় ২০৭ আসন (ভোটের হার ৪১ শতাংশ)। আর বিরোধী দল আওয়ামী লীগ পায় ৩৯টি আসন। ফলে এটি ছিল দেশের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের অন্যতম মাইলফলক।
তৃতীয় নির্বাচন: ১৯৮৬
এই নির্বাচনটি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়, যা ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করলেও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিএনপি বর্জন করে। এতে বিজয়ী দল জাপা (জাতীয় পার্টি) পায় ১৫৩টি আসন। আর বিরোধী দল আওয়ামী লীগ পায় ৭৬টি আসন।
চতুর্থ নির্বাচন: ১৯৮৮
সামরিক শাসক এরশাদের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনটি আরও বিতর্কিত। এতে অংশ নেয় মূলত এরশাদের দল জাতীয় পার্টি ও কয়েকটি ছোট দল। বিজয়ী দল জাপা ২৫১টি আসন পায়। অন্যদিকে নির্বাচনকালীন রাজনৈতিক পরিবেশ ও নিরপেক্ষতার অভাবের অভিযোগ তুলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ অধিকাংশ প্রধান রাজনৈতিক দল এটি বর্জন করে। ফলে সংসদে কার্যকর বিরোধী দল প্রায় অনুপস্থিত ছিল এবং নির্বাচনটি দেশে-বিদেশে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ও সমালোচিত হয়।
পঞ্চম নির্বাচন: ১৯৯১
১৯৯০ সালে সামরিক শাসক এরশাদের পতনের পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনটি দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা পুনরুদ্ধারের প্রথম প্রকৃত পরীক্ষা। এতে বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। দেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন বেগম খালেদা জিয়া। বিজয়ী দল বিএনপি পায় ১৪০টি আসন। আর বিরোধী দল আওয়ামী লীগ পায় ৮৮টি আসন। এটি দেশের ইতিহাসে সংসদীয় ব্যবস্থার গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। ফলে রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য এবং শক্তিশালী বিরোধীদলীয় কাঠামোর উদ্ভব হয়।
ষষ্ঠ নির্বাচন: ১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি)
এই নির্বাচন বিতর্কিত হিসেবে চিহ্নিত। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে নির্বাচনটি আয়োজন করে। বিজয়ী দল বিএনপি প্রায় ২৭৮ আসন। আওয়ামী লীগ এই নির্বাচন বর্জন করায় বৈধতা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। পরে নির্বাচনটি ব্যর্থ হয়।
সপ্তম নির্বাচন: ১৯৯৬ (জুন)
ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনটি বিতর্কিত ও ব্যর্থ হওয়ার পর একই বছরের জুনে পুনর্নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করে। বিজয়ী দল আওয়ামী লীগ পায় ১৪৬টি আসন। আর বিরোধী দল বিএনপি পায় ১১৬ আসন। আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হন। দেশের রাজনীতিতে পুনরায় স্থিতিশীলতা আসে এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়।
অষ্টম নির্বাচন: ২০০১
এই নির্বাচনে বিএনপি জোটভিত্তিকভাবে ১৯৩টি আসন পায়। প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ৬২টি আসন পায়। বিএনপির জোটভিত্তিক শক্তি প্রদর্শনের কারণে এই নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক সহিংসতার অনেক ঘটনা ঘটে।
নবম নির্বাচন: ২০০৮
আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ২৩০টি আসন জেতে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি মাত্র ৩০টি আসন পায়। এই নির্বাচনটি ফৌজদারি অবস্থা থেকে গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধারের প্রতীক। কারণ স্বচ্ছতার কারণে নির্বাচন প্রশংসিত হয় এবং জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়।
দশম নির্বাচন: ২০১৪
এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩৪টি আসন পেয়ে একতরফাভাবে বিজয়ী হয়। তবে প্রধান বিরোধী দলের বিএনপি নির্বাচনটি বর্জন করায় এটি বিতর্কিত হয় এবং বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
একাদশ নির্বাচন: ২০১৮
এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৫৭ আসনে জয়লাভ করে। আর বিরোধী দল বিএনপি পায় মাত্র ৬টি আসন। পরে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো এটিকে আগের রাতের ভোটের অভিযোগ তুলে তা বর্জন করে। ফলে ভোটের স্বচ্ছতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
দ্বাদশ নির্বাচন: ২০২৪
বিএনপির অংশগ্রহণ ছাড়া এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ ২২২ আসনে জয়লাভ করে, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৬২ আসন এবং জাতীয় পার্টি পায় ১১টি আসন। বিএনপি নির্বাচন বর্জন আর স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বেশি আসন পাওয়ায় এই নির্বাচন আমি-ডামি নির্বাচন হিসেবে সমালোচিত হয়।
বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে এ দেশের নির্বাচনগুলোতে প্রথমে একদলীয় আধিপত্য, পরে বহুদলীয় ব্যবস্থার বিকাশ, সামরিক শাসন, বিরোধী দল বর্জন এবং রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্য দিয়ে গেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের পতনের পর এ দেশে নির্বাচনে আরও একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতাকে হত্যার দায়ে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে এ দেশের সবচেয়ে প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করেছে। এ কারণে দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া এই দলটি প্রথমবার কোনো জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। রাজনৈতিক পালাবদলের বিশেষ প্রেক্ষাপটে এবারই প্রথম কোনো জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিন একই সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অনেক ইস্যুতে গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ ছাড়া ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রায় দেশবাসীর সামনে হাজির হয়েছে।