সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ী বাংলাদেশ নারী ফুটবলারদের সংবর্ধনা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল শনিবার বেলা ১১টায় ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এই সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
প্রধান উপদেষ্টা স্বাগত বক্তব্যে খেলোয়াড়দের উদ্দেশে বলেন, ‘এই সাফল্যের জন্য আমি গোটা জাতির পক্ষ থেকে আপনাদের অভিনন্দন জানাই। জাতি আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ। আমাদের দেশের মানুষ সাফল্য চায়। আপনারা আমাদের সাফল্য এনে দিয়েছেন।’ বিজয়ী খেলোয়াড়দের দাবিগুলো মনোযোগের সঙ্গে শুনেছেন প্রধান উপদেষ্টা এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধানে প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
প্রধান উপদেষ্টা প্রতিটি খেলোয়াড়কে তাদের ব্যক্তিগত আশা-আকাঙ্ক্ষা, সংগ্রাম এবং দাবিগুলো আলাদা কাগজে লিখে তার অফিসে পাঠাতে বলেন। অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘আপনারা যা মন চায়, লিখতে পারেন, দ্বিধা করবেন না। যদি এখন কিছু বলতে চান, সেটাও বলতে পারেন। আমরা আপনাদের দাবি পূরণ করার চেষ্টা করব। এখন যদি কিছু সুরাহা করা যায়, তবে আমরা এখনই তা করব।’
এমন একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য অধিনায়ক সাবিনা খাতুন প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানান এবং বলেন এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পেরে তারা সম্মানিত বোধ করেছেন। সাবিনা বলেন, ‘অনেক বাধা অতিক্রম করে আমরা এই পর্যায়ে এসেছি। এটা শুধু নারী ফুটবল দলই নয়, বাংলাদেশের নারীরা অনেক সংগ্রামের মুখোমুখি হয়।’
একই সঙ্গে সাবিনা বাংলাদেশের নারী ফুটবলে তার আগের প্রজন্মের অবদানের কথা স্মরণ করেন, যারা ফুটবলকে তাদের আবেগ হিসেবে নেওয়ার সাহস দেখিয়েছেন।
সাবিনা বলেন, ‘তাদের মধ্যে অনেকেই প্রত্যন্ত এলাকা থেকে উঠে এসেছেন এবং তাদের পরিবারকে সমর্থন করা দরকার। আমরা যা বেতন পাই, তা দিয়ে পরিবারকে পর্যাপ্ত সহায়তা করতে পারি না। কারণ আমরা বেশি কিছু পাই না।’
সাবিনা তার কয়েক সতীর্থের উঠে আসার সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। যেমন মিডফিল্ডার মারিয়া মান্দা, যিনি উঠে এসেছেন ময়মনসিংহের কলসিন্দুর থেকে। মারিয়া তার বাবাকে হারিয়েছেন ছোটবেলায়। মা তাকে লালন-পালন করেছেন। কলসিন্দুর থেকে সাফজয়ী দলে ৬ জন খেলোয়াড় আছেন।
কৃষ্ণা ঢাকায় তাদের আবাসনসমস্যার বিষয়টি তুলে ধরেন উপদেষ্টার সামনে। মিডফিল্ডার মনিকা চাকমা খাগড়াছড়ির প্রত্যন্ত উপজেলা লক্ষ্মীছড়ি থেকে কীভাবে সংগ্রাম করে উঠে এসেছেন, তা তুলে ধরেন। মিডফিল্ডার স্বপ্না রানী তার উঠে আসার স্থান দিনাজপুর জেলার রানীশংকৈল গ্রামের দুর্বল অবকাঠামোর বর্ণনা দিয়েছেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের কোচ পিটার বাটলার ও ম্যানেজার মাহমুদা আক্তার। উপস্থিত ছিলেন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদও। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘বিগত সরকারের সময়ে খেলোয়াড়দের চেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হতো কমিটির সদস্যদের। সবার উর্দ্ধে ছিলেন তারা। এখন থেকে আর সেটা হবে না। স্পোর্টসের স্টেকহোল্ডার হচ্ছে আমাদের খেলোয়াড়রা। এখন থেকে তাদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। এটা অন্তত আমার সময় নিশ্চিত করব ইনশাআল্লাহ।
ক্রীড়া উপদেষ্টা বলেন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ এবং খোলামেলা আলোচনা করেছেন সাফজয়ী নারী ফুটবলাররা। স্যার (ড. ইউনূস) তাদের উৎসাহ জুগিয়েছেন। বলেছেন, জয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। নারী ফুটবলাররা প্রধান উপদেষ্টাকে তাদের সমস্যার কথা বলেছেন। আবাসন সমস্যা, অনুশীলন, বেতন কাঠামোসহ সব কিছু নিয়ে কথা হয়েছে। তিনি প্রত্যেক নারী ফুটবলারকে লিখিতভাবে সমস্যা জানাতে বলেছেন। সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নেবেন বলে প্রধান উপদেষ্টা জানিয়েছেন। দুই-তিন দিনের মধ্যে ফুটবলাররা তাদের সমস্যাগুলো লিখিতভাবে দেবেন। সেটা আমি সরাসরি প্রধান উপদেষ্টাকে পৌঁছে দেব।
যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া আরও বলেন, নারী ফুটবলাররা প্রত্যেকের স্বাক্ষর করা জার্সি এবং ফুটবল প্রধান উপদেষ্টাকে উপহার দিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টাসহ আমরা সবাই নারী ফুটবলারদের সঙ্গে নাস্তা করেছি।
যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা বলেন, নারী ফুটবলারদের দুই মাসের বেতন বাকি আছে। এতদিন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনে (বাফুফে) সালাউদ্দিনের কমিটি ছিল। এখন নতুন কমিটি এসেছে। নতুন কমিটির সঙ্গে আমরা সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করব। ভবিষ্যতে যেন নারী ফুটবলারদের বেতন বাকি না থাকে। বাফুফের বিশাল অঙ্কের ঋণ রয়েছে, কেন এমন হলো আমাদের জানতে হবে? কোন কোন জায়গায় আর্থিক অনিয়ম হয়েছে, তা আপনারা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন। সেগুলো নিয়ে নতুন কমিটিকে অডিটের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোথাও অনিয়ম হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, নারী ফুটবলারদের আবাসন, বেতন, অনুশীলনসহ সব সমস্যার সমাধান করা হবে। শুধু ফুটবল না, ক্রিকেটসহ খেলাধুলার সব খাতের বিরাজমান সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ আরও বলেন, নারী ফুটবলাররা জানিয়েছেন, ক্যাম্প সারা বছর চলার কারণে এই সাফল্য সম্ভব হয়েছে। ক্যাম্প যেন সারা বছর চলমান রাখা যায় সে দাবি তুলেছেন তারা। আমরাও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ক্রীড়া উপদেষ্টা বলেন, বাফুফের নতুন কমিটি আন্তরিক। এই কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে নারী ফুটবল দলের সমস্যার সমাধানে চেষ্টা করা হবে। বাফুফের কারোর আয়োজনে না থাকার ব্যাপারে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাফুফের সভাপতি দেশে ছিলেন না। যে কারণে বাফুফের কেউ আজকে নেই। আমার কাছে যে ২৫ জনের তালিকা এসেছে, আমরা তাদের এখানে আনার ব্যবস্থা করেছি। সেখানে সহকারী কোচের নাম ছিল না।’
আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ফুটবল, ক্রিকেটসহ খোলাধুলার সব খাতের উন্নয়নে আমাদের যতটুকু সামর্থ্য আছে চেষ্টা করব। ক্রিকেটেরও কিন্তু সমস্যা আছে। সেগুলোও সমাধানের চেষ্টা করা হবে।’
নেপালে সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৪ জিতে গত বৃহস্পতিবার দেশে ফিরেছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। বিকেল ৪টায় বিমানবন্দর থেকে ছাদখোলা বাসে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় বাফুফে ভবনে। সেখানে সাবিনাদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেন ক্রীড়া উপদেষ্টা। ফুটবলারদের বরণ করার পর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আর্থিক পুরস্কারের ঘোষণা দেন উপদেষ্টা। সাফজয়ী বীরদেরকে ১ কোটি টাকার আর্থিক পুরস্কার দেওয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা তাৎক্ষণিক পুরস্কারের চেক তুলে দেন সাফজয়ী ফুটবল দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুনের হাতে।