প্রাচীন লোককথায় ইউনিকর্ন বা একশৃঙ্গ প্রাণীর কথা হয়তো অনেকেই পড়েছেন। লোককথায় ইউনিকর্নকে একটি সুন্দর ও অলৌকিক সাদা ঘোড়া হিসেবে কল্পনা করা হয়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই ইউনিকর্নের ধারণা কেবল কল্পনাপ্রসূত নয়, বরং বাস্তবেও এমন একটি প্রাণী ছিল, যার নাম এলাসমোথেরিয়াম।
‘সাইবেরিয়ান ইউনিকর্ন’ বলতে সাধারণত এলাসমোথেরিয়াম (Elasmotherium) নামে পরিচিত একটি বিলুপ্ত প্রাণীকেই বোঝানো হয়। এই প্রাণীকে ‘সাইবেরিয়ান ইউনিকর্ন’ বলার কারণ এটি গণ্ডার জাতীয় একটি বিলুপ্ত প্রাণী যার কপালে বিশাল একটি শিং ছিল। এটি দেখতে গণ্ডারের মতো হলেও আকৃতিতে বিশাল এবং এর গায়ে ছিল ঘন লোম। এর শিংটি প্রায় দেড় মিটার লম্বা ছিল যা আত্মরক্ষা, প্রতিযোগিতা এবং খাদ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত হতো।
বিজ্ঞানীদের মতে, এলাসমোথেরিয়াম বা ‘সাইবেরিয়ান ইউনিকর্ন’ একসময় বাস্তবে পৃথিবীতে বসবাস করত। এই ইউনিকর্ন ছিল লম্বাটে এবং তুলনামূলকভাবে বড় আকৃতির। উচ্চতা প্রায় সাড়ে ৬ ফুট আর দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১৫ ফুট। ওজন আনুমানিক সাড়ে তিন থেকে চার টন বলে ধারণা করা হয়। এলাসমোথেরিয়াম রাশিয়া, ইউক্রেন, কাজাখস্তান, সাইবেরিয়া এবং মধ্য এশিয়ার তৃণভূমিতে বাস করত। এটি ছিল তৃণভোজী প্রাণী, যার খাদ্য তালিকায় ঘাস, শেকড় এবং গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ অন্তর্ভুক্ত থাকত। শক্তিশালী চোয়াল ও দাঁতের কারণে এটি শুষ্ক এবং শক্ত জমির উদ্ভিদ খুব সহজেই খেতে পারত। অনেক গবেষক মনে করেন, এটি ছিল একাকী প্রাণী, তবে কিছু ক্ষেত্রে এরা ছোট ছোট দলে বসবাস করত।
.jpg)
২০০০ সালের দিকে সাইবেরিয়া ও কাজাখস্তানে এলাসমোথেরিয়াম বা ইউনিকর্নের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এটি আগের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সময় বেঁচে ছিল। ২০১৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয় যে, এটি ২৯ হাজার বছর আগেও জীবিত ছিল। অথচ আগে ভাবা হয়েছিল ২ লাখ বছর আগেই বিলুপ্ত হয়েছিল ইউনিকর্ন। বিজ্ঞানীরা ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে এটি আধুনিক গণ্ডারদের নিকটাত্মীয় বলে নিশ্চিত করেছেন।
এখন প্রশ্ন আসে- এত বড় একটি প্রাণী হুট করে বিলুপ্ত হওয়ার কারণ কী। ইউনিকর্ন কীভাবে বিলুপ্ত হয়েছে তা জানা বেশ জটিল। তবে ধারণা করা হয়, আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে তৃণভূমি ধ্বংস হয়ে যায় এবং খাদ্যের অভাব দেখা দেয়। আর ইউনিকর্ন যেহেতু মূলত তৃণভোজী প্রাণী ছিল তাই তুষারাবৃত অঞ্চলে খাদ্যের অভাব বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কিছু গবেষক মনে করেন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিকম্প বা অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয় এদের আবাসস্থলে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিল। ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের কারণে তৃণভূমি ধ্বংস হয়ে যায় এবং খাদ্যের উৎস আরও কমে যায়। দীর্ঘস্থায়ী খরা বা অতিরিক্ত বরফ ঢাকা পরিবেশ এদের টিকে থাকার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। খাদ্য সংকট এবং প্রতিকূল পরিবেশের কারণে এদের বংশবৃদ্ধির হার কমে যায়। এভাবে ধীরে ধীরে ইউনিকর্ন একসময় বিলুপ্ত হয়ে যায়।
তারেক
.jpg)
.jpg)