জ্বালানিসংকট দিনকে দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। এর প্রভাব পড়েছে পণ্য পরিবহন খাতে। জ্বালানির ঘাটতির কারণে চট্টগ্রামে প্রায় ৪০ শতাংশ পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন মালিকরা। এতে আয়-রোজগারে ধস নেমেছে চালক ও তাদের সহযোগীদের জীবনে। অন্যদিকে সরকার এখনো জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ালেও ইতোমধ্যে বেড়েছে পণ্য পরিবহন খরচ। এর প্রভাবে চট্টগ্রামে ভোগ্যপণ্যের বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ ও পাহাড়তলীতে এখনো দাম বাড়েনি। তবে যেকোনো সময় সেখানে পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
চট্টগ্রামের পরিবহনমালিক ও শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দর, বেসরকারি ১৯ ডিপো, বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও ভোগ্যপণ্যের বাজার মিলিয়ে চট্টগ্রামে প্রায় ১৫ হাজার পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল করে। এসব গাড়ির মধ্যে রয়েছে ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ডভ্যান, প্রাইম মুভার ইত্যাদি। এসব গাড়ির অধিকাংশই চলে ডিজেলে। তবে জ্বালানিসংকটের কারণে ইতোমধ্যে ৪০ শতাংশ গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। সে হিসাবে, প্রায় ৬ হাজার গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকায় এসব গাড়ির চালক ও সহযোগীরা পড়েছেন বিপাকে।
হিসাব কষে যা জানা গেল
পরিবহনমালিকরা হিসাব কষে জানিয়েছেন, একটি গাড়ি লোন নিয়ে কিনলে দিনে সাড়ে ৩ হাজার টাকা কিস্তি শোধ করতে হয়। চালক ও সহযোগীকে দিনে খোরাকি দিতে হয় ২ হাজার টাকা। গাড়ির মেরামত খরচ লাগে ৫০০ টাকা। আবার এই গাড়ির মাধ্যমে মালিকের দিনে আয় হয় ২ হাজার টাকা। যেসব গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়েছে সেগুলোর মালিকরা এই অর্থ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আর চালক, সহযোগীরা আয় না থাকায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
নগরের বারিক বিল্ডিং এলাকার বাসিন্দা ট্রাকচালক মো. নুর ছফা বলেন, ‘পণ্য পরিবহন মালিকদের সঙ্গে নির্দিষ্ট পেট্রলপাম্পের চুক্তি থাকে। কিন্তু ওই পেট্রলপাম্পগুলো এখন চাহিদামতো তেল দিতে পারছে না। একটি গাড়ি পর্যাপ্ত তেল নিয়ে চট্টগ্রাম ছাড়তে না পারলে ফেরার সময় তেল পাবে কি না, সন্দেহ রয়েছে। তাই অনেক মালিক গাড়ি চলাচল বন্ধ রেখেছেন। এতে চালক ও সহযোগীরা দৈনিক খোরাকি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দুশ্চিন্তায় আছি, কখন আমার মালিক গাড়ি বন্ধ করে দেন। এভাবে চলতে থাকলে আমরা সংসার চালাব কীভাবে?’
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
আন্তজেলা মালামাল পরিবহন সংস্থা ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী জাফর আহম্মদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের পণ্যবাহী পরিবহনগুলো বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় পণ্য পরিবহন সেবা দিয়ে থাকে। প্রতিদিন চট্টগ্রাম বন্দরে যে পরিমাণ আমদানি ও রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডেলিং হয়, তার প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্য কাভার্ড ভ্যান, ট্রাক ও প্রাইম মুভারের মাধ্যমে পরিবহন হয়। কিন্তু জ্বালানিসংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে। পর্যাপ্ত জ্বালানি না পেয়ে অনেক পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। পণ্য পরিবহনে ভাড়াও বেড়েছে।’
বাংলাদেশ সড়ক-মহাসড়ক পণ্য পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওয়াজি উল্লাহ খবরের কাগজকে বলেন, ‘জ্বালানিসংকটের কারণে যেসব পণ্য পরিবহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে তাদের চালক-সহযোগীরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তাদের অসুবিধার কথা জানাচ্ছেন। গাড়ি বন্ধ হয়ে যাওয়া মানেই তো তাদের আয় বন্ধ হওয়া। তবে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া তো সমাধান নয়। করোনার সময় গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও পণ্য পরিবহন চলাচল বন্ধ থাকেনি। এই পণ্য পরিবহনের সঙ্গে শুধু চালক-সহযোগীর জীবিকা নয়, পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর, পোশাক খাতসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কার্যক্রমও জড়িত। কাজেই বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে করে অন্তত পণ্য পরিবহন খাত সচল থাকে।’
বেড়েছে পণ্য পরিবহন ভাড়া
এদিকে জ্বালানিসংকটের কারণ দেখিয়ে পণ্য পরিবহনের ভাড়াও বেড়েছে। পণ্য পরিবহন মালিক ও ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পণ্য পরিবহন খরচ ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পণ্য পরিবহন খরচ আগে ছিল প্রায় ৩০ হাজার টাকা। এখন আদায় হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গ থেকে পণ্য আনতে পরিবহন খরচ ৫ হাজার টাকা বেড়েছে। অর্থাৎ আগে ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকায় পণ্য আনা গেলেও এখন গুনতে হচ্ছে ২২ থেকে ২৩ হাজার টাকা। তবে এখনো ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়েনি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
পাহাড়তলী বণিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, সরকার তো জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি। কিন্তু জ্বালানিসংকটকে পুঁজি করে পণ্য পরিবহনের ভাড়া বাড়তি আদায় করা হচ্ছে। এর প্রভাব ভোগ্যপণ্যের দামে পড়ার কথা। কিন্তু পণ্যের দাম এখনো বাড়েনি।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক মো. মহিউদ্দিন বলেন, বিশ্ববাজারে ভোগ্যপণ্যের বুকিং রেট বাড়তে শুরু করেছে। দেশে পণ্য পরিবহন খরচ বেড়েছে। সে হিসাবে খাতুনগঞ্জে এখনো ভোগ্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হয়নি। জ্বালানিসংকট, বাড়তি পণ্য পরিবহন খরচ–এসব সমস্যার সমাধান করতে না পারলে যেকোনো সময় ভোগ্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হতে পারে। তখন এর চাপ গিয়ে পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, জ্বালানির আমদানি তো থেমে নেই। পাশাপাশি সরকার এখনো জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়নি। যারা জ্বালানির কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে এবং জ্বালানিসংকটকে পুঁজি করে যারা বিভিন্ন অনিয়ম করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।