‘দুই মাস হতে যাচ্ছে, এখনো কাটেনি এলপি গ্যাসের সংকট। তাই হাজারীবাগের ঝাউতলা থেকে এখানে গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে এসেছি। ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম কোম্পানি ভেদে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা। কিছু লাভ করে বিক্রি করতে হবে। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে কেউ বলতে পারছে না।’
হাজারীবাগের ঝাউতলার সুমন মোহাম্মদপুরের স্বপ্নধারা হাউজিংয়ে পেট্রোম্যাক্স গ্যাস কোম্পানির ডিলার এমএন ট্রেডার্সে এসে এভাবেই কথা বলেন। ওই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার মো. আকাশও বলেন, ‘রমজান মাস শুরু হলেও গ্যাসের সংকট এখনো কাটেনি। চাহিদা মতো পাওয়া যায় না। এখনো ৫০ শতাংশ চাহিদার ঘাটতি রয়েছে। তাই নির্ধারিত দামে ১ হাজার ৩৫৬ টাকায় বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।’ শুধু খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতারা নয়, রাজধানীর মালিবাগ, পান্থপথ, কারওয়ান বাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলাতেও বেশি দাম ছাড়া মেলে না এলপি গ্যাস। ভুক্তভোগীরা বলছেন, ভোক্তা অধিদপ্তরের অভিযান না থাকায় সিন্ডিকেট চক্র মিলেমিশে ভোক্তাদের পকেট কাটছে। গতকাল সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
গতকাল বিভিন্ন ডিলারের দোকানে কথা হয় খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে। তারা বলেন, ‘এখনো সংকট কাটেনি। এখানে-সেখানে ঘুরেও চাহিদা মতো পাওয়া যায় না। আবার কিছু পাওয়া গেলেও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। গ্রিন রোডের আশা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মনিরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রায় ২ মাস হতে যাচ্ছে, এখনো ঠিকমতো এলপি গ্যাস পাওয়া যায় না। ১২ কোজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। বেশি দামে কেনা। তাই নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব না। ৩৫ কেজির সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে কেউ বলতে পারে না। এতে আমাদেরও খারাপ লাগছে।’ এদিকে কারওয়ান বাজারের জনতা ট্রেডার্সে মগবাজার মোড়ের মো. শাহানও খবরের কাগজকে বলেন, ‘আগের মতো গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। তাই খালি সিলিন্ডার নিয়ে এখানে এসেছি। ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৫০০ টাকায় কেনা হলো। তা ১ হাজার ৬৫০ টাকায় বিক্রি করা হবে।’ অন্য খুচরা এলপি গ্যাস বিক্রেতারাও জানান, ঠিকমতো পাওয়া যায় না। মাঝে গ্যাপ দিয়ে পাওয়া যাচ্ছে। জনতা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. আবদুল হকও বলেন, ‘আমি পেট্রোম্যাক্স, বিএম, সেনা কল্যাণ এলপি গ্যাসের ডিলার। তারা আগে ঠিকমতোই গ্যাস দিত। কিন্তু গত ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে সংকট শুরু হয়েছে। তারা আগে পরিবহন বাবদ কমিশন দিত। কিন্তু গত মাস থেকে আর দিচ্ছে না। এ জন্য নির্ধারিত ১ হাজার ৩৫৬ টাকা দামে সিলিন্ডার বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। দেড় হাজার টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।’ মালিবাগের খুচরা গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রেতা খলিলুর রহমানও একই তথ্য জানান। বলেন, ‘বেশি দামে কেনার কারণে নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।’
লোয়াব ও বিইআরসি থেকে জানা যায়, দেশে বর্তমানে এলপিজির চাহিদা বছরে ১৬ থেকে ১৭ লাখ টন। দিনে কম-বেশি ৫ হাজার টন এলপিজি লাগে। ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা তা বিক্রি করেন। ভোক্তাপর্যায়ে বেসরকারি খাতের এলপিজি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম সরকার জানুয়ারিতে নির্ধারণ করে ১ হাজার ৩০৬ টাকা। গত মাসে এর দাম নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ২৫৩ টাকা; অর্থাৎ জানুয়ারিতে ১২ কেজিতে দাম বেড়েছে ৫৩ টাকা। কিন্তু সেই দামে মেলে না। তবে ভোক্তাদের দাবি, নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। এলপি গ্যাসের বাজার যেন নিয়ন্ত্রণ ও স্বাভাবিক করা হয়। কারণ শহরের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এই গ্যাস রান্নার কাজে ব্যবহার হচ্ছে।
এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সূত্র বলছে, দেশে ২৮টি কোম্পানি এলপিজি ব্যবসা করে। এর মধ্যে ২৩টি কোম্পানির আমদানির অনুমোদন আছে। তবে এখন ৫ থেকে ৬টি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করতে পারছে। অন্যদের বাংলাদেশ ব্যাংক এলসি করতে দিচ্ছে না। এ জন্য আগের মতো আমদানি স্বাভাবিক হচ্ছে না।
এ ব্যাপারে লোয়াবের সহসভাপতি ও এনার্জি-প্যাক কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ হুমায়ুন রশিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘মাসে এলপিজির চাহিদা ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে দেড় লাখ টনের মতো। ডিসেম্বর আমদানি কম হয়েছে। জানুয়ারিতে কিছুটা বাড়ে। গত ১৬ দিনে ৬৮ হাজার টন আমদানি হয়েছে। ৫ থেকে ৬টি কোম্পানি এসব আমদানি করেছে। তাহলে সংকট তেমন নেই বলা যায়। লোয়াব থেকে বেশি করে আমদানির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আবেদন করা হয়। তারপরও বাংলাদেশ ব্যাংক এলসি খোলার অনুমতি দিচ্ছে না। অন্য যারা এলপি গ্যাস কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছে তারা লোকসান করে দিন কাটাচ্ছে। আগের মতো বেশি করে আমদানি হচ্ছে না। এ সুযোগে দুষ্টচক্র বেশি দামে বিক্রি করছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান গত ১ জানুয়ারি খবরের কাগজকে বলেছিলেন, রমজান মাসের আগেই এলপি গ্যাসের সংকট কেটে যাবে। বিপিসিকে আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তারপরও সংকট দূর হলো না কেন? এ ব্যাপারে গতকাল তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘যারা বাজারে এলপি সরবরাহ করে তারা বলেছিল রমজানের আগে সংকট কেটে যাবে। আগের তুলনায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। সংকট তেমন নেই বলা যায়। তা ছাড়া আমি মঙ্গলবার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়েছে। যারা দায়িত্বে আছেন তারা বিস্তারিত বলতে পারবেন।’