নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বামনী নদী অববাহিকার বন্যা ব্যবস্থাপনা এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ‘বামনী ক্লোজার বাঁধ’ এখন দৃশ্যমান।
মঙ্গলবার (৯ জুন) অনেক স্রোত ও প্রতিকূলতার মাঝেও বাঁধটি দিতে সক্ষম হয়েছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড (পিডিএল)।
স্থানীয়দের দাবি, বামনী নদীতে এ ক্লোজার বাঁধ স্থায়ী হলে আশেপাশের ৯ লাখ মানুষ উপকৃত হবেন।
বুধবার (১০ জুন) দুপুরে সরেজমিনে ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নোয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ড (ডব্লিউডিবি) এবং প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের (পিডিএল) কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে শত শত শ্রমিক মেশিনের মাধ্যমে জিও ব্যাগে বালি ভরে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করেন। বাঁধের দুই পাশে বামনী নদীতে পানি থই থই করছে। এ সময় বাঁধ দেখতে ডব্লিউডিবি, পিডিএলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা উপস্থিত হন।
পাউবো সূত্র জানায়, বাঁধটি রক্ষা হলে জোয়ার-ভাটার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন প্রতিরোধ, নদীর স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং আশপাশের জনপদ, কৃষিজমি, মৎস্য খামার ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বন্যা ও ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পাবে।
এর আগে গত ১০ মার্চ পানিসম্পদ মন্ত্রী শাহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু যৌথভাবে এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নোয়াখালী জেলায় মূলত অতিবৃষ্টির কারণে বন্যা ও জলাবদ্ধাতা সৃষ্টি হয়। পূর্ববর্তী একটি প্রকল্পের আওতায় বামনী ১৯-ভেন্ট রেগুলেটর নির্মাণ করা হলেও বামনী ক্লোজার নির্মাণ অসম্পূর্ণ থাকায় বামনী নদী হয়ে আলগীর খাল ও নোয়াখালী খালে জোয়ার-ভাটার প্রভাব অব্যাহত থাকে।
এর ফলে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ, উচ্চ জোয়ারে ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট প্লাবিত হওয়াসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নোয়াখালী শহরের পানি নিষ্কাশনের প্রধান খাল নোয়াখালী খালের রিকশাওয়ালার দোকান এলাকায় মাটি দিয়ে একটি অস্থায়ী আড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। এতে লবণাক্ততা ও জোয়ার-ভাটার প্রভাব কিছুটা কমলেও জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।
এ প্রেক্ষাপটে ‘নোয়াখালী জেলার বামনী নদী অববাহিকার বন্যা ব্যবস্থাপনা এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন’ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।
এছাড়া সাড়ে ১০ কিলোমিটার নদী খননসহ ৪৭ কোটি টাকার এ প্রকল্পে ১৯-ভেন্ট রেগুলেটর ও ক্লোজার বাঁধে ২৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। এ ক্লোজারের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪১৫ মিটার এবং গভীরতা প্রায় ১০ মিটার। এ বাঁধ নির্মাণ হলে কোম্পানীগঞ্জ ও কবিরহাট উপজেলার ১৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকার প্রায় ৯ লাখ মানুষ উপকৃত হবেন।
অন্যদিকে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৮০ কোটি টাকার সম্পদ সুরক্ষিত হবে। দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা সমস্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কয়েক লাখ মানুষ, কৃষি, মৎস্যচাষি এবং ব্যবসায়ীরা এর সুফল ভোগ করবেন।
বাঁধ পরিদর্শনে আসা নোয়াখালী-৫ আসনের পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিনিধি যুবায়ের ইসলাম বলেন, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের দক্ষিণাঞ্চলের অবহেলিত জনপদের উন্নয়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতা করায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, পানিসম্পদ মন্ত্রী শাহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু ও স্থানীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামকে ধন্যবাদ জানাই।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পটির মাধ্যমে এলাকার বন্যা ব্যবস্থাপনা, কৃষি উৎপাদন ও সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে নোয়াখালী উপকূলীয় অঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা সমস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। পাশাপাশি কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে এ এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি টেকসই পরিবেশ ও দুর্যোগ সহনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
সার্বিক বিষয়ে প্রকল্পের কাজ পাওয়া প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের (পিডিএল) চিফ অপারেটিং অফিসার সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রতিকূল আবহাওয়া, ভারী বর্ষণ, তীব্র জোয়ারের চাপ এবং অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং কর্মপরিবেশের মধ্যেও প্রকল্পের কাজ সফলভাবে এগিয়ে চলছে। এই বৃহৎ কার্যক্রমে আরএফএল জিও টেক্সটাইল গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা করছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় জিওটিউব, জিওব্যাগ এবং জিওটেক্সটাইল শিটের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করে প্রকল্পের নির্মাণকাজকে গতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
নোয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম রেফাত জামিল বলেন, আগামি ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ থাকলেও জনগণের সুবিধার কথা চিন্তা করে বৈরি আবহাওয়ার মধ্যেও প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের (পিডিএল) কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকরা নিরলস পরিশ্রম করে কাজটি দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সাধারণত এ কাজ অক্টোবরের পরে করার কথা থাকলেও স্থানীয় অধিবাসীদের সুবিধার কথা চিন্তা করেই এই মে-জুন মাসে ঝুঁকি নিয়ে বাঁধটি সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে।
তামান্না রুপা/অমিয়/