আজতেকা স্টেডিয়ামে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ। প্রায় ৮০ হাজার দর্শকের গর্জনে মুখরিত গ্যালারি। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে এগিয়ে থাকা মেক্সিকো আরও একটি গোলের খোঁজে। সেই মুহূর্তে রবার্তো আলভারাদোর ডান প্রান্ত থেকে ভেসে আসা ক্রসে উড়ে উঠে মাথা ছোঁয়ালেন রাউল গিমেনেজ। বল জালে জড়াতেই যেন সময় থমকে গেল।
গোলের পর উচ্ছ্বসিত উদ্যাপন। এরপর আকাশের দিকে আঙুল তুলে তাকানো। অনেকের কাছেই সেটি ছিল মার্চ মাসে প্রয়াত হওয়া তার বাবা রাউল গিমেনেজ ভেগার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন। কয়েক সেকেন্ড পরই আবেগে ভেঙে পড়লেন তিনি। সতীর্থরা ঘিরে ধরলেন, আর গিমেনেজের চোখ বেয়ে নামল অশ্রু।
মাত্র কয়েক বছর আগেও যে দৃশ্যটি অসম্ভব মনে হয়েছিল, সেটিই বাস্তবে রূপ নিল আজতেকার সবুজ ঘাসে। বৃহস্পতিবার রাতে উদ্বোধনী ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচে মেক্সিকোর প্রথম গোলটি করেন জুলিয়ান কিনোনেস। নবম মিনিটে তার গোলেই আসরের উদ্বোধনী গোলের দেখা পায় সহআয়োজক মেক্সিকো। ম্যাচ শেষে গিমেনেজের প্রশংসায় তিনি বলেন, ‘আমরা তাকে অভিনন্দন জানিয়েছি। সে দলের জন্য অনেক কিছু দেয়। জাতীয় দলের হয়ে খেলাটা আমাদের গর্ব, আর সে এখনো গোল করে চলেছে, এটা দারুণ ব্যাপার।’
গোলটি ছিল জাতীয় দলের জার্সিতে গিমেনেজের ৪৬তম গোল। ১২৫তম ম্যাচে এসে তিনি মেক্সিকোর সর্বকালের গোলদাতাদের তালিকায় যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছেন। তার সামনে আছেন শুধু হাভিয়ের হার্নান্দেজ, যার গোলসংখ্যা ৫২। মজার বিষয় হলো, গোল করার আগেই বিশ্বকাপে নতুন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন গিমেনেজ। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২–এই তিন বিশ্বকাপে মোট ছয়বার মাঠে নামলেও প্রতিবারই বদলি হিসেবে খেলেছিলেন তিনি। ২০২৬ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচটিই ছিল বিশ্বকাপের মূল পর্বে তার প্রথম একাদশে শুরু করা ম্যাচ।
শুরুর চার মিনিটেই গোলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। শক্তিশালী হাফ-ভলি শট দুর্দান্ত দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন দক্ষিণ আফ্রিকার গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামস। তবে শেষ পর্যন্ত ৬৭ মিনিটে কাঙ্ক্ষিত গোলটি পেয়ে যান গিমেনেজ। তার পর যে আবেগ দৃশ্যমান হয় তার পেছনে রয়েছে এক ভয়ংকর অধ্যায়।
মেক্সিকোর ক্লাব আমেরিকায় ক্যারিয়ার শুরু করে আতলেতিকো মাদ্রিদ ও বেনফিকার হয়ে খেলেছিলেন গিমেনেজ। ২০১৮-১৯ মৌসুমে ধারে উলভারহ্যাম্পটনে যোগ দিয়ে ১৩টি প্রিমিয়ার লিগ গোল করেন। তার অবদানে লিগে সপ্তম হয়ে ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতার টিকিট পায় ক্লাবটি। এরপর উলভস তাকে ৩ কোটি পাউন্ডে স্থায়ীভাবে দলে ভেড়ায়, যা সে সময় ক্লাবটির রেকর্ড ট্রান্সফার ছিল। ২০১৯-২০ মৌসুমে আরও ১৭টি লিগ গোল করেন তিনি।
কিন্তু ২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর বদলে যায় সবকিছু। আর্সেনালের ডিফেন্ডার ডেভিড লুইজের সঙ্গে ভয়াবহ মাথার সংঘর্ষে মাঠেই অজ্ঞান হয়ে পড়েন গিমেনেজ। তার মাথার খুলি ভেঙে যায়। সতীর্থ, কোচিং স্টাফ এবং পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কে দেখছিলেন–তিনি আদৌ বেঁচে আছেন কি না। মাঠেই তাকে অক্সিজেন দিতে হয়েছিল। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ পুনর্বাসন। ছয় মাস অন্য খেলোয়াড়দের সঙ্গে অনুশীলন করার অনুমতি পাননি। আট মাস মাঠের বাইরে থাকার পর অবশেষে উলভসের জার্সিতে ফেরেন। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে সাউদাম্পটনের বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচে গোল করে প্রত্যাবর্তনের গল্প লেখেন তিনি।
২০২৩ সালে ফুলহামে যোগ দেন গিমেনেজ। সেখানে তিন মৌসুম কাটানোর পর চলতি সপ্তাহেই পুরোনো ঠিকানা উলভসে ফেরার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ২০২২-২৩ মৌসুমে উলভসের সহকারী কোচ হিসেবে তার সঙ্গে কাজ করা এদু রুবিও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকার ক্লাব স্পোর্টিং কানসাস সিটির সহকারী প্রধান কোচ। গিমেনেজের বিশ্বকাপ গোল দেখে তিনিও আবেগাপ্লুত, ‘এটি তার কাছে পৃথিবীর সমান মূল্যবান। নিজের দেশকে সে ভীষণ ভালোবাসে এবং জাতীয় দলের হয়ে খেলতে গর্ববোধ করে।’
কখনো মনে হয়েছিল, সেই ভয়াবহ মাথার আঘাত হয়তো তার ক্যারিয়ারই শেষ করে দেবে। কেউ কেউ শঙ্কা করেছিলেন, হয়তো আর কখনো ফুটবল মাঠে ফিরতেই পারবেন না। অথচ ছয় বছরেরও কম সময়ে তিনি ফিরে এসেছেন বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে। গোল করেছেন, জিতিয়েছেন দেশকে, আর চোখের জলে লিখেছেন ফুটবলের অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ক প্রত্যাবর্তনের গল্প।