২০০৭ সালের ঘটনা। একটি নামকরা সরকারি হাসপাতালে গিয়েছি এক আত্মীয়কে নিয়ে। তার লিভারে সমস্যা। খেতে পারেন না। খেতে গেলে বমি বমি লাগে। গ্রামের অনেক নামকরা ডাক্তার দেখিয়েছেন। শুধু কি ডাক্তার? গ্রামের কবিরাজের ডিম পড়া, কলা পড়া কিছুই বাদ রাখেননি।
মফস্বল শহরের বড় বড় ডিগ্রিধারী ডাক্তারের যখন রোগীর টাকা খাওয়া শেষ। এখন আর তারা কোনো অসিলায় আর টাকা খসাতে পারছেন না ঠিক তখনই বলেন, রোগীর অবস্থা ভালো নয়। ঢাকা নিয়ে যান। তারা আমার শাহজাহানপুরের বাসায় এসে উঠেছেন। প্রতিদিন নিয়ম করে তাকে পিজি হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু সেখানে কোনো সিট খালি নেই। সেখানকার ডাক্তার সিট খালি হলে ভর্তি হতে বলেন। কিন্তু দীর্ঘ ১৫ দিনের মধ্যে সিট খালি হওয়ার মতো নয়। গ্রাম থেকে আসা রোগীকে তো আর ফেলে দিতে পারি না। ধৈর্য সহকারে হাসপাতালে নিয়মিত ঘুরছি। এই আশা, যদি একটু ভালো চিকিৎসায় নষ্ট হওয়া লিভার ভালো হয়।
অবশেষে অপেক্ষার প্রহর শেষ হলো। সিট পাওয়া গেল একটা। ডাক্তার সেলিমুর রহমান। তার আগে লিভারের আরেকজন ডাক্তার ছিলেন মবিন খান। তার হাতযশ ভালো। লিভারে হাত দিলেই লিভার কথা বলত। তিনি দেখে একটা বায়োপসি পরীক্ষা দিলেন। এ পরীক্ষাটা হলো, পেট ফুটো করে লিভার থেকে মাংস কেটে এনে দেখা হয় কতটা ভালো আছে। পরীক্ষার খরচ ধানমন্ডির মতো বড় বড় ডায়াগনস্টিক সেন্টারে তখনকার সময়ে ৮ হাজার। আর পিজি হাসপাতালে করালে লাগবে ১ হাজার ২০০ টাকা।
হাসপাতালে ভর্তির পর আত্মীয়ের জন্য প্রতিদিনই ১১টার দিকে বাসা থেকে খাবার নিয়ে যাই। একদিন নিচ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করব, ঠিক এমন সময় এক অ্যাম্বুলেন্স চালক আরেকজন চালককে বলছেন, এখন পর্যন্ত একটা লাশও নামল না। কথাটা শুনেই আমার ভেতরটা নাড়া দিয়ে উঠল। কয় কী এ ব্যাটা! সে লাশের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। কী সাংঘাতিক ব্যাপার? এখানে লাশ না নামলে যে তাদের আয়-রোজগার হবে না। তার বাড়ি ভাড়া আটকালে বাড়িওয়ালা বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে। বউয়ের কোনো বায়না সে পূরণ করতে পারবে না। তা ছাড়া রয়েছে তার বাচ্চাদের স্কুলের খরচের হিসাব। ঢাকা শহর বলে কথা। সেখানে পড়াশোনা করাতে গেলে খরচ একটু বেশি। তাই টেনশনে আছেন অ্যাম্বুলেন্সের চালক। তার কথা হলো প্রতিদিনই দু-তিনটা করে লাশ নামে। এখানে যে কয়জন চালক আছেন তারা রোটেশন করে লাশ রোগীর বাড়িতে পৌঁছে দেন। এটাই তাদের একমাত্র আয়ের উৎস। তাহলে মৃত্যু কামনা করা ছাড়া কী আর তাদের কোনো গত্যন্তর আছে? যেমন মানুষকে বদদোয়া দিলে বলে শকুনের দোয়ায় গরু মরে না। এখন বদদোয়া যদি কাজে না লাগে তাহলে তো শকুনের অবস্থা করুণ হবে। শকুন না খেয়ে থাকতে থাকতে মারা যাবে। তবে আমাদের পরিবেশ থেকে শকুন মারা গেছে না খেতে পেয়ে নয়। অন্য কারণে। ওষুধ হিসেবে ক্লোফেনাক নামক এক ধরনের বিষাক্ত ওষুধ গরুকে খাওয়ানো হতো আগের দিনে। সে গরু যদি মারা যেত এবং তার মাংস খেয়েই পরিবেশ থেকে শকুন এখন বিপন্ন।
শকুন না হয় বিলুপ্ত প্রায়। তাহলে এই অ্যাম্বুলেন্স চালকরা সারা দিন আল্লাহর কাছে বদদোয়া করে আল্লাহ ওপর থেকে একটা লাশ ফেলো। আমার বাড়ির বউ-বাচ্চা না খেয়ে আছে। তাদের এখন কী হবে? সেদিনের পর থেকে হাসপাতালে গেলেই এ করুণ দৃশ্যটি আমার চোখের সামনে ভাসে। তবে আমি আমার আত্মীয়কে সম্পূর্ণ সুস্থ করে নিয়ে আসতে পেরেছি। শকুনের বদদোয়া কাজে আসেনি। তবে লিভার সিরোসিস হলে প্রথমেই সরকারি হাসপাতালগুলোর শরণাপন্ন হলে রোগী অল্পতেই লিভার সিরোসিস থেকে ভালো হয়ে যায়। দেশের অসংখ্য গরিব রোগী ভিটেবাড়ি বিক্রির টাকা প্রথম ধাপেই মফস্বল ডাক্তার ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার খেয়ে ফেলে। যখন মুমূর্ষু অবস্থায় রোগীকে ঢাকা আনা হয় তখন আর তাদের চিকিৎসা করানোর মতো সহায়-সম্বল থাকে না।
দেশের হাসপাতালে খাবার বরাদ্দ থাকলেও তা রোগীদের ভাগ্যে সামান্য জোটে। সরকার কলা, রুটি ও মাছ মাংস বরাদ্দ করলেও তা থেকে রোগীরা হন বঞ্চিত। একদিন ভাত দেয় তো আরেক দিন ভাত বন্ধ। তাই শকুনরা এ দেশ থেকে বিতাড়িত হলেও মানুষ শকুনগুলো এখনো রয়ে গেছে। তাদের বদদোয়ায় রোগীরা ভালো থাকে কী করে।
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ।
তারেক/
.jpg)