যেকোনো সিরিজে দ্বিতীয় ম্যাচের আগে প্রথম ম্যাচ নিয়ে থাকে চুলচেরা বিশ্লেষণ। হেরে গেলে হারের কারণ অনুসন্ধান। জয়ী হলে খুঁটিনাটি দুর্বলতা বের করে তা সংশোধনের চেষ্টা। সঙ্গে থাকে ম্যাচ জিতে সিরিজ জয় নিশ্চিত করা। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ বাংলাদেশ জিতেছে অনেকটা অনায়াসেই। ডাচদের ৮ উইকেটে করা ১৩৬ রান বাংলাদেশ টপকে গিয়েছিল ৬.৩ ওভার হাতে রেখে মাত্র ২ উইকেট হারিয়ে। সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে আজ দ্বিতীয় ম্যাচ। বাংলাদেশ দল চাইবে আজই সিরিজ নিশ্চিত করা। আজ ম্যাচ জিততে পারলে ডাচদের বিপক্ষে বাংলাদেশের হবে প্রথম টি-টোয়েন্টি সিরিজ জয়। এর আগে একবার ২০১২ সালে নেদারল্যান্ডসে গিয়ে বাংলাদেশ দুই ম্যাচের সিরিজ খেলে জিততে পারেনি। ১-১ সমতা হয়েছিল। খেলা শুরু হবে সন্ধ্যা ৬টায়।
প্রথম ম্যাচে জয়ের ব্যবধানেই বলে দেওয়া সেখানে ভুল-ত্রুটি খুব একটা ছিল না। বরং সেখানে ছিল কিন্তু ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ভাস্বর। যেমন তাসকিনের ২৮ রানে ৪ উইকেট, লিটন দাসের ২৯ বলে অপরাজিত ৫৩ রান আর সাইফ হাসানের ১৯ বলে অপরাজিত ৩৬ রানের ইনিংস। তাসকিন দলের নিয়মিত সদস্য। বলা যায় নিয়মিত পারফর্মরাও। ক্যারিয়ারে এটি ছিল তার চতুর্থবার ইনিংসে ৪ উইকেট নেওয়া। লিটন দাসও নিয়মিত সদস্য। অধিনায়ক। নিয়মিত রান করতে না পারলেও কম-বেশি রান করে যান। তার হাফ সেঞ্চুরি ছিল ক্যারিয়ারের ১৩তম। সাইফ হাসান কিন্তু হাফ সেঞ্চুরি করতে পারেননি। কিন্তু প্রথম ম্যাচ শেষে তাকে নিয়েই আলোচনা বেশি। আবার গতকাল দ্বিতীয় ম্যাচকে সামনে রেখে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলতে আসা দলের সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন ম্যাচের চেয়ে সাইফ হাসানকে নিয়েই বলেছেন কথা। অবশ্য তিনি কথা বলতে বাধ্যও হয়েছেন। কারণ সংবাদ সম্মেলনে সাইফ হাসানকে নিয়েই যে একাধিক প্রশ্ন হয়েছে।
সাইফ হাসানকে নিয়ে এভাবে কথা বলার কারণ দীর্ঘ প্রায় দুই বছর পর জাতীয় দলে ফিরেই তিনি শুধু ১৯ বলে ৩ ছক্কা আর ১ চারে অপরাজিত ৩৬ রানের ইনিংসই খেলেননি, এর আগে বল হাতে নিয়ে প্রথম ওভারেই তুলে নেন ২ উইকেট। ইনিংসে ২ ওভারে ১৮ রান দিয়ে তিনি ২ উইকেট পান। সাইফের ৬ ম্যাচের ক্যারিয়ারে এই ম্যাচেই তিনি প্রথম উইকেট পান। স্বাভাবিক কারণে কামব্যাক ইনিংসে এ রকম নৈপুণ্য আলোচনায় আসাটাই স্বাভাবিক।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাইফের প্রথমে অভিষেক হয় টেস্ট ক্রিকেট। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে তিনি খেলেছিলেন টেস্ট। কিন্তু ভালো করতে না পারার কারণে একসময় বাদ পড়ে যান। ৬ টেস্টের ক্যারিয়ারে তিনি রান করেছিলেন ১৫৯। সর্বোচ্চ রান ছিল ৪৩। প্রায় ২১ মাস পর ২০২১ সালের নভেম্বরে এই পাকিস্তানের বিপক্ষে চট্টগ্রামে টি-টোয়েন্টি ম্যাচে অভিষেক হয়েছিল। কিন্তু এই ফরম্যাটে তার অবস্থা ছিল আরও করুণ। ০ ও ১ রান করে তিনি বাদ পড়ে যান। এরপর ২০২৩ সালে গুয়াজুং এশিয়ান গেমসে সুযোগ পেয়ে তিন ম্যাচ খেলে একটি ম্যাচে অপরাজিত ৫০ রান করেছিলেন। এটি বাংলাদেশের মূল জাতীয় দল ছিল না। জাতীয় দল তার কাছে দূর আকাশের চাঁদ হয়েই থাকে। অবশেষে ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো করে তিনি নির্বাচকদের নজর কেড়ে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে সিরিজে ফিরেন দলে। একই সঙ্গে তার জায়গা হয়েছে এশিয়া কাপের স্কোয়াডেও।
সাইফ হাসান দলে সুযোগ পেলেও সেরা একাদশে সুযোগ পাওয়া ছিল অনেকটা চমক। ওপেনার হিসেবে জাতীয় দলে অভিষেক হলেও বর্তমানে তিনি টপ বা মিডল অর্ডারেও খেলতে পারেন। তাকে জায়গা দিতে শামীম পাটোয়ারীকে বাদ দেওয়া হয়। শামীম পাটোয়ারী আবার খেলে থাকেন নিচের দিকে। সাইফ এবার আর ওপেন করেননি, চারে ব্যাট করেন। ফলে জায়গা ছেড়ে দিতে হয় তাওহিদ হৃদয়কে। সফল প্রত্যাবর্তনের পর সাইফ ভাসছেন প্রশংসায়। কিন্তু দলের সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন সাইফকে এভাবে আকাশে তুলতে চান না। গতকাল সিলেটে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি আগেও বলেছি একবার- কাউকে তাড়াতাড়ি আকাশে তুলে ফেলবেন না আবার কাউকে তাড়াতাড়ি নিচে নামিয়ে ফেলবেন না। ভালো খেলেছে, কামব্যাক করেছে। যেটা স্ট্রং মানসিকতার একটা পরিচয়। যেকোনো মানুষের ক্ষেত্রেই আপনি যখন ব্যাকফুটে চলে যাবেন তখন সে ওইখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। যেহেতু ওর পেছনে টেস্ট খেলোয়াড়ের তকমা ছিল, সে হয়তো সাদা বলে ভালো খেলতে পারেনি। সেখান থেকে বেরিয়ে সে যে ক্যারেক্টার শো করেছে এটা আসলে সবার ভেতর থাকে না।’ এক ম্যাচে ভালো করলেই হয় না, এটা ধরে রাখতে হয়। মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন আশা করেন সাইফ এই পারফরম্যান্স ধরে রাখবেন। তিনি বলেন, ‘আশা করি, গত ম্যাচে সে যে ক্যারেক্টার শো করেছে সেটা যেন সে আরও কন্টিনিউ করতে পারে। কারণ এটা অনেক কঠিন ক্রিকেট। এটা ভাবার কোনো কারণ নেই এক ম্যাচেই সে সফল হয়ে যাবে। সাফল্যটা আপনি কতদিন, কত বছর ধরে রেখেছেন সেটা নির্ভর করবে। উন্নতি তো নিয়মিতই করতে হবে। কিন্তু তার চেষ্টাটা ছিল। এটা আসলে সে নিজেই চেষ্টা করেছে। সে নিজেকে অন্য জায়গায় দেখতে চেয়েছে। কারণ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম ৬-৭টা ম্যাচে সে ব্যর্থ হয়েছে। সেখান থেকে মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো খুবই কঠিন কাজ। হয়তো আমরা বাইরে থেকে মনে করি এটা অনেক সহজ। কিন্তু এটা অনেক কঠিন কাজ। সেই কাজটা সে করতে পেরেছে, তার ক্যারেক্টারের ভেতরে ছিল। সে নিজে উন্নতি করার চেষ্টা করছে এবং এ কারণেই এখন পারফরম্যান্সগুলো হচ্ছে।’
জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার পর সাইফ নিজেকে ফিরে পেতে অনেক পরিশ্রম করেন। ধৈর্য ধারণ করেন। সাইফের ধৈর্য ধারণটা ছিল প্রায় চার বছরের মতো। মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনের কাছে এটি খুব ভালো লেগেছে। তিনি বলেন, ‘ওর চেষ্টার কথা বলব, অনেক মানুষই চেষ্টা করে। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে হয়তো এক-দুই মাস কিংবা এক বছর ধৈর্য থাকে। কিন্তু ধৈর্যটা চার বছর ধরে দেখলাম। আপনি কতদিন আপনার ধৈর্য ধরে রাখবেন এটা অনেক বড় ব্যাপার। সেটার ফলই হয়তো সে এখন পাচ্ছে। ভবিষ্যতে সে হয়তো আরও ভালো করবে।’
পলাশ/নিলয়/