কাগজে-কলমে, বরুণ চক্রবর্তী এবং মিচেল স্যান্টনার উভয়ই স্পিনার। বাস্তবে স্পিন বোলিংয়ে তাদের পদ্ধতি একেবারেই পৃথক। একজন ঘূর্ণিতে নির্ভর করেন, অন্যজন নিয়ন্ত্রণের ওপর। দুই ঘূর্ণিবাজ আজকের ফাইনালে তাদের দলের ভাগ্যের চাবিকাঠি। চ্যাম্পিয়ন ট্রফিতে দুজনেই সাতটি করে উইকেট নিয়েছেন, যা অন্য যেকোনো স্পিনারের চেয়ে বেশি। বরুণের উইকেট মাত্র দুটি ম্যাচে এসেছে। অন্যদিকে চার ম্যাচ খেলা স্যান্টনার অধিনায়কত্বের অতিরিক্ত বোঝা কাঁধে তুলেছেন। পুরোপুরি ভিন্ন রকম দুই স্পিনারের প্রভাব টুর্নামেন্টে অনস্বীকার্য।
স্যান্টনার একজন অসাধারণ বাঁহাতি স্পিনার। তিনি ফ্লাইট, ড্রিফট এবং নিখুঁত স্পিনের ওপর নির্ভরশীল। গতি পরিবর্তন এবং লেন্থ নিয়ন্ত্রণে তার দক্ষতা তাকে এমন একজন বোলার করে তোলে যে আক্রমণ আর প্রতিরক্ষা উভয়ই করতে পারেন। বোলিংয়ে সূক্ষ্ম বৈচিত্র্যের মাধ্যমে ব্যাটারদের বেঁধে রাখে। বরুণ একেবারেই ভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করেন। তিনি বল দ্রুত ডেলিভারি করেন, টার্নের চেয়ে কৌশলের ওপর বেশি নির্ভর করেন। তাই সাইড-অন গ্রিপ এবং সোজা গতিপথ ব্যাটারদের খুব বেশি সময় দেয় না।
চলমান টুর্নামেন্টে দুজনের উইকেটসংখ্যা জানান দেয়, কতটা বৈচিত্র্য এনেছেন তাদের বোলিংয়ে। স্যান্টনারের ৩৮.৬ শতাংশ ডেলিভারি ৪.৫ ডিগ্রির বেশি টার্ন করেছে। টুর্নামেন্টে এটা যেকোনো স্পিনারের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বরুণের মাত্র ০.৮ শতাংশ ডেলিভারি টার্ন পেয়েছে এবং ৮৮.৫ ডেলিভারি ২.৫ ডিগ্রিরও কম টার্ন করেছে। গতির কথা বলতে গেলে, বরুণের গড় গতি (৯৩.৭৪ কিমি/ঘণ্টা) টুর্নামেন্টের দ্রুততম স্পিনারদের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। আর স্যান্টনার বল করেন ৮২.৯০ কিমি/ঘণ্টা বেগে।
কিউই স্পিনার তার ৮১.৭ শতাংশ ডেলিভারি ভালো লেন্থ অথবা ব্যাক-অব-এ-লেন্থ জায়গায় করেছেন, যা তার ধারাবাহিকতার প্রমাণ। বরুণ এই লেন্থে বল করেছেন মাত্র ৬৩ শতাংশ সময়। তিনি ৩০ শতাংশের বেশি সময় শর্ট বোলিং করেছেন, যা কার্যত মিডিয়াম পেসারের মতো আচরণের প্রতিফলন। হোক ভিন্ন কৌশল, কিন্তু দুজনেই ফল পাচ্ছেন। লাভবান হচ্ছে তাদের দল। তাই আজ শিরোপার লড়াইয়ে বাজির ঘোড়া তারা। বলা বাহুল্য, ভারতের মুখোমুখি হওয়ার বেশ মিশ্র অভিজ্ঞতা রয়েছে স্যান্টনারের। বরুণের কাছে নিউজিল্যান্ড নতুন প্রতিপক্ষ।
স্যান্টনার ভারতের বিপক্ষে ২৩টি ওয়ানডে খেলেছেন, অন্য যেকোনো দলের চেয়ে বেশি। এশিয়ার প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তার রেকর্ড আশানুরূপ নয়। ৬১.২০ গড়ে মাত্র ১৫টি উইকেট পেয়েছেন তিনি। তবে মিতব্যয়ী, প্রতি ওভারে মাত্র ৪.৭৫ রান দিয়েছেন। নিউজিল্যান্ডের জন্য বরুণ অচেনা এক অস্ত্র। ভারতীয় স্পিনার এক মাসেরও কম সময় আগে তার ওয়ানডে অভিষেক করেছেন এবং কিউইদের বিপক্ষে মাত্র একটি ৫০ ওভারের ম্যাচ খেলেছেন। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির গ্রুপ পর্বে সেই ম্যাচে পাঁচ উইকেট শিকারে বরুণ হয়েছিলেন ম্যাচসেরা।
বরুণের পাঁচ শিকারের একজন ছিলেন স্যান্টনার নিজেই। স্পিনের বিপক্ষে নয়, লেন্থ এবং পেসের কাছে হেরেছিলেন কিউই দলপতি। বলাই যায়, সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকার দ্বিতীয়বার না হতে বরুণের বিপক্ষে লেখাপড়া করেই আজ মাঠে নামবে নিউজিল্যান্ড। অন্যদিকে ভারতকে অবশ্যই স্যান্টনারের ডট-বল চাপ তৈরি এবং রানের গতি কমানোর ক্ষমতা সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। এককথায়, দুবাইয়ের ফাইনালটি শুধু ভারত এবং নিউজিল্যান্ডের মধ্যে লড়াই নয়, এটি বিপরীত স্পিন দর্শনের একটি প্রতিযোগিতাও। এখন দেখার অপেক্ষা- স্যান্টনারের নির্ভুল স্পিন কি ভারতের ব্যাটারদের দমিয়ে দিবে নাকি বরুণের রহস্যময় স্পিন আবারও ব্ল্যাকক্যাপসদের বিভ্রান্ত করবে।